‘উপকূলের তথ্য কেন্দ্রে নিতে চাই’

প্রকাশ: ২০১৭-১১-২৮ ৪:০২:৫৪ পিএম
ছাইফুল ইসলাম মাছুম | রাইজিংবিডি.কম

রফিকুল ইসলাম মন্টু। উপকূল-সন্ধানী সংবাদকর্মী হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূল অঞ্চল ঘুরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংবাদ পাঠককে জানান তিনি। পূর্বে কক্সবাজারের টেকনাফ, পশ্চিমে সাতক্ষীরার শ্যামগরের কালিঞ্চি গ্রাম- সর্বত্রই তার পদচারণা। খবরের খোঁজে ছুটে চলেন এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। উপকূলের যত আঁকাবাঁকা পথ আছে, সবই তার চেনা, সবই তার নখদর্পণে। সমগ্র উপকূল নিয়ে গণমাধ্যমে ব্যতিক্রম ধারার কাজ তিনিই প্রথম শুরু করেন। সে হিসেবে তিনি আছেন উপকূল সাংবাদিকতার অগ্রগামী হয়ে। প্রান্তিকের পিছিয়ে থাকা সুবিধাবঞ্চিত মানুষ নিয়েই তার কাজ। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে পেয়েছেন বহু পুরস্কার। পেয়েছেন ‘উপকূল বন্ধু’ সম্মাননা। সাংবাদিকতা করে এ ধরণের সম্মাননা পাওয়ার ঘটনা বিরল। সম্প্রতি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির বেস্ট রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন তিনি। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ছাইফুল ইসলাম মাছুম।

মাছুম : উপকূল সাংবাদিকতার স্বীকৃতি হিসেবে আপনি ‘উপকূল বন্ধু’ সম্মাননা গ্রহণ করেছেন। আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
রফিকুল ইসলাম মন্টু :
সম্মাননা কিংবা পুরস্কার সব সময়ই আনন্দের। আর এটা অর্জিত হয় যে কোনো কাজের মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে। কাজের ধারা অব্যাহত রাখতে স্বীকৃতিটাই সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। জানি না, আমি এ সম্মাননা পাওয়ার যোগ্যতা রাখি কি না। তবে পাওয়ার পর বুঝতে পারলাম, আমার কাজে উপকূলের মানুষের সমর্থন আছে। ‘উপকূল বন্ধু’ সম্মাননা আমার কাজের গতি অনেকখানি বাড়িয়ে দেবে, ভাবনার জগত প্রসারিত করবে। একই সঙ্গে এ সম্মাননা উপকূলের প্রতি আমার দায়িত্ব অনেকখানি বাড়িয়ে দিলো।

মাছুম : উপকূল নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা কোথায় পেলেন?
রফিকুল ইসলাম মন্টু :
বাংলাদেশের উপকূল, মূলধারার বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি জগত। এখানে সরকারি-বেসরকারি কার্যক্রমও সেভাবে পৌঁছায় না। যেসব কার্যক্রম আছে, সেগুলোও যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। স্বাধীনতার এত বছর পরেও এখানকার মানুষ চরম নিগ্রহের মধ্যে বসবাস করছে। যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সকল ক্ষেত্রেই এখানকার মানুষ চরম অবহেলার মধ্যে রয়েছেন। এই যে নিগ্রহ, অবহেলা, এখান থেকেই আমি উপকূল নিয়ে কাজের অনুপ্রেরণা পাই।

মাছুম : উপকূলে আপনার কাজের এলাকা সম্পর্কে জানতে চাই।
রফিকুল ইসলাম মন্টু :
কাজের সুবিধার্থে গোটা উপকূলকে আমি তিন ভাগে ভাগ করি। পূর্ব-উপকূলে রয়েছে ৫ জেলা- চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর; মধ্য-উপকূলে রয়েছে ৮ জেলা- বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ভোলা, ঝালকাঠি, চাঁদপুর ও শরীয়তপুর; এবং পশ্চিম-উপকূলে ৩ জেলা- খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা। এই পুরো অঞ্চল, উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার সমুদ্ররেখাজুড়ে আমি খবরের সন্ধানে ঘুরছি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর তথ্য সংগ্রহ করছি, প্রতিবেদন লিখছি, মানুষকে জানাচ্ছি।

