কামাল চৌধুরীর কবিতার সঙ্গে আলাপ-সালাপ : টোকন ঠাকুর

প্রকাশ: ২০১৮-০২-১৬ ৮:২৪:৪০ এএম
টোকন ঠাকুর | রাইজিংবিডি.কম

কামাল চৌধুরী

কবিতা এমন এক আয়না, কবি সেই আয়নার কারিগর। শব্দ-বাক্য-ভাষায় আয়নাটি তৈরি হয়, আয়নাটি থেকে যায়। একদিন আয়নার সামনে কোত্থেকে মানুষের মত একজন এসে দাঁড়িয়ে পড়ে, মানুষের নাম পাঠক। পাঠক লোকটি কবিতার মধ্যে বা আয়নার মধ্যে কী দেখতে পায়? দৃশ্যকল্পটি এরকমও দেখা যায়, ফাঁকা মাঠের দিগন্তে আর কিচ্ছুটি নেই, কিছুই নেই, দূরে ঠিকই আকাশ নেমে মিতালি করছে মাটির সঙ্গে;  হয়তো আকাশের সঙ্গে মাটি বরাবর প্রান্তরে কে যেন এক ঝকঝকে  আয়না টাঙিয়ে গেছে, একদিন কোত্থেকে এক লোক এসে আয়নাটির সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছে। কী দেখছে সে, আয়নার মধ্যে? নিজের মুখ, আরো আরো মানুষের মুখ, পুরো একটি জনপদ, জনপদের ইতিহাস-দুঃখগাথা-প্রেমবিরহ-আশা-আকাঙ্খা-বেঁচে থাকার টুকরো টুকরো অনুভূতি? কী আছে বা কী থাকে সেই আয়নার মধ্যে, কবিতার মধ্যে?


কাচের আয়না নিঃশব্দই থাকে কিন্তু কবিতা-আয়নার শব্দই তো সব। শব্দই প্রধান অবলম্বন কবিতায়। কয়েকটি শব্দ ছাড়া কিছুতেই একটি বাক্য হবে না, কয়েকটি বাক্যই একটি কবিতা বা সেই আয়না। আয়নার কারিগর কবি। আয়নার মধ্যে দৃশ্য ফলিত হয়, শব্দ ধ্বনিত হয়। অসংখ্য মানুষ হেঁটে গেলে যাওয়ার শব্দ মনে হয়, মিছিলের। মিছিলের ভেতর থেকে ডাক আসে মুক্তির, কারণ মানুষ বন্দি থাকতে পারে না, মানুষ মুক্তি চায়। কার কাছে মানুষ বন্দি, কার কাছেই বা সে মুক্তি চায়? মানুষ বন্দি মানুষের কাছে, মানুষের তৈরি করা নিয়ম-নীতি-শাসন-শোষনের কাছে, মানুষ বন্দি বিভিন্ন ট্যাবুর কাছে!

আয়না-কারিগর স্বচ্ছতার  সন্ধানে দিনরাত পেরিয়ে একটি বাক্যের কাছে যান, বাক্য তাকে নিয়ে যায় মানুষের মুক্তির বাসনার কাছে। কবিতা বেরিয়ে আসে। কবিতা জমে জমে আয়না হয়ে ওঠে দিগন্তের মাঠে। আয়না-কারিগরের অনুভূতির জ্বর নিয়ে প্রকাশিত হয় কবিতা। পাঠক, আয়নার মধ্যে নিজেকে দেখতে পেয়ে কবিকে ভালোবেসে ফেলেন। একটা প্রেম তৈরি হয়। অনুভূতির বাতাস দিয়ে মানুষকে দেখা ও মানুষকে ধরার ফাঁদ ফুটে ওঠে কবিতায়। কবিতা আর্ট হয়ে ওঠে। ভালো লাগে। জীবন ও বেঁচে থাকা রক্তজবার মতো টকটক করে। কবি বলেছেন:

