বরেন্দ্রকাব্য-২ : একলব্যের রণক্ষেত্র

প্রকাশ: ২০১৮-০৫-০৮ ১:১০:১২ পিএম
অনার্য মুশিদ | রাইজিংবিডি.কম

অনার্য মুশিদ : ‘বসুধা শিরো বরেন্দ্রীমন্ডল চূড়ামণিঃ কুল স্থনম/শ্রী পৌন্ড্রবধর্নপুর-প্রতিবন্ধঃ পুন্যভব্বৃহদ্বটু’। অর্থাৎ পুন্ড্রবর্ধনপুরের নিকটবর্তী বৃহদ্বটু নামক পুণ্যভূমিতে কবির নিবাস, এ স্থান পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ (শির) বরেন্দ্র মন্ডলের চূড়ামণি।

দশ শতকের কবি সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিতম’ কাব্যে আমরা সর্বপ্রথম এইভাবে বরেন্দ্র শব্দের সাক্ষাত পাই। অভিধান অনুযায়ী যে ভূমি দেবরাজ ইন্দ্রের আশীর্বাদ পেয়েছে তা-ই বরেন্দ্র। বৈদিক যুগে যা পুন্ড্র নামে ছিল। বিশ শতকের প্রথম দিকে সড়ক, রেললাইন, চা বাগান তৈরি ও কৃষি কাজের জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সাঁওতালদের এই অঞ্চলে ব্যবহার শুরু করে। সেই যে শুরু হলো, আর কি শেষ হলো! ইংরেজ বেনিয়া ক্ষমতা ছাড়ার সময় এই আদিবাসীদের তুলে দেয় পাকিস্তানের হাতে, পাকিস্তান তুলে দেয় বাংলাদেশের হাতে। এত এত হাত বদল হয়েছে, তাদের ভাগ্যের বদল হয়নি। গত কয়েক দশক ধরে তাদের ঐতিহ্য হুমকির মুখে। তারা নিজেদের সাঁওতাল বলে পরিচয় দিতে কুণ্ঠাবোধ করছে। এই পরিচয় সংকট স্পর্শ করেছে সংবেদনশীল চিত্রশিল্পী সুমন কুমার সরকারকে। সুমন নিজেও বরেন্দ্রপুত্র। বরেন্দ্রীয় মৃত্তিকা-ঐতিহ্য তার নষ্টালজিক ক্যানভাসের বিষয়। শিল্পী হিসেবে সুমনের দায়বদ্ধতা তার মাটির কাছে। তিনি নিছক মনের আনন্দে শিল্প করেছেন বলে মনে হয় না। আনন্দের চেয়ে দায়বদ্ধতাই তার কাছে বড়। এই প্রদর্শনীর বিক্রয়লব্ধ অর্থ সুমন সাঁওতালদের জন্য নির্মিতব্য জাদুঘরে ব্যয় করবেন।

চলুন, এবার তার ছবির দিকে যাই। প্রথমে আমরা কথা বলব ছবির বিষয় নিয়ে। তারপর কাজের ধরন-ধারণ নিয়ে। এই প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া ২৯টি ছবির বিষয়ই প্রায় কাছাকাছি। তিন-চারটি বিষয়ই ঘুরে ফিরে এসেছে প্রদর্শনীতে! এর মধ্যে আছে বরেন্দ্র অঞ্চল বিশেষত সাঁওতালদের কৃষিজীবন, বাসস্থান, শারিরীক অবয়ব প্রভৃতি। তবে কৃষিটাই সম্ভবত বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। শিরোনাম ছাড়া এই ছবিগুলো আবহমান বাংলার ছবিই মনে হবে। কেউ যদি এগুলোকে নদীয়া বা সমতটের ছবি বলে আমার মনে হয় তাও ভুল হবে না। আলাদা করে বরেন্দ্রীয় ভাবার সুযোগটা কম। তবে বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটির ঘর আর কৃষি বিষয়ক চার-পাঁচটি ছবি এই প্রদর্শনীর বিষয়কে কিছুটা হলেও প্রাসঙ্গিক করেছে।

বরেন্দ্রীয় বা সাঁওতালীদের খাদ্যাভ্যাস, উৎসব, সাংস্কৃতিক চর্চা, ধর্মাচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো থেকে  যদি একটি করে ছবিও প্রদর্শনীতে স্থান পেত তাহলে ‘বরেন্দ্রকাব্য-২’ নামটি সফল এবং সার্থক হত। যেমন, সাঁওতালরা ঢোল, তবলা, দোতরা, বাঁশি, মেগোর মতো বাদ্যযন্ত্র নিজেরাই বানায় এবং বাজায়। তারা ঘরের দেয়ালে ছবি আঁকে। সে রকম সাংস্কৃতিক দিক অনুপস্থিত। মাটির দেয়ালে শিল্পীও ছবি আঁকতে পারতেন। কিন্তু তিনি কি বিষয়টি খেয়াল করেননি নাকি জলরংয়ে দেয়ালে ছবি আঁকাটা কঠিন বলে তিনি ছেড়ে দিয়েছেন! জলরংশিল্পীরা হয়ত বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন। আমরা জানি, সাঁওতালরা মাছ, কাঁকড়া, গুইসাপ, ইঁদুর ও খরগোশ খায়। তাদের এই খাদ্যাভ্যাস নিয়েও একটি ছবি সুমনের দর্শকরা আশা করতেই পারেন।

