নুহাশ পল্লীতে অমলিন হুমায়ূন

প্রকাশ: ২০১৪-০৭-১৮ ৮:১৯:৪৬ পিএম
| রাইজিংবিডি.কম

আমিনুল ই শান্ত : রিক্সা চলছে। কিছুক্ষণ আগে হয়ে যাওয়া বৃষ্টি আর শীতল বাতাস মিলে দারুণ উপভোগ্য। যতই সামনে যাচ্ছি ততই বিমোহিত হচ্ছি। কিছু দূর যেতেই খেয়াল করলাম, আকাশের কাল মেঘ আমাদের গ্রাস করছে। তবে প্রকৃতির এমন সজ্জায় আমরা তখন উন্মাদ। কিছুক্ষণ পরেই আবার বৃষ্টি নামল। না পারতে পিরুজালী বাজারে যাত্রা বিরতি দিলাম। এ হচ্ছে বৃষ্টি বিরতি। তবে তার আগেই ভিজে একাকার। তাতে কী, নুহাশ পল্লীতে আজ যেতেই হবে। এ অভিযাত্রার সামনে সবই মলিন। বৃষ্টি বিরতির ফাঁকে ফটো সেশনও চলল কিছুক্ষণ। এরপর কিছুটা চিন্তার ভাঁজ পড়ে। কেন না আকাশ দেখে মনে হচ্ছিল না এ বৃষ্টি থামবে। তাই বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে রওনা হলাম। ভিজতে ভিজতেই গিয়ে হাজির হলাম নুহাশ পল্লীতে। তখন দুপুর আড়াইটা।

বিছানাটা ঠিক আগের মতোই আছে। দুটো বালিশ পাশাপাশি পাতা। একটিতে মাথা রাখার কেউ নেই। তাতে লেগে আছে গায়ের গন্ধ, খানিকটা স্পর্শও! দেয়ালে ঝুলে আছে আয়নাটা। বড় বেশি বিমর্ষ। যেন অপেক্ষায় দিন গুনছে সে, একটি মুখের জন্য। কখন এসে নিজেই নিজেকে দেখে বলবে, ‘কিরে হুমায়ূন কেমন আছিস?’ আরো কত অদ্ভুদ ভঙ্গিতে ভেংচি কেটে দাঁত কেলিয়ে হাসবে। কিন্তু দিন যায় রাত আসে, তার প্রতিক্ষার শেষ হয় না। অপেক্ষায় থেকেই কী লাভ?

ঘরের একপাশে ফাঁকা সোফা। তারপাশে বুকশেলফ। তাতে রাখা আছে কিছু বই। খানিকটা ময়লাও জমেছে বটে। বোধ হয় বহুদিন ছোঁয় না কেউ। সুনসান শুন্য পুরোটা থাকার ঘর। কান পাতলে কারও কান্নার শব্দ কি শুনা যায়! এ এক অদ্ভুদ নিষ্প্রাণ অনুভূতি। হাহাকার করে উঠে ভিতরটা। শোয়ার ঘরটা তালাবদ্ধই থাকে বেশি। আমাদের জন্য খোলা হয়েছিল। কতটা শুন্য হলে মানুষ তাকে শুন্য বলে- এ সুযোগে ঠিক তাই দেখে নিয়েছি।

নুরুল হক। ব্যক্তিগত কাজের লোক। তিনি ষোল বছর ধরে কাছ থেকে দেখেছেন স্যারকে। তিনি পুনরায় তালা ঝুলিয়ে দিলেন ঘরের দরজায়। তার তালা লাগানো দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি শুধু ঘরটিই তালাবদ্ধ করেননি! চেষ্টা করেছেন শুন্যতাকেও আবদ্ধ করতে। তাতে কী আর কাজ হয়? দরজার ফাঁক গলে দিব্যি হু হু করে বেড়িয়ে আসে শূন্যতা! থাকার ঘরের পাশেই পরে আছে ইজি চেয়ারটা। তাতে আর কেউ হয়তো বসেন না। আর একটু এগিয়ে হাতের বামে বসার ঘর। আজও সেখানে দেখা মিলল হুমায়ূন আহমেদের ক’জন বন্ধুর। তারা ঠিক আগের মতোই গল্প করছেন, আড্ডা দিচ্ছেন, গান শুনছেন। বুকশেলফের বইগুলোও ঠিক আগের মতোই আছে।

দখিনের জানালাটাও খোলা। হু হু করে বাতাস হুমড়ি খেয়ে ভিতরে ঢুকছে। বিন্দুমাত্রও আপত্তি নেই তার! স্যারের থাকার বাংলোটার সামনে দাঁড়িয়ে, সদ্য ফোঁটা রক্ত জবাকে প্রশ্ন করি, তুই ফুটেছিস কেন? ও কোনো  উত্তর দেয়নি। চুপ ছিল। একদম চুপ।

