আস্তিনে সাপ ঘাড়ের কাছে ঘাতক ।। অজয় দাশগুপ্ত

প্রকাশ: ২০১৮-০৩-০৫ ১০:৩৯:০৩ এএম
অজয় দাশগুপ্ত | রাইজিংবিডি.কম

জাফর ইকবাল যখন আক্রান্ত আমরা তখন গভীর ঘুমে। সিডনি সময় রাতে বাংলাদেশে এমন ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। বারবার ঘটে আমরা আশঙ্কা আর উত্তেজনায় জেগে উঠি, ফের ঘুমিয়ে পড়ি। দেশের মানুষও তাই করেন। কী করবেন তারা? কী আর করার আছে তাদের? গোড়াতেই বলি, জাফর ইকবালের আহত বা আক্রান্ত হবার ঘটনা আমাকে বিস্মিত করেনি! করেনি এই কারণে যে, তিনি মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তবুদ্ধি দুটোই লালন করেন। এমন অনেক মানুষ আছেন, থাকবেনও। করেনি এই কারণে যে, তিনি বাচ্চাদের ইতিহাস শেখান। তাঁর কথা বা লেখা কোনোটাই উচ্চকিত নয়। মিতভাষী, মৃদুভাষী এই লেখক যতদিন দেশের একটি জনপ্রিয় পত্রিকার শিবিরে ছিলেন, যতদিন তাদের সাথে গাঁটছড়া বাধা ছিলো মূলত ততদিন নিরাপদ ছিলেন। যখনই সরে এসে ভূমিকা রাখতে শুরু করলেন, একটা সময় শেখ হাসিনার সাথে মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিলেন, গণজাগরণে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখলেন, ধরে নিয়েছিলাম বিপদ ঘনিয়ে আসছে। আমরা কেন বলব? তাঁর মা জননীই তো একবার বলেছিলেন- ‘তিনি বড় ছেলে খ্যাতিমান হুমায়ূন আহমেদের জন্য ভয় পান না।’ কারণ হুমায়ূন আহমেদ ম্যানেজ করে চলতে জানতেন। জানতেনই তো। পিতার হত্যাকারীদের সন্তানের বিয়েতে তিনি যেতেন। তাদের মিডিয়ায় লিখতেন। একবার নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়া সুন্দরী বলে তাকে ভোট দেবেন এমন কথাও ছাপা হয়েছিল কাগজে। তাঁর ভয় তো কম হবেই। এমনকি মানুষের পরিবর্তে টিয়া পাখি দিয়ে ‘তুই রাজাকার’ বলালেও তাঁকে মারার পরিকল্পনা থাকবে না এটা জননী জানতেন। তাই তিনি মেজ ছেলের জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁর সৌভাগ্য মাথা বুকে হাতে ছুরির আঘাতে ফালা ফালা ছেলেকে দেখে যেতে হয়নি।

জাফর ইকবালের ওপর যারা চড়াও হয়েছে তাদের আমরা চিনি না। তবে তাদের চিনি যারা এই কাজকে নিয়মিত মদদ দিয়ে যাচ্ছেন। চিনি না? না চিনলে আপনি কী করে জানেন- কাদের তালিকা করতে হবে, আর কাদের তালিকা করতে হবে না? যারা ভেবেছিলেন বইমেলা পার হয়ে গেছে, ব্যস আর কোনো লাশ পড়বে না। তারা আসলে ভুলে যান প্রকাশককে অফিসে গিয়ে খুন করা যায়। ব্লগারকে বাসার গলিতে। আমেরিকা থেকে আসা লেখকের খুলি পড়ে থাকে রাস্তায়। আর তাঁর পিতা সংশয় ও বেদনায় বিচার  চান না। সেই সমাজে জাফর ইকবাল লিকলিকে দুটো পুলিশ পাহারায় নিরাপদ থাকবেন কীভাবে? ছবিতে দেখলাম পুলিশগুলো মোবাইলে ব্যস্ত। ব্যস্ত না-থাকলে যেন তারা এ ঘটনা সামাল দিতে পারতেন। তারা কেন, স্বয়ং সরকারই তো এসব ঘটনা সামাল দিতে পারছে না। অথচ কি মুশকিল, এই জাফর ইকবাল কখনো এক কলম ধর্মের বিরুদ্ধে লেখেননি। ব্যক্তিগতভাবে আমি আস্তিক তবে সংস্কারহীন। ধর্মগ্রন্থ পাঠে আমার আগ্রহ আছে। আমি জানতে চাই, এর মূল মর্মবাণী। সে কারণে পবিত্র কোরান পড়ি আমি। সেই পাঠের একটি সূত্র এই জাফর ইকবাল। একবার তিনি লিখেছিলেন, ভালো বাংলা অনুবাদের অভাবে মাতৃভাষায় কোরান পড়ার সুযোগ ঘুঁচিয়েছেন মুহম্মদ হাবিবুর রহমান। সেবার দেশে গিয়ে তাঁর অনূদিত বাংলা কোরান নিয়ে আসি আমি। এভাবে কোরান পাঠে  আগ্রহী করে তোলার মতো একজন লেখক কি করে অধার্মিক বা নাস্তিক হয়?

