কেন চকবাজার ট্র্যাজেডি?

প্রকাশ: ২০১৯-০২-২৩ ৩:০১:৩৯ পিএম
অলোক আচার্য | রাইজিংবিডি.কম

অলোক আচার্য : একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে আমরা যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে তখন পুরান ঢাকার চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দেশজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। দেশের মানুষ ঘটনার বিস্তারিত জানতে চোখ রেখেছিলেন টেলিভিশনের পর্দায়। একের পর এক আহত, নিহত মানুষের মৃতদেহ, স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছিল। কত মানুষের স্বপ্ন নিমেষেই ছাই হয়ে গেল! এক স্বামী সন্তানসম্ভবা স্ত্রী নামতে পারেননি বলে স্ত্রীকে ফেলে নিজে বাঁচার জন্য নেমে আসেননি। আগুনে পুড়েছেন। আহা! তাদের সন্তান, তাদের এই ভালোবাসা সব পুড়ে গেল নিমেষেই। এই বেদনা ভার আমাদের অনেকদিন বইতে হবে।

দিনের আলো বাড়ার সাথে সাথে আগুন নিভে যেতে থাকে। সেইসঙ্গে নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে পুড়ে যাওয়া স্বপ্নের সংখ্যা। নিমতলীর পর চকবাজার। দুই এলাকার দুরত্ব খুব বেশি নয়। আগুনের সূত্রপাত গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে। আগুন দ্রুতগতিতে বিস্তার লাভ করেছিল কেমিক্যালের কারণে। নিমতলীতেও ভয়াবহ আগুনের পেছনে এই কেমিক্যাল ছিল। আমাদের দেশে প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ডে অনেক মানুষ নিহত ও আহত হন। নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জন মারা যাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি ওই স্থান থেকে রাসায়নিক গুদাম সরানোসহ ১৭টি সুপারিশ করেছিল। তারপর বহু বছর পার হয়ে গেছে। রাসায়নিক গুদাম যেভাবে ছিল সেভাবেই রয়ে গেছে। তারপর আবার এই চকবাজার ট্রাজেডি। এবারও তদন্ত কমিটি হয়েছে। সেই সুপারিশ এবং তা বাস্তবায়নের কথা ঘুরেফিরে আসছে। কারণ সুপারিশ যদি বাস্তবায়িত না হয় তাহলে সেই সুপারিশে মানুষের লাভ কোথায়?

কোনো ঘটনা থেকে কেবল শিক্ষা নিয়ে বসে থাকলেই পরবর্তী ঘটনা আটকানো যায় না। ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে তা যেন আর না ঘটে বা ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাই আসল কাজ। নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের পর চকবাজারের অগ্নিকাণ্ড আমাদের নতুন করে শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি পুরনো অবহেলা মনে করিয়ে দিলো। কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কি পরিণাম হতে পারে চকবাজারের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। এখানে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাতের উৎস হিসেবে মতভেদ শোনা গেলেও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কথা বেশ জোরের সঙ্গে শোনা যাচ্ছে। এই গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মৃত্যুর ঘটনা আমাদের দেশে একেবারেই কমন। যানবাহনের মেয়াদ উত্তীর্ণ সিলিন্ডার নিয়ে ঘুরে বেড়ানো খুব সাধারণ একটি ঘটনা। বলা হয় মেয়াদউত্তীর্ণ একটি সিলিন্ডার একটি বোমার মতো। চলন্ত গাড়িতে এরকম বোমা নিয়ে দেশের অনেক স্থানেই ঘুরে বেরাচ্ছি আমরা। যে কোনো সময় আমি বা আপনি যে গাড়িতে চড়ে বসে আছি নিশ্চিন্তে গন্তব্যে যাবার জন্য, হয়তো সেটিতেই কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যাবে। এরকম বহু ঘটেছে আমাদের দেশে। এই বিষয়টি নিয়ে বহু কথা উঠেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এই না হওয়াতেই আমাদের যত অপারগতা। গাড়িতে মেয়াদউত্তীর্ণ সিলিন্ডার আছে কি না তা সাধারণ যাত্রীর জানার কথা নয়। কিন্তু যাদের জানার কথা তারা সেটা জানছে না কেন?

