সুপ্রিম কোর্টের কাপল ব্যারিস্টার

প্রকাশ: ২০১৮-০১-১০ ৮:২৯:০৩ এএম
মেহেদী হাসান ডালিম | রাইজিংবিডি.কম

রাইজিংবিডির ক্যামেরায় ব্যারিস্টার শফিকুর রহমান ও ব্যারিস্টার কিউ এন দীপা

মেহেদী হাসান ডালিম: সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের কাছে তারা কাপল ব্যারিস্টার নামেই পরিচিত। বলা হচ্ছে ব্যারিস্টার শফিকুর রহমান রাতুল ও ব্যারিস্টার কিউ এন দীপার কথা। প্রবীণ আইনজীবী মুক্তিযোদ্ধা ওবায়দুর রহমান মোস্তফার বড় ছেলে রাতুল আইন পেশায় উচ্চতর ডিগ্রি নিতে এইচ এস সি পাশ করে পাড়ি জমান লন্ডনে। অপরদিকে সিভিল এভিয়েশনের ইঞ্জিনিয়ার মুক্তিযোদ্ধা রেজা মাহমুদের মেয়ে কামারুন নাহার মাহমুদ দীপাও বাবার স্বপ্ন পূরণে ব্যারিস্টারি পড়তে যান বিলেতে। বিদেশেই পরিচয়, বন্ধুত্ব, প্রেম এবং বিয়েতে গড়ায় দুইজনের সম্পর্ক।

ব্যারিস্টারি পড়া শেষ করে রাতুল দেশে এসে বাবার মত আইন পেশায় নিয়োজিত হন। দীপাও দেশে চলে আসেন। তারা দুজনেই এখন আইন পেশায় রয়েছেন। দরিদ্র মানুষের কল্যাণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ক্যান্সার রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও বৃদ্ধাশ্রম পরিচালনার জন্য গঠিত ট্রাস্টেও তারা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

আইনজীবী হিসেবে একদিন ব্যারিস্টার দীপার যশ, খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে, সারাদেশের মানুষ এক নামে চিনবে স্ত্রীকে- এ প্রত্যাশা ব্যারিস্টার রাতুলের। অপরদিকে একই পেশায় স্বামীর থাকাটা অনেক বড় পাওয়া বলে মনে করেন ব্যারিস্টার দীপা। তার ভাষায়, আমি এতটাই হ্যাবিচুয়েটেড হয়ে গেছি যে, ও যদি একদিন কোর্টে না যায় আমার কাছে কেমন যেন শূণ্য লাগে। ও কোর্ট প্রাঙ্গণে আছে- এটা আমাকে খুব মোটিভেট করে, শক্তি যোগায়।’

জীবনের পার হয়ে যাওয়া দিনগুলো, বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়ে এই প্রথম গণ্যমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন কাপল ব্যারিস্টার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাইজিংবিডির সুপ্রিম কোর্ট প্রতিবেদক মেহেদী হাসান ডালিম
 



প্রবীণ আইনজীবী ওবায়দুর রহমান মোস্তফার সঙ্গে বড় ছেলে ব্যারিস্টার শফিকুর রহমান, ছোট ছেলে শাহরিয়ার ও পুত্রবধু ব্যারিস্টার কিউ এন দীপা


রাইজিংবিডি : পেছনের গল্প …
ব্যারিস্টার কিউ এন দীপা: আমার বাবা সিভিল এভিয়েশনের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। বর্তমানে তিনি অবসরে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বাবর রোডের বাসায় আমার জন্ম। ওখানেই বেড়ে উঠা। আমরা ছয় ভাইবোন। তার মধ্যে আমি পাঁচ নম্বর। মোহাম্মদপুরে গণভবন গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে পড়ালেখা করেছি। ১৯৯৩ সালে গণভবন গভর্নমেন্ট হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে উইমেন্স ফেডারেশন কলেজে এইচএসসি ভর্তি হই। ১৯৯৫ সালে এইচ এস সি পাশ করি। ২০০১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলোসফিতে অনার্স করি। ২০০৬ সালে লন্ডনের লিংকন্স ইন থেকে বার এট ল সম্পন্ন করি।

