অভিনন্দন টাইগারস, আগামীর ফাইনালগুলো তোমাদের হবে

প্রকাশ: ২০১৮-০৩-১৯ ২:৩৭:৩৩ পিএম
জাফর সোহেল | রাইজিংবিডি.কম

জাফর সোহেল: কাকে দিয়ে শুরু করব, কী দিয়ে শুরু করব, ভেবে পাচ্ছি না। কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম, ঢাবির টিএসসি, কারওয়ান বাজারের সবজি হাট কিংবা ঘরে ঘরে টিভিরুম- সবখানে তো একই ছবি। সবখানে বসেছে বোবার হাট। কারো মুখে রা নেই। চোখে জল বেরিয়েছে, কারো বা আটকে আছে মণিকোঠায়। আকাশ থেকে বাজ পড়ে হঠাৎ যেন থেমে গেছে সব কোলাহল।

২০তম ওভারের শেষ বলটি সৌম্যর হাত ছাড়ার আগ পর্যন্ত উত্তাল ঢেউয়ের মতো ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি। ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ স্লোগান আর নাগিন নৃত্যে রাতের নিয়ন আলোয় এক অপূর্ব দ্যোতনা সৃষ্টি হয়েছিল সেখানে। কিন্তু কী এক অশরীরি শক্তি ভর করেছিল কাল দীনেশ কার্তিকের গায়ে, কীভাবে যেন কী করে ফেললেন তিনি। শেষ বলে ছয় মেরে জয়! ক্রিকেট তার দেড়শ বছরের জীবনে ক’দিনই বা দেখেছে এমন ঘটনা? কী আশ্চর্য, সেই অল্পক’টির আরেকটি ঘটে গেল কালই, বাংলাদেশেরই বিপক্ষে! কেন বার বার বাংলাদেশই? কেন বার বার ‘এত কাছে, তবু এত দূরে’র আক্ষেপ?

সত্যিই, এ যেন নিয়তির নির্মম প্রহসন। বারবার এই প্রহসন মেনে নেয়া কঠিন। দীনেশ কার্তিকের ‘ছয়’ বাউন্ডারি লাইন পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাই উত্তাল টিএসসি হঠাৎ মরা নদীতে পরিণত হয়ে যায়। কী হলো, কী করে সম্ভব? হাজারো মুখ একে অপরের দিকে তাকায়; কোন উত্তর নেই কারো মুখে। সবাই বোবা! তরুণ-তরুণীদের নরম হৃদয়গুলো হুহু করে কাঁদতে শুরু করে, আর কঠিনেরা কাঁদে লুকিয়ে। এ কী আবেগ বাঙালি লুকিয়ে রেখেছে লাল সবুজের কাণ্ডারিদের জন্যে- না দেখলে বোঝাই যায় না। টিভি পর্দায় তার কিছু কিছু উঠে আসে খবরের সঙ্গে। কিন্তু, এর বাইরেও আবেগের অনেক রং থেকে যায়; দেখার বাইরে, শোনার বাইরে।

পাশের বাসায় ছোট্ট একটি বাবু আছে ৫ বছরের। দু’বছর বয়স থেকেই সে নাকি টাইগার ভক্ত হয়ে গেছে। লাল সবুজের খেলা থাকলেই সে বাবার কোলে বসে খেলা দেখার আবদার করে-‘ড্যাডি, মাশরাফি দেখব’। রোববার রাতে সে বাবাকে বলল, ‘বাংলাদেশ জেতার পরেই আমি ভাত খাব’। বাংলাদেশ হেরে গেছে। তার বাবা জানালো, বাবুটি কাল রাতে আর ভাত খায়নি। আমি নিশ্চিত, বাংলাদেশের অনেক মানুষের গলা দিয়েই ভাত নামেনি রোববার রাতে। এ রাত ছিল বাঙালির জন্য অন্যরকম এক দুঃখের রাত।

খেলা শেষে একটু নিঃশ্বাস নিতে গিয়েছিলাম কারওয়ান বাজারে। সেখানে সারি সারি ট্রাক সবজি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোনোটা থেকেই মালামাল নামানো হচ্ছে না। আমি বললাম, ব্যাপার কী? একজন বলল, ‘সবাই খেলা দেইখছে তো, একটু মন খারাপ, পরে নামাইবো নে’। আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম! ভাবছিলাম বাইরে গিয়ে একটু হালকা হব, কিন্তু টাইগারদের জন্য গোটা বাংলাদেশ যে দুঃখের বাতাসে ভরে যাবে, এমনকি এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোকেও ছুঁয়ে যাবে সেই দুঃখের হাওয়া, তা সত্যি ভাবিনি। এ কেমন দুঃখবিলাস বাঙালির! টাইগাররা প্রাণের ঠিক কোন গভীরে লুকিয়ে আছে- তা বোধ হয় বাঙালি নিজেও জানে না।

