জঙ্গিবাদের চেয়েও ভয়াবহ কিছু ঘটছে ফেসবুক ইউটিউবে

প্রকাশ: ২০১৮-০১-৩০ ১২:৩৬:০৮ পিএম
হাসান মাহামুদ | রাইজিংবিডি.কম

হাসান মাহামুদ: বর্তমান যুগকে বলা হয় তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তির এই বিকাশ আরো বেশি আকর্ষণীয় এবং জীবনঘনিষ্ঠ করেছে অনলাইনের অবাধ প্রাপ্যতা। অনলাইনের এই অবাধ চলাচল বলা চলে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই।

২০১৮ সালের মার্চ থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উপনীত হতে যাচ্ছে। এতোদিন ধরে আমরা স্বল্পোন্নত দেশ হয়ে আছি। অবাক করা খবর হচ্ছে, স্বল্পোন্নত দেশ হলেও বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় সবচেয়ে বেশি লোক ফেসবুক ব্যবহার করে। বিশ্বের এতো এতো উন্নত শহর এবং শিক্ষিত নাগরিকদের ভিড়ে এই পরিসংখ্যান আপনাকে অবাক করতে পারে। তবে, আমাদের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি যে হারে মাত্রাতিরিক্ত ম্যানিয়া বিরাজ করছে, তা লক্ষ্য করলে আর হয়তো অবাক হতে হবে না।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উই আর সোশ্যাল’ আর কানাডাভিত্তিক ডিজিটাল সেবা প্রতিষ্ঠান ‘হুটস্যুইট’ যৌথভাবে চালানো এক বৈশ্বিক জরিপে জানিয়েছে: ‘ফেসবুক ব্যবহারে পৃথিবীতে দুই নম্বরে রয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা’। ২০১৭ সালের এপ্রিলে জরিপটি প্রকাশ করা হয়। তথ্য মতে, ঢাকায় সক্রিয় ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২২ মিলিয়ন বা ২ কোটি ২০ লাখ। সবচেয়ে বেশি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে ব্যাংকক শহরে, তিন কোটি।

একবার ভাবুন, সর্বশেষ আদমশুমারী অনুযায়ী ঢাকার জনসংখ্যা ছিল দেড় কোটির কাছাকাছি। অথচ এখানে দুই কোটির বেশি মানুষ ফেসবুক চালায়! এটা কি সম্ভব? কীভাবে সম্ভব, তাও একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে। কিছু মানুষ ফেসবুকে একটিমাত্র আইডি ব্যবহার করেন। একাধিক, দুই বা ততোধিক আইডি ব্যবহার করছেন এমন মানুষের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। ফলে দেখা যাচ্ছে, দেড় কোটি মানুষের শহরে ফেসবুক আইডি দুই কোটির বেশি।

সব কিছুরই ভালো এবং মন্দ প্রভাব রয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত ফেসবুক আসক্তি আমাদের মন্দ প্রভাবের দিকেই টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ফেসবুক আসক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বলা চলে ফেসবুক আমাদের গিনিপিগ বানিয়ে ফেলছে। এর সাথে রয়েছে ইউটিউবেরও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার।

আগে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যে ধরনের বন্ধন ছিল, এখন তা অনেকাংশেই নেই। সঙ্গে প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং মোবাইল অপারেটরগুলোর সুচতুর কৌশলে অনলাইন ব্যবহারের প্রতি আসক্তি তৈরি করার চেষ্টা- সব মিলিয়ে ফেসবুক ব্যবহারের মাত্রা বাড়ছে বলে আমরা মোটামুটি ধারণা করতে পারি। কিন্তু সর্বশেষ সিদ্ধান্তটা যেমন ব্যবহারকারী নিজে নিচ্ছে, তেমনি ক্ষতির সম্মুখীনও সে নিজেই হচ্ছে। মূল প্রশ্নটি হচ্ছে, আমাদের মধ্যে ক’জন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের নিয়ম জানি? ক’জন সেই নিয়ম মেনে ব্যবহার করি?

সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছাড়া বর্তমানে একদিনও চলে না। সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়া একটি দিন, মানে বিচ্ছিন্ন একটি দিন। এসবের আবেদন রয়েছে, গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ছে- এতে দ্বিমত নেই। সোশ্যাল মিডিয়াকে অনেক দেশেই বর্তমানে সিটিজেন জার্নালিজমের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও মূলধারার গণমাধ্যম অনেক সময় কোনো কোনো সংবাদ বা ঘটনা এড়িয়ে গেলে ফেসবুক এবং ইউটিউবে আলোচনার কারণে সেটি পরে দেখা গেছে গণমাধ্যমে স্থান পেয়েছে। অনেক সময় ফেসবুক বা এসব মাধ্যম হয়ে উঠছে খবর প্রচার এবং প্রকাশের উৎস।

কিন্তু না-বুঝে ব্যবহার এবং খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের কারণে এসব সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা লাভের চেয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি বেশি। খুব কমসংখ্যক ব্যবহারকারী ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পুরোপুরি সঠিকভাবে ব্যবহার করছেন। নিজেদের কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবহার করছেন, পেশাগত সুবিধা গ্রহণ করছেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারছেন- এমন ব্যবহারকারী বাংলাদেশে খুব কম। বাকীদের মধ্যে বড় একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বলতে ‘ফেসবুক’ বুঝেন। এদের মধ্যে আবার বড় একটি অংশ কিছু না বুঝেই ফেসবুক চালান। সচেতন ফেসবুক ব্যবহারকারী অবশ্যই রয়েছে ঢাকায়। কিন্তু খারাপ উদ্দেশ্যে ফেসবুক ব্যবহার করেন, এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়। এদের দ্বারা অন্যেরা ক্ষতির সম্মুখীন হন। এদের কাছে ফেসবুক কিংবা অনলাইন হচ্ছে প্রতারণা ও মন্দ কাজের একটি মাধ্যম। আবার মাত্রাতিরিক্ত ফেসবুক আসক্তি আমাদের আত্মকেন্দ্রিক করে তুলছে। সামাজিক সময় হারিয়ে যাচ্ছে এসবের প্রভাবে।

অবাধ তথ্যপ্রবাহের কারণে বর্তমানে পৃথিবী আপনার হাতের মুঠোয়। বিজ্ঞানের এই জয়যাত্রার যুগে যে অবাধ তথ্যপ্রবাহের সুবর্ণ দ্বার উদ্ঘাটিত হয়েছে এর পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করবে আমাদের তরুণ সমাজ। এটাই সবার কাম্য ছিল। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্ব জুড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে এগিয়ে চলার তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। প্রতিদ্বন্ধিতাময় বিশ্বে টিকে থাকতে হলে তরুণ সমাজকে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। তাদের মধ্যে যে অফুরন্ত সম্ভাবনা ও সুপ্ত সৃজনী শক্তি রয়েছে তা জাগিয়ে তুলতে হবে। এর জন্য চাই জ্ঞানভিত্তিক সমাজ, গুণগত শিক্ষা।

আমরা জানি, জ্ঞানই শক্তি। জ্ঞান সৃজনী শক্তিকে পরিপুষ্ট করে, উন্নয়নের সিঁড়িকে করে মজবুত। জ্ঞানান্বেষণের প্রবল ইচ্ছা একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজের জন্ম দেয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চর্চা যেমন অর্থনৈতিক উন্নতির ভিত তৈরী করে, তেমনি নৈতিক শিক্ষা সভ্যতা ও সুশাসনের ভিতকে শক্তিশালী করে।

পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, যে ইন্টারনেট আমাদের সামনে খুলে দিতে উন্নয়নের দ্বার, সেই ইন্টারনেটের বদৌলতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে যুব সমাজ বিপথগামী হচ্ছে। দেশীয় সংস্কৃতি হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। যুব সমাজ নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের অপব্যবহার করছে। একই সঙ্গে নিজের ভবিষ্যতও বিলিয়ে দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বলতে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, স্কাইপে, গুগল প্লাস, ইমো, ভাইবার, লিংকডইন, উইচ্যাট, ইনস্টাগ্রাম, পিন্টারেস্ট, হোয়াইটসঅ্যাপ প্রভৃতিকে বুঝি আমরা। আমাদের দেশে উল্লেখিত সব সার্ভিসই বর্তমানে চালু রয়েছে। কিন্তু এসব মাধ্যম ব্যবহারের কোনো নীতিমালা দেশে নেই। একটি মোটামুটি মানের নীতিমালা করা হয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য। ২০১৬ সালের ১৬ মার্চ ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা-২০১৬’জারি করে সরকার। মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এই নির্দেশিকায় এসব সার্ভিসকে আওতাভুক্ত করা হয়েছে। এর বাইরে কোনো পর্যায়ের জন্য ‘ব্যবহার নির্দেশিকা’ বিধি কিংবা নীতিমালা কোনোটাই নেই।|

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য জারিকৃত নির্দেশিকার মূল লক্ষ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনা। এর বাইরে র‌্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনীগুলো প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো তদারকি করে। পুলিশ হেডকোয়াটার্সে আলাদা সেলও গঠন করা হয়েছে। এসবের মাধ্যমে জঙ্গিবাদের অনেক কিছু চিহ্নিত এবং বন্ধ করা গেছে। কিন্তু তদারকহীন চলতে থাকা ফেসবুক, ইউটিউবে জঙ্গিবাদসংশ্লিষ্ট কথাবার্তার বাইরেও ভয়াবহ বিষয় প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। এসব মাধ্যমে যেসব বিশৃঙ্খলা হচ্ছে, সেসব জঙ্গিবাদের চেয়ে খুব একটা কম ভয়াবহ নয়।

জনমনে অসন্তোষ বা অপ্রীতিকর মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে এমন কনটেন্ট আমরা অহরহ দেখতে পাই এসব মাধ্যমে। কিংবা কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্যমূলক মন্তব্য এবং পোষ্টও অহরহ হচ্ছে। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নয়, সাধারণ জনগনের জন্যও একটি সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা প্রয়োজন। যেহেতু এই নির্দেশিকা তদারকির জন্য জনবল নিয়োগ হচ্ছে; তারাই বাড়তি নির্দেশিকার দেখভাল করতে পারবে। ইন্টারনেটভিত্তিক কর্মকাণ্ডে আমাদের দেশে সুফলের থেকে কুফলের পাল্লাই ভারি বেশি।

এখন ছেলেমেয়েরা বই বা পত্রিকা হাতে রাখে না, রাখে মোবাইল। আগে মোবাইল ব্যবহার হতো কথা বলা ও ক্ষুদ্র বার্তা আদান-প্রদানে। এখন দিনের ২০ ঘণ্টা মোবাইল ব্যবহার করা হলে তার মধ্যে ১৮ ঘণ্টা ব্যয় হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এর ফলে একদিকে যেমন সৃজনশীলতা বিকাশের পথ রুদ্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের কঠোর নজরদারির অভাবে অনলাইনকেন্দ্রিক নেতিবাচক চর্চা বেশি হচ্ছে।  একজন সুস্থ মানুষের মস্তিষ্কে ১০ হাজারেরও অধিক শক্তিশালী নিউরন আছে, যা একটি কম্পিউটারের চেয়ে অনেক শক্তিশালীভাবে কাজ করতে সক্ষম। কিন্তু আমাদের তরুণদের মস্তিষ্কে ফেসবুক এবং সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং নামক পরজীবী বাসা বেঁধেছে। যা তরুণ প্রজন্মকে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে। স্কুলপড়ুয়া ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যতটুকু না পড়াশোনা করে তার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করে ফেসবুকে। যে সময় চেতনা আর সৃষ্টিশীলতা দিয়ে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, সে সময় গ্রাস করে নিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া। যেহেতু আমরা ফেসবুকের নেশায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছি, কাজেই এখান থেকে রাতারাতি কিংবা একেবারে বের হওয়া হয়তো সম্ভব নয়। ফেসবুক বন্ধ করলেও আসক্তরা ঠিকই প্রক্সি সার্ভার দিয়ে  ফেসবুক ব্যবহার করে। কাজেই সরকারকে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে যাতে এ আসক্তি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। অন্যথায় নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তরুণ প্রজন্ম বিপথগামী হবে। তাদের শ্রম ও মেধাবঞ্চিত হবে বাংলাদেশ।

