চুড়িহাট্টার শোকগাথা

প্রকাশ: ২০১৯-০২-২৬ ৪:১৬:০৮ পিএম
জাফর সোহেল | রাইজিংবিডি.কম

জাফর সোহেল: ঢাকা মেডিকেলের মর্গে একটা নিথর হাত। সে হাতে আছে একটি ঘড়ি। ঘড়িটি থেমে আছে মনে হলো। থেমে থাকা সে ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ১২টা বেজে ২০ মিনিটি। চকবাজারের চুড়িহাট্টায় এই ঘড়ির কাঁটা শেষবার ঘুরেছে; বুঝতে কষ্ট হয় না। কারণ, ঘড়ির আশপাশে হাতের আঙুল, কবজি, তালু- সব  পোড়া দাগে ভরা! পুড়ে পুড়ে মানুষ মরেছে চুড়িহাট্টায়, মরেছে বুঝি ঘড়িও! ঘড়িটারও তো প্রাণ ছিল- টিক টিক টিক। সে কথা বলত, সময় বলত, ঘুম থেকে ওঠাতো, অফিসে নিয়ে যেত, কত কথা মনে করিয়ে দিতো- অনেক কাজ ছিল তার! এখন আর সে কিছুই করবে না। সে কি তবে সহমরণে গেল? মালিক মরে যাচ্ছে দেখে, পুড়ে যাচ্ছে দেখে তারও কি মরণের সাধ জাগল?

কে জানে, তবে কেউ কেউ যে সত্যিকার অর্থেই চুড়িহাট্টায় অনেকটা সহমরণের পথে হেঁটেছেন, সে কথাও শোনা যাচ্ছে। ছোট্ট ভাতিজার জীবন রক্ষায় দুই ভাই দুদিক থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলেন, চেপে ধরেছিলেন যাতে আগুনের আঁচ না লাগে। মৃত্যু তো কেউ কামনা করে না, তবুও ঐ দুই ভাই কী চিন্তা করেছিলেন তখন? নিশ্চয়ই ভেবেছিলেন একসময় আগুন নিভে যাবে, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাদের উদ্ধার করবে, নিজেদের পিঠ পোড়া যায় যাক, ভাতিজার যেন এতটুকুও কষ্ট না হয়, এতটুকু আগুনে যেন সে না পোড়ে! কিন্তু নিয়তি নির্মম আর কী যে নিষ্ঠুর তা তো আর তারা জানতেন না। ওয়াহেদ ম্যানশনের পাশের দোকান থেকে দমকল কর্মীরা তুলে আনেন দুটি অঙ্গার দেহ, একটির সঙ্গে আরেকটি লেগে রয়েছে আঠার মতো। সবাই ভেবেছিলেন, দুই ভাই বুঝি শেষ যাত্রায় একত্রে যেতে চেয়েছেন। কিন্তু না, দুজনকে আলাদা করলে বেরিয়ে আসে নতুন গল্প; দুজনের মধ্যখানে নিরাপদেই পুড়ে গেছে আরেকটি জীবন- তাদের অতি আদরের ছোট্ট ভাতিজা!

চুড়িহাট্টার মোড় নাকি ছিল নিজেই একটা আড্ডা। আশপাশের সব মানুষের দেখা করবার জায়গা, লেনদেনের জায়গা, একটু নাশতা করে আসার জায়গা, কাজ শেষে একটু নিঃশ্বাস নেয়ার জায়গা, দু’ দণ্ড গল্প করার জায়গা ছিল পাঁচমুখি এই মোড়। মোড়ের জীবনে যা ঘটেনি, তাই ঘটে যায় ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখ। অনেক মানুষের, অনেক জীবনের, অনেক ঘটনার আড্ডাখানা পরিণত হয় আস্ত নরকে। মোড়ের সংযোগ গলিগুলোতে ছুটে যেতে থাকে আগুনের নদী! এই তীব্র অগ্নি স্ফুলিঙ্গ মুহূর্তেই ধ্বংস করে দেয় সব আড্ডা, সব গল্প, সব লেনদেন! পুড়ে যায় রিকশা, পুড়ে যায় রিকশার যাত্রী; পুড়ে যায় পথিক, পুড়ে যায় পথ। এমনতর  পোড়া যে, অনেকের কোনো চিহ্নই আর থাকে না। চিহ্নের অভাবে গ্রাম থেকে ছুটে আসা এক মা কুড়িয়ে নিয়ে যান ক’টি কঙ্কাল; মাটি চাপা দিয়ে তাই তিনি রাখবেন নিজের কাছে!