প্রিয় টাইগারস, আমি জানি, আমাদের এত এত দুঃখের চেয়েও তোমাদের দুঃখের ডালা অনেক ভারী। তোমাদের কষ্টের বিশালতা আমাদের সমস্ত কষ্টের দ্বিগুণ সমান, কিংবা আরও বেশি। মাঠের সবুজ ঘাসে লেখা থাকে তোমাদের নীল কষ্টগুলো। কখনো সেগুলো আমরা পড়তে পারি, কখনো পারি না। রোববারের ফাইনাল শেষে তোমাদের অশ্রু বাঁধ মানেনি, টেলিভিশনের পর্দায় আমরা দেখেছি। আমরা জানি, এ অশ্রু মিথ্যে নয়। দেশকে ভালো কিছু দিতে না পারার কষ্ট জীবনের যে কোনো কষ্টের চেয়ে বেশি। ২০১২ এশিয়া কাপের ফাইনালেও আমরা তোমাদের সে অশ্রু দেখেছি। তোমাদের সে অশ্রু সংক্রমিত হয়েছিল গোটা বাংলাদেশে। গোটা বাংলাদেশ সেদিন অশ্রুসজল হয়েছিল তোমাদের না পাওয়ার বেদনায়।

আমাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়ত তোমাদের কষ্টগুলো ঠিক বুঝতে পারি না। এটা সেটা বলি, গালমন্দ করি। কী করব, অনেক সময় মনে হয়, তোমরা ঠিক পুরোটা দাওনি। রাগ লাগে, কষ্ট হয়। তবু দুঃখ পেও না প্রিয় টাইগারস। শেষ বলে ‘ছয়’ দেয়া ব্যথিত সৌম্যর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কান্নার দৃশ্য আর সাইড বেঞ্চে বসে তাসকিন-ইমরুলদের কান্না লুকানোর চেষ্টা আমাদের জানান দেয়, মাঠে তোমরা কতখানি দিতে চাও; কতখানি চেষ্টা করো হৃদয় দিয়ে।

রুবেল ১৯তম ওভারে ২২ রান দিয়েছে নিজের ইচ্ছায় নয়, আমরা জানি। ফাইনালের স্নায়ুক্ষয়ী মুহূর্তে তার হাতের আঙুলগুলো হয়ত অনেক কাঁপাকাঁপি করছিল। কিংবা হয়ত সে ঠিক জায়গায় বল ফেলেছিল, নিয়তি তা আরেকটু এদিক সেদিক করে দিলো! কী করার আছে? এই রুবেলই তো আগের তিন ওভারে মাত্র ১৩ রান দিয়ে দুটি উইকেট তুলে নিয়েছিল। এখন অদৃশ্য কোনো শক্তি যদি তাকে এলোমেলো করেই দেয়, তোমরা কী করতে পার?  তোমাদের দলনেতা সাকিবকে হয়ত আমাদের কেউ কেউ একটু কটু কথা বলতে পারে। বলতে পারে, সাকিব ঠিক সময়ে ঠিক বোলারটি ব্যবহার করতে পারেনি; প্রশ্ন রাখতে পারে কেন শেষ ওভারে একজন নিয়মিত বোলার বল করবে না? তোমরা তাতে কিছু মনে করো না। ভালোবাসা বেশি বলেই মানুষ এত কথা বলে, এত প্রশ্ন করে। আমি জানি, সাকিব নিশ্চয়ই তার সেরা চিন্তাটাই কাজে লাগিয়েছে। আজ যদি বাংলাদেশ জিততো তাহলে সেই চিন্তাটাই প্রশংসার বন্যায় ভেসে যেতো।

অসাধারণ একটি জয়ের কাছে গিয়েও হেরে যাওয়ার দুঃখে তোমরা কতটা কাতর, তা আমরা জানি। দুঃস্বপ্নের এই ফাইনাল তোমাদের কত রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে- তাও আমরা জানি। আমরা জানি, খেলাশেষে কালও তোমরা গোল হয়ে দাঁড়িয়েছিলে ড্রেসিং রুমে। ‘আমরা করব জয়’ কোরাসে তোমরা সবাই কালও কণ্ঠ দিয়েছ। না দেখলেও জানি, কাল তোমাদের কণ্ঠগুলো জড়িয়ে গেছে বেদনার নীল কষ্টে; কারো কারো শব্দগুলো আটকে গেছে গলার কাছেই। তারপর তোমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েছ; না দেখলেও আমরা তা বুঝতে পারি।

