নববর্ষে হোক নব বোধোদয়

প্রকাশ: ২০১৮-০৪-১৩ ২:৫২:৫৭ পিএম
রুমা মোদক | রাইজিংবিডি.কম

|| রুমা মোদক ||

এই ভার্চুয়াল যুগ এক আশ্চর্য আর বিচিত্র দুনিয়া উন্মোচিত করেছে আমাদের হাতের মুঠোয়। আমাদের জানার কিংবা ততোধিক উপলব্ধির জগত ছিলো পাঠকেন্দ্রিক। আর তারও পরে আমাদের স্বপ্নগুলো প্রাণময় হয়ে উঠতো সাদাকালো জীবন্ত বাক্সে। এতোদিন ছাপার অক্ষরে নির্বিকার ঘাপটি মেরে থাকা বেদনারা গলার কাছে বাষ্প হয়ে জমে যেতো দুর্গার মৃত্যুর পর অপুর ছুড়ে ফেলে দেয়া মালার সঙ্গী হয়ে। সেই পানা পুকুরে পরক্ষণে কচুরিপানা এসে ফাঁকা হওয়া জলটুকু ঢেকে দিতো ঠিক,আমাদের বেদনার বাষ্পগুলো দিনের পর দিন বালিশ ভিজিয়ে যেতো। আমাদের বীজগণিতের খাতা ঝাপসা হয়ে উঠতো সংশপ্তকের মালুর কান্নায়, কুলায় কালস্রোতের রাখির বিষণ্ন দৃঢ় আদর্শ কেবল তাঁর গর্ভস্থ সন্তান শুধু নয়, সংক্রামিত হতো আমাদের মাঝেও।

তারপর একদিন তাতে টুকটাক আলোর ফোয়ারা ছোটাতে এলো ক্যাবল চ্যানেল। আমাদের সাপ্তাহিক নাটক, ধারাবাহিক নাটকের মধুরতম অপেক্ষাগুলো গ্রাস করে নিলো মাধুরী, শ্রীদেবী,এক দো তিন...ভাবি তেরা দেবর দিওয়ানা...। সেই শুরু আমাদের স্থিতধী উপলব্ধিগুলোর অস্থির অবনমন। হ্যাঁ অবনমন। আমরা দ্রুতই হারিয়ে ফেললাম আমাদের অপু-দুর্গাকে, হারিয়ে ফেললাম শ্যামাঙ্গ-লীলাবতী, শশী-কুসুমকে। হারিয়ে ফেললাম আমাদের খেলার মাঠ, পুতুলের ঘর। পরিবর্তনশীলতা সময়ের ধর্ম। মেনে নেয়াটা প্রগতি। কিন্তু সেই পরিবর্তন যদি হয় নিজের জন্ম-পরিচয় সমেত অস্তিত্ব ভুলিয়ে দেবার অসুস্থ পায়তারা তবে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়াই প্রগতির পথে অবিচল থাকা।

আজ হাতের মুঠোয় উন্মুক্ত বিশ্ব জ্ঞান-বিজ্ঞান আর অদেখা জগৎকরে দিয়েছে সহজলভ্য। মুঠো খুলেই আমরা দেখা পাচ্ছি আমাজানের জঙ্গল  থেকে এন্টার্কটিকার গলে যাওয়া বরফ। পাঠাভিজ্ঞতার কল্পনাময় অসীম অধরা জগতগুলো কেমন চেনা ঘোরহীন নিত্যাদিনের ডালভাত হয়ে গেলো। আমরা হঠাৎ আবিষ্কার করলাম হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছে আমাদের একঘেয়ে জীবনের আনন্দ খুঁজে ফেরা রোমাঞ্চময় ক্ষণগুলো। আর সেইসাথে ভেঙে পড়েছে আমাদের আজন্ম লালিত মূল্যবোধ, হারিয়ে গেছে স্বপ্ন নির্মাণের নিষ্পাপ ভ্রমণ।

