সমুন্নত রাখি মাতৃভাষার শির

প্রকাশ: ২০১৮-০২-০৮ ৩:৫৬:৩৬ পিএম
শতাব্দী জুবায়ের | রাইজিংবিডি.কম

শতাব্দী জুবায়ের : ‘চিঠিটা তার পকেটে ছিল, ছেড়া আর রক্তে ভেজা।’ বিখ্যাত এই পঙ্ক্তিমালার রচয়িতা কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। মাতৃভাষা রক্ষার জন্য সন্তান রাজপথে নেমেছে আন্দোলনে। মা সন্তানের প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে বসে আছেন- তার খোকা ঘরে ফিরবে। কিন্তু খোকার বুকপকেট থেকে যখন এই চিঠি উদ্ধার করা হলো তখন তা রক্তে ভেজা। 

আমাদের মাতৃভাষার দাবি এভাবেই অর্জিত হয়েছে। নানান দুঃসহ ঘটনার মধ্যে দিয়ে আমরা পেয়েছি আমাদের ভাষা। কোনো কিছু উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া সহজ। কিন্তু তা অবিকৃত রাখা বা তার ঐতিহ্য ধরে রাখা কষ্টকর। আমরা এতগুলো বছর পার হয়ে এসে ভাষা নিয়ে শঙ্কিত। প্রশ্ন উঠেছে আমরা কি আমাদের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে পারছি? হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃত বাংলাভাষা। নানা সময় বিকৃতভাবে উচ্চারিত হচ্ছে বাংলা শব্দ। অশুদ্ধ  উচ্চারণ প্রায়ই শোনা যায়। আবার এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করছি যেটির অর্থ বদলে যাচ্ছে। অথচ আমরা এ সম্পর্কে উদাসীন। বিশেষ করে আমরা যারা তরুণ প্রজন্ম তারা এই কাজগুলো জেনে অথবা না-জেনে করছি। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত একটি সাহিত্য সংগঠন ‘অনুস্বার’। সাহিত্য নিয়ে কাজ করছে তারা। কাজ করছে বাংলা ভাষা নিয়ে। প্রতি শনিবার বিকাল সাড়ে তিনটায় বসে সাহিত্য আড্ডা। ভাষার মাসে তাদের আড্ডার বিষয় ছিল-‘বাংলা ভাষার শুদ্ধাচার চর্চা।’ আড্ডায় কথা হয় এ বিষয়ে।

নির্ধারিত সময়ের আগেই সবাই এক এক করে আসতে শুরু করে সভায়। বাংলাভাষার শুদ্ধাচারের আড্ডাটি বসেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। লাল ইট বিছানো শহীদ মিনারের বেদীতে বসেছিল আড্ডা। সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়তে শুরু করেছে তখনই আড্ডাটা জমে ওঠে তুমুল পর্যায়ে। বাংলা ভাষার শুদ্ধ চর্চার বর্তমান অবস্থা নিয়ে চলে দীর্ঘ আলোচনা।

ফেব্রুয়ারি ভাষার মাস। যে ভাষার জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে আমাদের। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ছিনিয়ে আনা হয়েছিল আমাদের মাতৃভাষা। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি একমাত্র ঘটনা। যেখানে মাতৃভাষায় কথা বলার জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা মাতৃভাষার চেতনায় উজ্জীবিত হই। বাকি ১১ মাস ঘুম পাড়িয়ে রাখি সেই চেতনাকে। ভুলে যাই আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। অনুস্বার’র সদস্য ঐশ্বর্য মীম বলেন, ‘যদি বাংলা ভাষাকে ভাগ করি তাহলে দুটি অংশ পাই। প্রমিত বাংলা ভাষা যাকে আমরা বলি দাপ্তরিক ভাষা। আরেকটি হচ্ছে উপভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা। কোন জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি তুলে ধরে যে ভাষা তাই অঞ্চলিক ভাষা। প্রমিত ভাষার আবার দুটি রূপ রয়েছে। একটি সাধু এবং চলিত। সাধু ভাষা এখন বিলুপ্ত প্রায়। বলতে গেলে চলিত ভাষাই এখন প্রমিত ভাষা। আর উপভাষা হলো আমাদের আবেগের জায়গা। নিজস্ব সংস্কৃতি, স্বকীয়তা তুলে ধরে। কিছু ইংরেজি শব্দ বাংলা ভাষায় আছে যেটিকে বাংলা শব্দ বলেই মনে হয়। কিন্তু সেগুলো বিদেশি শব্দ। শব্দগুলো ব্যবহার করতে করতে এমন অবস্থা হয়েছে যে, অন্য দেশের শব্দ বলে মনেই হয় না। যেমন: চেয়ার, টেবিল রিকশা। তবে বেশি মাত্রায় বিদেশি শব্দের ব্যবহার বাংলা ভাষার মর্যাদা ক্ষুন্ন করেছে বলে মনে করি।’