বলা হয়, ফেসবুকের মাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিত এবং অনাহুত সর্ম্পকে জড়ানোর হার বেড়েছে। সামাজিকভাবেই বাংলাদেশের নারীদের এখনো নির্ভরশীল হয়ে বসবাস করতে হয়। স্বাবলম্বি নারীর সংখ্যা বাড়ছে, তবে তা শহরে কিংবা রাজধানীতেই বেশি। আবার খোদ রাজধানীতেই এখনো পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বলি হচ্ছেন এমন নারীর সংখ্যাও কম নয়। হয়তো কিছুটা সময় একান্তভাবে কাটানোর জন্য ফেসবুকে গিয়েছেন, আর ধীরে ধীরে তাতে অভ্যস্ত হতে হতে বিষয়টি এক সময় নেশায় পরিণত হচ্ছে। এক সময় চরম সর্বনাশ ডেকে আনছে এই ফেসবুকই।

আবার ফেসবুককেন্দ্রিক প্রতারক চক্রের সংখ্যাও অনেক। সামান্য অসাবধানতার কারণে এর ব্যবহারকারী এসব প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কেউ কেউ পড়ছেন মারাত্মক হয়রানিতে। এক কথায় বলা যায়, সাইবার জগৎ এখন অপরাধের আখড়া। এমন কোনো অপরাধ নেই যা এই জগতে ঘটছে না।

আমাদের দেশে ফেসবুকের পরেই ইউটিউবের জনপ্রিয়তা। ইউটিউব সঠিকভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে অনেকেই অর্থ উপার্জন করছেন। এটি আউটসোর্সিংয়ের একটি বড় খাতও বলা যায়। বিচিত্র ধরনের ভিডিও নির্মাণ ও আপলোডের মাধ্যমেই আয় করা সম্ভব ইউটিউব থেকে।  যাদের ভিডিও থেকে, টিউটোরিয়াল থেকে অন্যেরা উপকৃতও হচ্ছে। বাংলাদেশেও অনেক তরুণ-যুবা আশাব্যঞ্জক ভিডিও কন্টেন্ট নির্মাণ করে চমকে দিচ্ছে। কিন্তু তাদের সংখ্যা কম। মন্দ লোকের সংখ্যাই বেশি। একটু খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, বাংলাদেশ থেকে ইউটিউবে আপলোড করা ভিডিওর বেশির ভাগই অশ্লীল ভিডিও। অথচ ইউটিউব একটি বিশাল তথ্যভাণ্ডার। সুন্দর ভাবনা-চিন্তার মানুষগুলো নানা বিনোদন আর শিক্ষামূলক কল্যাণকর কাজে ইউটিউব ব্যবহার করে।

এতো সুন্দর একটি সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের দেশের কিছু মন্দ লোকের কারণে ভয়ানক পরিস্থিতিতে চলে গেছে। অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে কিছু অসাধু মানুষ ইউটিউবকে কলুষিত করছে। খুব বাজে শিরোনাম দিয়ে ভিডিও আপ করা, বাজে শব্দের ট্যাগ ব্যবহার এবং আপত্তিকর ভিডিও আপ করার প্রতি এইসব রুচিহীন মানুষগুলোর আগ্রহ বেশি। ইউটিউব থেকে আয় হয়, এই ধারণা থেকেই নিজেদের ভিডিও বেশি বেশি ‘হিট’ বা ক্লিক করানোর জন্য এসব আপত্তিকর কাজ করা হচ্ছে ইউটিউবে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে অন্য ব্যবহারকারীদের উপর। নতুনভাবে ইউটিউব ব্যবহারে আসা কিশোর-কিশোরীদের উপর।