ব্যারিস্টার শফিকুর রহমান: বাবা অ্যাডভোকেট ওবায়দুর রহমান মোস্তফা। উনি ৯ নম্বর সেক্টরে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু যখন তোফায়েল আহমেদকে পিএস হিসেবে নিয়োগ দিলেন, বাবা তখন তোফায়েল আহমদের পিএস ছিলেন। আমার জন্ম ১৯৭৬ সালে বরিশালে। বরিশাল জেলা স্কুল থেকে এসএসসি করার পর ঢাকায় চলে আসি। ঢাকা নটরডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করার পর ল পড়তে লন্ডনে যাই। সেখানে গিয়ে আমাকে ফাউন্ডেশন ইয়ার করতে হয়। ফাউন্ডেশন ইয়ার করে হরবোন কলেজ থেকে এলএলবি পাশ করি। পরে নর্দাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে বিপিটিসি শেষ করে লিংকন্স ইন থেকে বার এট ল করি।

আমরা তিন ভাই বোন। আমি বড়, মাঝখানে একটা বোন, তারপর ছোট ভাই। ছোট ভাইয়ের ব্যারিস্টারি পড়া শেষের দিকে। আগামি বছর কল টু দ্যা বার হবে। আর বোন হচ্ছেন সৌদি আরব এয়ারলাইন্সের ক্যান্ট্রি ম্যানেজার।

রাইজিংবিডি: কার অনুপ্রেরণায় ব্যারিস্টারি পড়লেন ?
ব্যারিস্টার কিউ এন দীপা: মুলত বাবার অনুপ্রেরণাতেই ব্যারিস্টারি পড়েছি। বাবা সব সময় চাইতেন ডিরেক্টলি দেশের জন্য কাজ করা যায় এমন প্রফেশনে আসতে। আমি ফিলোসফিতে পড়েছি, আমার ইচ্ছা ছিল ওই বিষয়ে ডক্টরেট করে কানাডাতে চলে যাওয়া। কিন্তু ওই সময়ে দেখলাম আমাদের কিছু ফ্রেন্ড ল পড়ার জন্য ইংল্যান্ডে চলে গেল। আবার বাবা বলতেন এমন কিছু হতে যেন নাম শুনলেই বোঝা যায় দেশের জন্য কিছু করছি। একসময় চিন্তা করলাম ল পড়লে যদি ডিরেক্টলি দেশের জন্য কিছু করা যায়। ওখান থেকেই সিদ্ধান্ত। কিন্তু তখন ল’তে চান্স পাইনি। পরে ফিলোসফিতে অনার্স করে লন্ডনে গিয়ে এলএলবি পাশ করে বার এট ল করি।

ব্যারিস্টার শফিকুর রহমান: ছোটবেলা থেকেই একটা এনভাইরনমেন্ট দেখেছি যে, বাবার কাছে ক্লায়েন্টরা আসতেন প্রবলেম নিয়ে। দেখা যেত মানুষ আসছেন একটা সমস্যা নিয়ে। দেখতাম বাবা একটা দিক নির্দেশনা দিয়ে দিচ্ছেন। সেটা আমাকে সব সময় আকৃষ্ট করতো। পরবর্তী সময়ে আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে যে, লিগ্যাল প্রফেশনের সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত আছে। একজন লইয়ারকে সব দিক নিয়ে চিন্তা করতে হয়, সব দিকে জ্ঞান থাকতে হয়। যাদের মধ্যে একটু জানার আগ্রহ আছে আমার মনে হয় তাদের জন্য এই প্রফেশনটা বেস্ট। ব্যারিস্টার হওয়ার পেছনে তো ফ্যামিলির ভূমিকা অবশ্যই ছিল।
 