নতুন নির্মাণের জন্য কিছু ভাঙন জরুরি। কিন্তু আমাদের এ ভাঙন যেনো শেকড় থেকে ঘুণে কাটার মতো ভয়াবহ। এক উত্তুঙ্গ প্রজন্ম জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠেছে কালের গর্ভে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও চেতনাহীন শেকড়ের সংস্পর্শ বিচ্ছিন্ন এক ভোকাট্টা প্রজন্ম। যে তরুণেরা একদা ছিলো এই সমাজের মহৎ সব পরিবর্তনের মূল নিয়ামক তারাই হয়ে উঠেছে জাতির ভয়াবহ আতঙ্কের উৎস। ৫২, ৬৯, ৭১ এমনকি নিকট অতীতে ৯০-এর গণ অভ্যুত্থান পর্যন্ত তরুণরাই ছিলো দেশ ও জাতির কেবল আশার সুতিকাগার নয়, অগ্রসৈনিকও।

আমরা দুঃখের সাথে দেখছি, সেই তরুণরা মিছিলের স্লোগান থেকে মলেস্ট করছে তরুণীকে, অথচ এই তরুণীর হওয়ার কথা ছিলো মিছিলের সহযাত্রী, যেমনটা আমরা দেখেছি ৫২, ৭১-এ ইতিহাস বদলে দেবার মিছিলে। অসহায় বিস্মিত বিমুঢ় আমরা দেখছি আমাদের স্বপ্ন বিনির্মাণের যোদ্ধা হয়ে ওঠার কথা যাদের তারা হিংস্র শ্বাপদের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে জাতির সূর্য সন্তানদের উপর।

দেখতে দেখতে অচেনা হয়ে উঠেছে এ স্বদেশ। জানি নিয়মমতো মেলা হবে, শোভাযাত্রা হবে, বৈশাখী আয়োজনমালায় হুল্লোড়ে মাতবে বাংলাদেশ। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই, সবকিছুর মধ্যে ওৎ পেতে থাকবে এক অজানা আতঙ্ক। আমাদের এইসব উদযাপন দিনশেষে পর্যবসিত হবে অর্থহীন উদযাপনেই। একটা অর্থহীন উদযাপন শেষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি আপলোড শেষে আমরা ফিরে যাবো চাপাতি আর ক্ষমতাধর দম্ভের পদতলে।


দুয়ারে পহেলা বৈশাখ। বাঙালির এক এবং একমাত্র অসাম্প্রদায়িক উৎসব। একইসঙ্গে ক্ষদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীদের বৈসাবী। এইতো মাত্র সেদিন জাতীয়তাবোধের উন্মেষে আগ্রাসী ধর্মীয় অপশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আদায় করেছি আমাদের স্ব-পরিচয় আর জাতিসত্তার অধিকার। রবীন্দ্রনাথকে অর্জন করেছি, অর্জন করেছি নজরুল। আগ্রাসনের প্রতিবাদে আমরা রমনার বটমূলে গেয়ে উঠেছি ধর্ম-বর্ণেও উর্ধ্বে এক অসাম্প্রদায়িক সুর- এসো হে বৈশাখ এসো এসো। কিছু তরুণের স্বতঃস্ফূর্ত শোভাযাত্রা হয়ে উঠেছে বিশ্ব ঐতিহ্যের গর্বিত অংশ। ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই, চাকমা তঞ্চঙ্গাদের বিজু উৎসব হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী নতুন বছর বরণের উৎসব পালিত হয়ে আসছে এদের নিজস্ব রীতিতে। পানিতে ফুল ভাসানো, বুদ্ধদেবের প্রতিকৃতির নবজলে স্নান এসবই এদের ধর্মীয় বিশ্বাস আর সংস্কৃতির পরিপূরক হয়ে উঠেছে। আবহমান প্রাকৃতিক ধারাবাহিকতায় হয়ে গেছে এদের জীবনাচরণের অংশ। ঠিক তেমনি কূপমণ্ডুকতার বিপরীতে আমাদের বৈশাখ আমাদের বর্ষবরণ আমাদের শোভাযাত্রা ঘোষিত করছিলো আমাদের অসাম্প্রদায়িক জাতীয় চরিত্র। কিন্তু দুঃখের সাথে স্বীকার করতে হয় আজ পাহাড়ে বসবাসকারী নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী যেমন অসহায়, তেমন অসহায় হয়ে পড়েছে বাঙালি জাতিসত্তা। পাহাড়ের মেয়েটির যেমন রেহাই নেই অপহরণ গুম হত্যা থেকে, তেমনই রেহাই নেই বাঙালি নারীর। আমার বাঙালি মেয়েটা আজ জানেনা আমাদের গৌরবময় পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠা এই শোভাযাত্রা থেকে এই বৈশাখের জনারণ্য থেকে সে সম্ভ্রম নিয়ে ফিরতে পারবে কিনা!