জনগণের জীবন নিয়ে যারা ছেলেখেলা করে তাদের বিরুদ্ধে জোরদার পদক্ষেপ কেন নেওয়া হয় না? দুর্ঘটনা ঘটার পর অনেক কিছু করার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার চেয়ে আগেভাগে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে সেই দিনটা হয়তো আর দেখতে হয় না। গাড়িতে মেয়ায়উত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার বহনের পাশাপাশি বাড়িতেও কিন্তু এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে বহু অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে এবং ফলশ্রুতিতে ঘটছে মৃত্যুর ঘটনা। এই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। আমাদের চোখের সামনেই যে কোনো দোকানে গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি করতে দেখা যায়। অথচ আইন অনুযায়ী এই গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির জন্য অনুমতির প্রয়োজন এবং সব ধরনের দোকানে বা যত্রতত্র বিক্রি করা যায় না। আবার এই সিলিন্ডারগুলোর মেয়াদ কতটা সতকর্তার সাথে নির্ণয় করা হয় তাই বা কতজন ব্যবহারকারী জানে? চকবাজারে আগুন দ্রুত ছড়ানো এবং ভয়াবহতার পেছনে কেমিক্যালের প্রভাব রয়েছে। যে স্থাপনায় মূলত আগুন লেগেছে সেখানকার বেসমেন্টে প্রচুর কেমিক্যালের ড্রামের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। প্রশ্ন হলো একটি রাসায়নিক পল্লী তৈরির কাজ আর কতদূর? অথচ এরকম একটা ঘিঞ্জি স্থানে কেমিক্যাল ব্যবসা ঝুঁকিপূর্ণ। নিমতলীর মত একটি ভয়াবহ ট্রাজেডি ঘটার পর খুব দ্রুত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি আলাদা স্থানে কেমিক্যাল কারখানা সরিয়ে নেওয়ার কথা ছিল। এরকম বহু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ আমাদের চোখের সামনেই হয় এবং কিছুই হবে না ভেবে মেনেও নেই। তবে দুর্ঘটনা ঘটার পর আর করার কিছুই থাকে না। নিমতলী ট্র্যাজিডিও দেখতে দেখতে আট বছর পেরিয়ে গেছে।

পুরান ঢাকার রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম সরিয়ে নিতে ‘বিসিক কেমিক্যাল পল্লি’ নামের ২০২ কোটি টাকার একটি অনুমোদিত প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্প্রতি কাজ শুরু করেছে বিসিক। আগুনের ভয়াবহ বিস্তারের পেছনে যে কেমিক্যাল দায়ী যদি তা সরিয়ে নেওয়া যায় তাহলে ভবিষ্যতে হয়তো আর কোনো নিমতলী বা চকবাজারের মত হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হতে হবে না দেশবাসীকে। এসব ঘটনার পাশাপাশি আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসকে বেগ পেতে হয়েছে আরো কয়েকটি কারণে। তার কয়েকটি হলো ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির প্রবেশমুখ সরু, ঘটনাস্থল থেকে পানির উৎসের দুরুত্ব। যে কোনো স্থানেই অগ্নিকাণ্ডের মত দুর্ঘটনা ঘটার পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যাতে সহজেই আগুন নেভানোর কাজটি করতে পারে সেজন্য পরিকল্পিত উপায়ে বাড়িঘর তৈরি করতে হবে। এর আগেও জলাশয়ের অভাবে আগুন নেভানোর কাজ তরান্বিত করা যায়নি। অথচ ঢাকা শহরের এমন অবস্থা যে হাতে গোণা কয়েকটি জলাশয় অবশিষ্ট আছে। দখলের কবলে সব জলাশয়। বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট মহলের গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। অতীত থেকে শিক্ষা নেয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। না হলে নিমতলী বা চকবাজারের মত দুর্ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯/সাইফ/তারা

     


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

রঙ বাংলাদেশের ঈদ পোশাক

২০১৯-০৫-১৯ ৯:৫৭:২৯ পিএম

১৪তম রোজার সাহরি ও ইফতার সময়

২০১৯-০৫-১৯ ৮:৪৮:৩৩ পিএম

বিএএসএর ইফতার মাহফিলে স্পিকার

২০১৯-০৫-১৯ ৮:৪৪:৫৫ পিএম