ব্যারিস্টার কিউ এন দীপার সঙ্গে কথা বলছেন রাইজিংবিডির প্রতিবেদক মেহেদী হাসান ডালিম


রাইজিংবিডি: ইংল্যান্ডে কাটানো দিনগুলো …
ব্যারিস্টার কিউ এন দীপা: ২০০৩ সালে আমি ল পড়তে ইংল্যান্ডে যাই। সেখানে হরবোন কলেজে ল পড়া শুরু করি। রাতুলও তখন একই কলেজে ল ফাইনাল ইয়ারে পড়ত। আমার ফাস্ট ইয়ার ওর ফাইনাল ইয়ার। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়, তবে কলেজ ক্যাম্পাসে দেখা হয়নি। আমি লন্ডনে যে বাসায় থাকতাম একই বাসায় রাতুলের এক ফ্রেন্ড থাকতো। সেখানেই দেখা ও আলাপ। ২০০৩ সালের শেষের দিকে পরিচয় হয়, ভাললাগা-ভালবাসা হয়। ২০০৫ সালে বিয়ে হয়। ২০০৪ সালে রাতুল বার এট ল শেষ করে আর ২০০৬ সালে আমি করি। এর কিছুদিন পরেই আমাদের কন্যা সন্তান হয়। ওর নাম নভেরা শফিক। গ্রিন ডেল স্কুলে ২য় শ্রেণিতে পড়ে।

ব্যারিস্টার শফিকুর রহমান: আমার লাইফটা ইংল্যান্ডে কখনই বেড অব রোজেস বলতে যে কথাটা বোঝায় তা ছিল না। ক্লাসের ফাঁকে আমাকে কাজও করতে হয়েছে। আমি যে সময় গিয়েছি সে সময় ইংল্যান্ডে বাঙালি খুবই কম ছিল। আমরা যখন বাইরের দেশগুলোতে যাই বাংলাদেশের স্মৃতিটা সঙ্গে করে নিয়ে যাই। যে কয়দিন থাকি ওই স্মৃতিটা আঁকড়ে ধরেই থাকি। যখন ফিরে আসি ওভাবেই আসি। মাঝখানে অনেক কিছু মিস করি। আমাদের দেশের সঙ্গে ওদের যে ডিফারেন্সটা সেটা ট্রাফিক থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক দিক, মানুষের মোরালিটি- এই জিনিসগুলো আমি দেখে বোঝার চেষ্টা করেছি। অনেকে দেশে এসে বলে এই দেশে এটা হবে না, ওটা হবে না। আমি এটাতে বিশ্বাসী নই। আমি বলি এটা কোন সমস্যাই নয়, করার মত করলে সমাধান হবে।

রাইজিংবিডি: আপনাদের দুজনের পরিচয়, প্রেম, বিয়ে নিয়ে যদি বলতেন …
ব্যারিস্টার শফিকুর রহমান : ওটা ইন্টারেস্টিং। আমার তখন ফাইনাল ইয়ার চলছে, দীপা ফাস্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছে। হঠাৎ করে দীপার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ও আমাকে কখনই খেয়াল করেনি। আমিই খেয়াল করলাম, আমিই দেখলাম। এটাকে কেউ কেউ বলে হঠাৎ করে ক্লিক করে যাওয়া। এক নজরেই ভাল লেগে যাওয়া। প্রথম দেখার পরেই মনে হয়েছে, যদি আমি কোন লইয়ার মেয়েকে বিয়ে করি তাহলে ও হবে আমার প্রথম পছন্দ।