যেনো দেখতে দেখতে অচেনা হয়ে উঠেছে এ স্বদেশ। জানি নিয়মমতো মেলা হবে, শোভাযাত্রা হবে, বৈশাখী আয়োজনমালায় হুল্লোড়ে মাতবে বাংলাদেশ। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই, সবকিছুর মধ্যে ওৎ পেতে থাকবে এক অজানা আতঙ্ক। আমাদের এইসব উদযাপন দিনশেষে পর্যবসিত হবে অর্থহীন উদযাপনেই। একটা অর্থহীন উদযাপন শেষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি আপলোড শেষে আমরা ফিরে যাবো চাপাতি আর ক্ষমতাধর দম্ভের পদতলে।

বলছিলাম এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে প্রকাশ্যে কল্লা কর্তনের আহবান, ক্রিকেট খেলা কিংবা মোশাররফ করিমের পোশাক সংক্রান্ত বক্তব্য ঘিরে অন্ধ মূর্খ জাতীয়তাবাদ ও মৌলবাদী চিন্তার বিকাশ দেখে বিস্মিত ভাবি- কে বলবে এদেশে কাজী মোতাহার হোসেন, আব্দুল ওদুদরা অনেক আগেই ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’ বলে বুদ্ধির মুক্তির আন্দোলন করে গেছেন। যে আন্দোলন সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশের দিক থেকে ইউরোপের রেনেসাঁর থেকে কিছু কম ছিলো না। যে রেনেসাঁর সুফল ঘরে তুলে ইউরোপ আজ উন্নতির শীর্ষে, আমরা কেনো পিছিয়ে গেলাম হাজার বছর!

এর দায় কি সবটুকুই মুর্খ ধর্মান্ধ জনগোষ্ঠীর? নিশ্চই নয়। বরং অন্ধ ক্ষমতার লোভে যারা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে দিনের পর দিন সুচতুরভাবে দূরে রেখেছে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাদের আর তারও বেশি সেইসব জ্ঞানপাপীদের ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার লোভে যারা ন্যায়কে ন্যায় আর অন্যায়কে অন্যায় বলার মেরুদণ্ড হারিয়েছে। একটি জাতি যদি সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ না হয় তার অন্য সকল সূচক অন্ধকারে পথ হারায়। নববর্ষ সামনে রেখে এই বোধোদয়টুকু হোক আমাদের। নববর্ষে আমাদের প্রত্যাশা হোক এমন কিছু মানুষের আবির্ভাব, আর তাদের অদম্য সৎ স্পৃহা আর স্পর্ধায় হার মানুক এই মাৎসায়নের কাল।

লেখক : নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ এপ্রিল ২০১৮/তারা

   
 



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

পোকামাকড় কামড়ের সেরা চিকিৎসা

২০১৮-০৭-১৬ ১:৫৮:১৪ পিএম

বুধবার ‘কিনু কাহারের থেটার’

২০১৮-০৭-১৬ ১২:৪৮:৪৬ পিএম

শুধু পুতিনের মাথায় ছাতা কেন?

২০১৮-০৭-১৬ ১২:১১:৫১ পিএম