হিসাব রক্ষণে ৩৩ দুর্নীতিতে দুদকের ২১ সুপারিশ

প্রকাশ: ২০১৯-০৩-১১ ৮:১৮:১০ পিএম
এম এ রহমান | রাইজিংবিডি.কম

এম এ রহমান মাসুম : উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি বিভিন্ন ক্রয় কিংবা পেনশন ভাতাসহ বিভিন্ন বিলের অর্থ ছাড় করতে আদায় হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এমন ৩৩টি সম্ভাব‌্য দুর্নীতি উৎস চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে ২১টি সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

সোমবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের নিকট “হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়সমূহ-এর” ‘দুর্নীতি সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিমের অনুসন্ধানী এবং পর্যবেক্ষণমূলক প্রতিবেদন হস্তান্তর করেছে দুদক।

দুদক কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান প্রতিবেদন হস্তান্তরকালে বলেন, দেশের উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে দুর্নীতি দমনের যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন তা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে পেয়েছি। এখন দরকার দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক টিমসমূহের কার্যক্রম সমন্বিত উদ্যোগরই একটি অংশ।

তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন হিসাব রক্ষণ কর্মর্কার কার্যালয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধে গঠিত কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক টিমের রিপোর্টে মোটা দাগে ৩৩টি দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তা নিরসনে ২১ দফা সুপারিশ রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দুদকের এই কার্যক্রমকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি কমকর্তা-কর্মচরীকে দুর্নীতিমুক্ত থাকতে হবে।

দুদক দুর্নীতির যে ৩৩ উৎস চিহ্নিত করেছে-

১। সরকারি দপ্তরসমূহ কর্তৃক ক্রয়ের ক্ষেত্রে সংঘটিত অনিয়মসমূহের উপর যথাযথ প্রি-অডিট আপত্তি প্রদান না করে অনিয়মিত অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে বিল পাশ করা হয়ে থাকে;

২।  সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীর কর্ম অবসানে অবসরে গমনকালে সর্বশেষ হিসাব রক্ষণ  দপ্তর কর্তৃক তার প্রত্যাশিত শেষ বেতনপত্র (ইএলপিসি) ইস্যুর ক্ষেত্রে অনাকাঙ্খিত বিলম্ব ঘটে থাকে;

৩।  কর্মকর্তাদের সার্ভিস স্টেটমেন্ট ইস্যুর ক্ষেত্রে হয়রানি মুক্ত সেবা প্রদান করা হয় না;

৪।  কর্মচারীদের সার্ভিস বুক ভেরিফিকেশনের বেলায় অনিয়মিতভাবে অর্থ আদায় করা হয়ে থাকে;

৫। কর্মকর্তা/কর্মচারীদের সিলেকশন গ্রেড/টাইম স্কেলে বেতন নির্ধারণের বেলায় এবং বেতন নির্ধারণের পর এরিয়ার বিল দাখিল করা হলে অনিয়মিতভাবে আর্থিক সুবিধা আদায় করা হয়ে থাকে;

৬।  কর্মকর্তা/কর্মচারীদের পে-ফিক্সেশনের বেলায় অনিয়মিতভাবে আর্থিক সুবিধা প্রদানের দাবী করা হয়;

৭। কর্মকর্তা/কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ তহবিল (জিপিএফ) হিসাব খোলার সময় অনিয়মিতভাবে অর্থ আদায় করা হয়ে থাকে;

৮। কর্মকর্তা/কর্মচারীদের জিপিএফ অগ্রিমের অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে অনিয়মিতভাবে আর্থিক সুবিধা আদায় করা হয়;

৯। কর্মকর্তা/কর্মচারীদের জিপিএফ হিসাব হতে চূড়ান্ত অর্থ পরিশোধের বেলায়ও অনিয়মিতভাবে আর্থিক সুুবিধার দাবী করা হয়ে থাকে;

১০।  সরকারি বিভিন্ন অগ্রিম যথা-গৃহ নির্মাণ, গাড়ি, মোটর সাইকেল, কম্পিউটার ইত্যাদির বিলের অর্থ প্রাপ্তিতে অনিয়মিত আর্থিক সুবিধা প্রদান করতে হয়;

১১। সরকারি প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষকসহ কর্মচারীদের পেনশন সংক্রান্ত আনুতোষিক (গ্র্যাচুইটি) প্রাপ্তির ক্ষেত্রে  অনিয়মিত অর্থ প্রদান করতে হয়;