বর্তমান সময়ে তরুণদের মধ্যে যে বিষয়টা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়- কম সময়ে বেশি কাজ করা। অল্প সময়ে বেশি বুঝিয়ে দেয়া। তাই সবাই সংক্ষিপ্ত রাস্তা খোঁজে। এই শর্টকাট করতে গিয়েই তৈরি হয় ভাষার বিকৃতি। সদস্য হিমেল দেবনাথ বলেন, ‘তরুণরা বাবাকে বলছে- বাবা এত প্যারা দিও না! ‘প্যারা’ শব্দের অর্থ বুঝতে না পেরে বাবা-মা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকেন। এই শব্দটা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কাছে অদ্ভুত মনে হতেই পারে। কিন্তু প্যারা শব্দের অর্থ বাংলা বা ইংরেজি অভিধানে পাওয়া যায়- একাধিক বাক্যের রচিত গদ্যের অংশ।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভাই অথবা বন্ধুকে বলি- হাই ব্রো। ‘ভাই’ হয়ে যায় ‘ব্রো’! রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ইংরেজিতে ‘জি’, ‘ডি’, ‘এন’ আর ‘এইট’ লিখে চার অক্ষরে হয়ে যায় ‘গুড নাইট’ স্ট্যাটাস। কত সহজে মনের ভাব প্রকাশ করছি! তাই না? আর বাংলায়, তোমরা থেকে ‘তোম্রা’, ‘ব্যাপক’, ‘অস্থির’ ‘বিনুদুন’, ‘ক্যারে’,  ‘লোল’ ইত্যাদি শব্দ তো এখন অনেক চোখে পড়ে। এরকম অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যাবে।’

হিমেলের সঙ্গে কথা মিলিয়ে এমদাদুল এইচ সরকার বলেন, ‘অনেকে বলতে পারেন কথা বুঝলেই তো হলো, যেমনই হোক না! কিন্তু যখন সবাই একসঙ্গে এমন রূপের ব্যবহার শুরু করেছেন, তখনই তা উদ্বেগ সৃষ্টি করে। নিজের ভাষার বিকৃতি নয় কি এটি? এভাবে নানা বাংলা শব্দ বিকৃতি ঘটছে অহরহ। যা বাংলা ভাষার জন্য হুমকিস্বরূপ।’ সদস্য মাহের রাহাতের মন্তব্যে আসে একটু ভিন্ন স্বাদ। তিনি বলেন, ‘স্বকীয়তার যুগে নিজেদের ভাষার স্বকীয়তা কতটুকু ধরে রাখতে পারছি তা নিয়েই আমাদের ভাবা উচিত। বিশ্বায়নের কালে বাংলাভাষাকে কতটুকু শুদ্ধ ব্যবহার করছি এবং নিজেকে অপরের নিকট উপস্থাপন করছি তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। আর এই কাজটা করতে হবে আমাদের তরুণ প্রজন্মকেই।’

ভাষা পরিবর্তনশীল। কিন্তু এই পরিবর্তন বা আধুনিকতার নামে ভাষার বিকৃতি কখনো কাম্য নয়। পরিবর্তন যেমনই হোক, ভাষার মাধুর্য সৌন্দর্য ও বোধগম্যতা রক্ষা করা জরুরি। অনুস্বারের আরেক সদস্য আব্দুর রহমান বলেন, ‘পৃথিবীর প্রত্যেক ভাষাই পরিবর্তনশীন। সময় এবং যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে তার পরিবর্তন ঘটে। বিবর্তন হয় শব্দের আর পরিবর্তন হয় অর্থের। আমাদের সামনে হাজির হয় নতুন শব্দ নতুন অর্থ নিয়ে। আধুনিকতার করণে আমরা হারাচ্ছি আমাদের ভাষার স্বকীয়তা। তাই আমদের ভাষার শুদ্ধাচার চর্চা জরুরি।’

বাংলা শব্দের সঙ্গে ইংরেজি শব্দের সংমিশ্রনও দেখা যায়। এ প্রসঙ্গে অনুস্বারের সদস্য আরাফাত বলেন, ‘আমরা একটা বিষয়ে চর্চা করতে পারি। সেটা হচ্ছে যদি বাংলায় কথা বলি তাহলে সম্পূর্ণ বাংলায়ই বলবো। ইংরেজিতে বললে ইংরেজিতে। বাংলা ইংরেজির মিশ্রণ ঘটিয়ে বাংলা ভাষাকে অপমান না করে ভাষায় মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখা উচিত।আবেগ, ঐতিহ্য আর স্মৃতির বাংলা ভাষা। তাই সবারই উচিত মাতৃভাষা বাংলার শির সমুন্নত রাখা।’



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮/তারা

   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

রাজশাহীতে নতুন আট থানার উদ্বোধন

রাজশাহীতে নতুন আট থানার উদ্বোধন

২০১৮-০২-২২ ৪:২৪:১১ পিএম
বাগেরহাটে ৩ দিনের ইজতেমা শুরু

বাগেরহাটে ৩ দিনের ইজতেমা শুরু

২০১৮-০২-২২ ৩:৪৪:৪৫ পিএম