বিয়ে বাড়ির বাজনা, সামাজিক বর্বরতা এবং আমরা

প্রকাশ: ২০১৮-০১-২২ ৭:১৭:৩৪ পিএম
জাফর সোহেল | রাইজিংবিডি.কম

জাফর সোহেল : ঢাকা একটি শহরের নাম। একটি দেশের রাজধানী। অথচ দেখেশুনে মনে হয় সারাদেশ থেকে বাছাই করে এখানে কিছু বোধ বিবেচনাহীন মানুষকে নিক্ষেপ করা হয়েছে। রাজধানী ভরে উঠেছে এ ধরনের মানুষে। এদের মনোবৈকল্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মন বলে তাদের আদৌ কিছু আছে কি না এই প্রশ্ন তোলা যায়! মনহীন মানুষ কি মানুষ? শুধু একটা দেহ নিয়ে কি মানুষ হওয়া যায়? ঢাকা শহরে সম্ভবত এমন মানুষের সংখ্যাই এখন বেশি। এ ধরনের মানুষের সঙ্গে প্রাণহীন জঞ্জালের আসলে কোনো পার্থক্য নেই।

পুরান ঢাকার গোপীবাগে বিয়ে বাড়িতে হত্যার শিকার অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীর স্বজন একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারে বলছিলেন: ‘সিনেমা দেখে না সিনেমা, ঐরকম। সবাই সিনেমা দেখতে ছিল। একটা লোকও এগিয়ে আসেনি। তারা অসুস্থ লোকটাকে মারতে মারতে মাটিতে ফেলে দিয়েছে। কেউ একটা কথাও বলেনি!’

টেলিভিশনের নিউজ দেখতে দেখতে আমার কাছে পুরো ব্যাপারটা সিনেমার মতোই মনে হচ্ছিল। পেশি শক্তির ব্যবহার; এমনকি বিয়ের মতো একটি সামাজিক অনুষ্ঠানের দিনও কম দেখাতে রাজি নয় কিছু মানুষ। অন্যদিকে সিনেমার শুটিং দেখার বাইরে এই শহরের মানুষের যেন আর কোনো দায়-দায়িত্ব নেই! কোনো বোধ নেই, অনুভূতি নেই। খবর দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, নিহত এই ভদ্রলোক কি তার প্রতিবেশীর বিয়েতে নিমন্ত্রণ পেয়েছিলেন?

এবার ‘সিনেমা’র গল্পটিতে চলুন প্রবেশ করি। গল্পের পটভূমি, নায়ক-নায়িকা-ভিলেন সব পুরান ঢাকার গোপীবাগের। সেখানকার একটি বাড়িতে এক রাজকুমারের বিয়ে হবে। বিয়ের আগে গায়ে হলুদের রাত। বিয়ে বাড়িতে শুরু হয় রাজকুমারকে নিয়ে নানারকম ব্যস্ততা। এর মধ্যে বাড়ির ছাদে উঠতে থাকে ইয়া বড় বড় বাক্স। শব্দের কম্পন তোলা যেগুলোর কাজ। বাদ্য বাজনার তালে তালে এই বাক্সগুলো যত বেশি কম্পমান হবে তত এদের কদর। একসময় এদের ভূমিকা শুরু হয়ে যায়। এদের স্বাভাবিক মাত্রার কম্পনে সন্তুষ্ট হয় না রাজকুমার আর তার স্বজনরা। তারা আরও জোরে বিল্ডিং কাঁপিয়ে দেয়ার মাত্রায় তাদের চালিত করে। এতে বোবা বাক্সগুলো কষ্ট পেলেও, ফেটে গিয়ে মারা যাওয়ার (ধ্বংস হওয়ার) ভয় থাকলেও কিছু বলে না। কারণ তারা বলতে পারে না। সুতরাং তাদের সর্বোচ্চ শক্তির কম্পনে চারপাশ প্রকম্পিত হতে থাকে। এমন সময় বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে শোনা যায় গোঙানি। সদ্য হার্টে বাইপাস সার্জারি করা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী নাজমুল হক বুকে হাত দিয়ে গোঙাতে থাকেন। মধ্যরাতে বাবার বুকের ব্যথা বেড়ে যাওয়ার কারণ বুঝতে দেরি হয় না ছেলের। সাহস করে ছাদের ওপরে উঠে যান তিনি। উচ্চমাত্রার শব্দ দূষণের প্রতিবাদ করেন।