ইউটিউবে বাংলায় অধিকাংশ শব্দই ট্যাগিং-ব্রান্ডিং করে কলুষিত করে দিয়েছে একটা শ্রেণির মানুষ। ট্যাগ করা শব্দগুলো এতোটাই বাজে থাকে যে, ‘মা’ কিংবা ‘বাবা’র মতো পবিত্র শব্দগুলো লিখে সার্চ দিলে বাজে সব ভিডিও ভেসে আসে। এমনকি ট্যাগ শব্দগুলোর কারণে এড্রেসবারে বাংলায় একটি অক্ষর লেখার সাথে সাথে সাজেস্টেড যেসব শব্দ চলে আসে তার দিকে তাকানো যায় না। অবস্থা এমন হয়েছে যে, ইউটিউবে অটো-প্লে চালু রেখে একটানা তিনটির বেশি ভিডিও আপনি দেখতে পারবেন না। যতই ভালো ভিডিও দিয়ে আপনি শুরু করেন না কেন, যতই ফিল্টার করে রাখুন না কেন, দুয়েকটি ভিডিওর পর বাজে ভিডিও চলে আসবে। এমনকি ভালো একটি ভিডিওর সাজেশনে দেখা যাবে বাজে একটা ভিডিওর প্রিভিউ।

ফেসবুকে নগ্নতা নিষিদ্ধ। কিন্তু যতটা সেন্সরের বাইরে থাকে আমাদের মতো মুসলিমপ্রধান দেশে তাও অনেকে বেশি অনাকাঙ্খিত। আর ইউটিউবে যতটা সেন্সর ছাড় দেয়, ততটাই নগ্নতা প্রদর্শনযোগ্য। এক্ষেত্রে ঘটে আরেক বিপত্তি। কারণ ইউটিউবের সব ভিডিও পাবলিক। আজ যে ছেলেটি বা মেয়েটি প্রথমবারের মতো ইউটিউব ক্লিক করলো, তার সামনেও ওপেন হয়ে যেতে পারে ‘সেক্সুয়ালি এক্সপ্লিসিট’ কিছু। যার জন্য সে কখনোই প্রস্তুত ছিল না। একজন ব্যবহারকারীকে নিমিষেই বিভ্রান্ত ও অস্বস্তিতে ফেলতে পারে এমন ভিডিওর সংখ্যা ইউটিউবে অসংখ্য। অথচ দায়িত্বশীলদের সঠিক তদারকি থাকলে এমন হওয়ার কথা নয়।

সামাজিক মিডিয়ার অপরাধ প্রতিরোধে আমাদের কোনো ফরেনসিক ল্যাব গড়ে উঠেনি। এ জন্য সাইবার জগতে সংগঠিত বিভিন্ন অপরাধ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের পক্ষে শনাক্ত করা কঠিন। এমনকি প্রযুক্তি সংক্রান্ত অপরাধের জন্য দেশে যে আইন আছে তাও বিশেষায়িত নয়। এসব বিষয়ে সরকারকে আরো বেশি মনযোগী ও উদ্যোগী হতে হবে।

চলতি সপ্তাহে (২৯ জানুয়ারি) মন্ত্রিসভায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। এতে দণ্ড এবং জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এই আইনের পূর্ণ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। পাশাপাশি এ বিষয়ে জনসচেতনতারও কোনো বিকল্প নেই।

আমরা চাই, বর্তমান প্রজন্ম যেন সত্যিকার মানুষ হিসেবে সকল কুসংস্কার ও অপসংস্কৃতির জঞ্জাল সরিয়ে নিজেদের আলোকিত করতে পারে। জীবনকে গড়ার মধ্য দিয়ে উন্নয়নের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হবে এবং দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি বয়ে আনবে। আর এ জন্য সকল ক্ষেত্রে নির্দেশিকার কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি সরকারিভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

লেখক: সাংবাদিক



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩০ জানুয়ারি ২০১৮/তারা

   
 



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

খুনিদের সঙ্গে সংলাপ নয় : তোফায়েল

২০১৮-০৮-১৯ ৭:১৬:৪২ পিএম

সংসদ অধিবেশন বসছে ৯ সেপ্টেম্বর

২০১৮-০৮-১৯ ৬:৩০:৫৩ পিএম

জাহিদ-তিশার ‘পলিসি কাশেম’

২০১৮-০৮-১৯ ৬:১৬:৪১ পিএম