তারপর কয়েকটা ঘটনা ঘটেছে অনেকটা কাকতলীয়। যেমন ওর সাথে দেখা হওয়ার কথা নয় তবুও দেখা হয়ে গেছে। তখন আমি ভাবতাম, হয়তো উপরওয়ালা চাইছেন। একটা ঘটনা বলি, সেটা হলো একটা বাসা যেখানে ও আছে আমি জানতাম না। সেও জানতো না যে, ওই বাসায় আমার যাওয়ার কোন কারণ আছে। আমি গেছি সম্পূর্ণ একজন থার্ড পারসনের জন্য। গিয়ে দেখি দীপা ওইখানে। এরকম আরো ঘটনা ঘটেছে যা সাধারণত সিনেমায় দেখা যায়। এরপর তো আমরা একে অপরকে ভালবেসে ফেলি। ২০০৫ সালে আমাদের বিয়ে হয়।
 

ব্যারিস্টার শফিকুর রহমান ও ব্যারিস্টার কিউ এন দীপা


রাইজিংবিডি: লন্ডনে তো থাকার সুযোগ ছিল। দেশে ফিরে আসলেন কি কারণে ?
ব্যারিস্টার কিউ এন দীপা: আমাদের ইচ্ছা ছিল আমরা ইংল্যান্ডেই থেকে যাব, বাংলাদেশে আসবো না। তখন তো রাতুলের লন্ডনে থাকার বয়স প্রায় ১৪ বছর। ওই দেশের কালচার সে এডপ্ট করে ফেলেছিল। ইন দ্যা মিন টাইম আমরা লন্ডনে একটা চেম্বারে কাজ করা শুরু করে দিয়েছিলাম। এই সময়ে আমার শশুড় অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাতুল তো বড় ছেলে। যখন দেশে এলাম বাবা বললেন, তোমরা একটা বছরের জন্য ট্রায়াল বেসিসে দেশে আসতে পারো কি না। যদি ভাল না লাগে তখন চলে যেও। দেশে আসার পরে আমি রাতুলকে রিকোয়েস্ট করলাম, চলো একটা বছরের জন্য আমরা ট্রায়াল দিতে যাই। যেভাবেই হোক তাকে আমি ম্যানেজ করতে পেরেছি। সে দেশে আসল। কিন্তু তার মন ওখানে পড়ে ছিল। এখানে কাজ করতে করতে দেখা গেছে খারাপ লাগে না। আর আমি তো অনেকটা আলুর মত। যে কোন জায়গায়, যে কোন পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারি।

ব্যারিস্টার  শফিকুর রহমান: লন্ডনে আমাদের বাড়ি কেনা আছে, সব কিছু গুছিয়ে আইন পেশায় নিয়োজিত হয়েছিলাম। এমন হয়ে গেল যে, দুই পরিবারের যার সঙ্গেই কথা হয় প্রত্যেকেই শুধু দেশে আসার কথা বলে। দেশে আসার পজিটিভ দিকগুলো প্রত্যেকেই তুলে ধরে। বাবার অসুস্থতার সংবাদে আমি যখন দেশে আসি, বাই দ্যাট টাইম বাবার যে এসোসিয়েটস আছে, রহমান এসোসিয়েটস, ওখানে বাবা বেশি সময় দিতে পারছিলেন না।

এছাড়া দেশে আসার পরেই দেখলাম আমাদের চেম্বারের সবার মধ্যে কেমন যেন অবস্থা। এসোসিয়েটরা বললেন, আপনারা সিরিয়াসলি বলেন, আপনারা চেম্বারের হাল ধরবেন কিনা। আমরা বললাম, ফাইনালি চলে এসেছি। এখন থেকে আমাদের কাজ হচ্ছে এটাকে ফ্লোরিশ করা। এটাকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এভাবে আস্তে আস্তে শুরু করলাম।

রাইজিংবিডি: কোর্টে প্রথম দিনের শুনানির স্মৃতি …
ব্যারিস্টার কিউ এন দীপা: আমি যখন থেকে প্র্যাকটিস শুরু করি তখন থেকেই বাবার (শ্বশুর) সঙ্গে এটাচড ছিলাম। বাবা ছোটখাট বিষয়েই শুনানিতে দাঁড় করিয়ে দিতেন। এভাবে দেখা গেছে যখন আমি নিজে মোশন করা শুরু করলাম আমার কাছে খুব একটা কঠিন লাগেনি। এখন পর্যন্ত যতগুলো মামলা করেছি সব আমার পক্ষেই এসেছে।