পরদিন সকালে বিয়ে বাড়ির রাজকুমার বর আর তার স্বজনরা নাজমুল আর তার ছেলেকে ডেকে পাঠান। কত বড় সাহস, রাত দুপুরে অপমান! বাবা-ছেলে নেমে আসেন। আর তখনই হার্টের রোগী বাবা আর ছেলের ওপর শুরু হয়ে যায় অ্যাকশন। হৃদযন্ত্রের অব্যবস্থপনায় আগে থেকেই নাকাল বয়োজ্যেষ্ঠ নাজমুল বুকের ভেতরের প্রাণপাখি আর ধরে রাখতে পারেন না। তার প্রাণপাখি আকাশে উড়াল দেয়। নিয়াজুল পড়ে যান। এমনভাবে পড়েন, যেখান থেকে তাকে টেনে তোলার সাধ্য কারো নেই।

সিনেমার গল্প শেষ। এবার নিহত নাজমুলের স্বজনের ক্ষোভের জায়গাটায় একটু যাই। একটা শহর। এখানে মানুষ আছে; মানুষের মিলিত সমাজ আছে। ন্যায় অন্যায় সমাজে থাকবেই। কিন্তু প্রকাশ্যে অন্যায় চললেও এর বিরুদ্ধে কেউ কথা বলবে না- এটা কোন ধরনের সমাজ? পৃথিবীর ইতিহাসে কি এমন কোনো সমাজ ছিল, যেখানে মানুষের বিপদে মানুষ এগিয়ে আসে না? হ্যাঁ ছিল, অরাজক দেশে। যেখানে শাসন বা অনুশাসন বলে আসলে কিছু কার্যকর থাকে না। যে যার মতো চলে। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে শক্তিধরেরা যেমন খুশি তেমন আচরণ করে। দুর্বলেরা কেঁচোর মতো নিজেদের অর্ধেক মাটিতে ডুবিয়ে রাখে। সবলের কোদালে অপরাপর কেঁচোরা কচুকাটা হলেও অন্যরা মুখ লুকিয়ে থাকে। ঢাকা শহর কি একটি অরাজক দেশের অংশ? এখানেও যেভাবে সবলের কাছে দুর্বলের মার খাওয়া এবং আইনের শাসনের তোয়াক্কা না করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তাতে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। অন্যায় দেখেও সমাজের মানুষের নির্লিপ্ত থাকার ছবি সামাজিক বিপর্যয়ের কথা বলে। না হলে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকে একেবারে আয়োজন করে পেটানো হচ্ছে আর মানুষ তা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে, সিনেমার শুটিংয়ের মতো! এ কথা ভাবা যায়?

আমরা ইতিহাস পড়ি। হাজার বছর আগে কীভাবে বিক্ষিপ্ত মানুষেরা সমাজ গঠন করেছিল; মিলেমিশে থাকতে শিখেছিল; একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর অভ্যাস রপ্ত করেছিল। আমরা দাবি করি, দিনে দিনে মানুষের এই সমাজ ব্যবস্থা আরো দৃঢ় হয়েছে এবং হচ্ছে। দিন যত এগোয়, সমাজ নাকি তত সভ্য হয়, বন্ধন নাকি তত পোক্ত হয়। এই তার নমুনা? পুরান ঢাকার গোপীবাগের বিয়ে বাড়ি কোন সমাজের প্রতীভূ? সেখানকার বাড়ির মালিক, ভাড়াটিয়া, সিনেমার শুটিংয়ের দর্শক প্রতিবেশী কোন সমাজ থেকে এসেছেন? বইয়ের জ্ঞানের সঙ্গে বাস্তবতার মিল কোথায়? বাস্তবে তো আমরা দেখছি দিনে দিনে সমাজ সভ্য হওয়ার বদলে অসভ্য হচ্ছে; সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হওয়ার বদলে বন্ধন ছিঁড়ে যাচ্ছে। মিলন নয়, কীভাবে একে অপর থেকে পৃথক হওয়া যায় সেই চর্চা চলছে পরিবারে।

আবার আরেক দিক থেকে যদি দেখি, সমাজের মানুষ কখন নিজেকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে মনে করে? যখন সে দেখে, এরকম আরো দশটা ঘটনায় কারো কোনো বিচার হয় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এসব ঘটনায় কিছু যায় আসে না। কিংবা যে কোনো প্রকার সম্পর্ক দিয়ে, সেটা অর্থ হোক বা ক্ষমতা, আইনের চোখ বেঁধে রাখা যায়। পুরান ঢাকার বিয়ে বাড়ির লোকেরাই কেবল নন, এই সমাজের অনেক মানুষই এখন মনে করে ‘আমার কিচ্ছু হবে না’। এই মানুষেরা সমাজের কাছ থেকে এক ধরনের ইনডেমনিটি পেয়ে যায়; প্রশাসনের কাছ থেকেও। ফলে এরা যখন কাউকে কানে ধরে উপর তলা থেকে নীচ তলায় নামিয়ে আনে, তখন কারো কিছু বলার থাকে না। মারধরের বেলায় এরা কি চোর-ছেঁচড়ার গায়ে হাত তুলছে, নাকি সজ্জন ব্যক্তির গায়ে হাত দিচ্ছে- দেখার কেউ থাকে না। এরা যা করে তাই ঠিক। এরা নিজেদের মনে করে সমাজের প্রশাসক। তাই যে কাউকে মারার যেমন এদের অধিকার আছে, তেমনি মেরে একেবারে পরপারে পাঠিয়ে দেয়ারও বিশেষ অধিকার এরা রাখে। ‘অনধিকার চর্চা’র মতো শব্দ তাদের অভিধানে নেই। 

