প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রতিরোধের কৌশল

প্রকাশ: ২০১৮-০১-০৬ ৪:৩৬:০৭ পিএম
প্রদীপ অধিকারী | রাইজিংবিডি.কম

প্রদীপ অধিকারী: সাম্প্রতিককালে তথাকথিত ফাঁস প্রশ্নপত্রের জন্য দৌড়-ঝাপ পরীক্ষাসংস্কৃতির জন্য বাজে দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরীক্ষার পূর্বের রাত বা তার কাছাকাছি সময়ের দৃশ্য গল্পের সেই শেয়ালের মতো।

এক শেয়াল ঘুমাচ্ছিল বনের ভেতর কাঁঠাল গাছের নিচে। এমন সময় একটা পাঁকা কাঁঠাল গাছ থেকে পড়ল। ঘুমের ঘোরে শেয়ালের মনে হলো আকাশ ভেঙে পড়েছে। লাফিয়ে উঠেই সে দৌড়াতে শুরু করল। পথে যার সঙ্গে দেখা তাকেই সে ভয়ে-বিস্ময়ে বলল, আকাশ ভেঙে পড়ছে, পালাও পালাও। তার কথা শুনে অন্যরাও পালাতে লাগল। এক সময় দেখা গেল বনের সব পশু দৌড়াচ্ছে। পরীক্ষার্থীদের অবস্থা অনেকটা এ রকম। তারা তো দৌড়ায়ই, অভিভাবক দৌড়ায়, শিক্ষক দৌড়ায়, শুভাকাঙ্খী দৌড়ায়। পরীক্ষার পূর্বের রাতে দৌড়ায়, সপ্তাহব্যাপী দৌড়ায়, মাসব্যাপী দৌড়ায়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে সম্পৃক্ত চক্রের অর্থোপার্জন কৌশলের মারপ্যাঁচে পরে প্রায় সময়ই তারা ধোকা খায়- তবু দৌড়ায়।

পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র প্রণয়নের প্রচলিত প্রক্রিয়াটিতে রয়েছে মোটামোটিভাবে ৪টি পর্যায়ের ১৫টি উপপর্যায়। যার প্রায় প্রতিটি উপপর্যায়েই রয়েছে যে কোনো অসৎ ব্যক্তি বা চক্রের জন্য প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিস্তর সুযোগ। এই সুযোগের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি। ফলে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ সমস্ত বিজ্ঞতা ও ক্ষমতা ব্যবহার করেও এদের টিকি স্পর্শ করতে পারছে না। পারা সম্ভবও নয়। নিচের ছকটি থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

প্রশ্নপত্র প্রণয়ণের বিভিন্ন পর্যায়, উপপর্যায়, প্রতিটি প্রশ্নপত্রের জন্য প্রয়োজনীয় সময়, জনবল, নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান, ফাঁসের সম্ভাবনা, ফাঁস প্রতিরোধ ব্যবস্থা  ছক আকারে উপস্থাপনা করা হলো:



উপরের উপাত্তগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকে পরীক্ষা কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছাতে সময় লাগে মোটামোটি দেড় থেকে দুই মাস এবং সম্পৃক্ত জনবল প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। যেমন প্রশ্নপত্রের প্যাকেটের নিরাপত্তায় মান্ধাতা আমলের যে সিলগালা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় তা যে কোনো লোকের পক্ষে ভেঙে পুনরায় হুবুহু ঐ ধরনের সিলগালা করার জন্য এক ঘণ্টা সময়েরও প্রয়োজন হবে না। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই যুগে এত বিশাল সময় এবং জনবল সংশ্লিষ্ট  প্রক্রিয়াটি যতটুকু নিরাপত্তা নিয়ে টিকে আছে এর জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের সততাকে ধন্যবাদ জানানো উচিৎ বলে মনে করি।