মাছুম : আপনার কাজের ভিন্ন ধারাটা কী? যে ধারা প্রচলিত ধারার রিপোর্টিং থেকে আপনার কাজ আলাদা করে?
রফিকুল ইসলাম মন্টু :
আমার কাজের ভিন্ন ধারাটা হচ্ছে, আমি প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে একেবারে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে মিশে, তাদের সাথে থেকে তাদের জীবনের গল্প জানার মধ্য দিয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছি। আমি বিশেষ করে প্রান্তিক জনপদে, যেখানে মিডিয়ার পা পড়ছে না, সরকারি কর্মকর্তারা খুব একটা যাচ্ছেন না, সেইসব জায়গায় আমি মানুষের কাছে যাচ্ছি। তাদের সঙ্গে থেকে, কারো বাড়িতে থেকে, কাচারি ঘরে থেকে, কখনো মাছের আড়তে থেকে আবার কখনো সমুদ্রে জেলেদের সঙ্গে মাছ ধরতে গিয়ে তাদের গল্পগুলো জানার চেষ্টা করি। গতানুগতিক যে রিপোর্টিং, সেখান থেকে একটু ভিন্ন ধারায় গিয়ে আমি খবরগুলো শুরু করি। কখনো গল্প দিয়ে, কখনো পরিস্থিতির বিবরণ দিয়ে, আবার কখনো কারো উদ্ধৃতি দিয়ে খবর শুরু করি। এভাবে প্রতিবেদন উপস্থাপনে একটু ভিন্নতা থাকে। খবরে মানবিক আবেদন থাকে, যাতে নীতিনির্ধারক মহলে নাড়া পড়ে। সর্বোপরি আমার প্রতিবেদন লেখায় পৃথক পরিকল্পনা থাকে।

 



মাছুম : আপনার কাজের প্রভাব সমাজে কতটুকু পড়ছে বলে মনে করেন?
রফিকুল ইসলাম মন্টু :
উপকূল ঘুরে রিপোর্টিং করার ফলে প্রভাব বিভিন্ন দিক থেকে রয়েছে। আমি যদি আমার দিকটি বলি, আমার রিপোর্টগুলো বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়েছে। উপকূলের বিভিন্ন ইস্যুতে লেখা আমার বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন জাতীয় পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। মাঠ-সরেজমিনের ভিত্তিতে এ ধরণের প্রতিবেদন লেখার ফলে স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিক, জাতীয় পর্যায়ের টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা বিভিন্ন ইস্যু পাচ্ছেন। আমি সেসবের বিস্তারিত রিপোর্ট তুলে ধরছি, সেগুলো তাদের প্রতিবেদন লেখায় কাজে লাগছে। ফলে জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে উপকূলের খবরের সংখ্যা বেড়েছে। ভিন্নধর্মী রিপোর্টিংয়ের ফলে বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, দেশি-বিদেশি সাংবাদিক-গবেষকদের কাছ থেকে আমি ব্যাপক সারা পেয়েছি। তারা আমার কাছ থেকে উপকূলের তথ্য জানতে চান।

মাছুম : উপকূল নিয়ে আপনার স্বপ্নের কথা জানতে চাই?
রফিকুল ইসলাম মন্টু :
উপকূল নিয়ে আমার স্বপ্ন এটাই, উপকূলের বিভিন্ন জনপদের তথ্য আমি কেন্দ্রে নিতে চাই। এবং কেন্দ্রে নেওয়ার উদ্দেশ্যটা হচ্ছে, উপকূলের অবস্থার পরিবর্তন, উপকূলের মানুষের অবস্থার পরিবর্তন। সেটাই আমার স্বপ্ন। হয়তো এভাবে উপকূলের তথ্য নিয়মিত কেন্দ্রে নিতে নিতে একদিন অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে। দরজায় বার বার কড়া নাড়াটা খুবই জরুরি।

