পানিকষ্টে বারো মাস

প্রকাশ: ২০১৯-০৫-২৬ ১:২৯:২২ পিএম
রফিকুল ইসলাম মন্টু | রাইজিংবিডি.কম

রফিকুল ইসলাম মন্টু : পড়ন্ত বেলায় পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে জনা দশেক নারী। সারিবদ্ধ চকচকে সিলভারের খালি কলসি অন্তত কুড়িটি। খেজুর গাছের নড়বড়ে ঘাটলায় দুজন নারী। একজন কলসি ভর্তি করে পানি তুলছেন, আরেকজন তার হাত থেকে কলসি নিয়ে পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যজনের কাছে দিচ্ছেন। এভাবে একটি কলসি দিয়ে পানি তুলে একে একে ভরা হচ্ছে সব কলসি। কলসি ভরলে শুরু হয় এদের দলবেঁধে বাড়ি ফেরার পালা। এটা সাতক্ষীরার শ্যামনগরের হেঞ্চি গ্রামের মনোরঞ্জন বৈরাগির পুকুর পাড়ের প্রত্যেক বিকেলের দৃশ্য। এই পুকুরটাই যেন সাত গ্রামের মানুষের ভরসা। দুই-তিন কিলোমিটার দূর থেকে নারীরা এখানে আসেন পানি নিতে। অনেকেই আবার একই সঙ্গে দুই কলসি পানি বহন করেন এই দীর্ঘ পথ। পানিকষ্টে তাদের জীবনটাই যেন শেষ!

-এত দূরে কেন পানি নিতে আসেন?

-সে কি আর বলব, সাহেব! এটা আমাদের কপাল! কপালে ঘরের কাছে পানির সুবিধা নেই। তাই দূরে এসে নিয়ে যাই।

-কষ্ট হয় না?

-অনেক কষ্ট হয়। কী করব? বেঁচে তো থাকতে হবে!

-কয় কলসি পানি লাগে দিনে?

-দুই-তিন কলসি তো লাগবেই।

-প্রতিদিন আপনারাই আসেন পানি নিতে?

-কে আসবে? পুরুষ তো বাইরের অনেক কাজে ব্যস্ত থাকে। ঘর তো নারীকেই সামলাতে হয়।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরের গ্রাম আটুলিয়া ইউনিয়নের তালবাড়িয়া আর আটুলিয়া। এখানে প্রায় ৩০০ পরিবারের বাস। লোকসংখ্যা দেড় হাজারের ওপরে। এই গ্রাম থেকে সুপেয় পানির উৎস কমপক্ষে তিন কিলোমিটার দূরে। এই দুই গ্রামের মানুষ পানি সংগ্রহ করেন একই ইউনিয়নের হেঞ্চি গ্রামের মনোরঞ্জন বৈরাগির বাড়ির পুকুর পাড়ে বসানো ফিল্টার থেকে। দিনের প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করার কাজ শুরু হয় ভোর থেকে। কার আগে কে যাবে। লাইনের আগে থাকার চেষ্টা সবার। আগেভাগে পানি ঘরে তুলতে পারলে অন্যান্য কাজে সময় দেওয়া সম্ভব হবে। সকালের পালা শেষ হলে শুরু বিকালের পালা।

সরেজমিনে ঘুরে চোখে পড়ে, পশ্চিম উপকূলে সাতক্ষীরার শ্যামনগর, খুলনার কয়রা, পাইকগাছা আর বাগেরহাটের শরণখোলার প্রত্যন্ত গ্রামে পানিকষ্টের বিপন্ন রূপ। কষ্ট নিরাবণে মানুষগুলোর দীর্ঘ পথ পায়ে হাঁটা। সকাল-বিকেল-দুপুর জলের আধারগুলো ঘিরে নারী-পুরুষ ও শিশুদের জটলা। কলসি, বালতি, ড্রাম, জগ, যার যা আছে, তা নিয়েই ছুটে যান পানির কাছে। সুপেয় পানির সংকটই সবচেয়ে বেশি। কোথাও আবার গোসল, রান্নাবান্না আর সেচের পানির কষ্টও তীব্র হয়ে ওঠে। অর্থের বিনিময়ে মানুষদের পানি কিনতে হয়।
 