এই ব্যাপক সময় এবং জনবল হ্রাসের লক্ষ্যে স্বল্পতম এবং প্রচলিত প্রযুক্তিভিত্তিক প্রস্তাবনাটি হচ্ছে, ন্যূনতম ৫জন প্রশ্নপ্রণেতা ৫টি প্রশ্নপত্র পরীক্ষার ২ ঘণ্টা ৩০মিনিট পূর্বে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের ই-মেইলে জমা করবেন। যদি পরীক্ষা সকাল ১০টায় হয় তবে সকাল ৭টা ৩০মিনিটের মধ্যে। নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি একটি সফটওয়্যার দ্বারা  (দৈবচয়ন পদ্ধতি বলা যেতে পারে) ৫টি প্রশ্নপত্র থেকে চূড়ান্ত প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করবেন। যদি নিয়ন্ত্রণ কতৃপক্ষ কেন্দ্র সচিবদের সাথে ভিপিএন (Virtual Private Network) সংযোগে যুক্ত থাকেন তাহলে চূড়ান্ত প্রশ্নপত্রটি সকাল ৮টার মধ্যে সরাসরি ভিপিএন সার্ভারে আপলোড করবেন। এই সার্ভারের প্রশ্নপত্র ফোল্ডারে অনুপ্রবেশেকে দুটো পর্যাযে বিভক্ত করে দুটো অথেন্টিকেশন পাসওয়ার্ড দিতে হবে। পাসওয়ার্ড দুটোর একটি কেন্দ্র সচিবের নিকট অপরটি জেলা প্রশাসক অবগত থাকবেন। পাসওয়ার্ডগুলো প্রতিদিনই পরিবর্তন হবে। সকাল ৮টায় জেলপ্রশাসক প্রতিনিধি পাসওয়ার্ডটি কেন্দ্র সচিবকে প্রদান করবেন। কেন্দ্র সচিব বিশ্বস্ত কেন্দ্র কর্মকর্তার দ্বারা জেলা প্রশাসক প্রতিনিধির উপস্থিতিতে প্রশ্ন ডাউনলোড করে প্রিন্টিং-এর ব্যবস্থা করবেন। ভিপিএন সংযোগ না থাকলে চূড়ান্ত প্রশ্নপত্রটি পাসওয়ার্ড দ্বারা এনস্ক্রিপ্ট করতে হবে। এর জন্য একটি এনস্ক্রিপশন সফটওয়্যার ডিজাইন করে নেয়া যেতে পারে। এনস্ক্রিপটেড প্রশ্নটি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের ওয়েব পেইজে আপলোড করতে হবে। এ ক্ষেত্রেও ডাউনলোড ও ডিস্ক্রিপ্ট করার জন্য দুই পর্যায়ে দুটো পাসওয়ার্ড থাকতে হবে এবং পূর্বের ন্যায় সকাল ৮টা থেকে ৮টা ৩০ মিনিটের মধ্যে কেন্দ্র সচিব প্রশ্নপত্র ডাউনলোড করবেন।

এবার প্রশ্নপত্র ছাপা প্রসঙ্গ। কেন্দ্র সচিব ১টি কম্পিউটার দিয়ে প্রয়োজনমাফিক প্রিন্টার বা ফটোকপিয়ার ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র প্রিন্ট করে পরীক্ষার হলে সরবরাহ করবেন। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে ইউনিভার্সাল পোর্টে হাব এবং একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করে ৬টি ইঙ্কজেট প্রিন্টার বা লেজারজেট প্রিন্টারে ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটে সহজেই ১৫০০ বা ততোধিক প্রশ্ন প্রিন্ট দেয়া যাবে। বিদ্যুৎ, কালি এবং গতি- সার্বিক বিবেচনায় ইঙ্কজেট প্রিন্টার ব্যবহারই সুবিধাজনক। লেজারজেটের গতি বেশি হলেও ৬০ থেকে ৮০ পৃষ্ঠা প্রিন্টের পর তাপমাত্রা জনিত কারণে তাকে ৫ মিনিট বিশ্রাম দিতে হয়। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটরের প্রয়োজন হয়। ইঙ্কজেট প্রিন্টারে এক্সটার্নাল ড্রাম ব্যবহার করলে সহজে কালি ভরা যায় এবং প্রশ্নপত্রে কোনো রঙের ব্যবহার না থাকায় দ্রুতই প্রিন্ট হয় এবং বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটরের পরিবর্তে আইপিএস দিয়ে চালানো যায়। (প্রস্তুতকারীদের হিসেবে প্রচলিত প্রিন্টার মিনিটে ২০টি প্রিন্ট দেয়) কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫০০-এর অধিক হলে কোনো উপকেন্দ্র না করে পৃথক পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র করাই বাঞ্ছনীয়। পরীক্ষায় নৈর্ব্যক্তিক অংশ থাকলে বিষয়টি আরো সহজ হবে। সৃজনশীল প্রশ্ন প্রিন্ট দেয়ার পর ২ ঘণ্টা সময় পাওয়া যাবে। কোনো কেন্দ্র সচিব প্রশ্নপত্র ডাউনলোডে ব্যর্থ হলে, বিশেষ জরুরী পরিস্থিতিতে ৮টা ৩০মিনিটে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রশ্নটি সরাসরি নির্দিষ্ট  কেন্দ্র সচিবের ই-মেইলে  পাঠিয়ে দেবেন।