মাছুম : উপকূলীয় সাংবাদিকতায় কী ধরণের সমস্যা রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
রফিকুল ইসলাম মন্টু :
উপকূলীয় রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হই। যাতায়াত সমস্যা এর মধ্যে অন্যতম। দুর্যোগকালীন কিছু সমস্যা রয়েছে। হয়তো ঘূর্ণিঝড় সিগন্যাল আছে, আমি উপকূলে। সিগন্যালের কারণে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারছি না। এই সময় কোনো যানবাহন চলবে না। এছাড়াও দ্বীপাঞ্চলে আবাসন সমস্যাও রয়েছে। তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে নদী সাতরানো, কিংবা নৌকায় যাওয়া, দীর্ঘ পথ পায়ে হাঁটা, এটা একেবারেই স্বাভাবিক চেহারা উপকূলীয় সাংবাদিকতায়। অনেক সময় কষ্ট করে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হলেও সে তথ্য দিয়ে তৈরি করা সংবাদ কেন্দ্রে পাঠানো যায় না। ইন্টারনেটের ধীরগতিতে বেশ সমস্যা।   

মাছুম : উপকূল রিপোর্টিংয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা কী? গণমাধ্যম আরও কী করতে পারে?
রফিকুল ইসলাম মন্টু :
উপকূল সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম যে ভূমিকা রাখছে তা একেবারেই অপ্রতুল। জাতীয় গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকগণ কেবল দুর্যোগকালীন বিপন্নতার দিকেই নজর রাখেন। ঘূর্ণিঝড় আসছে, কিংবা ঘূর্ণিঝড়ে সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে, এমন পরিস্থিতিতেই সাংবাদিকগণ ক্যামেরা নিয়ে উপকূলে ছুটে যান। আবার বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতেও উপকূলের খবরে তাদের আগ্রহ বাড়ে। কিন্তু স্বাভাবিক সময়েও উপকূলের মানুষের জীবন যে কতটা অস্বাভাবিক, সে খবর গণমাধ্যমের কাছে খুব কমই আছে। আমি মনে করি, সব সময়ই উপকূলের দিকে মিডিয়ার নজর রাখা উচিত। আরও বেশি জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে। উপকূলের জন্য বিশেষ প্রতিবেদক নিয়োগ করতে পারে, পাতায় আরো বেশি স্থান বরাদ্দ করতে পারে।

মাছুম : উপকূল উন্নয়নে আপনার পরামর্শ কী?
রফিকুল ইসলাম মন্টু :
উপকূল অঞ্চলে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বয় দরকার। কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি করতে হলে মাঠে তথ্য নিয়ে পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। আর সেই পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে মাঠের তথ্য নিয়ে। আর সেই কার্যকর পরিকল্পনা তৈরিতে অবাধ তথ্যপ্রবাহ বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৮ নভেম্বর ২০১৭/তারা

   
 



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

রেকর্ড গড়ে পাকিস্তানকে হারাল ভারত

২০১৮-০৯-১৯ ১১:৫৯:৪৭ পিএম

সড়ক পরিবহন আইন পাস

২০১৮-০৯-১৯ ১০:৫৫:৩৪ পিএম

ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল পাস

২০১৮-০৯-১৯ ১০:৩৪:১৩ পিএম

‘কারো মান ভাঙাতে আর যাব না’

২০১৮-০৯-১৯ ৮:২৭:৫৪ পিএম
বাজে আউটফিল্ড

খুলনায় খেলা বন্ধের ঘটনায় তোলপাড়

২০১৮-০৯-১৯ ৭:৫৪:৩৭ পিএম