ছবিতে নারী ও কিশোরীর খোঁপায় ফুলের এবং কানে ঝুমকার ব্যবহার শিল্পীর সাঁওতালী অলংকার সম্পর্কে সচেতনার পরিচয়। কিন্তু পোষাকের দিকটি সমালোচনার দাবি রাখে। আমরা জানি সাঁতালী নারীরা ‘ফতা’ এবং ‘আরা শাড়ি’ পরে। প্রদর্শনীর নারীচিত্রগুলোর পোষাকের দিক থেকে সাঁওতালের চেয়ে গতানুগতিক বাঙালি নারীরই প্রতিনিধিত্ব করছে বেশি। তবে শিল্পী কি পরিবর্তিত সাঁওতালের রূপটিই ধরতে চেয়েছেন? কিন্তু একই ছবিতে অতীত এবং বর্তমানের মিশেল যৌক্তিক কিনা তা আমাদের বোধগম্য নয়। আবার এমন অনেক ছবি এখানে আছে যেগুলো শিল্পী তাঁর স্মৃতি থেকে এঁকেছেন। যা বর্তমানে নেই। তবে কি প্রদর্শনীটি অতীত বর্তমানের মিশেলে? আমরা জানি না। এর জবাব শিল্পীই ভালো জানেন।



এখন আমরা কথা বলব শিল্পীর কাজের ধরন নিয়ে। আমরা দেখতে পাচ্ছি এই প্রদর্শনীর সব কটি ছবিই স্বচ্ছ পদ্ধতির জলরংয়ে আঁকা। কিন্তু তুলির অবাধ্যতা দুয়েকটি ছবির কিয়দাংশ অসচ্ছ করে দিয়েছে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে ছবির বক্তব্য অস্পষ্ট। যেমন একটি ছবিতে আমরা দেখতে পাই, লোকজন হাটে যাচ্ছে। শিরোনাম ছাড়া বোঝার উপায় নেই তারা আসলে কোথায় যাচ্ছে! কারণ, হাটে যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত প্রপসগুলো ছিল অস্বচ্ছ। হয়ত এই জায়গায় গাঢ় রংকে হালকা রং দিয়ে ঢেকে কোনো ভুল সংশোধনের চেষ্টা করেছেন শিল্পী। কিন্তু স্বচ্ছ পদ্ধতির জল রংয়ে তা কি সম্ভব! সম্ভব হতো, যদি তা গোওয়াশ বা টেম্পরা পদ্ধতির ছবি হতো। কিন্তু এ প্রদর্শনীর সব ছবি ওয়াশে করা। তেল রংয়ের ছবি হলেও এই দুর্বলতাকে দর্শক নতুন অর্থে গ্রহণ করত। স্বচ্ছ পদ্ধতির জলরং হওয়ায় সেই সুযোগটি থাকছে না।

তারপরও রংয়ের ব্যবহারে শিল্পীকে অনেক ক্ষেত্রেই পাকা মনে হয়েছে। সব মিলিয়ে শিল্পীর কাজে আমরা সন্তুষ্ট না হলেও খুশি।  ছবির বিষয় এবং কাজের ধারা সংক্রান্ত এই নিছক সমালোচনা নিশ্চয় সুমনের ছবিকে দুর্বল আখ্যা দিতে পারে না। এমনকি তার পবিত্র স্বপ্নকেও না। সাঁওতালদের প্রতি সুমনের অনুভূতিতে মনে হয় তিনি বিলীন সাঁওতালদের একলব্যের ভূমিকা পালন করছেন। এই নগরকেন্দ্রিক শিল্পচর্চার যুগে সুমন বুকের মধ্যে লালন করছেন এক খণ্ড লাল মৃত্তিকা। যা রাষ্ট্রের শোষণের প্রতি তাঁর দ্রোহের বহিঃপ্রকাশ। তাঁর এই বৈপ্লবিক রোমান্টিকতা একদিন সকল সুন্দরের কানে নিশ্চিত পৌঁছে দিবে- এ দ্রোহ আমাদের, সকলের।

‘বরেন্দ্র কাব্য-২’ চিত্র প্রদর্শনীটি গত ৪ মে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে উদ্ভোধন হয়। ১০ মে ২০১৮ পর্যন্ত চলবে। দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। সবার জন্য উন্মুক্ত।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৮ মে ২০১৮/তারা

   
 



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

ফালুর এক ভাই ও তিন আত্মীয়কে তলব

২০১৮-০৯-২০ ৯:২৬:৫৪ পিএম

ফেরার ইঙ্গিত দিলেন দিলশান

২০১৮-০৯-২০ ৯:০৮:২০ পিএম

ভ্রমণপিপাসুদের জন্য হালট্রিপ

২০১৮-০৯-২০ ৯:০০:১৪ পিএম

২২তম অধিবেশনে ১৮ বিল পাস

২০১৮-০৯-২০ ৮:৩৮:০৪ পিএম

ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে বিরল ঘটনা

২০১৮-০৯-২০ ৮:১৩:৫৯ পিএম
দুদকের অভিযান

সাত ভুয়া এমবিবিএস ডিগ্রিধারী সনাক্ত

২০১৮-০৯-২০ ৭:৩৬:৫১ পিএম