যানজট নিরসন

প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর পরিকল্পনা

প্রকাশ: ২০১৮-০৫-২৩ ৭:৫২:১৩ এএম
আলী নওশের | রাইজিংবিডি.কম

রাজধানী ঢাকায় বর্তমানে যে সমস্যা সবচেয়ে বেশি প্রকট ও দুর্বিষহ তা হল যানজট এবং যাতায়াত সমস্যা। যতদিন যাচ্ছে সমস্যা ততই প্রকট আকার ধারণ করছে। প্রায় দুই কোটি মানুষের এই মেগাসিটিতে যানজটের কারণে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে দেশের। সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে ‘গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং যানজট নিরসনের পরিকল্পনা রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্তি ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকার’ শীর্ষক আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, রাজধানীতে যানজটে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা। আর এতে বছরে ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা।

ঢাকা মহানগরীর বাসিন্দাদের যানজটের কারণে এখন নির্দিষ্ট গন্তব্যে যেতে রাস্তায় আটকে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এক ঘণ্টার পথ পেরোতে কখনও সময় লেগে যায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা। এভাবে অপরিমেয় কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়ে দেশের যে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তা অপূরণীয়।  বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, নগরের যানজট যদি ৬০ শতাংশ কমানো যায়, তাহলে ২২ হাজার কোটি টাকা বাঁচানো যাবে।

ঢাকা মহানগরীতে বসবাসকারী প্রায় দুই কোটি মানুষের যাতায়াতের প্রয়োজনে রাস্তায় ছুটে চলছে নানাধরনের বাসসহ অন্যান্য যানবাহন। কিন্তু এত যানবাহন ধারণের পর্যাপ্ত রাস্তা রাজধানীতে নেই। ঢাকা শহরে প্রতিদিন চলাচলকারী যন্ত্রচালিত যানবাহনের সংখ্যা ৫ লাখ ২৭ হাজার। গেল ৬ বছরে যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে ২ লাখ ২৪ হাজার। বিআরটিএ’র তথ্য অনুসারে, রুট পারমিট নেওয়া ঢাকার বাস-মিনিবাসের সংখ্যা ৫ হাজার ১০৩টি। এই সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়লেও তা জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় অপ্রতুল।

বর্তমানে ঢাকার যানবাহনের গড় গতিবেগ প্রতি ঘণ্টায় ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার। কিন্তু গাড়ির সংখ্যা যদি বর্তমান গতিতে বাড়তে থাকে, ২০২৫ সাল নাগাদ গড় গতিবেগ প্রতি ঘণ্টায় ৪ দশমিক ৭ কিলোমিটারে নেমে আসবে, যা মানুষের হাঁটার গতির চেয়েও কম। অথচ মানুষের হাঁটার গতি ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটারের উপরে। ২০৩৫ সালে ঢাকার জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ৩ কোটি ৫০ লাখ হবে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।

রাজধানীতে যানজটের অন্যতম আরেকটি কারণ সড়কের স্বল্পতা। একটি মোটামুটি উন্নত শহরের জন্য ২৫ শতাংশ ভালো সড়ক প্রয়োজন। বাংলাদেশে রয়েছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। ঢাকা শহরে পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা নেই। আবার রাজধানীর গণপরিবহনের চালকদের অনেকেরই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। চলছে ফিটনেসবিহীন গাড়ি, চলাচলে নেই শৃঙ্খলা। ফলে যানজটের পাশাপাশি ঘটছে দুর্ঘটনাও।

যানজট ও দুর্ঘটনা নিরসনে রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানো একান্ত জরুরি। কিভাবে শৃঙ্খলা ফেরানো যায় তার একটি প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে বুয়েটের গোলটেবিল বৈঠকে। বলা হয়েছে, রাজধানীতে ১৫০ থেকে ২০০ বাস সার্ভিস চলছে। এই সার্ভিসে প্রতিটি রুটে একটি করে কম্পানিকে দায়িত্ব দিলে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা কমবে।একই সঙ্গে যানবাহন পরিচালনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে।

বর্তমানে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে রাজধানীর অনেক রাস্তা এখন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। আবার কোথাও মেট্রো রেল, কোথাও ইউলুপ বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ চলছে। ফলে নির্বিচারে চলছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি। সেবাসংস্থাগুলো সমন্বয় করে এবং দ্রুত কাজ সম্পন্ন করলে নগরবাসীর ভোগান্তি কম হতো। নগরীর অনেক ফুটপাত নতুন করে চলে গেছে হকারদের দখলে। ফুটপাত দখল করে দোকানপাট বসানো, যেখানে সেখানে গাড়ি পার্কিং যানজট আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।


যানজট নিরসনে সব কিছুর আগে প্রয়োজন সদিচ্ছা।  দৈনিক ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট জাতির অগ্রগতির জন্য বিরাট এক বাধা।  দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার হয়েছে। রাজধানী ঢাকার আয়তন ও জনসংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু চলাচলের বিকল্প মাধ্যম নেই। যানজট নিরসনে গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে।


দেশের গণপরিবহণ সংস্থাগুলো কোম্পানিভিত্তিক পরিচালিত হওয়ায় কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এ ধরনের ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে নির্দিষ্ট কয়েকটি কোম্পানিকে গণপরিবহণের লাইসেন্স বা দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।এতে গণপরিবহণের মাঝে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ হয়ে পরিবহণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।  পরিবহনে দ্বিতল বাসের সংখ্যা বাড়াতে হবে। সাধারণত: একটি বাসে একটি বাসে ৪০ থেকে ৬০/৭০ জন চলতে পারে। কিন্তু দ্বিতল বাস হলে এ সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হবে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে যানজটের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে জরুরিভিত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। সব সেবা সংস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা ও চলাচলের উপযোগী রাস্তাঘাট তৈরি করে নগরীকে যানজটমুক্ত রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে। ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আরো গতিশীল ও কার্যকর করে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি নগরীতে  ট্রেনে করে যে যাতায়াত ব্যবস্থা রয়েছে, তার উন্নয়ন করতে হবে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ, জয়দেবপুর, গাজীপুর, নরসিংদীসহ নিকটবর্তী শহরগুলোর সঙ্গে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে। দখল হওয়া সব খাল দখলমুক্ত এবং ঢাকার চারপাশের নদী ও অভ্যন্তরীণ খালগুলো সংস্কার করে যাতায়াতে নৌ-পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুললে সড়কে চাপ কমবে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৩ মে ২০১৮/আলী নওশের

   
 



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

পুরুষের মেনোপজ : যা জানা জরুরি

২০১৮-১০-১৭ ৯:০৩:৫৩ পিএম

সুজি দিয়ে তালের বড়া

২০১৮-১০-১৭ ৮:৫১:১৮ পিএম

মনোবিদের ক্লাসে ক্রিকেটাররা…

২০১৮-১০-১৭ ৮:৩৫:৫৩ পিএম