সরু মাটির রাস্তা পেরিয়ে মোটরবাইক চলে। শ্যামনগরের আটুলিয়া ইউনিয়নের তালবাড়িয়া গ্রামে মোটরবাইকের স্টার্ট বন্ধ হতেই জটলা বাড়ে মানুষের। উৎসুক মানুষ। শহুরে মানুষ দেখলে সংকটে থাকা গ্রামের মানুষগুলো কিছু বলার জন্য এগিয়ে আসেন। অনেকে আবার নতুন কিছু বার্তা পাওয়ার আশায় ছুটে আসেন। গ্রামে কি নতুন কিছু বরাদ্দ এলো? আমরা তাহলে কি কিছু পাব? না, এসব কিছু না। আমাদের দরকার পানিকষ্টের তথ্য। জানতে চাই, কীভাবে সামলান পানির কষ্ট। সামনে এগিয়ে এলেন পানিকষ্টে থাকা একজন বাসিন্দা তাপস কুমার মন্ডল। পেশায় স্কুল শিক্ষক। আলাপ তার সঙ্গে-

-এ এলাকায় কবে থেকে পানিকষ্ট?

-আগেও পানির সংকট এই এলাকায় ছিল। তবে আইলার প্রলয়ের পর থেকে পানিকষ্ট অস্বাভাবিক বেড়েছে।

-কীভাবে বেঁচে আছেন?

-বেঁচে থাকার জন্য সুপেয় পানির তো বিকল্প নাই। কিন্তু কই পাই? এই দুই গ্রামের কোনো মানুষই প্রয়োজনীয় সুপেয় পানি পান না। ভোর হলেই পানির সন্ধানে ছুটতে হয়। সকাল ও বিকেলে পানির ফিল্টারের কাছে সংগ্রহকারীদের লাইন দীর্ঘ হয়। কষ্ট করি। আর কী করব?

-পানির সংকট কখন বেশি থাকে?

-সংকট থাকে বারোমাসই। তবে মার্চ এপ্রিল ও মে মাসে তীব্রতা বেশি।

খানিক এগিয়ে একই গ্রামের সুজাতা মন্ডলের বাড়ি গিয়েও একই চিত্র দেখি। দিনে যে দুই-কলসি পানি প্রয়োজন হয়, তা সংগ্রহ করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। বললেন, পানির কষ্টে আমরা তো মরি গেলাম। তিনবেলা খাবার জোগানোর জন্য লড়াই করতে হয়। তারপর আবার পানির কষ্ট। বিভিন্ন স্থান থেকে আমরা পানি সংগ্রহ করি। কখনো ঘরের নারী পানি আনে, কখনো পুরুষ যায়। কখনো শিশুদেরও নিয়ে যাওয়া হয় পানি সংগ্রহে। এই এলাকার প্রত্যেক পরিবারেরই দিনের অনেকখানি সময় পানি সংগ্রহে ব্যয় হয়।

পেট ভরে দুবেলা ভাত খাওয়ানো যায়! কিন্তু অতিথির জন্য এক জগ পানি ব্যয় করা কষ্টকর। কারণ, তারা আছেন পানিকষ্টে। ঘরের যা কিছু পাত্র আছে- সবগুলোই সুপেয় পানির সংরক্ষণের কাজে লাগছে। এই এলাকার মানুষ পানি ব্যয় করেন খুব সাবধানে। বিশেষ করে, শুকনো মৌসুমে তাদের পানি ব্যবহারে সতর্কতা অনেক বেশি। কথাগুলো বলছিলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার লক্ষীখালী গ্রামের জরিনা খাতুন। তার সঙ্গে আলাপে উঠে আসে গাবুরার পানিসংকটের খণ্ডচিত্র।
 


-এক কলসি পানি আনতে কয় কিলোমিটার হাঁটেন?

-পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনি। আসা-যাওয়ায় যাতায়াত দশ কিলোমিটার।

-কত সময় লাগে?

-যেতে আসতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে।

-কয় কলসি পানি লাগে দৈনিক?

