শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ ও রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ

প্রকাশ: ২০১৮-০৯-২১ ৬:১৪:৩০ পিএম
মাছুম বিল্লাহ | রাইজিংবিডি.কম

মাছুম বিল্লাহ: বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘প্রতি বছর দেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বের হচ্ছে। তাদের একটি ভালো অংশ চাকরি পাচ্ছে না। অন্যদিকে দুই লাখ বিদেশি ব্যবস্থাপক, পরামর্শক, প্রকৌশলী ইত্যাদি কর্মীকে আমাদের নিয়োগ দিতে হয়। কারণ আমাদের শিক্ষা যথাযথ মানসম্পন্ন নয়। মানসম্পন্ন না হওয়ার সর্বপ্রধান কারন মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব। কেবল উন্নতমানের পাঠক্রম ও পাঠ্যসূচি তৈরি করলেই উন্নতমানের শিক্ষা হয় না। কাগজে লিখিত এসব পাঠক্রম ও পাঠ্যসূচি জীবন্ত ও অর্থপূর্ন করেন শিক্ষক। উপযুক্ত তথা মানসম্পন্ন শিক্ষক শুধু যথাযথ শিক্ষা দানই করেন না, শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় আগ্রহী করে তোলেন এবং উন্নত ও মহৎ জীবনাদর্শে উদ্বুদ্ধ করেন। সে কারণেই শিক্ষককে বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। আর জ্ঞান ও গুণে সমৃদ্ধ মানুষই হলো উন্নয়নের চাবিকাঠি।’

সিরাজুল ইসলাম স্যার যথার্থ বলেছেন। আমরা জানি, দেশে মানসম্পন্ন শিক্ষকের সংকট রয়েছে শিক্ষা বিভাগের সকল স্তরে। তবে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে এই সংকট প্রকট। প্রাথমিক শিক্ষার বিশাল অংশ সরকারি অথচ এই পর্যায়ের শিক্ষকদের এবং প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে কোন কার্যকরী ব্যবস্থা নেই। মাধ্যমিক পর্যায়ের সিংহভাগই বেসরকারি পর্যায়ে পরিচালিত হয়। সেখানেও মানের বিশাল প্রশ্ন রয়েছে। বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের চিত্র ভয়াবহ। ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব বিস্তার ও টাকাপয়সার লেনদেন করে বহু অযোগ্য ব্যক্তি শিক্ষকতার মতো একটি মানব ও সমাজগঠনমূলক কাজে ঢুকে পড়েছেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগের জন্য তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করে কয়েক বছর আগে। আশা ছিল স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজন, তাদের আত্মীয়-স্বজন ও রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত হয়ে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যোগ্য ও উপযুক্ত শিক্ষক পাবে। যদিও শুধু এই একটিমাত্র বিষয় যোগ্য ও উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তারপরেও এক্ষেত্রে এটি একটি বড় পদক্ষেপ।  সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালে গঠন করা হয় এনটিআরসিএ বা বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ। ২০১৫ সালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির পরিবর্তে এনটিআরসিএ-র হাতে গেলেও সমস্যার পাহাড় টপকে শিক্ষক নিয়োগে আশার আলো দেখা যায়নি। এনটিআরসিএ-র গাফিলতি ও দুর্নীতির কারণে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শূন্য পদের চাহিদা দিতে চায় না, তারা ম্যানেজিং কমিটির পরামর্শে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে কাজ চালিয়ে নেয়ার কালচার তৈরি করেছেন। এর ফলে মান নিয়ন্ত্রণের জায়গাটি আরও নাজুক হয়ে পড়েছে।

সারা দেশে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এনটিঅরসিএ সূত্রে জানা গেছে, দেশের সব বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শূন্য আসনের তালিকা চাওয়া হয়েছে। এ তালিকায় বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের পদ সংখ্যা প্রায় ত্রিশ হাজারের বেশি। এ সব শূন্য পদে যোগ্য বিবেচিতদের নিয়োগের জন্য এনটিআরসিএ থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সুপারিশ করা হবে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের নতুন আইন ও নীতিমালা অনুসারে সুপারিশকৃতদের নিয়োগ দিতে হবে প্রতিষ্ঠানকে। এ ক্ষেত্রে আর কোন ধরনের নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহণের সুযোগ নেই প্রতিষ্ঠানটির। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের জন্য ওই আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনটিআরসিএ সূত্র বলছে, আগামী এক মাসের মধ্যে শূন্য আসনের তালিকা মন্ত্রণালয় ও বোর্ড কর্তৃক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সব বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে চাওয়া হয়েছে। তারই ভিত্তিতে চাহিদা তালিকা প্রকাশ করার প্রস্তুতি চলছে। এ দিকে তালিকা পাওয়ার আগেই এনটিআরসিএ গত ১০ জুলাই (২০১৮) বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে সর্বশেষ ( এক থেকে এগার) শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ স্কুল-কলেজ পর্যায়ে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ প্রার্থীর মেধা তালিকা প্রকাশ করেছে। কিন্তু প্রকাশিত মেধা তালিকা নিবন্ধিত শিক্ষকদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে কারণ  তালিকাটি নানামাত্রিক ভুলে পরিপূর্ণ। তালিকায় পুরুষ শিক্ষকের নামে মহিলা শিক্ষকের নাম, মহিলার জায়গায় পুরুষের নাম, একই ব্যক্তি ও একই বিষয়ে শিক্ষকের নাম ভিন্ন তালিকায় ভিন্ন নামে স্থান পেয়েছে। নামের বানান-নাম্বার ভুলসহ বিভিন্ন ভুলভ্রান্তি ধরা পড়েছে।