দেশে যে সামাজিক অস্থিরতা বিরাজ করছে এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই। বিষয়টি স্বীকার করে সংকটগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত কাটিয়ে ওঠার ব্যবস্থা নেয়াতেই রয়েছে এর সমাধান। একটা সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকলে সেখানে প্রকাশ্যে মানুষ পিটিয়ে মারার মতো ঘটনা ঘটতে পারে না। ঘটনার হোতারা এই সাহস পেত না। রাষ্ট্রে বসবাসরত একজন সুস্থ সামাজিক মানুষ কখনও ভাবতে পারে না- আমিই সব। আমাদের ওপর কথা বলার কেউ নেই। বিয়ে বাড়িতে বাদ্য বাজবে কি বাজবে না, বাজলে কোন মাত্রায় বাজবে; শব্দ দূষণ করা যাবে কি যাবে না; বিশেষ আবদারে কিছুটা দূষণের অনুমতি দিলেও তা কত মাত্রায় থাকবে; যেখানে অনুষ্ঠান হবে সেখানে বা আশপাশে হাসপাতাল আছে কি না, অসুস্থ মানুষ আছে কি না; প্রস্তাবিত আয়োজনে কমিউনিটির সবার সায় আছে কি না- এ ব্যাপারগুলো মীমাংসা করা কি এতই কঠিন?

বিয়ে বাড়িতে বাদ্য-বাজনার শখ যেমন অধিকার, তেমনি প্রতিবেশীরও আছে নিরুপদ্রব ঘুমের অধিকার। একজনের কারণে দশজনের কষ্ট হতে পারে না। তাছাড়া দেশে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন আছে। ফলে আপনার শখের নামে অত্যাচার প্রতিবেশী কেন সহ্য করবে? গোপীবাগের ঘটনায় জানা যায়, তারা কমিউনিটির কারো মতামতের তোয়াক্কা করেনি। যথেষ্ট সুযোগ সেখানে ছিল কিছু করার। গানের শব্দ যেমন কমানো যেত, তেমনি অনুরোধ করে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও নেয়া যেত। কিন্তু ঐ যে ‘আমিই সব’ টাইপের চিন্তাভাবনা যেখানে ঢুকে গেছে, সেখানে কে কাকে অনুরোধ করবে? কে কার অনুমতি নেবে? সুতরাং সময় এসেছে যারা এমন ভাবে, তাদের উচিত শিক্ষা দেয়ার। যাতে তারা বুঝতে পারে-আমি আসলে কিছুই না। বরং সমাজের অন্য দশজনের মতো সাধারণ একজন।

আর আমরা যারা সিনেমার শুটিংয়ের দর্শক তাদেরও ভাবতে হবে, বুঝতে হবে-  কেঁচোর মতো মুখ লুকিয়ে থাকলেই কিংবা বোবা জন্তুর মতো চুপ করে থাকলেই বেঁচে যাওয়া যাবে না। আজ নাজমুল ঘটনার শিকার হয়েছেন কাল আপনিও হতে পারেন। পিঠের ওপর প্রতিবেশীর মারের দাগ কেবল নাজমুলের পরিবারকে নিতে হয়নি। এ দাগ আমাদের সবার পিঠেই লেগেছে। কষ্ট করে পেছনে হাত দিয়ে দেখুন। মন খুলে ভাবুন বুঝতে পারবেন।

লেখক : সাংবাদিক



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২২ জানুয়ারি ২০১৮/তারা

   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

উইন্ডিজের বোলিং কোচ থমাস

উইন্ডিজের বোলিং কোচ থমাস

২০১৮-০২-২১ ৯:০৩:৫৪ পিএম
রংপুরে বাস-পিকআপ সংঘর্ষ, নিহত ২

রংপুরে বাস-পিকআপ সংঘর্ষ, নিহত ২

২০১৮-০২-২১ ৭:৪৪:৫৩ পিএম
‘সবাক ২১ জন হয়ে গেলেন নির্বাক’

‘সবাক ২১ জন হয়ে গেলেন নির্বাক’

২০১৮-০২-২১ ৭:১৯:০৯ পিএম