বেস্ট সেলিং বইয়ের পাঠক কারা?

প্রকাশ: ২০১৯-০৩-০৫ ৬:৩৮:১৩ পিএম
অনার্য মুর্শিদ | রাইজিংবিডি.কম

অনার্য মুর্শিদ : ‘জনপ্রিয় সাহিত্য এবং মননশীল সাহিত্য’ এই সময়ের একটি স্পর্শকাতর বিষয়। অনেকে এ বিষয়ে কথা বলাকে ‘গুরুতর পাপ’ বলে মনে করেন। এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে কেউ ক্ষেপে যান, কেউ আমতা-আমতা করেন। বিষয়টিতে আমরা মোটা দাগে তিনটি শ্রেণী পাই। অধিকাংশকেই দেখবেন মননশীলতার পক্ষে। খুবই অল্পবিস্তর পাবেন যারা তথাকথিত জনপ্রিয় ধারার পক্ষে। নগণ্য একটা অংশ পাবেন যাদের মতে, দুটো বিষয়ই আপেক্ষিক এবং বিষয়টি নিয়ে তারা কোনো আলাপেই বসতে চান না।
এই পরিসংখ্যান আপনাকে মানতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। কারণ এটা সমগ্র পাঠকের পরিসংখ্যান নয়। আমার মতে, এই পরিসংখ্যান শুধু সংবেদনশীল পাঠকদের। প্রশ্ন হতে পারে মননশীল সাহিত্যের পক্ষে এতো পাঠক থাকার পরও কেন রকমারিতে ‘প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ’ বেস্ট সেলার হয়? প্রশ্নটি সন্দেহজনক। উত্তর একটাই- যারা বেস্ট সেলারের কনসেপ্টের বিরুদ্ধাচরণ করছেন তাদেরও একটা বড় অংশ বেস্ট সেলার হতে চেয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধাচরণের ধরন বলছে- ‘আমার বইটা কেনো বেস্ট সেলার লিস্টে এলো না?’

বিষয়টিকে যারা আপেক্ষিক বলে প্রস্তাব করেন তারা আসলে তথাকথিত জনপ্রিয় ধারার পক্ষে। আপনি দেখবেন, তারা হয় নিজে ওই ধারার লেখক অথবা চটি দর্শনের অনুসারী। প্রকৃত অর্থে মননশীল সাহিত্যধারার পক্ষে পাঠকের সংখ্যা নিতান্তই সামান্য। একথা সর্বজনস্বীকৃত মননশীল মানুষের সংখ্যা যুগে যুগে কমই হয়। সেই বিবেচনায় বেস্ট সেলিং নিয়ে আফসোস বা পরিহাস এক প্রকার সময় নষ্ট বটে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে এই লেখাটিও।
তবু একটা বিতর্ক কোথায় জানি থেকেই যায়! তার প্রকৃষ্ট উপমা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং হুমায়ূন আহমেদ। এঁরা জনপ্রিয় ছিলেন, আছেন এবং আরো অনেকদিন বেঁচে থাকবেন পাঠক হৃদয়ে। এর কারণ কী? এই উত্তর দেয়ার যোগ্যতা আমার নেই। কারণ একজন শরৎ এবং একজন হুমায়ূনের কাছে আমি দুধশিশু। আমি সে পরিমাণ সাহিত্য তৈরি করতে পারিনি যে, তাদের সমালোচনা করার প্রতাপ প্রদর্শন করতে পারি। অন্যদের বরাত দিয়ে হয়ত আমি কিছু বলতে পারি। অতি সম্প্রতি কবি ও চিত্রশিল্পী দ্রাবিড় সৈকত এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন: ‘হুমায়ূন আহমেদ আমাদের যে রকমটা বুঝেছেন এরকম আর কোনো সাহিত্যিক আমাদের এতোটা বুঝেছেন কিনা জানি না। কিন্তু বুঝে তিনি করেছেনটা কী? এমন একটা চরিত্র তিনি দাঁড় করিয়েছেন যে কিনা খালি পায়ে হাঁটে, কোনো রকম কাজকর্ম করে না। একজন সাহিত্যিকের কাজ তো বাউন্ডুলেপনা উস্কে দেয়া না, তার পাঠককে অকর্মণ্য বা নির্লীপ্ত করে দেয়া না। তিনি মিসির আলী চরিত্রকেও হিমুর মতোই বিশ্লেষণ করেছেন।’