‘এই দেশে আমি আছি রক্তভেজা এই জনপদে

সহস্র মৃত্যুর সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হয়ে যায়’

 




বাংলাদেশ এমনই। এর থেকে মানুষ মুক্তি কামনা করে। কবিতা সেই মুক্তির প্রশ্নে পাঠকের মত মানুষকে অনুভূতির স্তরে গিয়ে আরেকটু বায়েত দিতে থাকে, তাকে আরেকটু প্রস্তুত করতে থাকে। একটি প্রোফেটিক উচ্চারণ আয়না-কারিগরের অর্জনে আসে, তখন তার কাছে শব্দ আর শব্দই থাকে না শুধু, বাক্যও থাকে না কেবল বাক্যে নিহিত, বাক্যের মধ্যে ধরা পড়ে সময়। শব্দ তার সীমানা ছাড়িয়ে যায়, বাক্য ছাড়িয়ে যায় তার রচিত পরিধি। বাক্যের মধ্যে গাথা হয় মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তির যুদ্ধও। তবু মুক্তি যেন আর আসেই না, মানুষ মুক্তির গান গায়, সেই গানই শোনা যায় মিছিলে মিছিলে, অনাপোষী তারুণ্যের ঝড়ে, শোনা যায়:

‘তবু আমি ভয়হীন দীপ্র-বর্ণ অনার্য যুবক

অনায়াসে ছিন্ন করি হাতকড়া, আঁধারনীলিমা

নিসর্গ আমাকে চেনে চক্ষুষ্মান মানুষ চেনে না

মানুষ দেখেনি আজো পরাক্রম বাহুর ক্ষমতা

শব্দে শব্দে গড়ে তুলি অলৌকিক নদী ও প্রাসাদ

সবুজ শস্যের গ্রাম, তীব্র ক্ষিপ্র কবির কবিতা

আমার প্রাসাদে এসো, অনুরোধ ফিরে যাবে জানি

তবু আমি দিয়ে যাব সুবর্ণ আমার আমন্ত্রণ

গ্রামগঞ্জ লোকালয় মনে রেখো আমার ঠিকানা।

আমাকে বিশ্বাস করো, অবিশ্বাসী হয়ো না কখনো

আমার ভেতরে জেনো বাস করে লালন ফকির

প্রতিদিন যাকে দেখি সেই আমি আমাকে চিনি না?’


টের পাই, কবি নিজেকে কোথায় স্থিত করতে ইচ্ছে করেন। ইচ্ছে তাকে কোথায় নিয়ে যায়! দিগন্তে আয়না ঝুলছে, আয়নার মধ্যে মেঘ, বনভূমি, একটি জনপদের মানুষের জীবনযাপনের গুঞ্জন ধ্বনিত হচ্ছে। বাংলা ভাষা, বাঙালির জীবন ধ্বনিত হচ্ছে। বাঙালির সংগ্রাম, বাঙালির ঘাম ও নুনের স্বাদ পাওয়া যাচ্ছে। আয়না-কারিগর বলেছেন:

‘ঘামের গন্ধকে বলো নিখিলের হরিৎ প্রণয়

আগামীর স্বপ্ন চোখে সারিবদ্ধ শ্রমিকেরা যায়

তাঁতের শব্দের কাছে আমাদের ভালোবাসা আছে

একবার শব্দ শোনো, শব্দ নয়, আসল প্রণয়’

কী এক উচ্চারণ, কী এক স্বপ্নগ্রস্থ জীবন!  সেই উচ্চারিত-অনুচ্চারিত জীবনের অনুভূতিই জমে জমে দিগন্তের আয়না হয়ে যায়। পাঠক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকি, তখন দেখতে পাই, কারিগর বা কবি বলছেন:

‘সব পাখি উড়ে গেছে, সব প্রেম সন্ত্রস্ত হরিণী

ব্যাঘ্র লালসার কাছে প্রতিদিন খুন হয়ে যায়

প্রতিদিন ভালোবাসা একা একা শুধুই পালায়’

