একুশে গ্রন্থমেলা

ও বাসন্তী! তোমারই অপেক্ষায়

প্রকাশ: ২০১৯-০১-২৪ ৩:৩৮:১২ পিএম
হামিম কামাল | রাইজিংবিডি.কম

|| হামিম কামাল ||

ক’দিন পরেই একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হতে যাচ্ছে। আমি জানি, এই ভেবে আমার মতো আরো অনেকেরই বুকের ভেতর বসন্ত ঋতু হাওয়া দিতে শুরু করেছে। ও বাসন্তী! আমি তোমারই অপেক্ষায়। আমাদের হাসান মাহবুব ভাই বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি আসছে না? দেখবি, সব ঠিক হয়ে যাবে।’ আমরা দেখি, সত্যিই কিন্তু; ফেব্রুয়ারি এলে সব ঠিক হয়ে যায়।

হাসলাম। হাসান ভাইও জানেন, কিছুই আসলে ঠিক হয় না। ঠিক হওয়ার মতো দেখায়, শোনায়। কারণ আমাদের নিজেদের একটা মুক্তির সময় চলে আসে বলে আমরাই আসলে কোনো কিছুকে, কোনো সংকটকে, সেভাবে স্বীকার করি না তখন। আমাদের বাঁচার জন্য এটুকু শ্বাস ফেলার জায়গা তো দরকার। আর স্রেফ অস্বীকার করে সেই জায়গায় আমরা নিজেদের পতাকা গেঁড়ে নিঃশ্বাস ফেলে বলি- যাক অন্তত এ ক’দিন দেশ আমার। দেশ যে একটা মানসিক ধারণা সে কথাও মনে রাখি। বলি, হে প্রাজ্ঞ প্রকৃতি, দিনগুলো এমনই রেখো। শুনে প্রকৃতি যখন অলক্ষ্যে হাসিয়া লয়, তখন তাতে আর কটাক্ষপাত করি না। থাক, হাসুক।

যখনও আমি জীবনের এমন স্তরে, জানি না যে বইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা হয়ে যাবে কোনোদিন, তখন থেকে, অর্থাৎ সেই দূর শৈশব থেকে বইমেলা; আক্ষরিক অর্থেই আমার প্রাণে দোলা দেয়। একসঙ্গে এতো বই দেখে আমার দাঁত চুলকাত, মাথা ঝিমঝিম করত। এখনও করে। হয়ত মা-বাবা দু’জনের কাছ থেকে আমি পড়ার স্বভাবটা, বইয়ের প্রতি ভালোবাসাটা পেয়েছিলাম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমার এই পাওয়া তাঁদের জন্যে দুর্ভাগ্যই বয়ে এনেছে, নানা পথে। একটায় আপাতত আলো ফেলছি। আমার পাঠ তাঁদের বেঁধে দেয়া সুশীল পরিধি ডিঙিয়ে আরো বহুদূর চলে গিয়েছিল। এতে আমার বাবা দুঃখী হয়েছেন। মাও খানিকটা দুঃখী হয়েছেন। কিন্তু আমি সুখী হয়েছি।

আমার দেশচেতনা, রাজনীতিক মূল্যবোধের প্রথম পাঠ মায়ের কাছে। বিচিত্র ব্যাপার হলো, সেই পাঠ নিয়ে প্রথম প্রতিপক্ষ হিসেবে বাবাকে পেয়েছিলাম। যাহোক; বইমেলা নিয়ে মায়ের সঙ্গে ভীষণ সুখের একটা স্মৃতি আছে আমার। ঘটনাটা খুবই সামান্য প্রতিপন্ন হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে এর আনন্দমূল্য তখনও ছিল অসীম, এখনও তাই। তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। সালটা ১৯৯৮। এর আগে ৯৪-এর দিকে বাবা বলেছিলেন, ৯৬-এ একটা মার্সিডিজ গাড়ি কিনব আমরা। কী হইতে কী হইলো, ভুবন পলাইল। বাবার মার্সিডিজ আর এলো না। কিন্তু আমার মান বাঁচল। কারণ ঠিক ৯৬-এ আমি স্কুল বদলে ফেলেছি।

আমার বাবার অপচয়িত বিচিত্র যৌবন নিয়ে আর কখনো বলব। তো, ওই সময়টায়, ৯৬-এর মার্সিডিজ যখন আমার মনের সুপ্ত বাসনাকে উপেক্ষা করে ৯৮-তেও এলো না, আমি আমার পরিবারের অভাব নিয়ে বাবা এবং মায়ের চেয়েও বেশি চিন্তিত হয়ে পড়লাম।

মার্সিডিজের কথা শুনে বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ নেই। আমাদের পরিবার নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে ধীরে মধ্যবিত্তের উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে তখন, ঘরে ঢুকতে পারেনি। এখন ঘরে ঢুকেছে কোনোক্রমে। যাহোক। মন তা থৈ বই মেলায় যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু ক’টা বই নিতে পারব তা নিয়ে আমার ঘোর সন্দেহ। তো মেলা ঘুরে দুটো বই পছন্দ হলো। একটা আনিস সিদ্দিকীর ‘দুঃসাহসী হুগো’। দুঃসাহসী হুগোর কয়েক পাতা উল্টে আমি আটকে গেলাম। বড়লোকের ছেলে হুগোর অমন আশ্চর্য স্বেচ্ছানির্বাসন আমাকে ভীষণ ছুঁয়ে গেল। বইটা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা মনে জাগল। তখন চোখে পড়ল অপর আরেকটা বই। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আম আঁটির ভেঁপু’। বইয়ের নামটা তেমন টানছে না। কিন্তু প্রচ্ছদের রূপসী কিশোরী আমার মন চুরি করে নিলো। (দুর্গা যখন পৃথিবীর আলোয় আর চোখ চাহিবে না, তখন যে আমার বুকটা মন না মানা হাহাকারে ভরে উঠবে তা তো আর তখনো জানা নেই।)

