কমিউনিটি রেডিও : বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন ও অর্থনৈতিক স্থায়ীত্বশীলতা

প্রকাশ: ২০১৯-০২-১৩ ১:০৭:৫০ পিএম
মাহফুজ ফারুক | রাইজিংবিডি.কম

মাহফুজ ফারুক : কমিউনিটি রেডিও নীতিমালা ২০০৮ যখন প্রণয়ন করা হয়, তখনও দেশে কমিউনিটি রেডিও সম্প্রচারে আসেনি। ফলে সে নীতিমালা অনুপাতে স্টেশন পরিচালনার ক্ষেত্রে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে, তা পূর্ব থেকেই অনুমান করতে পারাটা ছিল অনেক কঠিন একটা ব্যাপার। তবে রেডিওর যাত্রা শুরু হওয়ার আগেই একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রণয়ন হওয়ার ফলে নানাদিক থেকেই সুরক্ষিত ছিল এবং আছে কমিউনিটি রেডিওর পথচলা।

২০০৮-এর নীতিমালার আলোকে কমিউনিটি রেডিওগুলো শুধুমাত্র উন্নয়ন বিজ্ঞাপন সম্প্রচার করতে পারত। সেখানে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন সম্প্রচারের জন্য কোনো পথ খোলা ছিল না। ফলে রেডিওগুলো সম্প্রচারে আসার পর যেটি হলো-কমিউনিটি রেডিওর আয়ের পথ অনেকটা সংকুচিত বলেই মনে হতে থাকে। বিশেষ করে উদ্যোক্তা এবং ব্রডকাস্টাররা এমনটাই মনে করতেন। উন্নয়ন বিজ্ঞাপনে তেমন সাড়া না থাকায় আয়ের জায়গাটা একটা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ বলেই প্রতীয়মান হয়। ব্যয় অনুপাতে আয় না হওয়ার কারণে কয়েকটি রেডিও স্টেশন তাদের সম্প্রচার সময় পূর্বের তুলনায় কমিয়ে আনে। এতে করে স্টেশন বন্ধ হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেলেও সম্প্রচার সময় কমিয়ে আনায় শ্রোতাদের ওপর এর প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় কমিউনিটি রেডিওর গুরুত্ব স্বাভাবিকভাবেই যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আয়ের পথ যদি উন্মুক্ত না হয় বা আয় যদি প্রয়োজন অনুপাতে না হয় সেক্ষেত্রে আর্থিক স্থায়ীত্বশীলতার সংকট দেখা দিতে পারে। অতএব এ থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন না নিতে পারার বিষয়টিকেই বড় করে দেখা হতে লাগল। ফলে বিভিন্ন সময়ে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে এ দাবি বারবার উত্থাপন হতে থাকল, বাংলাদেশ বেতার ও বাণিজ্যিক এফএম রেডিওগুলো বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন নিতে পারলে কমিউনিটি রেডিওগুলো তা কেন পারবে না? দিনে দিনে এ যুক্তি ও দাবি জোরাল হতে থাকে। এরপর একটা সময়ে এসে সে দাবিও পূরণ হয়। অর্থাৎ কমিউনিটি রেডিও নীতিমালা ২০১; যা ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালে গেজেট আকারে প্রকাশ হয়েছে। সেখানে ৭.১ উপ-ধারায় বলা হয়েছে, ‘শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় নির্বাহের জন্য দৈনিক মোট প্রচার সময়ের সর্বোচ্চ শতকরা ১০ (দশ) ভাগ সময় বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে।’

১০ শতাংশ বিজ্ঞাপন গ্রহণের এমন সুযোগটি অনেক বড় একটি অর্জন বা প্রাপ্তি হিসেবে আশার আলো জ্বালালেও কমিউনিটি রেডিওর আর্থিক স্থায়ীত্বশীলতার ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের কোনো পরিতৃপ্তি এনে দিতে পারেনি ৭.১ উপধারা।

কয়েকটি স্টেশনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পূর্বের তুলনায় কিছু বিজ্ঞাপন তাদের বেড়েছে। তবে সেটি প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এর কারণ হিসেবে ওঠে এসেছে কমিউনিটি রেডিওগুলো সাধারণত উপজেলা/জেলা পর্যায়ের ছোট শহরে অবস্থিত। যেখানে সবাই সবার সম্পর্কে কম-বেশি জানে। কাজেই স্থানীয় গণমাধ্যম হিসেবে কমিউনিটি রেডিওতে পণ্য/সেবার বিজ্ঞাপন দেওয়ার ব্যাপারে তাদের মধ্যে আগ্রহের জায়গাটা অনেক কম। অন্যদিকে ওই সব এলাকায় স্থান ভেদে ৩০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যে দোকান/অফিস ঘর ভাড়া পাওয়া যায়। ফলে রেডিওতে বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা প্রথমেই ভাবেন-যে পরিমাণ টাকা দিয়ে তারা এক মাসের জন্য বিজ্ঞাপন দেবেন সে পরিমাণ টাকা থাকলে হয়তো কয়েক মাসের অফিস/দোকান ঘর ভাড়া পরিশোধ করতে পারবেন। ফলে স্থানীয় বিজ্ঞাপন বাজার রয়েছে অনেকটা নাজুক। তবে আশার বিষয় এটুকুই যে, এরপরও অনেক উদ্যোক্তা/ব্যবসায়ীরা কিছু কিছু বিজ্ঞাপন কমিউনিটি রেডিওতে দিচ্ছেন। তবে তা স্টেশনের পরিচালন ব্যয় নির্বাহের তুলনায় অনেক কম। বর্তমান নীতিমালার ৭.১ উপধারাকে কাজে লাগানোর জন্য কমিউনিটি রেডিওগুলোকে স্থানীয় পর্যায়ে তাদের ইমেজ তৈরির পেছনে হয়তো অনেক সময় এবং বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম ও কৌশল প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু ততদিনে নিজেদের অবস্থা যেন আরো শোচনীয় পর্যায়ে না যায় তা বিবেচনায় এনে আরো বিকল্প পথ তৈরি করা প্রয়োজন। আর তা হতে হবে অবশ্যই নীতিমালার ভেতরে থেকেই।