 




তো কবি আসলে কে? ব্যক্তি মানুষটা কে, আর সমাজের তিনি কে? এই সমাজ যতগুলো উপাদানে গঠিত তার মধ্যে কবিতার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? আর যদি হয়, বিশ শতকের শেষার্ধ বা একুশ শতকের সূচনা লগ্নের দিন তাহলে একজন কবি ও তার কবিতাকে কতখানি সময় দেবে সময়? সময় কি নিজে থেকেই নিজেকে দেবে? নাকি কবি বা তার কবিতা দখল করে নেবে সময়ের উপর? ধরা যাক জীবনানন্দ দাশকে বাংলা কবিতা  সময় দিয়েছিল প্রায় দুই দশকের মত, সুকান্ত ভট্টাচার্যকে কয়েকটি বছর মাত্র। আবার রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছে পয়ষট্টি বছরের বেশি সময়। কবি সেই সময়ের মধ্যে বসে কীভাবে সময় দেখছেন, কীভাবে সময়ের ভাষা তুলে রেখেছেন, সময় কীভাবে ভাষা হয়ে উঠেছে তার কলমে!

উপরে লিখিত কবিতাংশ সমূহের কবি কামাল চৌধুরী। কামাল চৌধুরী বাংলাদেশের কবি, বাংলা ভাষার কবি। বাংলাদেশ, কখন থেকে বাংলাদেশ? এই ভূমির রাজনৈতিক পরিচয় নানান সময়ে নানা রকম থাকলেও ঠিক ‘বাংলাদেশ’ হতে পারলো কবে, বিশ্ব মানচিত্রে? এ কথা পৃথিবীর ইতিহাস জানে, ‘বাংলাদেশ’ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করল ১৯৭১ সালে। কী ঘটেছিল ১৯৭১-এ, দক্ষিণ এশিয়ার এই প্রান্তে? মাত্র নয় মাসেই প্রাণ বলি দিতে হলো ত্রিশ লক্ষ মানুষের, তারা এই ভূমির স্বাধীনতা চেয়েছিলেন। উদ্বাস্তু হয়ে যেতে হলো দেড় থেকে দু’ কোটি মানুষকে মাত্র ক’ মাসে। কারণ তখন যুদ্ধ চলছে। দখলদারদের বিরুদ্ধে ভূমিপুত্রের লড়াই। দখলদার পাকিস্তানি, ভূমিপুত্র বাঙালি। চিরকালীন বাস্তবতা, যুদ্ধে যায় পুরুষ, যুদ্ধে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী ও শিশু। আবার নারী ও শিশুকে নিরাপদ রাখতেও যুদ্ধে যায় পুরুষ। ‘বাংলাদেশ’ জন্মের যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ বাঙালি নারীর এলোমেলো হয়ে গেল জীবন। অনাহারে, অপুষ্টিতে অসুখে শরণার্থী শিবিরের রাস্তায় ও তাবুতে মরে গেল হাজার হাজার শিশু। ঠিক সেই সময়ই বালক থেকে বয়ঃসন্ধির দিকে যেতে যেতে, উঠতি বয়সের চোখে কামাল চৌধুরীর মনে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ একটি বড় দাগ ফেলে গেছে। তাঁর কবিতায় সেই দাগ বারবার ফুটে ওঠে, নানান মাত্রায় ফুটে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধকে তার কবিতা ধারণ করেছে। কামাল চৌধুরীর কবিতার পাঠক হিসেবে আমি যে মুক্তিযুদ্ধ দেখতে পাই, সেই যুদ্ধের যোদ্ধারা গ্রাম-গঞ্জের মানুষ, যারা যুদ্ধ করছে তারা পারি দিচ্ছে খাল-বিল-নদী, জলাভূমি, ধানক্ষেত, পাটক্ষেত। তাদের বাড়িতে আছে সেই নারীরা, যাদের নাকে নাকফুল, কলাপাতার শাড়ি পরা, যারা নিজেদের দুঃখ ও ভালোবাসার শ্বাস-প্রশ্বাসের ফোঁড়ে ফোঁড়ে সুই সুতো দিয়ে গেঁথে তোলে নকশি কাঁথা। তাদের উঠোনে হাঁস মুরগি, উঠোনের কোণায় বড় হয়ে ওঠা ডালিম গাছটি, ঘরের চালে ডানা ঝাপটাচ্ছে দুটি কবুতর, বাড়ির বাইরে লাউয়ের জাংলা। কামাল চৌধুরীর কবিতায় সেই জীবনই প্রতিভাত হয়ে আছে। কোথায় যেন স্নিগ্ধ, পরিপাটি এক বাঙালি গার্হস্থ্য এষণায় নিহিত হতে চায় কামাল চৌধুরীর কবিতা।


মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞান কামাল চৌধুরীর কবিতার ভূমিতে একটি বড় ফসল। আর তাঁর বুকের মধ্যে প্রেম, প্রেমও কামাল চৌধুরীর কবিতাকে অনায়াসে দখল করেছে। এ তো কবি চেয়েইছেন, পাঠক জানে, আমিও পাঠক, আমিও তা জানি। কিন্তু কামাল চৌধুরী হয়ত বা চান নি তবুও সীমান্তের চোরাকারবারিদের মত তাঁর কবিতায় অনুপ্রবেশ করেছে কে, পাঠক হিসেবে দেখলাম, সেই অনুপ্রবেশকারীর নাম নারীর কাছ থেকে পাওয়া বিরহ- অর্থাৎ কামাল চৌধুরীর কবিতায় বিরহও একটি সাম্রাজ্য গড়েছে। গ্রাম থেকে আসা সবুজ শ্যামল, ধুলো লাগা শব্দগুলো তাঁর সঙ্গে থাকে, পাখিগুলো তাঁর সঙ্গে থাকে, নদীগুলো তাঁর সঙ্গে থাকে, বাক মোহনার সূর্যাস্ত তাঁর সঙ্গে থাকে, মোরগ-শীর্ষের ছটায় প্রভাসিত ভোরগুলো তাঁর সঙ্গে থাকে। আমরা দেখতে পাই, গ্রাম বাংলার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কবি চলে আসেন নগরের দিকে। নগরে অনেক মানুষ, মানুষের অনেক পা, মানুষের অনেক হাত, মানুষের অনেক মুখ, মানুষের অনেক চোখ। পাগুলো হেঁটে যাচ্ছে দৃপ্ত ভঙ্গিতে, রাস্তায়। হাতগুলা মুষ্ঠিবদ্ধ করে ছুঁয়ে দিচ্ছে অসীম শূন্য আকাশের দিকে। তাদের মুখ থেকে জীবনের দাবি নিয়ে ফেটে পড়ছে সশস্ত্র স্লোগান,  তাদের চোখ থেকে ছিটকে পড়ছে চিরকালের দ্রোহের আগুন- কামাল চৌধুরী কবিতা লিখলেন: ‘মিছিলের সমান বয়সী’

বাংলা কবিতায় সেদিন যে তরুণ কবির আবির্ভাব হলো, তিনিই আজ পরিণত কবি কামাল চৌধুরী। দারুণ ছন্দে বুননশীল তাঁর হাত, কুশলী তাঁর নির্মাণ। পাঠক হিসেবে আমি এখনো তাঁর যেকোনো নতুন কবিতার দিকে খেয়াল রাখি, দেখি, কামাল ভাই কী বললেন আজ ভোরবেলা!

আলোকচিত্র : হোসেইন আতাহার সূর্য



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮/তারা

   
 



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

শোডাউন ছাড়া কোনো চমক নেই এরশাদের

২০১৮-১০-২০ ৮:৫৯:২৫ পিএম

রূপসায় হেইয়ো হেইয়ো, পাড়ে করতালি

২০১৮-১০-২০ ৮:৪৮:৫৪ পিএম