যেভাবে যাত্রা শুরু
১৯৯৬ সালের বিদায়কাল। ১৯৯৭ সালের প্রথম সূর্যোদয়। ইট পাথরের শহর ছেড়ে, নিভৃতে জীবন যাপনের  ভাবনাটা মাথায় চেপে ছিল নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের। সেই তো শুরু জমি খোঁজা। তারপর ডাঃ এজাজের মাধ্যমে জমির সন্ধান মেলে। গাজীপুরের হোতাপাড়া থেকে বেশ খানিকটা ভিতরে। গহীন শালবনে ঘেরা পিরুজালী গ্রাম। প্রথমে একুশ বিঘা জমি কিনে কাজ শুরু হয় নুহাশ পল্লীর। তারপর একে একে গড়ে উঠতে থাকে এই মানুষটির স্বপ্ন।

বর্তমানে পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ বিঘা জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কথার জাদুকর হুমায়ূন আহমেদের নুহাশ পল্লী। কি আছে এই পল্লীতে? আপনি যখন দেখবেন একে উল্টো মনে প্রশ্ন জাগবে, কি নেই এখানে যা ভালোবাসতেন এ নিভৃতচারী লেখক। এ যেন ইচ্ছে মতো ছুটে চলা! এখানে কোনো বাধা নেই টেলিস্কোপ নিয়ে খোলা মাঠে চাঁদ দেখতে। ‘বৃষ্টি বিলাসে’ বৃষ্টির সঙ্গে বিলাস করে। তাই তো তিনি তৈরি করেছেন- দিঘি লীলাবতী, বৃষ্টি বিলাস, পদ্ম পুকুর, ভূত বিলাস,  মৎস্য কন্যা, ঔষধি উদ্যান, শুটিং স্পট ইত্যাদি।

সুইমিংপুল
মুল ফটক দিয়ে ঢুকতেই হাতের ডানে সুইমিংপুল। আকৃতিতে ছোট। পাশে সারি বাঁধা রক্ত জবা। ভীষণ ফুটেছে। এখানেই স্যার পুত্র নিষাদ ও নিনিতকে নিয়ে সাঁতার কাটতেন। এখন জলশূন্য নিথর পরে আছে সুইমিংপুলটি। সুইমিংপুলের পাশেই স্যারের থাকার বাংলো। ওদিকে তাকালেই কেন যেন চোখের পাতা ভিজে উঠে।

পদ্ম পুকুর
বৃষ্টি বিলাসের দক্ষিণ আর বাস ভবনের উত্তর পাশ। এই দুই বাংলোর মাঝা-মাঝি ছোট আকৃতিতে গড়েছেন পদ্ম পুকুর। চিকচিকে কালো জল। একটা সময় পুকুর ভরা পদ্ম ছিল। এখন নেই। স্যার পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে চা খেতে খুব পছন্দ করতেন। চা খেতে খেতে কখনো বৃষ্টি এলে ওখানে দাঁড়িয়েই ভিজতেন।

হুমায়ূন সমাধি
নুহাশ পল্লীতে ঢুকে মাঠ ধরে একটু সামনে এগিয়ে গেলেই, হাতের বাঁ-পাশে শেফালি গাছের ছায়ায় নামাজের ঘর। এর পাশেই তিনটি পুরোনো লিচু গাছ নিয়ে ছোট্ট একটি বাগান। লিচু বাগানের উত্তর পাশে জাম বাগান। দক্ষিণে আম বাগান। লিচু বাগানের ছায়ার নীচে এই কিংবদন্তির অনেক সময় কেটেছে। কখনো হেসেছেন কখনো বা মন খারাপের দিন কেটেছে তার। এই লিচু বাগানের নির্মল ছায়ায় চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তার এই সমাধি সৌধের ডিজাইন করেছেন সহধর্মিণী স্থপতি মেহের আফরোজ শাওন।

ঘড়ির কাটা চারটা। মলিন আকাশ থেকে তখনও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। না জানা অনেক প্রশ্নের উত্তরই জানা হলো। এবার ফেরার পালা। নুহাশ পল্লীর মূল ফটকের বাইরে পা রাখতেই ভিতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। দু’ কদম সামনে এগিয়ে যেতেই কানে ভেসে এলো ‘যাস নে’। আঁতকে উঠলাম। পিছন ফিরে তাকালাম। কাউকে দেখলাম না। আবার কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়ালাম। অবশেষে বলে এলাম ভালো থেকো নুহাশ পল্লী। ভালো থেকো কথার যাদুকর।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৮ জুলাই ২০১৪/রাশেদ শাওন

     


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

আরমীন মুসার ‘ভয় করছে’ (ভিডিও)

২০১৯-০৫-১৯ ৩:১৫:৪৭ পিএম

হন্ডুরাসে বিমান বিধ্বস্ত, নিহত ৫

২০১৯-০৫-১৯ ২:১২:১৬ পিএম