তাঁদের স্বাবলম্বী হওয়ার সংগ্রাম

প্রকাশ: ২০১৮-০৩-০৭ ৪:২৬:০৫ পিএম
আমিনুর রহমান হৃদয় | রাইজিংবিডি.কম

ছবি- খাদিজা খাতুন স্বপ্না

আমিনুর রহমান হৃদয়: সংসারের অভাব দূর করতে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এখন ঘরের বাইরে এসে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছেন। সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের নিত্যদিনের যাবতীয় খরচ চালাচ্ছেন পুরুষ ও নারী উভয়েই। রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ফুটপাতে বসে পণ্য বিক্রি করতে দেখা যায় অনেক নারীকে। পড়ুন এমনই কয়েকজন নারীর জীবন সংগ্রামের কথা।

চুড়ি বিক্রি করে সংসার: মোছাম্মদ মালঞ্চি। বয়স ৬০ বছর। বাড়ি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলায়। বর্তমানে রাজধানীর তেজগাঁর নাবিস্কো এলাকায় থাকেন স্বামী নিয়ে। তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। ছেলেরা বিয়ে করে আলাদা সংসার করছেন, দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। মালঞ্চি জানালেন, গত ২০ বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ফুটপাতে তিনি চুড়ি বিক্রি করছেন। স্বামী বদিউজ্জামান আগে পান-সিগারেট বিক্রি করলেও এখন বয়সের কারণে তার সঙ্গে চুড়ি বিক্রি করেন। ছেলে ও মেয়েরা নিজেদের সংসার নিয়ে নিজেরা ব্যস্ত। বাবা-মাকে দেখার সময় তাদের নেই। তিনি বলেন, ‘স্বামী নিয়ে যতদিন পারি কাজ করে নিজেদের খরচ নিজেরাই চালাতে চাই। ছেলেমেয়েরা সুখে-শান্তিতে থাকুক এই দোয়া করি।’



প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চুড়ি বিক্রি করেন মালঞ্চি। শুরুর গল্পটা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সংসারের অভাবের কারণেই ঘরের বাইরে এসে চুড়ি বিক্রি করা শুরু করেছিলাম। স্বামী ও আমার টাকায় সংসারের খরচ এবং সন্তানদের চাহিদাও পূরণ করেছি। ওদের বিয়েও দিয়েছি এই চুড়ি বিক্রির টাকায়। ঘরের বাইরে এসে কাজ না করলে অভাব থেকেই যেত।’

স্বামীর সাহসে ফুটপাতে ব্যবসা: মেয়েদের ওড়না ও হিজাব বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন ৩১ বছর বয়সি নূরনাহার। বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলায় হলেও বর্তমানে মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় থাকেন। রাজধানীতে স্বামীর সঙ্গে ওড়না ও হিজাব বিক্রির ব্যবসা করছেন প্রায় ১০ বছর। সংসারের অস্বচ্ছলতা দূর করতেই তিনি ঘরের বাইরে পা রেখেছেন। নূরনাহার বলেন, ‘মাত্র পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে এই ব্যবসা শুরু করেছিলাম। এখন এক লাখ টাকার মতো মালামাল রয়েছে আমাদের। সংসারে ফিরেছে স্বচ্ছলতা। ছেলেকে স্কুলে পাঠাচ্ছি। ছেলেকে নিয়ে এখন আমাদের স্বপ্ন।’



তিনি আরো বলেন, ‘ঘরের বাইরে এসে ফুটপাতে ব্যবসা করার সাহস জুগিয়েছে আমার স্বামী। তিনি সব সময় পাশে থেকে উৎসাহ দেন। নিজে লেখাপড়া করতে পেরেছি মাত্র পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত। ছেলে এখন নবম শ্রেণীতে পড়ছে।’

ভবিষ্যত ইচ্ছের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চলতে চলতে যতদূর যাওয়া যায়। মাত্র ৫ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করেছিলাম এখন ১ লাখ টাকায় এসেছি। পরিশ্রম করে যেতে চাই। ভালো থাকতে চাই।’

স্কুল ব্যাগ বিক্রি করেন আকলিমা: ২৩ বছর বয়সি আকলিমা বেগম স্কুল ব্যাগ বিক্রি করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন। নিজে লেখাপড়া না করলেও স্বপ্ন দেখছেন মেয়েকে লেখাপড়া করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করবেন। ১৬ বছর বয়সে নিজের বিয়ে হলেও, অল্প বয়সে নিজের মেয়ের বিয়ে দিতে চান না। তার বাড়ি কুমিল্লা। বর্তমানে রাজধানীর যাত্রাবাড়ি এলাকায় থাকেন। স্বামী স্বল্প বেতনে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। আকলিমা জানালেন, এক বছর আগে চা বিক্রি শুরু করেন। এরপর শুরু করেছেন স্কুল ব্যাগ বিক্রির ব্যবসা। তিনি বলেন, ‘অভাব আমাদের পিছু ছাড়তে চায় না। স্বামীর সামান্য বেতনে সংসার ও মেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালাতে কষ্ট হতো। স্কুল ব্যাগ বিক্রির ব্যবসা শুরু করার পর থেকে সংসারের অভাব দূর হতে শুরু করেছে।’



ঘরের বাইরে এসে দোকান দিয়েছেন, এ নিয়ে কেউ কিছু বলে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রথম প্রথম মানুষ নানা কথা বলতো, এখন ওসব পাত্তা দেই না। মানুষ তো আর আমার সংসারের চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। নিজের মতো করে চলার চেষ্টা করছি।’

চা বিক্রি করে চলছে সংসার: শারমিন আক্তার। বয়স ৩২ বছর। বাড়ি চাঁদপুর। বর্তমানে রাজধানীর কামরাঙ্গীর চরের বাসিন্দা। এক ছেলে পড়াশোনা করছে নবম শ্রেণীতে, মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেকে পড়াশোনা করিয়ে সরকারি চাকরি করাবেন এমন স্বপ্ন দেখছেন তিনি। স্বামীর সঙ্গে তিনিও ফুটপাতে বিক্রি করছেন চা ও বিস্কুট।



শারমিন বলেন, ‘দোকান করেও শান্তি মতো খাইতে পারি না। ফুটপাত থেকে পুলিশ তুলে দেয়। অনেক সময় জিনিসপত্র নিয়ে যায়। তারপরেও অভাবের সংসারে স্বামীর সঙ্গে ফুটপাতে বসে চা বিক্রি করতে হচ্ছে। দোকান না করতে পারলে তো ছেলেটারে লেখাপড়া করাইতে পারবো না। জীবনে আর কোনো ইচ্ছা নাই। শুধু ছেলেটারে মানুষ করতে চাই।’




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৭ মার্চ ২০১৮/ফিরোজ/তারা

   
 



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

বার্সার রেকর্ড রাজস্ব আয়

২০১৮-০৭-১৭ ৫:০২:১১ পিএম

যে ৮ বিষয় গুগলে খুঁজবেন না

২০১৮-০৭-১৭ ৪:৪৩:৫২ পিএম

শতাধিক প্রেক্ষাগৃহে ‘সুলতান’

২০১৮-০৭-১৭ ৪:০৩:৪৬ পিএম