আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ প্রয়োজন

প্রকাশ: ২০১৮-০২-১৪ ৯:২৪:৫১ পিএম
আলী নওশের | রাইজিংবিডি.কম

রাখাইনে মিয়ানমার বাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কতটা নির্মম ও ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে তা উঠে এসেছে সম্প্রতি রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের উসকে দেওয়ার পাশাপাশি বেসামরিক পোশাকে সেনা সদস্যরাও রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞে অংশ নিয়েছে। রোহিঙ্গাদের সম্পদ লুট করার পাশাপাশি তাদের বাড়িঘরসহ গোটা গ্রাম পুড়িয়ে দেয় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও পুলিশ। বার্তা সংস্থা  রয়টার্সের প্রকাশিত আলোকচিত্র দেখে যে কোনো মানুষের মনেই দাগ কাটবে- এ কেমন নৃশংসতা।

রয়টার্সের দুই সাংবাদিকের  তোলা আলোকচিত্রে দেখা যায়, ১০ জন রোহিঙ্গা পুরুষকে পিঠমোড়া করে বেঁধে বসিয়ে রাখা হয়েছে। কিছুক্ষণ পরেই তাদের গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর একটি গণকবরে তাদের মাটিচাপা দেওয়া হয়।  হত্যার আগে এই রোহিঙ্গাদের দিয়েই ওই কবর খনন করা হয়েছিল। মিয়ানমারের এ আলোকচিত্র তোলা হয় গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর।  রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও তাদের সমর্থক  বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা যে ধারাবাহিক নৃশংসতা চালাচ্ছে, তা তুলে ধরতেই অনুসন্ধানে নেমেছিলেন রয়টার্সের ওই দুই সাংবাদিক। কিন্তু তাদের আটক করেছে মিয়ানমার বাহিনী এবং 'অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট' লঙ্ঘনের অভিযোগ করে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

এ বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসে প্রথমবারের মতো মিয়ানমার সেনাপ্রধান রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করলেও তিনি তাদের ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং গ্রামবাসী হত্যা করেছে বলে দাবি করেন। আর মিয়ানমারের আধাসামরিক বাহিনীর দু’জন সদস্য বলেছেন, উপরের নির্দেশ ছিল রোহিঙ্গাদের একেবারে শেষ করে দেওয়ার। তারা জানিয়েছেন, সেনারা বেসামরিক পোশাকে রোহিঙ্গাবিরোধী গণহত্যায় অংশ নিত। তারা আরো বলেছে, সংবাদমাধ্যমে যদি ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় দেখা যেত, তাহলে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হতো তাদের। এ বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, মিয়ানমারের সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনী রোহিঙ্গা গণহত্যায় জড়িত। রোহিঙ্গাদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলাই মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর উদ্দেশ্য। তাদের বিরুদ্ধে যে হামলার অভিযোগ তারা এনেছে তা ঠুনকো এবং কেবল অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।

জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইসলামী সম্মেলন সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পাশাপাশি অনেক দেশ  রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর অভিযানের নিন্দায় সোচ্চার। কিন্তু চীন, রাশিয়া ও ভারতের মতো কোনো কোনো দেশ এমন নৃশংস আচরণের পরও তারা দেখেও যেন না দেখার ভান করছে। এখন রয়টার্সের আলোকচিত্র দেখে মিয়ানমারের বিষয়ে তাদের অবস্থানের পরিবর্তন হবে এমনটিই প্রত্যাশা আমাদের। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার পথ থেকে সরে আসতে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ  প্রয়োগ কার উচিত দেশগুলোর।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের কারণে দলে দলে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বিগত কয়েক মাস ধরে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে যাদের সংখ্যা প্রায় আট লাখ। মানবিক কারণে বাংলাদেশ সরকার তাদের থাকতে দিয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও চুক্তির ভিত্তিতে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু নানা অজুহাতে তারা সময়ক্ষেপণ করছে। আবার  মিয়ানমারে অবস্থান করা রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালানো হচ্ছে এ খবরও আসছে সংবাদমাধ্যমে। ফলে রোহিঙ্গা সংকটের অবসান ঘটানোর  ইচ্ছা আদৌ মিয়ানমারের সরকারের আছে কি না তা নিয়ে সংশয় তৈরি হচ্ছে।

তাই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার বাহিনীর গণহত্যা বন্ধ এবং তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কফি আনান কমিশনের সুপারিশের আলোকে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে দ্রুত ফিরিয়ে নেওয়া এবং মিয়ানমারে থাকা অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে সবার এগিয়ে আসা প্রয়োজন।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮/আলী নওশের

   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

‘চামচঠুটি’ বিরল প্রজাতির বক

‘চামচঠুটি’ বিরল প্রজাতির বক

২০১৮-০২-২০ ২:২৫:৪০ পিএম