পদ্ধতিটিতে প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুদৃঢ় তদুপরি বর্তমানে সিকিউর্ড নেটওয়ার্কিংয়ের ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত ভিপিএন সংযোগ ব্যবহার করলে প্রক্রিয়াটি দুর্ভেদ্য। দক্ষতার সাথে নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে সকল ক্ষেত্রেই হ্যাকারের প্রবেশের সুযোগ বেশ কষ্টসাধ্য হবে এতে ভুল নেই। হ্যাকার প্রবেশের চেষ্টা করলে তাকে শনাক্ত করার সুযোগ রয়েছে এবং কোনো হ্যাকার বা ফাঁসচক্র সময়ের স্বল্পতার কারণে অর্থ উপার্জনের সুযোগ পাবে না। ফলে আগ্রহী হবে না। এই পদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় সময় ৩ ঘণ্টা এবং কার্যকর জনবল ২জন। কেন্দ্রে প্রিন্ট চলাকালীন প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন আসতে পারে, কিন্তু বর্তমান প্রচলিত পদ্ধতিতেও পরীক্ষার দুই ঘণ্টা পূর্বে প্রশ্নপত্র কেন্দ্র সচিবের দপ্তরে নিয়ে আসা হয়। সকাল বিকেল পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিকেলের পরীক্ষার প্রশ্নও সকাল ৮টার মধ্যে কেন্দ্র সচিবের দপ্তরে নিয়ে আসা হয়। যেহেতু ফাঁসের সম্ভব্য ক্ষেত্র শুধু একটাই, ফলে ফাঁসকারীকে চিহ্নিত করা সহজ হবে। ডাটা নন-কপিয়েবলসহ অধিকতর ব্যবস্থা নিয়ে এ ক্ষেত্রটিকেও সুদৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।  অধিকতর নিরাপত্তার জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষার্থীদেরকে ১ ঘণ্টা পূর্বে হলে প্রবেশ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জরুরি প্রয়োজনে, ল্যাপটপ কম্পিউটার ব্যবহার করে, ৫-৬টি ইঙ্কজেট প্রিন্টার চালু রাখার জন্যে আইপিএস ব্যবহার করা যেতে পারে। বিদ্যুৎ সংযোগহীন কেন্দ্রে সৌর বিদ্যুতে সাহায্যে প্রক্রিয়াটি পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব। ব্যয়ের ক্ষেত্রে, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ যদি পরীক্ষার ফি থেকে প্রশ্নপত্র ছাপা খরচ ছাড় দেয়, পরীক্ষার্থী যদি এই টাকা কেন্দ্রে জমা করে এবং কেন্দ্রকে প্রেস থেকে প্রশ্নপত্র নেয়া, নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করা, বিন্যস্ত করা, সকল ক্ষেত্রে পুলিশি সহয়োগিতা, প্রতিদিন প্রশ্ন আনা নেয়ায় যে ঝামেলা ও ব্যয় মেটাতে হয়, সে বিবেচনায় সার্বিক ব্যয় প্রথম দিকে ভারসাম্যমূলক হলেও পরবর্তিতে লাভজনক হবে।

প্রস্তাবনাটি হালকা বিশ্লেষণে দুর্বল, সাদামাটা বা হাস্যকর মনে হতে পারে কিন্তু বাস্তবসম্মত এবং ৩০ বছর পরীক্ষা পদ্ধতির সাথে সম্পৃক্ত ও ১২ বছর মাল্টিমিডিয়া স্কুল পরিচালনার মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভুত। এতে কোনো উচ্চতর প্রযুক্তির ব্যবহার, পরীক্ষা গ্রহণ, ৩২ সেট প্রশ্ন তৈরি বা ফাঁস চক্রের জন্য কোনো কঠোর আইনের প্রয়োজন হবে না। ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে না। প্রস্তাবনার দুর্বল দিকগুলো হচ্ছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের কেন্দ্রসমূহে বিদ্যুৎ সংযোগ, দক্ষ জনবল, ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবস্থা নাও থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটিতে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন তা সৌর বিদ্যুৎ থেকে সংগ্রহ করা যাবে। স্বল্প প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল সৃষ্টি সম্ভব এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেও ছোট টেক্সট ফাইল ডাউনলোড করা যাবে।  

লেখক: শিক্ষক, মাল্টিমিডিয়া স্কুলের পরিচালক




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ জানুয়ারি ২০১৮/তারা

   
 



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

এবার সাদা রঙের ইয়াবা

২০১৮-১০-২১ ৮:৪৮:৫৮ পিএম

ঢাকা-মস্কো কমিশনের বৈঠক সোমবার

২০১৮-১০-২১ ৮:১৬:০৯ পিএম

ধরন পাল্টেছে কিশোর অপরাধের

২০১৮-১০-২১ ৮:০৪:৩৭ পিএম