সুন্দরবন দিবসে এই হোক অঙ্গীকার

প্রকাশ: ২০১৯-০২-১৪ ৪:৪৭:৫৩ পিএম
অলোক আচার্য | রাইজিংবিডি.কম

অলোক আচার্য : সুন্দরবন, বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের আধার। কেবল নামে সুন্দর নয়, মুগ্ধ করার মত প্রকৃতিশৈলী আর উদ্ভিদ-প্রাণী সম্পদের নিদর্শন এই সুন্দরবন। অসংখ্য পরিচিত-অপরিচিত বৃক্ষরাজি, প্রাণীকুল নিয়ে যুগ যুগ ধরে দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবদান রেখে চলেছে। সুন্দরবনের কথা শুনলেই দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে গায়ে ডোরাকাটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার, গোলপাতা, জোয়ার-ভাটা আর মৌয়ালদের কথা। বাংলাদেশের দক্ষিণ অংশে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের বদ্বীপ এলাকায় অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম জোয়ারধৌত গরান বনভূমি। নানা ধরনের গাছপালার চমৎকার সমারোহ ও বিন্যাস এবং বন্যপ্রাণীর সমাবেশ এই বনভূমিকে করেছে আরও আকর্ষণীয়।

আজ থেকে প্রায় দুইশ বছর আগেও এই বনভূমি ছিল প্রায় ১৬,৭০০ বর্গ কিলোমিটার। বিশ্বের অধিকাংশ বনভূমির অবস্থা আজ অস্তিত্ব সংকটে। আমাজানের মত বিশাল বন যার সম্পর্কে স্থানীয়দের ধারণা ছিল যে, এটি কোনদিন সংকুচিত হবে না। সেই বনও আজ মানুষের লোভের কারণে আয়তন হারাচ্ছে। মানুষের লোভের শিকার ও প্রাকৃতিক কিছু কারণে আমাদের সুন্দরবনও আয়তন হারাচ্ছে।বর্তমানে নানা কারণে ছোট হতে হতে প্রকৃত আয়তনের এক তৃতীয়াংশে পৌঁছেছে। ভারতীয় উপমহাদেশ দুই ভাগে ভাগ হলে সুন্দরবনের দুই তৃতীয়াংশ বাংলাদেশের এবং বাকিটা ভারতের অংশে পড়েছে। ১৮৭৫ সালে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ বনভূমির প্রায় ৩২৪০০ হেক্টর এলাকা বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সুন্দরবনের নাম ঠিক কি কারণে সুন্দরবন হলো তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় না। তবে প্রচলিত এবং গ্রহণযোগ্য মত এই যে, এই বনের সুন্দরী বৃক্ষের নাম থেকেই এই নামকরণ করা হয়েছে। কারণ এই বনে প্রচুর সুন্দরী গাছ দেখতে পাওয়া যায়। গাছপালা, প্রাণীকুল, সরীসৃপ, উভচর প্রাণী, মাছ ইত্যাদি মিলিয়ে সুন্দরবন আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের এক বিশাল ভাণ্ডার। বনভূমির বৃক্ষরাজির মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ পশ্চিম এলাকার লবণাক্ত পানির গেওয়া, গরান, কেওড়া, পশুর, ধুন্দুল, বাইন ইত্যাদি। দক্ষিণ অংশের অধিকাংশ এলাকা পরিমিত লবণাক্ত পানির বনে ঢাকা, আর প্রধান উদ্ভিদ সুন্দরী। ঘনভাবে জন্মাতে দেখা যায় গোলপাতা। যার ছাউনি দিয়ে ঘর নির্মাণ করা যায়। পশুর, হরিণঘাটা এবং বুড়িশ্বর নদী দিয়ে প্রবাহিত প্রচুর স্বাদুপানি লবণাক্ততা কিছুটা হ্রাস করে পাশ্ববর্তী এলাকায় সহনীয় স্বাদুপানির বন এলাকা গড়ে তুলতে সহায়ক হয়েছে।

