বাংলাদেশি বিমানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা নেপালেই

প্রকাশ: ২০১৮-০৩-১৩ ৩:১১:৩৯ পিএম
হাসান মাহামুদ | রাইজিংবিডি.কম

সোমবার ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের সময় রানওয়ের কাছে একটি ফুটবল মাঠে ইউএস বাংলার বিমানটি ছিটকে পড়ে (ছবি : টুইটার)

নিজস্ব প্রতিবেদক : অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুট মিলিয়ে বাংলাদেশি বিমানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে নেপালে।

এর আগে ১৯৮৪ সালে ঢাকায় দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটেছিল। সেটা ছিল বাংলাদেশ বিমানের একটি উড়োজাহাজ। তাতে নিহত হন ৪৫ জন যাত্রী ও ক্রু। তবে সোমবারের ঘটনা এ যাবৎকালে সবচেয়ে বড় বিমান দুর্ঘটনা।

মাঝের ৩৪ বছরে দেশে-বিদেশে বাংলাদেশি যাত্রীবাহী বিমানের দুর্ঘটনা ঘটনা আছে অন্তত ৩৫টি। ১৯৯১ সালের ১৫ জুন বাংলাদেশ বিমানের একটি এফ-২৮ বিমান রাজশাহী বিমানবন্দরে অবতরণের সময় রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ১৯৯২ সালে ঢাকায় একটি এটিপি উড়োজাহাজ, পরের বছর ডিসি-১০ ঢাকায় দুর্ঘটনায় পড়ে। এরপর ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কাঠমান্ডু, লন্ডন, রিয়াদ, সিঙ্গাপুর, নয়াদিল্লি, মাস্কাট, দুবাই ও কলকাতায় ২৮টি বাংলাদেশি যাত্রীবাহী বিমান দুর্ঘটনার মুখে পড়ে। চারটি ছিল ছোটখাটো অসঙ্গতি। এসবে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। তবে এই সময়ের মধ্যে হতাহতের পাশাপাশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে তিনটি।

ট্রু অ্যাভিয়েশনের একটি আন্তোনভ ২৬-বি মডেলের একটি উড়োজাহাজ ২০১৬ সালের ৯ মার্চ কক্সবাজার থেকে উড্ডয়নের পর পরই বঙ্গোপসাগরে বিধ্বস্ত হয়। এতে কোনো যাত্রী ছিল না। তবে চার জন ক্রু’র মধ্যে তিন জনই নিহত হন। বেসরকারি এই বিমান সংস্থাটি ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রশিক্ষণ উড্ডয়নের সময় এয়ার পারাবতের একটি বিমানে আগুন ধরে গিয়ে ঢাকার পোস্তগোলায় বিধ্বস্ত হয়। তাতে নিহত হন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের মেয়ে বৈমানিক ফারিয়া লারা ও সৈয়দ রফিকুল ইসলাম। ২০০২ সালের ৭ জুন পারাবতের আরেকটি প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন পাইলট মুখলেছুর রহমান সাকিব। এসব দুর্ঘটনার পর বন্ধ হয়ে যায় বেসরকারি এয়ারলাইনস এয়ার পারাবত।

দেশীয় যাত্রীবাহী বিমানের প্রথম বড় ধরনের দুর্ঘটনাটি ঘটে ১৯৮৪ সালের ৪ আগস্ট। এর আগে, ১৯৭২ সালে ১০ ফেব্রুয়ারি ডগলাস ডিসি-৩ প্রশিক্ষণ বিমান ঢাকায় বিধ্বস্ত হলে চার জন ক্রু’র মধ্যে তিন জন নিহত হন।



অ্যাভিয়েশন সেফটি নেট (এএসএন) সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে এই অবধি, দেশের মাটিতে বাংলাদেশি বিমান সংস্থার (সরকারি-বেসরকারি) মোট ১২টি বিমান দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছে। এছাড়া, তিনটি বিদেশি কোম্পানির বিমানও বাংলাদেশের মাটিতে দুর্ঘটনার মুখে পড়েছিল।