ঢাকা মেডিকেলের মর্গ আর আশপাশের বাতাসে অনেক কান্না এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে কেবল এমন কিছুর সন্ধানে, যা দিয়ে স্বজন চিনে নেবে স্বজনকে, ভাই চিনে নেবে ভাইকে। ৬৭টি পুড়ে যাওয়া দেহের অনেকগুলোতেই কোনো চিহ্ন নেই, ঘড়ি নেই, মালা নেই, অষ্টধাতুর আংটি নেই- কিছুই নেই। ৪ বছরের সানিন নমুনা দেয় ডিএনএ টেস্টের জন্য, তার মাকে পাওয়ার জন্য। তার কাছে মা হারিয়ে গেছে, এখানে এই নগরের ভিড়ে। ডিএনএ টেস্ট জমা দিলেই সে ফিরে পাবে মা, ওষুধ কিনতে চুড়িহাট্টার মোড়ে গিয়ে যে হারিয়ে গিয়েছে। মাকে খোঁজার জন্যে এসে সানিন আর কোনমতেই বাসায় যেতে চায় না, একা বাসায় গিয়ে সে কী করবে? মাকে সঙ্গে নিয়ে তবেই যাবে সে! সে যে আর কোনদিনই ফিরবে না, ছোট্ট সানিন তা বুঝতে পারে না; প্রাণহীন ঢাকায় সে খুঁজে বেড়ায় মাকে। নিশ্চয়ই মা তার ফিরে আসবে; ওষুধ নিয়ে, চকলেট নিয়ে, ললিপপ নিয়ে; মা কি তাকে ছাড়া থাকতে পারে? সানিন যখন কথা বলে, চারপাশ শুধু কাঁদে। সে কান্না এমনই ছোঁয়াচে, যারা কান্নার কথা জানতে যায়, তারাও কাঁদে!   

নিঃশ্বাস কেবল বড় হয়; যখন মানুষের হারানোর গল্প বড় হয়, করুণ হয়। এইসব গল্প, এইসব হারিয়ে যাওয়া কেবলই পোড়ায়; আগুনে পোড়ে দেহ আর তার গল্পে পোড়ে হৃদয়। পুরান ঢাকা ক’দিন ধরে কেবলই পোড়াচ্ছে। মানুষ পোড়ালো আগুনে আর পোড়া মানুষের জীবনের গল্প দিয়ে পোড়াচ্ছে অপরাপর মানুষের হৃদয়। বাতাসে এখন কেবল দেহ নয়, হৃদয় পোড়া মানুষের কান্নাও ভাসছে। অচেনা মানুষ কাঁদছে অজানা মানুষের জন্য। এ যেন এক কান্নার শহর। স্বজন হারানো মানুষ শোক মোছেন একে অন্যের বুকে। তবু শোক তো আর শেষ হতে চায় না। উপরওয়ালার কাছেও যখন চান প্রিয়জনের আত্মার শান্তি, তখনো ভিজে যায় চোখ, ভেতরের জমাট বাষ্প জল হয়ে বের হয় স্রোতের মতো। ঢাকা মেডিকেলের মর্গের পাশের কিছু ছবি আসে গণমাধ্যমে। কান্নার কত রঙ থাকতে পারে তার যেন একটা নিষ্ঠুর প্রদর্শনী! মুঠোফোনের এপারে যেমন কান্না, বোঝা যায় ওপারেও নেমেছে কান্নার রোল। ভাই কাঁদছে ভাইয়ের জন্য, বোন বোনের জন্য; বাবা ছেলের জন্য, ছেলে বাবার জন্য।