-লাগে তো তিন কলসির মত। ঘরের সকলেই একবার করে পানি আনতে যায়।

ইউনিয়নের দশ নম্বর সোরা গ্রামের মো. ইদ্রিস মোড়লের স্ত্রী আছমা খাতুনের ঘরে ঢুকেই বোঝা যায় পানির সমস্যা তাদেরকে কতটা সংকটে রেখেছে। ঘরের ভেতরে কলসি, ড্রাম, থালাবাটি এমনকি পলিথিনে করেও পানি সংরক্ষণ করা হয়েছে। এদের ঘরে একফোঁটা পানির মূল্য অনেক। নারী-পুরুষ ও শিশুরা পায়ে হেঁটে পানি আনেন, আবার কখনো ড্রাম ভরে ভ্যানে করেও আনেন। এতে পানির মূল্যটা আরো বেড়ে যায়। এলাকা ঘুরে জানা যায়, ঘরে একবেলা খাবার জোগাড়ের চেয়েও এই এলাকার মানুষের সুপেয় পানি যোগারে বেশি সমস্যা। চাল, ডাল, নুন, তেল সবাই জোগাড় হলো; কিন্তু ঘরে সুপেয় পানি নেই। এর মানে সবকিছুই অচল।

পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত বিভিন্ন দ্বীপ-চর ঘুরে সুপেয় পানি সংকটের ভয়াবহ চিত্র চোখে পড়ে। বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলোতে বহু মানুষের বসবাস থাকলেও সেখানেই প্রয়োজনীয় গভীর নলকূপ। বিচ্ছিন্ন এলাকার বহু মানুষ সারাব ছরই সুপেয় পানির সংকটে থাকেন। আবার কোথাও নলকূপ বসলেও নদীভাঙনের কারণে বহু নলকূপ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে ইউনিয়নের হাজারো মানুষ বছরের পর বছরের পানি কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। ঘূর্ণিঝড় আইলার আগে এতটা সংকট ছিল না। আইলা যেন মানুষের পানিকষ্ট কয়েক গুন বাড়িয়ে দিয়েছে। পানিসংকট নিরসনে যে উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছে, তা পর্যাপ্ত নয়- এই দাবি এলাকাবাসীর।

খুলনার দাকোপের সুতারখালী ইউনিয়নের কালাবগির পানিসংকটের তীব্রতা আরো বেশি। গ্রামের পথ ধরে হাঁটলেই এটা টের পাওয়া যায়। এখানে সুপেয় পানির জন্য রীতিমতো যুদ্ধ চলে। নদীর লবণপানি কোনোকাজেই ব্যবহার করা যায় না। ফলে রান্নাবান্না, খাওয়া দাওয়া, গোসল এমনকি শৌচকর্মের পানিও বাইরে থেকেই আনতে হয়। পানির কষ্ট নিয়ে যখন কথা হচ্ছিল, তখন ঝুলন্ত পাড়ার জালাল মীরের স্ত্রী সকিরন বিবি (৪৫) এগিয়ে এলেন। জানালেন নিজের কথা।

-অনেক কষ্ট করে তিনবেলা ভাত হয়তো পেট ভরে খেতে পারি। কিন্তু প্রায়োজন মতো পানি পান করতে পারি না। অন্যান্য কাজেও পানি ব্যবহার করতে হয় মেপে। ভাত খেয়ে পানি পান করতে না পারলে কেমন লাগে, বলেন?

-পানিকষ্ট কখন বেশি থাকে?

-ঘরে ধরে রাখা বৃষ্টির পানিটুকু শেষ হয়ে গেলে শুকনো মৌসুমে খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। বর্ষাকালে পানির কষ্ট কম থাকে। কারণ, তখন বৃষ্টির পানি পাই। তখন বৃষ্টির পানি ব্যবহার করি এবং সংরক্ষণ করেও রাখি।

-আমরা যে কীভাবে পানিকষ্টে বেঁচে আছি, সরকারকে একটু লিখে জানান। সরকার যদি আমাদের দিকে একটু নজর দেয়- পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জায়েদা খাতুন যোগ করেন সকিরণের কথায়। 
 


কালাবগির বাসিন্দাদের খাবার জোগাড়ের পাশাপাশি সুপেয় পানি সংগ্রহ যেন রীতিমতো যুদ্ধ। মিঠা পানির যে উৎসগুলো ছিল, ঘূর্ণিঝড় আইলা তা কেড়ে নিয়েছে। নদীতে আসা তীব্র লবণপানি ঢুকেছে পুকুর-ডোবা-খালে। ফলে এলাকায় পানি সংগ্রহের উৎস একেবারেই কমে গেছে। যা আছে, তাতে আবার সকলের প্রবেশাধিকার নেই। ঝুলন্ত পাড়ার কাঁচা রাস্তায় হাঁটার সময় চোখে পড়ে অসংখ্য প্লাস্টিকের ড্রাম। এগুলোতে এই পাড়ার মানুষেরা দূর থেকে আনা পানি সংরক্ষণ করে রাখেন। সাধ্যমতো অনেকে ধরে রাখেন বৃষ্টির পানি। সেগুলোও সংরক্ষিত হয় এই ড্রামে। ড্রাম থেকে আবার পানি চুরি হয়ে যাওয়ার ভয়ও আছে। সে কারণে ড্রামের মুখ শক্ত করে আটকে, পলিথিন দিয়ে বেঁধে মাটি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।

-কিন্তু কেন বাড়ল পানিসংকট?