কোনোটাই না। নাম উল্লেখ না করেই বলি, আপনি যদি ককটেলে বিশ্বাসী লেখক বা  আলোচক বা তেমন কোনো সেলিব্রেটি হন আপনার কিছু হবে না। এমন কি আপনি যদি ভাইবারে সহিংসতা ছড়ানোর দায়ে অপরাধীও হন আপনাকে আইন সসম্মানে নিয়ে যাবে। আবার ফেরতও আসবেন আপনি। আপনি যদি সম্পাদক হন, আপনার মিডিয়া যদি নিরীহ মাদ্রাসার ছাত্রদের রাস্তায় নামিয়ে সরকার অচলের মতো পরিবেশ তৈরি করে মারামারি হানাহানি করায় তবু আপনি নিরাপদ। ফুলের মালা গলায় আপনি বের হয়ে আসবেন একদিন। আপনি যদি কথায় কথায় রেগে যান। আলোচনা সমালোচনায় বুঝিয়ে দেন পাকিস্তান ভাঙাটা ছিলো অপরাধ। আর এই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত বিএনপি বা তেমন কোনো দলকে গদীতে রেখে ব্যালেন্স করা তাহলে কেউ আপনার টিকিও ছুঁতে আসবে না। কারণ আমরা যারা গণজাগরণে বিশ্বাস করি বা দেশ উত্তাল করে মিছিল করি আমাদের ওরা মনে করা ‘কাগুজে বাঘ’। মার খায়, মার খেয়ে হম্বিতম্বি করে মিডিয়ায় আসে তারপর ভেঙে টুকরো হয়, নয়তো গৃহবাসী। আর উল্টোদিকে যারা, তারা পরিকল্পনা করে এগুতে থাকে। তাদের মানুষ ঢুকে যায় ভেতরে। দাঁড়িয়ে থাকে ঘাড়ের কাছে। যেন ইচ্ছে ও সুযোগ হলেই কোপ মারা যায়।

খুব দেখবেন, একদল অছাত্র বা ছাত্রনামধারীরা মাঝে মাঝে শিরোনাম হয়। কেন? একটা নিরীহ দর্জিকে তারা প্রকাশ্যে কোপাচ্ছে। তাদের নিজেদের সম্মেলন তারা চেয়ার ভেঙে তছনছ করে দিচ্ছে। তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। তাদের আচরণ মারমুখো। আবার এও দেখবেন, দেশে তাদের দলের হয়ে যারা কাজ করে, কথা বলে তাদের কাউকে এরা বাঁচাতে পারে না। এমন কোনো পরিবেশ তৈরি করতে পারে না যাতে ঘাতক মনে করে, মারতে গেলে আমারও খবর আছে। জাফর ইকবালের কথায় ফিরে আসি। ভদ্রলোক যখন মাঝামাঝি শিবিরে ছিলেন তখন ছিলেন নিরাপদ। কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি তাঁকে এভাবে কেউ মারতে পারে। এখন যখন তিনি আক্রান্ত এখনো কিন্তু এরাই রটাচ্ছে, মারার পেছনে নাকি সামনে নির্বাচন আর পরিবেশ অন্যরকম করে ফেলা। ভাবখানা এই, জাফর ইকবাল সাহেব আওয়ামী লীগের সাংসদ বা নেতা। অথচ যেসব নেতারা  দুর্নীতি বা কারচুপি নামে দুটি বিষয়ে জড়িত তাদের কেউ মারা দূরে থাক তালিকায়ও রাখে না। তারা কি এত তুচ্ছ? না এতটাই সাধারণ? আসলে তারাও চলতে জানেন। না জানলে আপনি হেফাজতের দোয়া চাইতে যেতেন? তাদের কথামত মগজ ধোলাইয়ের পাঠ্যসূচী সমর্থন করতেন? ভোটের বাক্স যতদিন এভাবে রাজনীতিকে আগলে রাখবে ততদিন মুক্তচিন্তা নামের বিষয়টাও বাক্সবন্দী করে রাখতে হবে। তা না হলে আপনি এমন কোপ খাবেন এটা ধরে নিন।