আমার কাছে তার এই ব্যাখ্যা শতভাগ সত্য মনে হয়েছে। শিল্পীর দায় আছে। বাঙালির এই পরিমাণ সংকটের মধ্যেও যারা মনে করেন শিল্পীর দায় শুধু শিল্পের কাছে এবং যারা মনে করেন, শিল্প কেবল একটা পেটবান্ধব মাধ্যম, তাদের প্রতি করুণা বর্ষণ করা ছাড়া আমাদের উপায় থাকে না। ঈশ্বরের মতো শুধু করুণা বর্ষণ করেই ক্ষান্ত হবো না। মাঝেমধ্যে মনে হয় এদের খোঁয়াড়ে ঢুকানো উচিত। শিল্প-সাহিত্যেও যদি ভেজালবিরোধী অভিযান চালানো যেত, তবে কত বেস্ট সেলার যে খোঁয়াড়ে ঢুকত তার ইয়াত্তা নেই। রেস্টুরেন্টে পঁচা-বাসি, অখাদ্য পরিবেশনের জন্য যদি ভোক্তা অধিকার আইন থাকতে পারে তবে শিল্প-সাহিত্যে কেনো ভোক্তা অধিকার আইন থাকবে না! পুঁজিবাদের এই ভয়াল সময়ে এসেও যারা মনে করেন, শিল্প কোনো পণ্য নয়, তাদের জন্যও করুণা। শিল্পের মূল্য আমরা দিতে না পারলেও তা এক সময় পণ্য হবেই। এই চিরন্তন সত্যটি আমাদের বিশ্বাস করতেই হবে। শিল্প কীভাবে পণ্যসভ্যতার করালগ্রাস থেকে উদ্ধার করা যায়, শিল্প কীভাবে বেঁচে থাকবে সেটা আরো বিস্তর আলাপ। এই সংকটে শুধু বাংলাদেশই পড়ে নেই, বিশ্ব এখন পণ্যসভ্যতা থেকে মুক্তি চায়। যতক্ষণ আমরা স্বীকার করব না ‘আমাদের সব কিছুই এখন পণ্য সভ্যতার অংশ’ ততক্ষণ আমাদের মুক্তি নেই।

বেস্ট সেলিংয়ের ধারণাটি বাংলাদেশে নতুন। কয়েক বছরের চর্চা এটি। বিশ্বায়ন এবং প্রযুক্তি এই ধারণা এনে দিয়েছে আমাদের মাঝে। বিশ্বায়ন থেকে কি নেব আর কি নেব না এটা ঠিক হওয়ার আগেই জোয়ারের মতো এটি আমাদের দেশে প্রবেশ করেছে। এটা যখন পিলপিল করে আসছিল তখনই আমাদের উচিত ছিল কিছু নীতি নির্ধারণ করা। তাহলে অন্তত দেশবিরোধী, মানবতাবিরোধী কোনো কন্টেন্ট তৈরির ভাবনা কারো মাথাতেই আসত না। এখন একজন তরুণ ফিল্মমেকার জানে কোন সিনেমা বানালে অস্কার পাওয়া যাবে, আর কোন সিনেমা বানালে বাংলাদেশি পুরস্কার পাওয়া যাবে। ধরুন মুক্তিযুদ্ধের উপর দু’জন নির্মাতা দুটি মানসম্মত চলচ্চিত্র বানাল। একটির প্রধান চরিত্র একজন রাজাকার। অন্যটির প্রধান চরিত্র একজন আমেরিকান নাগরিক, যে কিনা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের। আমাদের মেধাবী চলচ্চিত্রকারদের বুঝতে অসুবিধা হবে না যে, আমেরিকান নাগরিক যে চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র সেটিই অস্কারে গ্রহণযোগ্যতা পাবে। কারণ তারা জানে অস্কার কারা দেয় এবং কেন দেয়। যারা অনলাইনে বেস্ট সেলার লেখক হয়েছেন, তারাও জানেন এই দেশে কী লিখলে চলবে আর কী লিখলে চলবে না। যাক সে কথা, আমি ভাবছি, এই বেস্ট সেলার বইয়ের যারা ক্রেতা তাদের নিয়ে। আমি ‘প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ’ বইটির কথা  জানতাম না। বছরখানেক আগে আমার এক ছোট ভাই, যে কিনা একটি রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের একনিষ্ঠ কর্মী; আমাকে প্রশ্ন করল-‘আপনি কি বইটা পড়েছেন ভাইয়া? খুব জনপ্রিয়! ওটা পড়লে আপনার চিন্তা বদলে যাবে এবং মনে হবে আপনার কোথায় কোথায় ভুল ছিল।’ আমি বললাম, ‘আমাকে দাও তো দেখি। আমি ফটোকপি করে ঢাকা নিয়ে যাব।’ সে তখন বলল, ‘আমি এখনো পড়ি নাই, শুনেছি কেবল। ইনশাআল্লাহ পড়ব।’
এই বইয়ের মার্কেটিং কতদূর পর্যন্ত পৌঁছেছে সেদিন বুঝেছিলাম। এবং আজকে যারা বেস্ট সেলার ঘোষণা দিচ্ছে আমি তাদের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন করব না। কেন তারা ওই বইগুলোর মার্কেটিং করে? আপনার যদি ইচ্ছে হয়, এই প্রশ্ন নিজেকে  করুন। আমার শঙ্কা এই বেস্ট সেলিং বইয়ের পাঠকদের নিয়ে।