তবে এএসএন সূত্রে আরো জানা গেছে, ১৯১৯ সাল থেকে এই ভূখণ্ডে মোট ৬৬টি বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর বিমানের ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশ বিমানের একজন কর্মকর্তা বলেন, বেসরকারি পর্যায়ে বাংলাদেশে বিমানসংস্থা গড়ে ওঠার ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। এরই মধ্যে বেসরকারি পর্যায়ের বিমানপরিবহনগুলো মোটামুটি আস্থা তৈরি করতে পেরেছে। কিন্তু কিছু দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।

তিনি বলেন, ইতিবাচক উদাহরণ কখনো দেশের চিত্র হতে পারে না। তবে সামগ্রিক বিবেচনায় বাংলাদেশের বিমান পরিবহনের লোকসান নিয়ে কথা থাকতে পারে, কিন্তু দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে আমাদের থেকেও অনেক বেশি পরিসংখ্যানের দেশ রয়েছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৭২ সালে কার্যক্রম শুরু করার পর এ পর্যন্ত ১৬টির মতো দুর্ঘটনার মুখে পড়ে। বাকি ঘটনাগুলো বেরসকারি পরিবহনের। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ৭ জুন শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের মুহূর্তে দুর্ঘটনায় পড়ে বিমানের বোয়িং-৭৭৭-৩০০ ইআর উড়োজাহাজ। বিমানের বিজি-০৪৯ ফ্লাইটটির বৈমানিক ছিলেন ক্যাপ্টেন শোয়েব আলী। রানওয়ে থেকে উড্ডয়নের আগেই উড়োজাহাজের ২নং ইঞ্জিনটি গরম হয়ে বিকল হয়ে যায়, যার সংকেত বৈমানিক ডিসপ্লে থেকে দেখতে পান এবং উড্ডয়ন বাতিল করেন।



২০১৫ সালের ২৮ মার্চ সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকায় আসার পথে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় পড়ে বিমানের একটি এয়ারবাস এ-৩১০ উড়োজাহাজ। ফ্লাইট নং বিজি ০৮৫ সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করে বাংলাদেশের আকাশসীমায় প্রবেশের পর চট্টগ্রামের শাহ আমানত (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৭০ নটিক্যাল মাইল দূরে উড়োজাহাজের দ্বিতীয় ইঞ্জিনে আগুনের সংকেত পান বৈমানিক। সে যাত্রায় বৈমানিকের দক্ষতায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে উড়োজাহাজটি। ওই সময় পুরো বিমানবন্দরে জারি করা হয় সতর্কতা সংকেত। বিমানবন্দর ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটগুলো নেওয়া হয় রানওয়েতে।

এর আগে ২০১৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের পর দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয় বিমানের বোয়িং-৭৭৭-২০০ ইআর উড়োজাহাজ। দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট ৭৭৭-২০০ ইআর (বিজি ০৪৭) উড়োজাহাজটি চট্টগ্রাম থেকে ওইদিন রাত ১২টা ৩৩ মিনিটে দুবাইয়ের উদ্দেশে রওনা হয়। এতে যাত্রী ছিলেন ২৪১ জন। উড্ডয়নের মাত্র ৮ মিনিটের মাথায় হঠাৎ বিকট শব্দ হয়। তাতে সব যাত্রী আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পর ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম ঘোষণা দেন, একটি ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেছে। অন্য ইঞ্জিনটি দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করে উড়োজাহাজটি নিয়ে নিরাপদে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন বৈমানিক।

একইভাবে ২০১৪ সালের ২৮ মার্চ সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকায় আসার পথে দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয় বিমানের এয়ারবাস এ-৩১০ উড়োজাহাজ। ওই ফ্লাইটের বৈমানিক ছিলেন ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ সালেহ ও ক্যাপ্টেন ইয়ামেনী। উড্ডয়নের পর বৈমানিক দুই নং ইঞ্জিনে আগুনের সতর্কতা সংকেত পান। তবে এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

