বই বনাম সাহিত্য

প্রকাশ: ২০১৯-০২-২৫ ১:৪০:৪৬ পিএম
মুম রহমান | রাইজিংবিডি.কম

এটা মনে রাখা দরকার, বইয়ের গায়ে দাম লেখা থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে-দামটা সাহিত্য মূল্য বিবেচনায় হয় না। সাধারণ ফর্মা হিসাবে, ছাপার খরচ ধরে বইয়ের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। বিষয়বস্তু হিসাবেও অনেক সময় বইয়ের দাম ধরা হয়। মানে নোট বই চলে বেশি, তার দাম কম রাখলেই হয়। আবার অতি গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ কম চলে, খরচ ওঠানোর জন্যে তার দামও কম রাখতে হয়। বাজারে যে-বই বেশি চলে তার দাম কম, যে বই কম চলে তার দাম বেশি। হিসাবটা অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত, সাহিত্য-রীতির সঙ্গে নয়। এমন তো নয় যে, জেমস জয়েসের বইয়ের দাম আর হেডলি চেজের বইয়ের দামের হেরফের আছে। কিন্তু দামের হিসাব দিয়ে তাদের কারো রচনার সাহিত্য মান হিসাব করা যায় না। মনে রাখতে হবে, বই বিক্রি হয়, সাহিত্য বিক্রি হয় না।

আজকাল ইউটিউব, ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম এবং বিবিধ সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে বিশ্বে অনেক তারকা লেখক তৈরি হচ্ছেন। তাদের কেউ কেউ চমকপ্রদ লেখেন। তাদের লেখা বেশ বেচা-কেনা হয়। কিন্তু সাহিত্য বাজারটা বেচা-কেনার হিসাবে চলে না। লেখক যে লেখাটি লেখেন; লেখার দায় এবং মালিকানা লেখকেরই থাকে। গ্রন্থস্বত্ত্ব তাই লেখকের। কিন্তু প্রকাশক যখন লেখাটি ছাপেন বই আকারে তখন তার ব্যবসায়িক দায় দায়িত্ব তার। বইয়ের সঙ্গে ব্যবসার সম্পর্ক গভীর। কারণ দিনশেষে প্রকাশনা একটা ব্যবসা। যে ব্যবসা করে দেশে-বিদেশে বহু লোক ভালোভাবে চলেন। কিন্তু সাহিত্য স্রেফ ব্যবসায়িক প্রণোদনায় সৃষ্টি হয় না। সাহিত্যে সৃজনশীলতা, সৃষ্টিশীলতা, আবেগ ইত্যাদি আছে, থাকে। কিন্তু ব্যবসায়ীকে ভাবতে হয় বইয়ের বিপণন, প্রচার এবং লাভ-লোকসান নিয়ে।

এই কথাগুলো মনে রাখলে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে উঠবে যে, বই বিক্রির হিসাব দিয়ে সাহিত্যিক হওয়া যায় না। হয়তো-বা যায়ও ক্ষেত্র বিশেষে। মানে খুব বাজে লেখা বইও প্রচুর বিক্রি হতে পারে, আবার খুব উঁচু লেখা বইও ভালো বিক্রি হতে পারে। কিন্তু তবুও, পাঠক আর ক্রেতা যেমন এক নন, প্রকাশিত বই আর সাহিত্যও এক নয়। সাহিত্য বই আকারে ছাপা হয়, আবার প্রচুর অ-সাহিত্যও বই আকারে ছাপা হয়। এমনকি কু-সাহিত্যও বই আকারে ছাপা হয়। ক্রেতা যখন বই কেনেন তখন সে উঁচু দরের এমনকি মাঝারি দরের পাঠকও না-হতে পারেন। বই যেহেতু পণ্য তা কেনায় বাধা নেই। যার যে বই খুশি, যতো খুশি কিনতে পারে। বই কিনে কেউ যেমন দেউলিয়া হয় না, তেমনি বই কিনলেই কেউ জ্ঞানী হয় না, এমনকি পাঠকও হয় না। এই যে কোটি কোটি টাকার বই কেনা-বেচা হয়, কোথাও কি হাজার টাকার আলোচনাও হয় সেই সব বইয়ের ভিতরের পদার্থ নিয়ে? ক্রেতারা বই কেনেন, অটোগ্রাফ নেন, ফটোগ্রাফ নেন, স্যোসাল মিডিয়া সে সব প্রকাশও করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বইটির ভাগ্যে কী থাকে? কয়টা বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া আমরা জানতে পাই।