-লবণাক্ত এলাকা বলে এখানে খাবার পানির সংকট তীব্র। আইলার পরে নদীর পানিতেও লবণাক্ততা বেড়েছে বলে আমরা অনুভব করি।

-লাকায় গভীর নলকূপ বসে না?

-নলকূপ বসলেও তা থেকে লবণপানি ওঠে। ১৬০-১৬৫ ফুট পাইপ বসিয়েও দেখা গেছে নলকূপ থেকে লবণপানিই ওঠে।

-নদীর পানি ব্যবহার করা যায় না?

-জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে নদীর পানি মিষ্টি থাকে। তখন পুকুরের পানিও মিষ্টি থাকে। এরপর থেকে লবণাক্ততা বাড়তে থাকে।

-কোথা থেকে পানি আনা হয়?

-চালনা, খুলনা, গড়ইখালীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে। তবে যেখান থেকেই আনা হোক না কেন, খরচ পড়ে বেশি।

ঝুলন্ত পাড়ার কয়েকটি স্থানে পানির পাকা ফিল্টার চোখে পড়লেও সেগুলো অকেজো। পানির সংকট নিরসনে বিভিন্ন সময়ে হয়তো এগুলো দেওয়া হয়েছিল বেসরকারি উদ্যোগে। ইট-বালুর এ ফিল্টারে পানি ধরে রাখা যাচ্ছে না। প্লাস্টিকের ড্রামকেই পানি সংরক্ষণের টেকসই মাধ্যম বলে মনে করেন এলাকার মানুষেরা। কিন্তু সব পরিবারের পক্ষে এই ড্রাম পর্যাপ্ত পরিমাণে সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। এনজিও থেকে কিছু ড্রাম দেওয়া হলেও তার সংখ্যা হাতেগোনা। পানিসংকট নিয়ে আলাপকালে এলাকার ইউপি সদস্য মোনতাজ সানা বলেন, এখানে নলকূপ বসিয়ে কিংবা ফিল্টার দিয়ে পানির অভাব পূরণ করা সম্ভব নয়। এখানকার প্রতিটি পরিবারে দেড় হাজার লিটারের একটি করে ট্যাংকি দিলেই তারা সারা বছরের পানি ধরে রাখতে পারবে।

আইলার পর থেকে পশ্চিম উপকূলে সুপেয় পানির সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। চারিদিকে পানি থাকার পরেও বহু মানুষ পাচ্ছে না এক ফোটা বিশুদ্ধ পানি। একদিকে বাড়ছে লবণাক্ততা, অন্যদিকে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। পানিদূষণের মাত্রাও যেমন অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলেছে, তেমনি পানি সরবরাহে রয়েছে অব্যবস্থাপনা। পানি সরবরাহে অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক স্থানে বিশুদ্ধ খাবার পানি পৌঁছাচ্ছে না বহু মানুষের কাছে। এর পাশাপাশি প্রভাবশালীদের খাময়েখালিপনায় পানির আধার সার্বজনীন হতে পারছে না। আইলার আগে এবং পরে বিভিন্নভাবে পানিসংকট নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেসব উদ্যোগ খুব একটা সফল হয়নি। পশ্চিম উপকূলে শ্যামনগর, গাবুরা, দাকোপের একটি অংশসহ বিভিন্ন এলাকায় ঠিক পাঁচ বছর আগে যেমন পানিকষ্ট ছিল, এখনও তেমনই আছে। গ্রামের মানুষেরা এই সংকটকে ‘পানির দুর্ভিক্ষ’ বলে অভিহিত করেছেন। এই কষ্ট থেকে বাঁচার আকুতি তাদের।
 