আমি মনে মনে ভাবছিলাম, যেহেতু আমার টাকা কম, আমরা গরিব, বই নেবো যে কোনো একটা। কিন্তু কোনটা নেবো? খুব দোটানায় পড়ে গেলাম। হুগো ডাকছে, আর দুর্গা টানছে ভীষণ। মায়ের শরণ নিলাম। বললাম, ‘মা, বই তো দু’টো পছন্দ হলো। কোনটা নেবো?’

আমার মা, তখনও তার শিক্ষকতার প্রাথমিক স্কুলটা আজকের মতো হাইস্কুল হয়নি, হেসে যে উত্তরটা দিলেন, তা শুনে আমি আজীবনের মতো কৃতজ্ঞ হয়ে থাকলাম। আমার শিশু মনের অমন আনন্দের আর কোনো ক্ষণের কথা সত্যিই এখনো মনে পড়ে না। মা বললেন, ‘দুটোই নাও।’ আমি বলি, ‘টাকায় হবে?’ মা বললেন, ‘কেন হবে না পাগল ছেলে!’

বটেই তো। কেন হবে না। দু’টো বই বুকের সঙ্গে চেপে ধরে বাসায় ফিরে এলাম। দু’টোই চোখের জল ঝরিয়ে আমাকে সুখী করল।

এখন তো বইমেলা নিয়ে উন্মাদনাটা ব্যক্তিগত নয়। আমরা যারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছি, তারা ইতোমধ্যেই বারবার পরস্পরকে মনে করিয়ে দিচ্ছি মেলার কথা। বলছি- কী রে, কড়া নাড়ছে রে! এই রে, বন্ধুরা তো একে অপরকে প্রায়ই খুঁজে পাই না মেলায়, মনে পড়ে গেল। ব্যবধানটা কেবল দিকভ্রমে নয়। মেলা যেন পুরো পূর্ব আর পশ্চিম দুই বাংলায় বিভক্ত হয়ে গেছে। মধ্যখানে পিচঢালা দোয়েলগামী নদী। নদী দোয়েলগামী; সে বড় ব্যস্ত, এপাড় আর ওপাড় করে মানবসমস্ত। আমার কিন্তু খুব মন খারাপ হয়। গোটা মেলাটা পশ্চিমের সোহরাওয়ার্দী অংশে করাটা কি খুব অশোভন?

ওরে ভাই, দাঁড়া দাঁড়া! কারা করে তাড়া রে? সত্যি, পুঁজির পুঁজ যেভাবে গন্ধ ছড়াচ্ছে, আর সহ্য করা মুশকিল। ওই গন্ধেরা দেখি দেহধারী গন্ধবহতে পরিণত হয়েছে। ওদের তাড়ায় মেলার এক মাথা থেকে আরেক মাথায় ছুটে যাই। কালী মন্দিরের ফটকের পাশে পুকুরপাড়ের সিঁড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়াই, মা কালী রক্ষা করবেন এ আশায়। দেবীর ফটকের বাইরে আমরা দাঁড়িয়ে থাকি, সময় বলি দিই। বর চাই, কিছু মেলে না। কালির সাধনা করলে হয়ত কালীকে পাওয়া হয় না।

তাড়া যারা করে, তারা কখনো ব্যক্তি, কখনো ব্যক্ত। কখনো বেহাড় লেখক, কখনো চিবুক উঁচু প্রকাশক। কখনো ছোবলোদ্যত দণ্ডমুণ্ডের কর্তা এবং তার কর্তাভজা সম্প্রদায় । ব্যক্তি, ব্যক্ত দুটোই শক্তি। যেখানে আমাদের এমন শাক্ত দেখেও স্বয়ং দেবী অস্বীকার করলেন, সেখানে ওসব শক্তি আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রভাবের বিচিত্র বিকটতা তো দেখাবেই। এই যেমন, ফি-বছর আমাকে বলে, রে নির্বোধ, আমার পূজারি হ! কী ব্যক্ত, কী ব্যক্তি- দু’টোই একই কথা বলে। এবারও হয়ত বলবে। কে জানে?

কী! শেষ দুই প্যারার হেঁয়ালিটা বোঝা গেল না­- তাই কি? থাক। এ কথাগুলো ব্যথার কথা। তাই হেঁয়ালির আড়ালে থাক। ব্যথাকে প্রকাশ্য করতে নেই। প্রকাশ্য হবে আনন্দ। আমাদের ব্যক্তিগত আনন্দী বসন্তের অপেক্ষায় আছি। পৃথিবীর বিচিত্র বিশাল একুশে গ্রন্থমেলা অমর হয়েছে। আমরা তার করতলগত করতালির লোক। অতএব, বাদ্য বাজাও!




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৪ জানুয়ারি ২০১৯/তারা

   
 


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

‘অন্যায়ের সঙ্গে আপোস নয়’

২০১৯-০৩-১৯ ১০:৩০:১৬ পিএম