চকবাজারের পোড়া বাতাসে কেবল হারানোর গল্প। একেকটি গল্প একেকটি দীর্ঘ শ্বাসের উপলক্ষ। যেমন, পাওয়া গেল নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার চার বন্ধুর গল্প। দুঃসহ আগুন পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে, চার বন্ধুর প্রিয় আড্ডা। কফি হাউজের আড্ডার চেয়ে হায়দার মেডিকোর এই আড্ডা কোনো অংশেই কম ছিল না। যার যার কাজ আর ব্যবসা গুটিয়ে বন্ধুরা আসতেন চুড়িহাট্টা মোড়ের হায়দার মেডিকো ফার্মেসিতে। চার বন্ধুর একজন ছিলেন মঞ্জু, তিনিই চালাতেন হায়দার মেডিকো। তার কাছে আসতেন আনোয়ার, হিরা আর নাসির। আনোয়ার প্লাস্টিক, হিরা ইমিটেশন আর নাসির আসবাবের ব্যবসা করতেন। ব্যবসার হিসাব চুকিয়ে রাত ১০টার দিকে সবাই আসতেন আড্ডায়। আড্ডা শেষে প্রতিদিন সবাই ঘরে ফিরতেন, কিন্তু বুধবার আর তা হলো না। আগুন লাগার পর জীবন বাঁচাতে ফার্মেসির দরজা টেনে দেন কোনো এক বন্ধু। কিন্তু উপরওয়ালা যে লিখে রেখেছেন, জীবনের শেষ আড্ডা তাদের সেদিনই! এই অমোঘ লিখন খেণ্ডাবে কে? চারজনই আড্ডা চালিয়ে যান জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত, পুড়ে পুড়ে, ক্ষয়ে ক্ষয়ে; আগুন নিভলে পাওয়া যায় চার বন্ধুর চারটি খুলি; জীবন তো আর বাঁচে না, বাঁচে না তাদের আড্ডাও। ক্ষণস্থায়ী আড্ডাকে চিরস্থায়ী করে চারজনই ঠাঁই নেন আকাশের কোলে। এখন থেকে আড্ডা হবে সেখানেই; তারাদের সাথে, নক্ষত্রের সাথে। 

নোয়াখালীরই আরেক উদ্যমী তরুণের কথা জানা যায়। তিনি ছিলেন মাসুদ রানা। ছিলেন ধর্মের প্রতি অনুগত। ফেসবুক প্রোফাইল বলছে, চুড়িহাট্টার মোড়ে তার ছিল টেলিকমের দোকান। কদিন আগেই পোস্ট দিয়েছিলেন, মৃত্যুর অমোঘ সত্য নিয়ে: ‘সব প্রাণিই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিবে!’ কে জানত, সত্যটা এত তাড়াতাড়ি ধরা দেবে তার নিজের কাছেই! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য বিবিএ শেষ করা পটুয়াখালীর এনামুল হক অভির স্বপ্ন ছিল বিসিএস ক্যাডার হয়ে পরিবারের হাল ধরবে, সেবা করবে দেশের। আগুনের লেলিহান শিখায় তার স্বপ্নগুলো উড়ে গেছে ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলায় থাকা পারফিউমের ক্যানগুলোর মতোই। কথা ছিল, শীঘ্রই বাড়ি ফিরবেন অভি, সে অপেক্ষায় বসে ছিলেন বাবা। অপেক্ষাটা বুঝি আর কোনদিন ফুরোবে না! কুমিল্লার হোমনার কাউছারের গল্পটা আরও বেশি ভারী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পাশাপাশি পরিবারের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন জীবন সংগ্রামে। চুড়িহাট্টার মোড়ে তারও ছিল একটি ওষুধের দোকান আর ডেন্টাল ফার্মেসি। কাউছারের আছে দুই জমজ শিশু। এই অসহায় পরিবারের সহায় এখন কে হবে? জীবন সংগ্রামে জিতে চললেও কাউছার যে হেরে গেলেন আগুনের ভয়াবহতায়। 

দুই বান্ধবী দোলা আর বৃষ্টি। তাদের কোনো খোঁজ এখনো দিতে পারেনি বাংলাদেশ। একুশের অনুষ্ঠানে কুবতা আবৃত্তি করে ঘরে ফিরছিলেন দু’জন। বাহন ছিল রিকশা। মুঠোফোনের ট্র্যাকিং বলছে রাত দশটার পরে দুই বান্ধবীর অবস্থান ছিল চুড়িহাট্টার আশপাশেই! তবে কি তারাও পুড়েছেন সর্বনাশা এই আগুনে; পুড়ে পুড়ে কি তারা ছাই হয়ে গেছেন? শোকার্ত মায়েদের কান্নাও যে শেষ হয়ে গেছে, ফুরিয়ে গেছে গ্রীষ্মের তিস্তার মতো! পুড়ে যাওয়া প্রাণগুলো আর কখনোই ফিরবে না, গল্পগুলোও একসময় হারাবে আবেদন। কিন্তু এই মানুষগুলো, এই গল্পগুলো ফেরাবে কি আমাদের বোধ- আগুনে পোড়া বাতাসে আজ এই একটিই প্রশ্ন।

লেখক: সাংবাদিক




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯/তারা

   
 


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

‘অন্যায়ের সঙ্গে আপোস নয়’

২০১৯-০৩-১৯ ১০:৩০:১৬ পিএম