যেসব খাবার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর

প্রকাশ: ২০১৮-০৪-০২ ১০:২৫:৫৩ এএম
মাহমুদুল হাসান আসিফ | রাইজিংবিডি.কম

প্রতীকী ছবি

মাহমুদুল হাসান আসিফ : পরিবেশের ক্ষতি বা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রসঙ্গ আসলে আমরা যানবাহন, শিল্পকারখানা, বাড়ি এবং অফিসকে দায়ী করে থাকি। কেননা এসমস্ত স্থানে বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য জ্বালানি প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

আমরা মজা করে আমাদের পছন্দের খাবারগুলো খাওয়ার সময় একবারও ভাবি না যে, এ সকল খাবার উৎপাদনের ফলে পরিবেশের ওপর কেমন প্রভাব পড়ে। দুঃসংবাদ হচ্ছে, কৃষি কাজের ফলে প্রচুর পরিমাণে গ্রিনহাউজ গ্যাস উৎপাদিত হয় যা পরিবেশের চরম ক্ষতির একটি কারণ।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস্থার মতে, কৃষিকাজের ফলে উৎপাদিত হওয়া গ্রিনহাউজ গ্যাসের মাত্রা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। খাদ্যদ্রব্য উৎপাদনের সময় সকল খাদ্য কিন্তু সমানভাবে উৎপাদন করা হয় না। এ প্রতিবেদনে ১০টি খাদ্য নিয়ে আলোচনা করা হলো, যেগুলো পরিবেশের স্বার্থে আমাদের কমানো উচিত।

* বাদাম দুধ উৎপাদন
বাদামের তৈরি দুধ বিভিন্ন দুগ্ধজাত খাদ্যদ্রব্যের বিকল্প হিসেবে প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। পরিবেশের ওপর এটির প্রভাব বেশ প্রকট। পৃথিবীতে উৎপাদিত বাদামের ৮০ শতাংশ আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াতে উৎপাদিত হয়ে থাকে যার ফলে সেখানে প্রতিবছর ভয়ানক খরা দেখা দেয়। প্রতিটি বাদামের গাছে প্রতিনিয়িত ৫ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। তাছাড়া ১০০ মিলি বাদামের দুধ তৈরিতে ১০০ লিটার পানির দরকার হয়। এর ফলে পানির চাহিদা প্রচুর পরিমাণে বাড়ে যা কৃষকদের অতিরিক্ত পরিমাণে কূপ তৈরিতে বাধ্য করে। ফলে রাস্তাঘাট, সেতু এবং চাষাবাদের জন্য তৈরি খালের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয় এবং ভূমিকম্পের সম্ভাবনা বেড়ে যায় যা পরিবেশের জন্য ধ্বংসাত্মক।

* গরুর মাংস উৎপাদন
বিশ্বের ১৪.৫ শতাংশ গ্রিনহাউজ গ্যাস পশু চাষাবাদের মাধ্যমে তৈরি হয়ে থাকে যার ৬৫ শতাংশ গরুর মাংস এবং নানান দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনের ফলে তৈরি হয়। আমেরিকার প্রাকৃতিক সম্পদ প্রতিরক্ষা অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কিলোগ্রাম গরুর মাংস উৎপাদনে ২৭ কিলোগ্রাম কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়। প্রতিদিন বিশ্বে গরুর মাংস উৎপাদন এবং ব্যবহারের হিসাব অনুযায়ী প্রচুর পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হচ্ছে, যা পরিবেশের ওপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলছে। তাছাড়া গরুর মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে মিথেন গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে যা খুবই ক্ষতিকর গ্রিনহাউজ গ্যাস হিসেবে পরিচিত। বেশ কয়েকটি দেশে গরুর ফার্মের জন্য বন উজাড় করে জায়গা তৈরি করা হচ্ছে, যার ফলে প্রতিনিয়ত ব্যাপক হারে গ্রিনহাউজ গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে এবং এটি জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ।

* ভেড়ার মাংস উৎপাদন
গরুর মাংস উৎপাদনের মতোই প্রতি কিলোগ্রাম ভেড়ার মাংস উৎপাদনের ফলে ২২.৯ কিলোগ্রাম কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়। লাল মাংস উৎপাদনের জন্য প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক সম্পদ খরচ হয় যা ভেড়া বা অন্যান্য পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাছাড়া তাদের খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপক হারে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় যা নাইট্রাস অক্সাইড নির্গত করে। নাইট্রাস অক্সাইড জলবায়ুর উত্তাপ বাড়িয়ে দেয় এবং এটি কার্বন-ডাইঅক্সাইডের তুলনায় ২৯৮ গুণ বেশি শক্তিশালী।

* পনির উৎপাদন
পনির উৎপাদনের ফলে কার্বন ডাই অক্সাইডের একটা বড় অংশ নির্গত হয়ে থাকে। প্রথমত, এটা গরু থেকে আসে যার ফলে মিথেন গ্যাস উৎপাদিত হয়। দ্বিতীয়ত, এটি হিমায়িতকরণের প্রয়োজন পড়ে পাশাপাশি পরিবহনের দরকার হয়। পনিরের মাত্র কিছু অংশ বাজারজাত করা হয় কিন্তু বাকি প্রায় অর্ধেক অংশ কার্বন ডাই অক্সাইড বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। পনির উৎপাদন করতে বিপুল পরিমাণ শক্তি খরচ হয়ে যায়, কেননা পনির উৎপাদনে অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করতে হয়। প্রথমে দুধ সংগ্রহ, তারপর সেটা নানান প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর পনির তৈরি হয়। তাছাড়া পনিরের হিমায়িতকরণ এবং পরিবহনের কাজেও প্রচুর শক্তি ব্যয় হয়, যা পরিবেশের ওপর ঝুঁকিপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