মেহেদি মিরাজ হয়ত বিলাপ করতে করতে বলেছে- আমার জন্যই হারল দল, ১ ওভারে ১৮ রান না দিলে এমনটা হতো না; কিংবা রুবেল হয়ত ড্রেসিং রুমের দেয়ালে ঘুষির পর ঘুষি মেরে বলেছে, ‘সব আমার দোষ, এক ওভারে ২২ রান কেউ দেয়?’ সৌম্য হয়ত আফসোস করে বলেছে, ‘ইশ, যদি শেষ বলটা ইয়র্কার দিতে পারতাম’! কিংবা তামিম হয়ত বলেছে, ‘ইশ্ ঐ বলটা কেন ছয় মারতে গেলাম, মারলামই যদি আরেকটু জোরে কেন মারলাম না?’ সাকিব-মাহমুদুল্লাহরা হয়ত নিজেদের শাপান্ত করছেন-‘কেন এভাবে রানআউট হতে গেলাম, আরেকটু সতর্ক হলে তো এমনটা হতো না, আরো কিছু রান বেশি হতো’। ইত্যকার নানা আফসোসে আর দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়েছিল ড্রেসিং রুম।

তোমাদের এইসব রঙ-বেরঙের নীরব দুঃখের বেসাতি আমরা কখনো দেখি না; তবে আমরা বুঝতে পারি। এই অনুভবে তোমরা-আমরা একই কাতারের; একের বেদনা অন্যকে ছুঁয়ে যায় সমানভাবে। আমরা বুঝি, কাল রাতে তো বটেই, আগামী অনেকগুলো রাতেও হয়ত তোমাদের কেউ কেউ হঠাৎ হঠাৎ জেগে উঠবে; তাদের স্বপ্নের ভেতরে হানা দিবে এইসব ব্যথাতুর ক্ষণগুলো!  যে বেদনা আজ তোমরা পেয়েছ, পেয়েছে বাঙালি, বুঝতে পারি, সাম্প্রতিক ত্রিভুবন ট্রাজেডির বেদনার চেয়ে কোন অংশে কম নয় এটি। যদিও এখানে কোনো প্রাণ হারাইনি আমরা, কিন্তু আমাদের স্বপ্ন হারিয়েছি; বুক ভরা স্বপ্ন। স্বপ্ন ছিল, পূর্বের ৪ ফাইনাল দুঃস্বপ্ন এবার মুছে দেব। মুশফিক আর মাহমুদুল্লাহর আগের দুই ম্যাচ জেতানোর ধরন বলছিল- এবার হয়ত ভাগ্যদেবী মুখ তুলে চাইবেন। এশিয়া কাপের ফাইনালের মতো আরেকবার সাকিব-মুশফিকের কান্নার জড়াজড়ি আর হবে না। ভেবেছিলাম, অনেক তো কাঁদিয়েছে ফাইনাল নামের দুষ্টগ্রহ, এবার আর কান্না নয়। শনির রাহু কেটে যাবে। কিন্তু হলো না। আরও একবার দুঃস্বপ্নের চোরাবালিই হলো ফাইনাল নামের শব্দটি। ওপরে বসে ভাগ্যের কারিগর সব লিখে দিয়েছেন, আমরা কে কী করতে পারি বল!  কিন্তু দুঃখ পেয়ো না প্রিয় টাইগারস, তোমাদের জন্য এই ভাগ্যকারিগরই হয়ত আগামীতে ভালো কিছু লিখে রেখেছেন, আরো ভালো কিছু। দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই কান্নাই হবে তোমাদের শেষ কান্না। আগামীর সব ফাইনাল তোমরাই জিতবে ইনশাআল্লাহ।

আমাদের প্রিয় টাইগাররাই। বিশ্বাস করো, বিশ্বাস রাখো; আগামীর স্বপ্নগুলো সব তোমাদের হবে। আমরা তোমাদের জন্য গর্বিত। তোমরা যা করেছ, যতটুকু করেছ তাতেই আমরা খুশি। সত্যি বলছি, আমরা এতটুকু ব্যথিত নই। দেখো, ফেসবুকের পাতাজুড়ে আজ কোন সমালোচনা নেই, কটু বাক্য নেই। সমগ্র বাংলাদেশ আজ তোমাদের অভিনন্দন জানাচ্ছে। আগামীতেও তোমরা অনেক অভিবাদন পাবে। কারণ, নিশ্চিতভাবেই আগামীতে অনেক অনেক জয় তোমরা আমাদের এনে দেবে। সেসব জয়ের কিছু কিছুর গায়ে থাকবে এমন ‘ফাইনাল’র তকমা।

লেখক: সাংবাদিক



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৯ মার্চ ২০১৮/তারা

   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

পাবনায় অটোরিকশা ধর্মঘট অব্যাহত

পাবনায় অটোরিকশা ধর্মঘট অব্যাহত

২০১৮-০৪-২১ ৭:৩২:৩০ পিএম
শাকিবকে নিয়ে নায়িকার আফসোস

শাকিবকে নিয়ে নায়িকার আফসোস

২০১৮-০৪-২১ ৬:৫৯:৪০ পিএম
‘মুভি মোগল এ কে এম জাহাঙ্গীর খান’

‘মুভি মোগল এ কে এম জাহাঙ্গীর খান’

২০১৮-০৪-২১ ৬:৪৬:১৩ পিএম