জানা গেছে, কার্যক্রম চালুর পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস দ্বিতীয়বার দুর্ঘটনায় পড়ে ১৯৭৯ সালের ১৮ নভেম্বর। ওইদিন বিমানের একটি ফকার এফ-২৭ উড়োজাহাজ উড্ডয়নের পর সাভার বাজারের কাছাকাছি থাকা অবস্থায় দুটি ইঞ্জিনেই আগুন ধরে যায়। পরে বৈমানিক উড়োজাহাজটি কাছাকাছি একটি মাঠে জরুরি অবতরণ করেন। এ দুর্ঘটনায় মেরামতের অযোগ্য হয়ে পড়েছিল উড়োজাহাজটি।

তৃতীয় দুর্ঘটনাটি ঘটে ১৯৮০ সালের ৩ এপ্রিল। বিমানের বোয়িং-৭০৭-৩৭৩সি উড়োজাহাজটি সিঙ্গাপুরের পায়া লেবার বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের পর ১০০ মিটার উচ্চতায় ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেলে পুনরায় রানওয়ের দিকে ফিরে আসে। অবতরণের সময় রানওয়ে থেকে প্রায় দুই হাজার ফুট দূরত্বে পিছলে যায়। এ দুর্ঘটনায়ও মেরামতের অযোগ্য হয়ে পড়েছিল উড়োজাহাজটি।



এছাড়া ১৯৯৭ সালের ২২ ডিসেম্বর কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার সময় সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে বেলি ল্যান্ডিং বা চাকা ছাড়াই অবতরণ করে বিমানের একটি ফকার এফ-২৮ উড়োজাহাজ। এ দুর্ঘটনায়ও মেরামতের অযোগ্য হয়ে পড়ে উড়োজাহাজটি। একইভাবে ২০০৪ সালের ৮ অক্টোবর ঢাকা থেকে যাওয়ার সময় ওসমানী বিমানবন্দরের রানওয়ে পার হয়ে ১৫০ ফুট দূরে ১৫ ফুট গর্তের মধ্যে ঢুকে পড়ে বিমানের একটি ফকার এফ-২৮ উড়োজাহাজ।

অন্যদিকে ২০০৫ সালের ১ জুলাই দুর্ঘটনায় পড়ে বিমানের ডিসি-১০-৩০ ইআর উড়োজাহাজ। উড়োজাহাজটি ঢাকা-চট্টগ্রাম-দুবাই আন্তর্জাতিক রুটে চলাচল করত। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার সময় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় অবতরণের সময় উড়োজাহাজের ডান দিক হেলে যায় ও একটি ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায়। নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন উড়োজাহাজের সব যাত্রী। পরবর্তীতে তদন্ত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়, উড়োজাহাজে কোনো যান্ত্রিক গোলযোগ ছিল না। এ দুর্ঘটনার জন্য বিমানের পাইলটকে দায়ী করা হয়। পরে তিনি চাকরিচ্যুত হন।

এছাড়া ২০০৭ সালের ১২ মার্চ দুর্ঘটনায় পড়ে বিমানের এয়ারবাস এ-৩১০-৩০০ উড়োজাহাজ। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের সময় উড়োজাহাজের সামনের দিককার ল্যান্ডিং গিয়ার অকেজো হয়ে যাওয়ায় উড়োজাহাজটি বিমানবন্দরের রানওয়ের শেষ দিকে গিয়ে থেমে যায়। উড়োজাহাজে ২৩৬ জন যাত্রীর অধিকাংশই অক্ষত ছিলেন।

আর সর্বশেষ দুর্ঘটনা ঘটে গত সোমবার, ১২ মার্চ। ঢাকা থেকে কাঠমান্ডুগামী ইউএস-বাংলার একটি ফ্লাইট  ৭১ আরোহী নিয়ে বিধ্বস্ত হয় ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এতে সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৫০ জনের মৃত্যুর খবর জানা যায়।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ মার্চ ২০১৮/হাসান/সাইফ

   
 



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

বার্সার রেকর্ড রাজস্ব আয়

২০১৮-০৭-১৭ ৫:০২:১১ পিএম

যে ৮ বিষয় গুগলে খুঁজবেন না

২০১৮-০৭-১৭ ৪:৪৩:৫২ পিএম

শতাধিক প্রেক্ষাগৃহে ‘সুলতান’

২০১৮-০৭-১৭ ৪:০৩:৪৬ পিএম