ব্যারিস্টার শফিকুর রহমান: প্রথম দিকে জুনিয়রদের ছোটখাটো কাজ থাকে। এই ধরুন যেমন আদালতের কাছে মামলার শুনানির সময় পিছিয়ে নেওয়া বা বাড়িয়ে নেওয়া। তো প্রথমেই এ ধরণের একটা মামলা নিয়ে আমি গেছি কোর্টে। আমাদের ক্লার্ক বলেছেন, কোর্টে গেলেই হয়ে যাবে। এটা ছিলো পারমিশন বিষয়ে এবং খুবই সিম্পল একটা ম্যাটার। আমি গেলাম এবং আদালত কক্ষে দাঁড়ালাম। জাস্টিস আমায় একটার পর একটা কোশ্চেন শুরু করলেন। যেটার জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না।

 

ব্যারিস্টার শফিকুর রহমানের সঙ্গে কথা বলছেন রাইজিংবিডির প্রতিবেদক মেহেদী হাসান ডালিম


আমি কোনভাবে কথা বলছিলাম এবং জাজ তা বুঝতে পারলেন। এক পর্যায়ে জাজ বললেন, একটা মামলা নিয়ে এসে দাঁড়িয়ে গেছেন- এটা কেমন কথা হলো।

আমি দেখিনি যে, সেখানে তখন আব্বাও বসা ছিলেন। তিনি দেখলেন আমার বিষয়টা আউট অব কন্ট্রোলে চলে যাচ্ছে। তিনি জাজের সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, মাই লর্ড এটা এই ব্যাপার।

রাইজিংবিডি: পরিবারের আরো সদস্য আইন পেশায়- এটা কেমন লাগে আপনাদের কাছে?
ব্যারিস্টার কিউ এন দীপা: আমার কাছে বেশ ভাল লাগে। আমি এতটাই হ্যাবিচুয়েটেড হয়ে গেছি যে, ও যদি কোন দিন কোর্টে না যায় আমার কাছে কেমন যেন শূণ্য লাগে। ও কোর্ট প্রাঙ্গণে আছে- এটা আমাকে খুব মোটিভেট করে, প্রেরণা যোগায়। ওর সাপোর্ট বিশাল সাপোর্ট। আমার শ্বশুর আছেন আমাদের সিনিয়র, আমাদের অভিভাবক। দেবর রেজাউর রহমান শাহরিয়ারেরও ব্যারিস্টারি পড়া প্রায় শেষ। এইজন্য আমরা পরিবারের চারজন একসঙ্গে আছি। আমাদের ইউনিটিটা এত বেশি যে, আমরা নিজেরাই নিজেদের শক্তি। আমাদের বাইরের আর কারো দরকার হয় না। আমরা তো করপোরেট প্র্যাকটিস করি, আমাদের নামই হলো ব্যারিস্টার কাপল। কখনও যদি আমি একা যাই, বলে হোয়ার ইজ ইওর হাজবেন্ড, ও একা গেলে বলে হোয়ার ইজ ইওর ওয়াইফ। মোস্ট অব দ্যা টাইম দুইজন একসঙ্গেই চলাফেরা করি।

