ওদের কাছে শিক্ষার চেয়ে ইলিশ মূল্যবান

প্রকাশ: ২০১৮-০৩-০৩ ৮:১৩:৩৮ এএম
খায়রুল বাশার আশিক | রাইজিংবিডি.কম

খায়রুল বাশার আশিক: সকাল হলেই নিয়তি ওদের নিয়ে যায় হাড়ভাঙা খাটুনির কাজে। অতি রোদ কিংবা বৃষ্টি, কিছুই তখন আর বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। ওরা সবাই শিশু, তবুও শিক্ষা ওদের জীবনে অমাবস্যার চাঁদ। শিশু সুরক্ষা বা শিশু অধিকার কখনো স্পর্শ করেনি ওদের। দারিদ্র্যের সংসারে একটু আয়ের আশায় তারা খুব কম বয়সেই বেছে নিতে বাধ্য হয় নদী ও জেলে জীবন। বাবা-চাচা, দাদা কিংবা বড় ভাইয়ের সঙ্গে সারাদিন ওরা জাল টানে। নদীর উত্তাল ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে তুলে আনে ইলিশ। এসব শিশুদের জীবনে শিক্ষার চেয়ে রুপালি ইলিশের মূল্যই যেন বেশি।

যেখানে তাদের এই বয়সে হাসি-খুশি ও আনন্দ-উল্লাসে বেড়ে ওঠার কথা, সেখানে শুধুই দারিদ্র্যের কষাঘাত। যে শিশুটির হাতে থাকার কথা ছিল বই, সেই শিশুটির হাতে আজ মাছ ধরার জাল। দিন কাটে তার নদীর বুকে। স্কুলের হাজিরা খাতায় কোনো না কোনো শ্রেণীতে নাম থাকলেও যাওয়া হয় না ক্লাসে। যে চোখে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার কথা, সেই চোখ নির্ঘুম রাত জাগে খুব সকালে উঠে বাবার কাজের সাথী হবে বলে। উপকূলীয় অঞ্চলের জেলে পল্লীর অধিকাংশ শিশুদের জীবনের গল্প এমন।

উপকূলীয় জেলা বরগুনা, পটুয়াখালী ও ভোলার বিভিন্ন নদনদী ঘুরে দেখা যায়, প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি উপকূলীয় জেলে পরিবারের শত শিশুর দিন এভাবেই কাটছে। স্কুলে যাবার বদলে নৌকা, জাল নিয়ে প্রতিদিন তারা ছুটছে নদী কিংবা সমুদ্রে। সরেজমিনে দেখা যায়, জেলে নৌকায় কাজ করা অধিকাংশ শিশুর বয়স আট থেকে পনেরো বছর। জীবনের প্রয়োজনে তারা এই বয়সে হয়ে ওঠে দক্ষ মাঝি বা জেলে। এই শিশুদের কেউ বাবার সঙ্গে জাল টানে, কেউ নৌকার বৈঠা ধরে, কেউবা জাল থেকে মাছ ছাড়িয়ে ঝুড়িতে তোলে। আকৃতি অনুযায়ী মাছ বাছাই করার কাজও তারা করে। এভাবেই তারা নিচ্ছে দক্ষ জেলেতে পরিণত হবার শিক্ষা। মাঝে মাঝে বাবার কাজের দায়ভারও তাদের বইতে হয়। ধরা মাছ নিয়ে বাবা হাটে গেলে বাবার অনুপস্থিতিতে উত্তাল নদীতে নৌকা নিয়ে চলে যায় শিশুটি। জোয়ার ভাটা ওদের মুখস্থ। দিন শেষে এই মাছ বিক্রি করে যা পায় তা দিয়ে কিছুটা হলেও উপকৃত হয় তাদের পরিবারের মানুষগুলো।
 


পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা, পাটুয়া, পানপট্টি, রাঙ্গাবালী, চর বিশ্বাস, চর কাজল, বাহেরচর অঞ্চলের জেলে পরিবারে গিয়ে দেখা যায় সেখানে প্রতিনিয়ত অনিশ্চতায় বিবর্ণ হয়ে ওঠে জেলে পল্লীর হাজারো শিশুর শৈশব। শিশুশ্রমের বেড়াজালে বন্দিজীবন আর বাবার কষ্টর সঙ্গী হতে ষষ্ঠ শ্রেণীতে আর পড়া হয় না অধিকাংশ শিশুর। ফলে কোমলমতি সব শিশুর কাঁধে ওঠে সংসারের বোঝা। বাবা-মা ছোট ভাইবোন নিয়ে বেঁচে থাকাই তাদের জীবনের মূলমন্ত্র। অনেক শিশুর স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও সম্ভব হয়ে ওঠে না। উপকূলীয় এই অঞ্চলের অনেক বাবা মায়ের ধারণা জেলে জীবনে শিক্ষার থেকেও ইলিশ বেশি মূল্যবান।

চরমোন্তাজ লঞ্চ ঘাটের কাছেই বাবার মাছ ধরার সঙ্গী হিসেবে ছিলেন দশ বছরের শিশু রুবেল। রুবেলের ভাষ্য ‘স্কুলে যাইতে তো ইচ্ছা করে তয় কামের লাইগ্যা যাইতে পারি না। জোয়ার আওয়ার আগেই জাল পাতি, আর ভাটায় পানি টানলে মাছ লইয়া আইতে আইতে স্কুল ছুটি হইয়া যায়।’
 


এই ঘাটেই কথা হয় আরো কিছু জেলে শিশুর সঙ্গে। ইমরান, আবির, হাসিব নামের এই শিশুরাও বলছে বাবার কাজের সঙ্গী হতে হয় বলেই তারা স্কুলে যেতে পারে না। পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলায় চরকাজল গ্রামের জেলে সেলিম আকন (৪০) বলেন, ‘সব পরিবারই এখন বোঝে যে, তাগো পোলাপাইনগুলারে পড়ানো উচিৎ। কিন্তু প্যাডের (পেটের) তাগিদে সবাই তো পড়াইতে পারে না।’

পটুয়াখালী চরমোন্তাজ দ্বীপের বাসিন্দা হাকিম মিয়া জানান, ‘একটি জেলে নৌকায় একজন জেলের পক্ষে জাল টেনে মাছ ধরা কষ্টকর। মাছ ধরতে হলে আরো লোকের দরকার। দরিদ্র জেলেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার পরিবারের মানুষগুলোকে সহকারী হিসেবে ব্যবহার করে। মূলত এই কারণে শিশুগুলোকে স্কুল ছাড়তে হয়।’
 


বিষয়টি নিয়ে কথা হলে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলে শিশুদের শিক্ষিত করতে হবে এমন প্রবণতা কম। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, এই অঞ্চলে দরিদ্র ও অভাবী মানুষের বিচরণ বেশি। শিশুদের শিক্ষিত করার প্রবণতা তখন বৃদ্ধি পাবে যখন সমাজ থেকে অভাব দূর করা যাবে। প্রতিটি শিশুর জীবনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পরিবারকে সচেতন করতে পারলে কমে আসবে শিক্ষাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩ মার্চ ২০১৮/ফিরোজ/তারা

   
 



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

শিশু বিল পাস

২০১৮-১০-২২ ৯:১২:৩০ পিএম

সিরিজ জিততে চট্টগ্রামে বাংলাদেশ

২০১৮-১০-২২ ৭:৩৩:৩৫ পিএম