সূত্র বলছে, ২০০৯ সালের ২৫ মে মাসে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আইলার আগে এই এলাকায় এতটা পানির সংকট ছিল না। কিন্ত আইলার প্রলয়ে সব পানির আধার লবণপানিতে ডুবে যায়। বিভিন্ন উপায়ে যেসব আধার থেকে সুপেয় মিঠা পানি সংগ্রহ করতেন, সেসব আধারে এখন লবণপানি। আইলার পর থেকে ডোবা-নালা থেকে লবণ সরানো যাচ্ছে না। এর ওপর চিংড়ি চাষের আগ্রাসন তো আছেই। অধিক লাভের আশায় বহু মানুষ ফসলি মাঠে লবণজল ঢুকিয়ে চিংড়ি চাষ করছে। চিংড়ি ঘেরের লবণপানি ঢুকে পড়ছে মিঠা পানির পুকুরে। এভাবে মিঠা পানির সংকট দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। ঠিক সুপেয় পানির সঙ্গে বোরো আবাদের জন্য সেচের পানির সংকটও এইসব এলাকায় প্রকট।  

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ঘূর্ণিঝড় আইলার রেশ দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের ক্ষতিগ্রস্থ ১১টি উপকূলীয় জেলার ৬৪টি উপজেলার প্রায় ৪০ লাখ দরিদ্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বড় অংশ বয়ে চলেছে। আইলার পর বেশ কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও ভূ-প্রাকৃতিক, মানবসৃষ্ট কারণ ও সরকারের সদিচ্ছার অভাবে এ অঞ্চলে পানি ও স্যানিটেশন সেবা নিশ্চিত করা যায়নি। এ অঞ্চলের মাটিতে বর্তমানে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭.৬-১৫.৯ পিপিটি; অথচ মাটির সহনীয় মাত্রা ০.৪-১.৮ পিপিটি। লবণাক্ততার কারণে গাছপালার পরিমাণও আশংকাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। পুকুরে লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে মাছসহ সকল জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) মাইনর ইরিগেশন ইনফরমেশন সার্ভিস ইউনিট পরিচালিত ‘দক্ষিণাঞ্চলের ভূগর্ভে লবণপানির অনুপ্রবেশ পূর্বাভাস প্রদান’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, ভূগর্ভস্থ পানিতে বঙ্গোপসাগর থেকে লবণ পানি এসে মিশছে। এপ্রিল-মে মাসে সাগর থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে গোপালগঞ্জ ও নড়াইলের লোহাগড়ায় মধুমতী নদীতে লবণপানি পাওয়া গেছে। বরিশাল মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, সাগরের কাছের নদীগুলোর পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা আগের থেকে অনেক বেড়েছে এবং বেশি সময় দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। বছর দশেক আগেও এই অঞ্চলের নদীগুলোয় লবণাক্ততার মাত্রা বাড়ত এপ্রিল থেকে মে-জুনে। এখন কপোতাক্ষ, শিবসা, পশুর, ভৈরব, রূপসা, বলেশ্বর, কচা, পায়রা, বিষখালী প্রভৃতি নদীতে লবণাক্ততার মাত্রা বাড়ে ডিসেম্বর-জানুয়ারি থেকে।

উপকূলের পানিসংকট নিরসনে স্থানীয় বাস্তবতাকে বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি বিশেষজ্ঞদের। তারা বলেছেন, নিরাপদ পানি, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য পরিচর্যা সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে এলাকা-উপযোগী প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বৃহৎ গবেষণা উদ্যোগ গ্রহণ নিতে হবে। তারা বলেন, ভেঙে যাওয়া বাঁধ উচু করে নির্মাণ করতে হবে, স্লুইস গেট স্থাপন ও টেকসইভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, পুকুরসহ সুপেয় পানির উৎসগুলো পুনঃখননের মাধ্যমে ব্যবহার উপযোগী করতে হবে। বৃষ্টির পানির যথাযথ সংরক্ষণের ওপর জোর দেন বিশেষজ্ঞরা।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৬ মে ২০১৯/রফিকুল ইসলাম মন্টু/রফিক

     


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

বিচারাধীন মামলা ৩৫ লাখ ৮২ হাজার

২০১৯-০৬-১৮ ৮:২১:৪০ পিএম

নাসায় যাচ্ছে শাবির ৪ শিক্ষার্থী

২০১৯-০৬-১৮ ৮:১২:৩২ পিএম

ভুয়া ম্যাজিস্ট্রেট গ্রেপ্তার

২০১৯-০৬-১৮ ৭:২৫:০২ পিএম