রাইজিংবিডি: আপনারা তো একটা ট্রাস্ট করছেন সেটা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই …।
ব্যারিস্টার শফিকুর রহমান: আমার চাচা ড. জোবায়দুর রহমান ওয়ার্ল্ডের ওয়ান অব দ্যা লিস্টেড একাউনটেন্টস। বিশ্ব ব্যাংকের বড় পর্যায়ের কর্মকর্তা ছিলেন। তার কোন সন্তান নেই। উনি তার বরিশালের পুরো সম্পত্তি, ঢাকা ও আমেরিকার প্রায় ১ হাজার একর সম্পত্তি নিয়ে ট্রাস্ট গড়ে তুলেছেন। আমি, দীপা, চাচা ও চাচী এই ট্রাস্টের ট্রাস্টি। ওনারা কিছুই নিজেদের জন্য রাখেননি। সব প্রপার্টি ট্রাস্টের নামে দিয়ে দিয়েছেন। চাচা বরিশালের জায়গায় দাদা ও দাদীর নামে ট্রাস্ট করে দিয়েছেন। ওইখানে চারতলা বিল্ডিং-এ একটা স্কুল আছে। নামে জে রেস টি শিশু নিকেতন। গরীব ছেলে মেয়েরা সেখানে পড়তে পারছে। এটা ট্রাস্টের একটা স্কুল। ওইখানে একটা কম্পিউটার সেন্টার আছে। এছাড়া সেলাই শিক্ষা কেন্দ্র, ফ্রি চিকিৎসা, মোটর ড্রাইভিং- এরকম বেশ কয়েকটা প্রজেক্ট রয়েছে।

ট্রাস্ট্রের অধীনে গুলশান-২ এ ইউনিভার্সিটি হচ্ছে। নাম জেরিনা রেফ ইউনিভার্সিটি ম্যানেজমেন্ট এন্ড সাইন্সসেস। সংক্ষেপে জমস(zums)। স্টার্ট হবে এমবিএ দিয়ে।

 

নিজস্ব চেম্বারে ব্যারিস্টার শফিকুর রহমান ও ব্যারিস্টার কিউ এন দীপা


এটা পারমিশনের প্রসেসে আছে। বাংলাদেশের অন্যতম একটা ভালো ইউনিভার্সিটি হবে। এখানে যারা টিচার হচ্ছেন তারা সবাই বিশ্বের সব নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করা। ইতিমধ্যে ২৩ জনের মত টিচার নিয়োগ হয়ে গেছে। এটা ম্যানেজমেন্ট এন্ড সাইন্স ভিত্তিক কিন্তু ল পড়ারও সুযোগ থাকবে। এছাড়া ইউনিভার্সিটির সঙ্গে একটা ক্যান্সার রিসার্চ ইনস্টিটিউট করা হচ্ছে ট্রাস্টের অধীনে। পুরোটাই দেখভাল করতে হচ্ছে আমাকে। আর এদিকে দীপা কোর্টে বেশি সময় দিচ্ছে।

ব্যারিস্টার কিউ এন দীপা: বর্তমান অবস্থায় ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পাওয়া একটা ম্যাসিভ ইস্যু। এটার জন্য যে রাতুলকে কি পরিমান কষ্ট করতে হয়েছে। পেপার ওয়ার্ক থেকে শুরু করে বিভিন্ন মিনিস্ট্রিতে দৌড়ানো, একটা ম্যাসিভ ব্যাপার। রাতুলের জন্যই এটা সম্ভব হয়েছে।

রাইজিংবিডি: স্ত্রীর যে গুণের কথা বলতে চান …
ব্যারিস্টার শফিকুর রহমান: আপনি তো জানেন, আমাদের চেম্বারের নাম রহমান এসোসিয়েটস। এটা স্বীকার করতেই হবে দীপা যেভাবে টেক কেয়ার করে এটাকে আজকের দিন পর্যন্ত নিয়ে এসেছে, ও না থাকলে এটা সম্ভব হতো না। আজকে রহমান এসোসিয়েটসকে যে পর্যায়ে নিয়ে এসেছে এর পুরো ক্রেডিট দীপার। এটা শুধু আমার না, আমার বাবার স্টেটমেন্ট। আমার ফ্যামিলির সবার স্টেটমেন্ট।

