মায়ের শাড়ির আঁচলে লুকানো সুখ

প্রকাশ: ২০১৮-০৫-১৩ ৫:৫১:০০ পিএম
সাইফ বরকতুল্লাহ | রাইজিংবিডি.কম

|| সাইফ বরকতুল্লাহ ||

রাত থম থম স্তব্ধ, ঘোর-ঘোর-আন্ধার,

নিশ্বাস ফেলি, তাও শোনা যায়, নাই কোথা সাড়া কার।

রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া একেলা জাগিছে মাতা,

করুণ চাহনি ঘুম ঘুম যেন ঢুলিছে চোখের পাতা।

শিয়রের কাছে নিবু নিবু দীপ ঘুরিয়া ঘুরিয়া জ্বলে,

তারি সাথে সাথে বিরহী মায়ের একেলা পরাণ দোলে।

             [পল্লীজননী, জসীমউদ্‌দীন]

আজ থেকে প্রায় একযুগ আগের কথা। সেদিন বিকেল বেলা। সে সময় আমি টিউশনি করি। আমার ছাত্র সাদমানকে বললাম হোমওয়ার্কগুলো শেষ করতে। সাদমানের মা চা দিয়ে গেলেন। বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি। হঠাৎ আমার সেলফোনে ক্রিং ক্রিং শব্দ। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কণ্ঠে ভেসে আসে… ‘তোর মা আর নেই, তাড়াতাড়ি চলে...’। সেলফোনটা হাত থেকে পড়ে গেল। আমার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি ঝরতে লাগল।

মা মারা যাবার পর প্রায় একমাস আমি প্রচণ্ড কেঁদেছি। ঠিক মতো খেতে পারতাম না। প্লেট নিয়ে খেতে বসলেই কান্না চলে আসতো। জীবনের সবচেয়ে আপন এবং সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ছিলেন মা। দিনের শেষে মায়ের সঙ্গে আমার একটা আড্ডা হতো। বাবার সঙ্গে খুব একটা খোলামেলা কথা হতো না আমার। সবকিছু মায়ের সঙ্গেই দুষ্টুমি আর সব সময় মায়ের শাড়ির আঁচল ধরেই লেপ্টে থাকতাম।

ছোট্ট বেলার কথা। আমাদের বাড়ির গ্রামের রাস্তা। শীতের সকালে রাস্তার দুই পাশে সবুজ ধানক্ষেতে। ক্ষেতে শিশির পড়ত। নিত্যদিন আমি এই রাস্তা দিয়ে হাঁটতাম। সকাল নয়টার দিকে প্রতিদিন প্রাইভেট পড়া শেষ করে বাড়িতে এসেই মায়ের রেডি করা পান্তাভাত খেতাম। কোনোদিন কাঁচা মরিচ, আবার কোনোদিন শুকনো মরিচ দিয়ে, কাঁচা পেঁয়াজ দিয়ে পান্তা খুবই মজা করে খেতাম। মায়ের এসব স্মৃতি মনে পড়লেই নিজেকে এখনো স্বাভাবিক রাখতে পারি না।

স্কুলের ফার্স্টবয় ছিলাম। এলাকার মধ্যে ভালো ছেলে বলে সুপরিচিত ছিলাম। স্কুলের সহপাঠীর বাবা-মা আমার ওপর অনেক ভরসা পেত। সহপাঠীদের কোনো সমস্য হলেই আমাকে ডাকত। এই সহপাঠীরাই দুষ্টুমি করে আমার মাকে বিচার দিত-‘আন্টি, ও তো সিগারেট খাইছে।’ আমার মা হেসে হেসে উত্তর দিতেন, ‘ছোটো মানুষ, খেতেই পারে।’ কোনোদিন কোনো শাসন করতেন না। কোনোদিন শিউরে ওঠেননি তিনি। বাবা কত মাকে বকা দিতেন। কিন্তু মা অভিমানী হলেও রাগ করতেন না।

কয়েকদিন আগে জ্যোৎস্না রাত ছিল। মাকে মনে পড়তেই ইউটিউবে একটা মাকে নিয়ে গান দেখছিলাম। আমার মায়েরও অসাধারণ গানের গলা ছিল। ওই গানটা ‘আমার গলার হার খুলে নে ওগো..।’ কি সুন্দর করেই না গাইতেন গানটা। এসব ভাবলেই নিস্তব্ধতার মাঝে ডুবে যাই। খা খা করে বুকটা। বড় ফাপর ফাপর লাগে। এইতো সেদিনও মাকে মনে করে ডুকরে ডুকরে কাঁদলাম। পান খাওয়া, মিষ্টি হাসি, দেশি মুরগির রান্নার কী ঘ্রাণ। তরকারি রান্না করলেই মাছের মাথাটা আমার প্লেটে তুলে দিতেন। স্কুল থেকে এসেই দুপুরে খেয়ে গান শুনতাম। আমাদের বাড়িতে বড় একটা কালো জামগাছ ছিল। এই গাছের নিচে বসে প্রায়ই অঙ্ক করতাম, আর রেডিওতে গান শুনতাম। মা এসে নাস্তা দিয়ে যেত।

কিছুদিন আগের কথা। অফিস থেকে বাসায় যখন ফিরি তখন দেখি আমার রুমমেট ফয়সাল দিব্যি ওর মায়ের সাথে ফোনে কথা বলছে। প্রায় নিয়মিতই আধা ঘণ্টা, এক ঘণ্টা  কথা বলে। এ কথা, সে কথা, নানা কথা। মাংস তরকারি রান্নার সময় বলে, মরিচ কতটুকু দিব? পায়েস কীভাবে রান্না করবো? ইত্যাদি ইত্যাদি...। এসব ভেবে ভেবে স্মৃতির পাতায় হারিয়ে যাই। এখনো আয়নার সামনে দাঁড়ালে মাঝে মাঝে মনে হয় ‘এই বুঝি মায়ের শাড়ির আঁচলে মুখ লুকানো’ দেখতে পাই। এখন মা নেই। দাদা, দাদি, নানি, নানা কেউ নেই। বাবা আছেন- তাও আমার সঙ্গে নেই।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ মে ২০১৮/সাইফ

   
 


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

সাফল্যে রঙিন বছর

২০১৮-১২-১৫ ১০:৫২:৩২ পিএম

যে ২৫ পাসওয়ার্ড ব্যবহার করবেন না

২০১৮-১২-১৫ ৮:৪৬:৫০ পিএম

৩০ ডিসেম্বর ভোটের বিপ্লব হবে : রব

২০১৮-১২-১৫ ৭:৫৯:৫০ পিএম