নীতিমালার ২.২ উপধারায় বলা হয়েছে, ‘সম্প্রচার অনুষ্ঠান সূচিতে শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, সমাজ, নারীর এলাকাভিত্তিক গ্রামীণ উন্নয়ন, পরিবেশ, আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য বিষয় এবং সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদক বিরোধী প্রচার অন্তর্ভুক্ত হবে।’ বলতে দ্বিধা নেই বাংলাদেশে সম্প্রচাররত কমিউনিটি রেডিওগুলো উল্লেখিত ২.২ উপধারায় বর্ণিত বিষয়গুলি ছাড়াও অনুরূপ অন্যান্য অনেক বিষয় নিয়ে অনুষ্ঠান/সংবাদ নির্মাণ ও সম্প্রচার করে আসছে। এর স্বীকৃতি স্বরূপ ইতিমধ্যে কমিউনিটি রেডিও সেক্টরে যুক্ত হয়েছে জাতিসংঘ তথ্য সমাজ পুরস্কার, এশিয়ান ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন অ্যাওয়ার্ড, মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ক্যাটাগরির অ্যাওয়ার্ড-পুরস্কারসহ আন্তর্জাতিক, জাতীয় ও স্থানীয় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্বীকৃতি। অন্যদিকে কমিউনিটি রেডিওগুলোর সম্প্রচার কার্যক্রমের ফলে যে ধরনের ইফেক্ট এবং ইমপেক্টগুলো স্ব-স্ব এলাকায় পড়েছে তা নিঃসন্দেহে গর্ব করার মতো। এমতাবস্থায় কমিউনিটি রেডিওর স্থায়ীত্বশীলতা নিয়ে শুধু উদ্যোক্তা এবং ব্রডকাস্টাররাই নন; বরং ভাবতে হবে সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকদেরকেও।

এক্ষেত্রে বিকল্প প্রস্তাবনা হিসেবে এ পর্যায়ে স্থানীয় উপদেষ্টা কমিটি প্রসঙ্গে আসা যাক। নীতিমালার ১৩.০ ধারায় স্থানীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠন ও কার্যপরিধি নিয়ে বলা হয়েছে। যেখানে ১৬ সদস্যের মধ্যে ১৫ জন সদস্যই রয়েছেন প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ও সরকার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা/প্রতিনিধি। এই কমিটি প্রতি ২ মাসে একটি মিটিং করবেন এবং সম্প্রচার প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় মনিটরিং কমিটির কাছে প্রেরণ করবেন। ১৩.২ (ঘ) উপধারায় বলা হয়েছে, ‘কমিউনিটি রেডিও’র মাধ্যমে উন্নয়ন বিষয়ক বিজ্ঞাপন/সরকারি বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য উৎসাহিত করা’।

আমরা জানি, সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন বিজ্ঞাপন জাতীয় সংবাদপত্রের পাশাপাশি স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রদান বাধ্যতামূলক করা আছে। অনুরূপভাবে সরকারি কিছু বিজ্ঞাপন যদি কমিউনিটি রেডিওতেও প্রচারের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয় তবে নিঃসন্দেহে তা কমিউনিটি রেডিওর স্থায়ীত্বশীলতা অর্জনে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে আমরা মনে করি। যেখানে সংবাদপত্রগুলো কমিউনিটি রেডিওর মতো উন্নয়নমূলক ও কমিউনিটিবেজড সম্প্রচার/প্রকাশের জন্য বাধ্য নয়, বরং এক্ষেত্রে কমিউনিটি রেডিওগুলোই বাধ্য; সেখানে সরকারের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে নির্ধারিত আকারে কমিউনিটি রেডিওগুলো সরকারি বিজ্ঞাপন দাবি করতেই পারে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় মনিটরিং কমিটির পক্ষ থেকে স্থানীয় উপদেষ্টা কমিটির প্রতি উপরোল্লেখিত ১৩.২(ঘ) উপধারার বাস্তবায়ন নিয়ে কার্যকর ফলোআপ থাকলেও কাঙ্খিত আর্থিক মুক্তি মিলতে পারে কমিউনিটি রেডিওর।

লেখক: কবি ও কমিউনিটি মিডিয়া ব্যক্তিত্ব



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯/সাইফ

     


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

রঙ বাংলাদেশের ঈদ পোশাক

২০১৯-০৫-১৯ ৯:৫৭:২৯ পিএম

১৪তম রোজার সাহরি ও ইফতার সময়

২০১৯-০৫-১৯ ৮:৪৮:৩৩ পিএম

বিএএসএর ইফতার মাহফিলে স্পিকার

২০১৯-০৫-১৯ ৮:৪৪:৫৫ পিএম