১২।  ভ্রমণ ভাতার বিল পরিশোধের জন্য একটি নির্দিষ্ট হারে অনিয়মিত অর্থ পরিশোধ করতে হয়;

১৩।  আনুষঙ্গিক ও অন্যান্য খাতের বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হারে অনিয়মিত অর্থ প্রদান করতে হয়;

১৪।  শ্রান্তি-বিনোদন ভাতার বিল উত্তোলনের বেলায় অনিয়মিত অর্থ পরিশোধ করতে হয়;

১৫।  বিল দাখিলের ক্ষেত্রে টোকেন প্রদানের সময় হয়রানির স্বীকার হতে হয়;

১৬।  সরকারি চাকরিতে নবনিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা/কর্মচারীদের প্রথম বেতন বিলের টাকা প্রাপ্তিতে অনিয়মিত অর্থ প্রদান করতে হয়;

১৭।  ভুয়া পেনশন সংক্রান্ত বিল পরিশোধের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়ে থাকে;

১৮।  ভুয়া ভ্রমণভাতা বিল পরিশোধের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়ে থাকে;

১৯। উন্নয়ন প্রকল্প হতে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত কর্মকর্তা/কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের বেলায় অনিয়মিতভাবে অর্থ আদায় করা হয়ে থাকে;

২০। সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীর বদলিজনিত কারণে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করার পর হিসাব রক্ষণ দপ্তর কর্তৃক শেষ বেতনপত্র (এলপিসি) নতুন কর্মস্থলে প্রেরণের বেলায় বিলম্ব ঘটে;

২১।  সরকারি দপ্তর কর্তৃক সম্পদ সংগ্রহ বা  ক্রয়ের ক্ষেত্রে ভ্যাট/আইটি/কাস্টম্স ডিউটি কর্তন না করে সরকারি রাজস্ব আদায়ের প্রতিবন্ধকতা বা বাধা সৃষ্টি এবং রাজস্ব আদায়ের টার্গেটে পৌঁছতে  প্রতিবন্ধকতা তৈরী করা হয়;

২২।  উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে অর্থ ছাড়ের বেলায় প্রতিবন্ধকতা, হয়রানি ও দুর্নীতির মাধ্যমে অনিয়মিত আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করা হয়ে থাকে;

২৩।  জুন মাসে যথাযথ প্রি-অডিট না করে অনিয়মিত আর্থিক সুবিধা নিয়ে বিল পাশ করা হয়;

২৪।  সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে মাস ভিত্তিতে সমরূপে ব্যয় না করে অর্থ বছরের শেষ প্রান্তে তথা এপ্রিল,মে,জুন মাসে অর্থ ছাড়  করা হয় ও বিল সাবমিট করা হয় এবং হিসাব দপ্তরসমূহ কর্তৃক যথাযথ প্রি-অডিট না করে বিলসমূহ পাশ করা  হয়;

২৫।  হিসাব রক্ষণ অফিস কর্তৃক বিভিন্ন অফিসের পে-রোলে নাই এমন ব্যক্তিদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করে সরকারি অর্থের আত্মসাৎ করা হয়;

২৬। ব্যাংক কর্তৃক পরিশোধিত মাসিক পেনশনের টাকা হিসাব অফিস কর্তৃক পুনর্ভরণের ক্ষেত্রে কখনও কখনও ভুয়া বিল বা ডুপ্লিকেট বিলের মাধ্যমে সরকারি অর্থের ক্ষতি ও আত্মসাৎ করা হয়ে থাকে;

২৭। সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীদের নিয়মিত বিলের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট অডিট আপত্তি উত্থাপন করা হয় না;

২৮। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বেতন-ভাতা পরিশোধের নির্দেশনা অমান্য করে সরকারি সেবা গ্রহীতাদের হয়রানি করা হয়;

২৯।  আইবাস+ + বরাদ্দ জটিলতা দেখিয়ে হয়রানি করা হয়;

৩০।  বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও বরাদ্দ নেই বলে বিলম্ব করা ও ভোগান্তি সৃষ্ট করা;

৩১।  দাখিলকৃত কাগজপত্র সঠিক ও পর্যাপ্ত নয় মর্মে অতিরিক্ত অর্থ দাবী করা হয়। অর্থ প্রদান করলে বিল প্রদান করা হয়;