জাফর ইকবালের ওপর এই আঘাত স্তম্ভিত করলেও বিস্মিত করেনি। কারণ মুক্তিচিন্তা আর মুক্তিযুদ্ধের দিকে ঝুঁকতে ঝুঁকতে তিনি নিজেই  বোঝেননি ঘাতক কতটা নিকটে। প্রশ্ন হচ্ছে একটা একুশ, বাইশ বছরের ছেলে চাইলেই এমন কাজ করতে পারে আসলে? যদি তার পেছনে বড় কোন শক্তি না থাকে? এই অপশক্তির উৎস যে সমাজ তার দিকে একবার তাকান। কোথায় উস্কানী নাই? কত মানুষ কত গুণি পরিচিতজন এখন আর বিধর্মীদের বাসায় কিছু খান না। কত মানুষ ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বাসা ভাড়া দেন না। কত কত জন মনে করেন- মুক্তিযুদ্ধ ভুল হোক আর শুদ্ধ হোক এখন এসবের আর দরকার নাই। বিএনপির হিন্দু নেতা গয়েশ্বর বাবু শহিদের সংখ্যা নিয়ে মজা করেও নিরাপদে থাকেন। কারণ তখন তিনি সংখ্যালঘু হলেও প্রোটেকটেড। আর আমাদের মানুষেরা সত্য বলেও অনিরাপদ।

একটা গল্প বলি। এক লোক রাস্তার ধারে বসে আছেন, তার পাশে একটা ফুটোওয়ালা দেয়াল। সে সংখ্যা গুনছে অবিরল। ত্রিশ, একত্রিশ করে করে ষাট, সত্তর এমন। একজন খুব চালাক লোক এসে বললো, কী করছো পাগলের মতো? লোকটি ভাবলেশহীনভাবে ফুটোটি দেখিয়ে দিলো। লোকটি ভাবলো এই বোকা ফুটোতে কি এমন দেখছে আর গুনছে? নিজেকে চতুর ও নিরাপদ ভাবা লোকটি কৌতূহলে যেই ফুটোয় চোখ রাখলো অমনি চিৎকার করে বললো, বাচাও, বাচাও। তারপর ফুটোর ওপার থেকে ছুটে আসা ধারালো চাকুর আঘাতে চোখে রক্ত নিয়ে পালিয়ে বাঁচল। ঐ লোকটি তখনো নিরীহের মতো গুনছে একশ একশ।

কেউ এই ফুটোর বাইরে না আমরা। একশ এক নাম্বার হবার আগে ফুটো বন্ধ করতে হবে। নিরীহ চেহারার ফুটোওয়ালা মানুষগুলো যাদের আমরা নিরপেক্ষ মনে করি তাদের থেকে সাবধান হতে হবে। নাহলে দুই নৌকায় পা রাখা নৌকা ও আরোহী সবাই মরবে  একসময়।

জাফর ইকবাল আমেরিকার নিশ্চিত সুন্দর জীবন ছেড়ে দেশে এসে একদিনের জন্যও এমন কিছু করেননি যাতে তাঁকে এমন আক্রমণের শিকার হতে হবে। তারপরও তিনি আক্রমণের শিকার হয়েছেন। এটাই এখন আমাদের বাস্তবতা। বাংলাদেশ কি আসলেই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে আর একবার?

লেখক: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ মার্চ ২০১৮/তারা

   
 



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

পুরুষের মেনোপজ : যা জানা জরুরি

২০১৮-১০-১৭ ৯:০৩:৫৩ পিএম

সুজি দিয়ে তালের বড়া

২০১৮-১০-১৭ ৮:৫১:১৮ পিএম

মনোবিদের ক্লাসে ক্রিকেটাররা…

২০১৮-১০-১৭ ৮:৩৫:৫৩ পিএম