রাইজিংবিডি: আইন পেশায় কার মত হতে চান, কত দূর যেতে চান?
ব্যারিস্টার কিউ এন দীপা ও ব্যারিস্টার শফিকুর রহমান: অবশ্যই আমাদের সিনিয়র, মানে আমাদের বাবা। আমরা তার কাছে কন্টিনিউ শিখে যাচ্ছি। আর যদি বলেন, আইন পেশায় আমাদের আইডল কে? সেক্ষেত্রে প্রথমই বলবো ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ স্যারের কথা। রোকন উদ্দিন মাহমুদ স্যার একটা কেস একদম উল্টানো আছে, কেসে কোন মেরিট নেই, উনি আধা ঘণ্টা শুনানির পরে কোর্টে বলেন, আচ্ছা তাহলে শুনানি করা যাবে। স্যারের কোর্টকে ম্যানেজ করার অসাধারণ ক্ষমতা আমাদের মুগ্ধ করে। এ জে মোহাম্মদ আলী স্যারের কথা কি বলবো। স্যারের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে যদি বলা হয় স্যার এই মামলায় তো কিছুই নেই। স্যার বলেন, দাঁড়াও একটু দেখতে দাও। তারপর কিভাবে যেন একটা পয়েন্ট বের করে নিয়ে আসেন। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম স্যারের কথা বলতেই হয়, স্যার যে কোন পরিস্থিতি মাথা ঠাণ্ডা রেখে ম্যানেজ করতে পারেন। অদ্ভুত লাগে ব্যাপারটা। সবচেয়ে বড় কথা তিনি অনেক হেল্পফুল। তিনি অলওয়েজ হেল্প করেন। সালাউদ্দিন দোলন স্যার, প্রবীর নিয়োগী স্যারের সাবমিশনও অসাধারণ লাগে।

রাইজিংবিডি: নতুনদের জন্য যে পরামর্শ রাখতে চান …
ব্যারিস্টার কিউ এন দীপা: একটা কথা বলবো, কখনই হতাশ হওয়া যাবে না। এমন সিন্ধান্ত নিতে হবে যে, প্রথম ৫ বছর আমি স্ট্রাগল করবো। কখনও চিন্তা করা যাবে না আমি এটার পরে কি পেতে যাচ্ছি। এই জিনিসগুলো যদি কেউ করতে পারে তাহলে হতাশ হওয়ার মত কিছু নেই। এই পেশায় যারা শর্টকাট পথ খুজতে যাবে সেটা হবে রং ওয়ে।

ব্যারিস্টার শফিকুর রহমান: আমার কাছে লিগ্যাল প্রফেশনটা হচ্ছে অনেকটা মার্সেনারি সোলজারের মত। আমাদের একটা টাচ দেওয়া হয়, এই ব্যাপার, আমরা ওখানে যাব, ফাইট করবো, ফর আওয়ার ক্লায়েন্ট। ফাইট করে আমাদের জয় ছিনিয়ে আনবো। উইথ ডিগনিটি এবং নিজের পারসোনালিটি দিয়ে।

 

স্বজনদের সঙ্গে ব্যারিস্টার শফিকুর রহমান ও ব্যারিস্টার কিউ এন দীপা


এর অর্থ এই নয় যে, আমি আমার সব কিছু বিক্রি করে দিয়ে ফাইট করে নিয়ে জয় নিয়ে আসবো। বেঁচেও থাকতে হবে আবার এট দ্যা সেইম টাইম ফলাফলও নিয়ে আসতে হবে। এখানে পারসোনালি নেওয়ার কিছু নেই। অনেক সময় অনেক লইয়ার একটা কেসের সঙ্গে নিজেদের পারসোনালি জড়িয়ে ফেলেন। অপরপক্ষের লইয়ারের সঙ্গে ঝগড়া শুরু করে দেন। অথচ বড় বড় লইয়ারদের দেখবেন কোর্টের মধ্যে শুনানির সময় মনে হয় যেন হাতাহাতি হয়ে যাবে। কিন্তু মামলার শুনানি যখন শেষ হয় দুইজন গল্প করতে করতে হাসতে হাসতে বের হয়ে আসেন। এটা দেখে মনে হয়েছে আসলে আমরা লইয়াররা হচ্ছি মার্সেনারি সোলজারের মত।