গত ০৯ এপ্রিল ২০১৮, ১৪তম শিক্ষক নিবন্ধনের লিখিত পরীক্ষার ফলে স্কুল-২ পর্যায়ে ৬২৪ জন, স্কুল পর্যায়ে ১৫ হাজার ৩৬২ জন এবং কলেজ পর্যায়ে ৩ হাজার ৮৭৭ জনসহ মোট ১৯ হাজার ৮৬৩ জন প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ফল প্রকাশের পর অসঙ্গতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরীক্ষার্থীরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা তাদের মনোভাব ব্যক্ত করে পোস্ট দিয়েছেন। বিষয়টি জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিতও হয়েছে। ফলে সেগুলো আর পুনরায় বলছি না। ৪০ নাম্বার পেলে বিজ্ঞপ্তিতে পাস করার কথা বলা হলেও অনেকেই ভালো পরীক্ষা দিয়ে রোল না পেয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। একটি দৈনিক পত্রিকা থেকে জানলাম, সারা দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় হাজার হাজার শূন্যপদ থাকলেও কর্তৃপক্ষ চার বছরে  মাত্র ছয় হাজার শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন যা ২০১৬ সালে সংঘটিত হয়। যথাসময়ে নিয়োগ না হওয়ায় লাখ লাখ নিবন্ধিত শিক্ষক হতাশায় দিন পার করছেন।  প্রথম থেকে দ্বাদশ নিবন্ধিত শিক্ষকদের নিবন্ধন পরীক্ষা মোটামুটি একই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হলেও ত্রয়োদশ নিবন্ধন থেকে পরীক্ষা সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে বিসিএস-এর আদলে যেমন প্রথম প্রিলিমিনারী, লিখিত ও পরে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এনটিআরসিএ থেকে বলা হয়েছিল যে, ত্রয়োদশ ব্যাচের নিবন্ধনকারীদের আলাদাভাবে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হবে। বাছাই প্রক্রিয়া ভিন্নতর হওয়ায় সম্ভবত কর্তৃপক্ষ এরুপ একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু সেটির ব্যাপক প্রচার, বিশ্বাসযোগ্যতা  এবং বিষয়টিতে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। এনটিআরসি-এর বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন এলোমেলো সিদ্ধান্ত , সময়মতো শিক্ষক নিয়োগ না দেওয়ার কারণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘সংসদীয় স্থায়ী কমিটি’ শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বাতিল করে আবার আগের মতো ‘ম্যানেজিং কমিটি’র মাধ্যমে নিয়োগের সুপারিশ করেছে। এই সুপারিশের পেছনে কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে কিনা জানি না, তবে এটি করা হলে তা শিক্ষার জন্য মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনবে। ইতিমধ্যে বহু লোক তথাকথিত ম্যানেজিং কমিটিকে ম্যানেজ করে শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশ করে এই মহান পেশাটির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। আবার সেই পুরাতন সিদ্ধান্তে চলে গেলে তা জাতির শিক্ষার ক্ষেত্রে এক বড়  হুমকির  সৃষ্টি করবে।

দীর্ঘদিন বিভিন্ন শিক্ষাবিদগণ একটি ‘বেসরকারি শিক্ষক নির্বাচন কমিশন’ গঠন করার কথা বলে আসছেন। কিন্তু কেউ তা গুরুত্ব দেয়নি। আবার শোনা যাচ্ছে যে, বেসরকারি শিক্ষক নির্বাচন কমিশন (এনটিএসসি) গঠনের উদ্দেশ্যে আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এই  লক্ষ্যে একটি  উপকমিটি গঠন করা হয়েছে যেটি আলোচনার জন্য ২২ জুলাই বসার কথা। জানি না বসেছে কি না। এই কমিশন গঠন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০১৫ সালে আর প্রস্তাবনা ও সুপারিশ চলছে বহু বছর যাবত। প্রিলিমিনারী পরীক্ষা, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই করা হবে প্রার্থীদের। উক্ত পরীক্ষাগুলোর উপর ভিত্তি করে উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে  মেধা তালিকা তৈরি করা হবে। এটি করা হলে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া অনেকটাই স্বচ্ছতার মধ্যে চলে আসবে, আর আমরা হয়তো একশত ভাগ না হলেও বর্তমান অবস্থার চেয়ে বহুগুণ ভালো শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থাপনা উপহার পাব। কিন্তু আসলেই এটি হবে কী? তারপরেও আশায় বুক বেঁধে রইলাম।

লেখক: ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮/তারা

   
 


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

পঞ্চম গোল্ডেন বুটে মেসির ইতিহাস

২০১৮-১২-১৯ ১০:১৬:০৪ এএম

লিগ কাপের শেষ চারে ম্যানসিটি

২০১৮-১২-১৯ ৯:২৬:০৯ এএম

টিভিতে আজকের খেলা

২০১৮-১২-১৯ ৮:৫২:৫১ এএম

ছবিতে আলোচিত ইরানি অভিনেত্রী

২০১৮-১২-১৯ ৮:২২:৫২ এএম