আরেকটি বিষয় হলো, বই আকারে অনেক কিছুই ছাপা হতে পারে। রান্নার বই তো আর সাহিত্য মানে বিচার্য নয়। তেমনি কৌতুকও সাহিত্য নয়। জেরম কে জেরম, সৈয়দ মুজতবা আলী কিংবা শিবরাম চক্রবর্তী বিশ্বমানের রম্যরস তৈরি করেছেন। তাদের সাহিত্যে রসের রসদ তো কম নয়। কিন্তু বাজার ভর্তি ‘হাসির কৌতুক’র বইগুলো প্রচুর বিক্রি হলেও সেগুলো সাহিত্য নয়। যেমন ধর্মীয় অসংখ্য বই সারা বছর রচিত হয়, বিক্রিও হয় প্রচুর। তার অধিকাংশই সাহিত্য নয়। আমাদের জানা অন্যতম কয়েকটি ধর্মের প্রধান কিতাবগুলো যথেষ্ট সাহিত্য মানসম্পন্ন। কিন্তু ধর্মকে পূঁজি করে রচিত অসংখ্য বই আছে যাকে সাহিত্য মানে ফেলা মুশকিল হবে। সত্যিকার অর্থে ফেলার দরকারও নেই। যা কিছু বই আকারে হবে তার সবই সাহিত্য হতে হবে এমন কোনো দিব্যি তো কেউ দিতে পারে না। রান্নার বই যেমন জরুরি, কৌতুক যেমন জরুরি, আরও জরুরি বাজারে বের হওয়া ম্যানুয়াল টাইপের অনেক বই। কী দিয়ে কী হয়, কী করলে কী হয় টাইপের বই তো কম নয়। ইদানিং মোটিভেশনাল স্পিকার বা অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তব্য নিয়ে একাধিক বই প্রকাশিত হচ্ছে। কোনোটি আবার বিক্রির তালিকায় সর্বোচ্চ। এইসব বই তাদের পাঠককে অনুপ্রাণিত করলেই হবে; সেগুলোকে আর যাই হোক সাহিত্যের কাতারে ফেলা যাবে না। দরকারও নেই।

যেটা গুরুত্বপূর্ণ এবং দরকারী, সেটা হলো ঘোষণা দিয়ে সাহিত্যের বাজারে যা বই আকারে ছাপা হয়, তার সাহিত্য মান। সাহিত্যিক হিসাবে সুপরিচিত ব্যক্তিও যখন সাহিত্য মানহীন রচনাকে বই আকারে প্রকাশকের কাছে বিক্রি করেন এবং প্রকাশক তা পোস্টার-ব্যানার-বিজ্ঞাপন সহযোগে বিক্রি শুরু করেন তখন বই এবং সাহিত্য উভয়েরই ক্ষতি হয়। আদতে বই যখন পণ্য, তখন সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাহিত্য বাজার। কারণ পণ্যের সঙ্গে লড়াই করার মতো মানসিকতা বা আগ্রহ নিয়ে সাহিত্য হয় না, হওয়া উচিতও নয়। বিশ্বের বহু বড় মানের সাহিত্যিকদের রচনাকে আমরা বাজার দর হিসাবে বিবেচনা করি না, করা উচিতও নয়। আমাদের অনেক দ্বিধা ও কোন্দল দূর হতে পারে, যদি শুধু এই ব্যাপারটি বুঝতে পারি যে, বই আর সাহিত্য সদা এক জিনিস নয়। বই আকারে প্রচুর অ-সাহিত্য ছাপা হয়, আবার সাহিত্যের নামেও প্রচুর দুর্বল বই ছাপা হয়।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯/তারা

   
 


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

‘অন্যায়ের সঙ্গে আপোস নয়’

২০১৯-০৩-১৯ ১০:৩০:১৬ পিএম