সুন্দরবনের প্রাণীকুলের কথা এলে প্রথমেই আসে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের কথা। তবে কেবল রয়েল বেঙ্গল টাইগারই নয় বরং আরও অনেক প্রাণীর আবাসস্থল এই সুন্দরবন। বনভূমিতে আছে প্রায় ৫০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী (উল্লেখযোগ্য চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, রেসাস বানর, বনবিড়াল, লিওপার্ড, সজারু, উদ এবং বন্য শুকুর), ৩২০ প্রজাতির আবাসিক ও পরিযায়ী পাখি (উল্লেখযোগ্য বক, সারস, কাঁদাখোচা, হাড়গিলা, লেনজা, গাংচিল, জলকবুতর, টার্ন, চিল, ঈগল, শকুনসহ দেশি প্রজাতির পাখি), প্রায় ৫০ প্রজাতির সরীসৃপ (গুইসাপ, কচ্ছপ ও নানা প্রজাতির সাপ),৮ প্রজাতির উভচর এবং প্রায় ৪০০ প্রজাতির মাছ। এ বিশাল বন ঘিরে বাংলাদেশের অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। এ অর্থনীতির প্রথমেই রয়েছে চিংড়ি। যা ‘সাদা সোনা’ নামে পরিচিত। প্রায় ২০ প্রজাতির চিংড়ির মধ্যে বাগদা চিংড়ি ও হরিণা চিংড়ি বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ চিংড়ি চাষ এবং বাণিজ্যের সঙ্গে বহু মানুষের কর্মসংস্থান জড়িয়ে রয়েছে। তাছাড়া সুন্দরবনকে ঘিরে একটি বিশলা অংশ মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত। এই মাছ ধরেই তাদের জীবন ও জীবিকা চলে। মাঝে মাঝে তারা বাঘের আক্রমণেরও শিকার হয়। তারপরও এই সুন্দরবনই তাদের বেঁচে থাকার অন্যতম উৎস।

অর্থনৈতিকভাবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পেশার নাম মৌয়াল যারা এ বনের মধু সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে। তারা বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে ফুলের মৌসুমে তিন-চার মাস বন থেকে মধু সংগ্রহ করে। এই মধু পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রির জন্য পাঠানো হয়। আমাদের দেশের জন্য এ বন আশীর্বাদস্বরুপ। বনের দিকে সতর্ক দৃষ্টি না রাখলে তা আমাদের জন্য অভিশাপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ নানা কারণে সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে চলেছে। চোরাকারবারীদের দৌরাত্ম্যে প্রতিনিয়তই সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এসব অবিবেচক, লোভী ও অসাধু মানুষের জন্য দেশের কোটি কোটি মানুষের হুমকি তৈরি হচ্ছে। একটি বন কেবল একটি বন নয়, তার সম্পর্ক থাকে সেই জাতির সঙ্গে। চোরাকারবারিরা এ বন থেকে কাঠ কেটে পাচার করছে। শিকারীদের লোভের শিকার হচ্ছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, শুকুরসহ নানা প্রাণী। এতে বনের খাদ্যশৃঙ্খলের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পরছে। বাঘ খাদ্যের খোঁজে লোকালয়ে প্রবেশ করে মানুষের হাতে মারা যাচ্ছে। অথচ এই বাঘের সংখ্যা কমতে কমতে আজ তা অস্তিত্ব হারানোর পথে।

প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সুন্দরবন গুরুত্বপূর্ণ। বড় বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকাতে গেলে বনায়ন বৃদ্ধি করতে হবে। এমনিতেই আমাদের দেশে প্রয়োজনীয় বনভূমি নেই। কোন দেশের জন্য শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা আবশ্যক। আমাদের তা নেই। যেটুকু আছে তাও যদি আমরা ধ্বংস করে ফেলি তাহলে তা হবে নিজের পায়ে কুড়াল মারা। পর্যটন শিল্পেও এ বন গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর প্রচুর দেশি-বিদেশি পর্যটক বন দেখতে যায়। সেক্ষেত্রে এটি আমাদের অর্থনীতিতে সরাসরি ভূমিকা রেখে চলেছে। সুন্দরবন রক্ষায় সরকারি মহলকে আরও কঠোর ভূমিকায় অবর্তীণ হতে হবে। সুন্দরবনের আশপাশে যারা বসবাস করে মূলত তারা এ বনের ওপর তাদের জীবন জীবিকা নির্ভর করে বেঁচে থাকে। তাদের যদি বিকল্প আয়ের পথ গড়ে তোলা যায় তাহলে তারা বনের ক্ষতিসাধন করবে না। সুন্দরবনের ভেতর অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে হবে। বনের সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল এবং সরঞ্জামাদি সরবরাহ করতে হবে। কারণ উদ্ভিদ এবং প্রাণী পাচারকারীরা শক্তিশালী এবং চতুর। তাই তাদের মোকাবেলা করার জন্য দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে। আজ সুন্দরবন দিবসে এই হোক অঙ্গীকার।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯/তারা

   
 


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

‘অন্যায়ের সঙ্গে আপোস নয়’

২০১৯-০৩-১৯ ১০:৩০:১৬ পিএম