জ্ঞানীজনেরা বলেন, ভুল ওষুধ যেমন মানুষের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি ভুল বই জাতির জন্য সমান ক্ষতিকর। সেই ভুল বইয়ের ক্ষত মস্তিষ্কে নিয়ে অনেকেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন আপনার চারপাশে। মাঝেমধ্যে আপনিও আক্রান্ত হন। কিন্তু জানেন না কেন? জানবেন কোত্থেকে! আমরা মুখ দেখি, বুক দেখি না, মস্তিষ্ক দেখি না। এ প্রসঙ্গে আমি কবি মাজহার সরকারের একটি ফেসবুক পোস্ট উদ্ধৃতি না দিয়ে পারছি না। মাজহার আমার মনের কথাটি বলেছেন। পোস্টের অংশবিশেষ এমন: ‘মধুর ক্যান্টিনে সিগারেট খাওয়া এক প্রকার নিষেধ। ব্যাপারটাকে শুধু ধূমপান ভাবলে ভুল হবে। এর সঙ্গে জড়িত আড়ষ্টতার বিরুদ্ধে মুক্তবুদ্ধির উন্মীলন। চারুকলার পাশে ছবির হাটের মতো আড্ডা বন্ধ, আজিজ সুপার মার্কেটের সাহিত্য আড্ডাখানাগুলো এখন কাপড়ের আড়ত। আজকাল প্রগতিশীল সংগঠনের নেতারা সিগারেট বা মদকে ক্ষতিকর না ভেবে পাপ মনে করছে। মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে, নাস্তিক্যের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে তলে তলে চালান হয়েছে ভয়ানক মৌলবাদী অচলায়তন। তাহলে মিয়া, বইমেলায় আপনার পাঠক যাবে কীভাবে? পকেটে টাকা নাই, প্রচার নাই, তথ্য নাই, আড্ডা নাই, যোগাযোগ নাই। যাদের বই বেস্ট সেলার হয়েছে তাদের প্রত্যেকের গত দশ বছরের গোয়েন্দা রিপোর্ট নেন, বাপ-দাদা-খালা-ফুপার খোঁজ নেন, অর্থনৈতিক চ্যানেল বের করেন, ঢাকায় কই থাকে কাদের সঙ্গে থাকে খোঁজ নেন। আপনারা সারফেস বলেন, আর আমরা দিস্তা দিস্তা গবেষণা রাখি হাতে।’

আমিও মনে করি, এ বিষয়ে যথেষ্ট গবেষণা হয়েছে। আপনার যদি আবুল বারাকাতের লেখা ‘মৌলবাদের অর্থনীতি’র সাথে পরিচয় থাকত তাহলে বেস্ট সেলার বইয়ের রহস্য বের করতে কষ্ট হতো না। আমি কেবল এই একটি বই দিয়েই প্রসঙ্গের অবতারণা করলাম। গল্প, উপন্যাস বা অন্যান্য বই যেগুলো বেস্ট সেলারের তালিকায় ছিল সেগুলোর কন্টেন্ট পোস্টমর্টেম করে তলিয়ে দেখার দায়িত্ব আপনাদের। আমার সেগুলো নিয়ে ভাবনা নেই। কারণ দশক না ঘুরতেই অনেক বেস্ট সেলার ঔপন্যাসিক আমাদের মধ্য থেকে হারিয়ে গেছেন। যেমন প্রণব ভট্ট, এমডি মুরাদ, ফিরোজ আশরাফ। অনেকেই নামগুলো শুনে হয়ত ক্ষেপে গিয়ে বলতে পারেন- তাহলে রসময় গুপ্ত এই তালিকায় নেই কেন? আপনি যেহেতু রসময়কে একটা ক্লাসে নিক্ষেপ করতে পেরেছেন, অতএব আপনাকেও কি একটা ক্লাসে নিক্ষেপ করা উচিত নয়?  আসলে আমরা স্বীকার করি বা না করি লেখক বা পাঠকের একটা ক্লাস অবশ্যই আছে। এটা যারা পাঠক এবং যারা লেখক তারা জানেন। আর  ক্লাস আছে বলেই ক্ল্যাশও আছে। এখানে পাঠককেই ঠিক করতে হবে, তিনি কোন ক্লাসে থাকবেন, কোন রুচিতে বাস করবেন। তবে শুধু পাঠককে ঠিক করলেই চলবে না, লেখককেও পাঠকের রুচি তৈরির দায়িত্ব নিতে হবে। অনেকেই সে দায়িত্ব পালন করছেনও। এখন শুধু তাদের খুঁজে নেয়ার পালা। চলমান বাজার আপনাকে কখনোই তাদের খুঁজে বের করে দেবে না। কারণ তাদের রুচি-দর্শনে ঝামেলা আছে- এটা আপনিও জানেন। ভাবনা সকলের, সিদ্ধান্ত আপনার।

লেখক : প্রাবন্ধিক, চলচ্চিত্রকর্মী



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ মার্চ ২০১৯/তারা

   
 


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

‘অন্যায়ের সঙ্গে আপোস নয়’

২০১৯-০৩-১৯ ১০:৩০:১৬ পিএম