৩২। ব্যাংকে কোন কোন ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে এডভাইস প্রদান না করা। ঠিকাদার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অর্থ প্রদান করলে এডভাইস পাঠানো হয়;

৩৩। সঠিক বরাদ্দ পাওয়ার পরেও অর্থনৈতিক কোড নিয়ে বিড়াম্বনা ও ভোগান্তি সৃষ্ট করা হয়।

দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক টিম ২১টি সুপারিশ প্রদান করেছে। সুপারিশগুলো হলো-
সিজিএ কার্যালয় কর্তৃক মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তা কর্মচারীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষায় ভিডিও কনফারেন্স প্রযুক্তির ব্যবহার জোরদার করা। বর্তমানে হিসাব রক্ষণ অফিসসমূহে জনবল কম থাকায় সেবা প্রার্থীদের সেবা পেতে অনেক বিলম্ব হয়। সেজন‌্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল বৃদ্ধি করা, আইটি সেক্টরকে শক্তিশালী করা, আইটি সিস্টেমকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য প্রতিটি হিসাব রক্ষণ অফিসে একজন আইটি বিশেষজ্ঞ নেওয়া,সমগ্র অফিস অটোমেশনের আওতায় আনার পদক্ষেপ, সব ধরনের বিল সংক্রিয় নিষ্পত্তির ব্যবস্থা ও কতিপয় ক্ষেত্রে জিপিএফ অগ্রিম গ্রহণ ব্যবস্থা নেওয়া।

পেপারলেস সাইবার আর্কাইভের ব‌্যবস্থা, প্রতিটি হিসাব রক্ষণ অফিসের জন‌্য পৃথক ওয়েবসাইড থাকা, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি সহজীকরণ করা, ভুক্তভোগীদের অভিযোগ দাখিল, শুনানী ও নিস্পত্তির ব্যবস্থা থাকা, বাজেটে নির্ভুল ও শুদ্ধ হিসাব প্রণয়নের জন‌্য অডিট এন্ড অ্যাকাউন্টস অফিসার,সুপার,অডিটর ডেস্ক আইবাস++ কানেক্টেড কম্পিউটার সরবরাহ নিশ্চিত করা, দাপ্তরিক কাজে গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা আনয়নের লক্ষ্যে কর্মকর্তা/ কর্মচারীগণকে তিন বছর অন্তর বদলীর বিষয়টি শক্তভাবে অনুসরণ করা।

পেনশন সংক্রান্ত কার্যক্রমকে স্বচ্ছ, দ্রুত এবং হয়রানিমুক্ত করতে পেনশন সহজীকরণ বিধিমালা বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণ করে সেবা সরবারহে টাইম লিমিট করে দেওয়া, উপজেলা,জেলা ও বিভাগীয়  মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, বেতন-ভাতাসহ সব ধরনের বিল পরিশোধের বেলায় দায়িত্ব অবহেলা ও বিলম্বের জন্য দায়ীদের ব্যবস্থা নেওয়া।

সরকারি সেবায় সংঘটিত অনিয়ম, দায়িত্ব অবহেলা ও দুর্নীতি মনিটরিং এর জন্য একটি ‘হট লাইন’ স্থাপন, ‘হট লাইনের’ মাধ্যমে প্রাপ্ত অভিযোগগুলো নিয়মিত পর্যালোচনা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ, সিদ্ধান্ত প্রদানকারী পর্যায়ে স্থানীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী  নিয়োগ না দেওয়া, কর্মকর্তা পর্যায়ে সরকারি নিয়মে নিয়মিত বদলী নিশ্চিত করা এবং কাজের গতিশীলতা ও স্বচ্ছতার লক্ষ্যে আইবাস+ +  বিষয়ে কর্মকর্তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ মার্চ ২০১৯/এম এ রহমান/এনএ

     


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

দারুণ সময় পার করছি: অপু

২০১৯-০৫-২৪ ১:১০:৫১ পিএম
আইলার ১০ বছর

‘আর কত লড়াই করব?’

২০১৯-০৫-২৪ ১২:৫৮:০৪ পিএম

ভোটের লড়াইয়ে তারকাদের ফল

২০১৯-০৫-২৪ ১২:৪০:৫৬ পিএম

টিভিতে আজকের খেলা

২০১৯-০৫-২৪ ১১:৪৩:৪০ এএম

তৃতীয় সপ্তাহেও কমেছে সবজির দাম

২০১৯-০৫-২৪ ১০:৪৮:৪৪ এএম