রাইজিংবিডি: অবসর সময় যেভাবে কাটে …
ব্যারিস্টার কিউ এন দীপা ও ব্যারিস্টার শফিকুর রহমান: আমরা অনেক স্যোশাল, শ্বশুর-শাশুড়ি ও দেবর সবাই একসঙ্গে থাকি। আমার ননদ শাম্মীও পাশেই থাকে। আমার বাবা-মা, আত্মীয় স্বজন, রাতুলের ফুফু, চাচা সবাই ঢাকাতেই থাকেন। তাই আমাদের অবসর বলতে কিছু নেই। অবসর হলো স্যোশাল গ্যাদারিং। আজ এই বাসায় তো কাল ওই বাসায় দাওয়াত, কোর্টের ড্রেসটা কোনরকম চেঞ্জ করে সরাসরি ওখানে গিয়ে উপস্থিত হই। এর বাইরে যদি কিছুটা সময় পাই দুজনই মুভি দেখি। আমাদের বাসায় মুভি দেখার অফুরন্ত অপশন রয়েছে। শুয়ে শুয়ে মুভি দেখি। তাছাড়া সপ্তাহে ৬ দিনই যেহেতু মেয়েকে সময় দিতে পারি না তাই ছুটির দিনে মেয়েকে নিয়ে বের হই। আর বন্ধের মধ্যে আমরা দেশের বাইরে বেড়াতে চলে যাই।

রাইজিংবিডি: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই …
ব্যারিস্টার কিউ এন দীপা: আমাদের যে ট্রাস্ট আছে সেটার উদ্দেশ্য গরীবদের জন্য কিছু করা। আমাদের ট্রাস্টের একটা উইং থাকবে গরীব বিচার প্রার্থীদের জন্য। আপনাকে প্রথমেই বলেছি আমার ব্যারিস্টার হওয়ার মূল উদ্দেশ্যই হলো দেশের জন্য কিছু করা। যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো নয় তাদের জন্য কিছু করা। যখন তাদের মধ্যে থেকে একজন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে তখন সে নিজে আরেকজনকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।

ব্যারিস্টার শফিক: লিগ্যাল লাইনে আমাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা হচ্ছে যে, একটা সময়ে মানুষ যেন আমাদেরকে এক নামে চিনতে পারে। যেমন সার্ভিস ম্যাটারের কথা উঠলেই মানুষ বলে সালাউদ্দিন দোলন স্যারের কাছে যাও। তেমনিভাবে একটা বিষয় নিয়ে যেন আমাদের কাছে, আমাদের ল ফার্মের কাছে আসে, দীপার কাছে আসে। আমার টার্গেটটা হচ্ছে আমাদের চেম্বারটা এমনভাবে ফ্লোরিশ করুক যে, একটা সময়ে বাংলাদেশের যে কোন প্রান্ত থেকে মানুষ বলে আমরা এই কেসটার জন্য ব্যারিস্টার দীপার কাছে যাবো বা ওই চেম্বারে যাবো।

রাইজিংবিডি: আপনাদেরকে ধন্যবাদ।
ব্যারিস্টার কিউ এন দীপা ও ব্যারিস্টার শফিকুর রহমান: আপনাকে এবং রাইজিংবিডির পাঠকদেরকে ধন্যবাদ।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ জানুয়ারি ২০১৮/মেহেদী/শাহনেওয়াজ

   
 


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

২০৫ বলে ১ বাউন্ডারি!

২০১৮-১২-১৫ ৯:৪৮:৫০ এএম

টিভিতে আজকের খেলা

২০১৮-১২-১৫ ৮:৩৫:১৪ এএম

জ্বলে-পুড়েও মুগ্ধ দহন’র দর্শক

২০১৮-১২-১৫ ৮:০৭:৫২ এএম