* চাল উৎপাদন
বিশ্বের সিংহভাগ মিথেন গ্যাসের উৎপাদন চাল উৎপাদনের ফলে হয়ে থাকে। চাল থেকে তৈরি ভাত হচ্ছে পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রধান জনপ্রিয় খাদ্য, যা উৎপাদনের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। ধান উৎপাদনের ফলে প্রচুর পরিমাণে মিথেন গ্যাস উৎপাদিত হয় এবং কার্বন-ডাইঅক্সাইড নির্গত হওয়ার হার বৃদ্ধির ফলে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। প্রতি কিলোগ্রাম চাল উৎপাদনে বিপুল পরিমাণে মিথেন গ্যাস নির্গত হয় যার ফলে পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি চালের চাহিদা বেড়েই চলেছে, যার ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের হার বেড়েই চলেছে প্রতিনিয়ত।

* পাউরুটি উৎপাদন
গম থেকে পাউরুটি অর্থাৎ সাদা রুটি উৎপাদন করতে গম থেকে তৈরি ময়দা পরিশুদ্ধকরণের পাশাপাশি অনেক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় যার ফলে ব্যপক হারে শক্তি খরচ হয়ে যায়। তাছাড়া এই রুটিগুলো প্লাস্টিক প্যাকেটের মাধ্যমে সংরক্ষণ এবং বাজারজাত করা হয় যার ফলে প্লাস্টিকের উৎপাদন বাড়ে। এই বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক উৎপাদনের ফলে পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

* ডিম উৎপাদন
খামারে উৎপাদিত একটি ডিমের কারণে ৪.৮ কিলোগ্রাম কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়। তাছাড়া খামারে মুরগির খাদ্য এবং বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাসহ অন্যান্য ব্যবস্থার জন্য প্রচুর শক্তির প্রয়োজন পড়ে। মুরগির খামারে প্রচুর পরিমণে নাইট্রাস অক্সাইড উৎপাদিত হয়ে থাকে। তাছাড়া খাঁচায় আবদ্ধ মুরগি থেকে ব্যাপক হারে অ্যামোনিয়া নির্গত হয়, যা পরিবেশের ওপর খুব একটা ভালো প্রভাব ফেলে না।

* টুনা মাছ উৎপাদন
বিশ্ববাজারে টুনা মাছের ব্যাপক চাহিদা থাকার কারণে প্রচুর পরিমাণে টুনা মাছ শিকার করা হয়, যার ফলে সমুদ্র থেকে টুনা মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। টুনা মাছ শিকারের পরিমাণ ইদানিংকালে ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ার কারণে টুনা মাছের প্রজাতি আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। বাণিজ্যিক উপায়ে টুনা শিকার এবং বাজারজাতকরণের ফলে সামুদ্রিক পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাছাড়া সমুদ্রে টুনা শিকারের জন্য জাহাজের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তা পরিবেশের সার্বিক ভারসাম্য নষ্ট করে চলেছে প্রতিনিয়ত।

* রুই মাছ উৎপাদন
রুই মাছে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩ তেল থাকে যা হৃৎপিণ্ডের জন্য খুবই উপকারী এবং হৃদরোগ বিশেষজ্ঞগণ প্রায়শই বেশি করে রুই মাছ খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন জলাশয় থেকে রুই মাছ শিকারের পাশাশি বাণিজ্যিকভাবে রুই মাছের চাষ করা হচ্ছে, যা পরিবেশের ওপর ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। খামারে রুই মাছ চাষের জন্য নানানরকম রাসায়নিক উপাদান ব্যবহৃত হয় এবং সেখানে উৎপাদিত বর্জ্য পদার্থ নদী-নালা এবং সমুদ্রে ফেলা হয় যার ফলে পানি দূষণের হার বেড়ে যায়। এর ফলে অন্যান্য জলজীবন ব্যাপকহারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ জলজ জীব বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বে বর্তমানে আমিষের সহজলভ্য উৎস হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে রুইয়ের চাষ করা হয়, যার ফলে দিনে দিনে বিশ্বের পানি এবং বায়ু মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।

* মুরগির মাংস উৎপাদন
বর্তমান বিশ্বের বিপুল জনসংখ্যার মাংসের চাহিদা মেটাতে ব্যাপক হারে মুরগির খামারের মাধ্যমে মুরগির মাংস উৎপাদিত হচ্ছে যা পরিবেশের ক্ষতি করে চলেছে প্রতিনিয়ত; হচ্ছে ব্যাপক মাত্রায় বিভিন্ন রকমের দূষণ। আমেরিকায় পরিবেশ নষ্টের অন্যতম কারণ এই মুরগির খামার। প্রতিবছর আমেরিকাতে ১০ বিলিয়নের বেশি মুরগি কাটা হয়, যা পরিবেশ দূষণে ভূমিকা রাখছে। তাছাড়া মুরগির খামারে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং ব্যাপকহারে পরিবেশের দূষণ ঘটায়।

তথ্যসূত্র : ওয়ার্ল্ড অ্যাটলাস

 

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২ এপ্রিল ২০১৮/ফিরোজ

   
 


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

সাফল্যে রঙিন বছর

২০১৮-১২-১৫ ১০:৫২:৩২ পিএম

যে ২৫ পাসওয়ার্ড ব্যবহার করবেন না

২০১৮-১২-১৫ ৮:৪৬:৫০ পিএম

৩০ ডিসেম্বর ভোটের বিপ্লব হবে : রব

২০১৮-১২-১৫ ৭:৫৯:৫০ পিএম