রসের হাড়িতে পাখির ফাঁদ

প্রকাশ: ২০১৮-০২-১৬ ৮:২৭:৪৩ এএম
খায়রুল বাশার আশিক | রাইজিংবিডি.কম

খায়রুল বাশার আশিক: গ্রাম বাংলার মানুষের পছন্দের খাবার খেজুরের রস। শীতের সকালে খেজুরের রসে ভেজানো পিঠা মন তৃপ্তিতে ভরিয়ে দেয়। রস দিয়ে ভিন্ন স্বাদের খাবার মানুষ তৈরি করতে পারলেও পাখিরা তা পারে না। তাতে অবশ্য খুব একটা ক্ষতি নেই। কেননা খেজুরের রস পাখিদেরও প্রিয়। শীতের সকালে রসের হাড়িতে ঠোঁট লাগিয়ে পাখির রস পানের দৃশ্য অনেক সময় দেখা যায়। উপকূলীয় জেলা বরগুনার পথেপ্রান্তরে রাইজিংবিডির ক্যামেরায় ধরা পরে রসের হাড়ি থেকে পাখির রস পানের এমন দৃশ্য। 

খেজুরের গুড় বা রস দিয়ে তৈরি পায়েসের (স্থানীয় নাম সিন্নি) ব্যাপক চাহিদার কারণেই গাছিরা খেজুর গাছে হাড়ি ঝুলিয়ে রেখে রস সংগ্রহ করে। রাতভর জমতে থাকা রস সংগ্রহ করা হয় সকালের রোদের তীব্রতা বাড়ার আগে। মানুষের পেতে রাখা এই হাড়িতে ভাগ বসায় নানা জাতের পাখি। রসের হাড়িতে পাখিদের আনাগোনা দেখলে মনে হয় পাখিরাও যেন রসের হাড়ির উন্মুক্ত অংশীদার।

 


রসের মিষ্টি গন্ধের সঙ্গে পাখিদের কিচিরমিচির নতুন ছন্দ যোগ করে গ্রাম বাংলার পথে পথে। তবে বেশি চোখে পড়ে শালিক পাখি। পাশাপাশি ঝুটকলি, ফিঙ্গে, বাবুই, ঘুঘুসহ নাম না-জানা আরো কিছু পাখি দেখা যায়। পাশাপাশি একাধিক হাড়িতে রস থাকলে সেগুলো তারা দখলের চেষ্টা করে। ছোট পাখিদের তাড়িয়ে বড় পাখিগুলো দখলে নেয়ার চেষ্টা করে একাধিক হাড়ি। অবশ্য দখলে রাখা হাড়ির সেই রসটুকু সাবাড় করার সাধ্য রাখে না তুলনামূলক বড় সেই পাখিগুলো।

পাখিরা শুধু যে হাড়িতে ঠোঁট ডুবিয়ে রস পান করে উড়ে চলে যাচ্ছে এমন নয়। সারাদিন গাছের আশপাশে চলে পাখিদের ওড়াউড়ি। রোদের তেজ বাড়ার আগেই গাছিরা গাছ থেকে রসের হাড়ি নামিয়ে নিলেও থেমে থাকে না পাখিগুলো। গাছের শরীরে খাজকাটা রসের নালায় ঠোঁট লাগিয়ে সারাদিন চলে রসের খোঁজ। তবে পাখিদের বিষ্ঠা বা পায়ে আটকে থাকা কাদামাটি দ্বারা রসের হাড়ি নোংরা হওয়ার কারণে মানুষ প্রতিনিয়ত রসের হাড়ি রক্ষা করার চেষ্টা করে। ফলে গাছিরা পরিষ্কার রস পেতে নানাভাবে পাখিদের রোধ করে। হাড়ির আশপাশে ও হাড়ির মুখে জাল পেঁচিয়ে রাখে কেউ কেউ। এই জালে পা পেঁচিয়ে মানুষের হাতে ধরা পরছে এবং মারা যাচ্ছে অসংখ্য পাখি। এছাড়াও দিনের বেলার রস মানুষ না খেলেও তখনও গাছে হাড়ি বা প্লাস্টিকের বোতল ঝুলিয়ে রেখে পাখি ধরার টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।  

 


প্রান্তিক গ্রামের পথে যেতে যেতে খেজুরের রস ও পখিদের নিয়ে কথা হয় বরগুনার রক্ষাচন্ডি গ্রামের বাসিন্দা রশিদ মিয়ার (৬০) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বয়সের ভারে এখন আর রসের কাম করি না। তয় বছর দশেক আগেও আমি খেজুর গাছ কাটতাম। তখন যত পাখি দেখছি, এখন পাখি হের অর্ধেকও নাই। গাছ যেমন কইমা গেছে, হেমনে পাখিও হারাইয়া যাইতাছে।’

এ প্রসঙ্গে কথা হলো একই গ্রামের বাসিন্দা মোতালেব শিকদারের (৮০) সঙ্গে। তিনি জানালেন, অবৈধ ইটের ভাটায় ইদানিং খেজুর গাছ পোড়ানোর ফলে কমে গেছে রসের প্রাপ্যতা। মানুষের চাহিদা অনুযায়ী রস এখন গ্রামেও দুর্লভ। যতটুকু পাওয়া যায় তা অনেক সময় পাখিরা নোংরা করে দেয়। তাই হাড়ির আশপাশে জাল পেতে রেখে গাছিরা পাখিগুলোকে বাধা দেয়। এই জাল পাখিদের পায়ে পেঁচিয়ে অনেক পাখি মারাও যায়।

গ্রামের বাসিন্দা হানিফ সরদার জানান, শীতের সকালে এখনো মাঝেমধ্যে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির পাখি চোখে পড়ে। এসব পাখি এলাকায় থাকে না। অনেক দূর থেকে যেমন অতিথি পাখি বাংলাদেশে আসে, তেমনি মিষ্টি রসের সুগন্ধে পাখিরাও অরণ্য ছেড়ে লোকালয়ে উড়ে আসে।

 


প্রসঙ্গক্রমে উদাহরণস্বরুপ তিনি আরো বলেন, দক্ষিণ অঞ্চলের একটি পরিচিত পাখি ডাহুক। মানুষের ডাহুক নিধনের ফলে এই পাখি এখন আর খুব বেশি দেখা যায় না। তেমনি রসের জন্য আগত পাখিদের নানাভাবে নিধনের ফলে একসময় অনেক প্রজাতির পাখি হারিয়ে যেতে পারে। বন্য এসব পাখিদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য হলেও যারা গাছির কাজ করে তাদের সচেতন করার উদ্যোগ নেয়া উচিত। 

প্রকৃতির নিয়মে শীত আসবে বারবার। নতুন রসের প্রয়োজনে গাছিরা প্রতিবছর রস আহরণ করবে। সঙ্গে বেঁচে থাকুক পাখিদের কুহুতান- এমনটাই বলছেন পরিবেশপ্রেমীরা। পাশাপাশি সচেতন গ্রামবাসীর দাবি, পাখি সংরক্ষণের প্রয়োজনে যে পাখি নিধন করবে তাকে শাস্তির আওতায় আনা হলে গ্রাম থেকেও নির্বিচারে কমে যাবে পাখি নিধন।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮/ফিরোজ/তারা

   
 



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

হলিউড সিনেমায় টাইগার শ্রফ?

২০১৮-০৯-২০ ১:০০:১২ পিএম

কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন নওয়াজ

২০১৮-০৯-২০ ১২:১১:৫৭ পিএম