বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা ও জননিরাপত্তা

প্রকাশ: ২০১৯-০৩-০৪ ৭:১৫:২৪ পিএম
মাছুম বিল্লাহ | রাইজিংবিডি.কম

মাছুম বিল্লাহ : পুরনো ঢাকার চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডে শোকের মাতম শেষ হতে না হতেই গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ঘটল আরেকটি ঘটনা। ঢাকা থেকে দুবাইগামী বাংলাদেশ বিমানের ময়ূরপঙ্খী এয়ারক্রাফট ছিনতাইয়ের চেষ্টা; বিমানটির শাহ আমানত বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ এবং ছিনতাইকারীকে হত্যার মাধ্যমে ঘটনার অবসান। বিষয়টি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি কেড়েছিল, দেশের মিডিয়াগুলোও ছিল সরব, সব সোশাল মিডিয়াও তথ্য ও প্রশ্নবাণে ছিল জর্জরিত। বিমান ছিনতাই সাধারণত উন্নত বিশ্বের ঘটনা। অথচ তা ঘটানোর চেষ্টা করা হলো আমাদের দেশে এবং আমাদের দেশেরই এক তরুণ দ্বারা! এই প্রচষ্টা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কমান্ডোরা বিমানের ভেতর প্রবেশ করে ঝটিকা আক্রমণ করে ছিনতাইকারীকে পরাস্ত করতে না পারলে কী ঘটত বলা যায় না। একপর্যায়ে কমান্ডো অভিযানে গুলির আঘাতে ছিনতাইকারী আহত হন এবং পরে মারা যান। বিমানটি ১৪৮জন যাত্রী ও সাতজন ক্র বহন করছিল। ঢাকা থেকে বিমান ছাড়ার পনের মিনিট পরেই অস্ত্রের মুখে পাইলটকে জিম্মি করে ছিনতাইকারী পলাশ। তাৎক্ষণিকভাবে এ ঘটনায় কিছু গুজব ছড়িয়ে পড়লেও পরবর্তী সময়ে মিডিয়ার মাধ্যমে দেশবাসী প্রকৃত সত্য জেনেছেন। তবে পাইলট বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার এক পর্যায়ে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে জুরুরি অবতরণ করেন। নিরপত্তা বাহিনীর চৌকস দল মাত্র আট মিনিটের মধ্যে সফল অভিযান পরিচালনা করে দেশবাসীর মধ্যে স্বস্তি এনে দেয়।

আমাদের সেনাবাহিনী পৃথিবীর বহু দেশে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে যুদ্ধ বিধ্বস্ত ও বিপজ্জনক এলাকায় জাতিসংঘের শান্তি মিশনে কাজ করে গোটা পৃথিবীতে সুনাম কুড়িয়েছেন। তারা দেশের বহু ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে কাজ করেও অনেক সমস্যার সমাধান করেছেন। এজন্য আমরা তাদের ধন্যবাদ জানাই। বিমান ছিনতাই রোধ করে সকল যাত্রী, পাইলট ও ক্রুদের নিরাপদে অবতরণ করাতে পেরেছেন আমাদের কমান্ডো বাহিনী। তাদের সকলের কর্ম অত্যন্ত প্রশংসনীয়। পাইলট কৌশলে বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ছিনতাই চেষ্টার খবরটি পৌঁছে দিতে পেরেছেন এটিও সফলতা।  ফলে শাহ আমানত বিমানবন্দরে বিমানটি অবতরণের পূর্বেই নিরাপত্তা বাহিনী কমান্ডো অভিযানের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার সময় পায়।

আমরা যারা ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে কিংবা বিদেশে যাতায়াত করি তাদের নিশ্চয়ই অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি দুটো ঘটনার উল্লেখ করছি এখানে। একবার কনফারেন্সে মালয়েশিয়া যাচ্ছিলাম। প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে গাড়ি রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল প্রায় দুই ঘণ্টা। যখন বিমানবন্দরে পৌঁছলাম তখনও বোর্ডিং কার্ড নেয়ার লাইন আছে। লাইনে হঠাৎ করে যখন আমার টার্ন আসল, বলা হলো একটু পরে। আমি বললাম আমার সকালে কনফারেন্স, সেখানে পেপার  প্রেজেন্ট করব। তখন বোর্ডিং কার্ড দিলো কিন্তু ইমিগ্রেশন পুলিশ আমাকে ঢুকতে দেবে না। অনেক অনুরোধ করলাম, কিন্তু তারা ঢুকতে দিলোই না। আমি বললাম, আমি একজন শিক্ষক। তাতেও কাজ হলো না। এ ঘটনায় আমাকে অত্যন্ত বিব্রত হতে হয়েছিল। অথচ নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে কীভাবে একজন যাত্রী খেলনা পিস্তল নিয়ে বিমানে উঠে গেল! পত্রিকা পড়ে জানলাম পলাশ ১৯৯০ সালে কাজের উদ্দেশ্যে ইরাক চলে যান। সেখানে চার বছর থাকার পর দেশে ফিরে এসে আবার সৌদি আরব চলে যান। তিনি তাহেরপুর মাদ্রাসার ছাত্র। সোনারগাঁও ডিগ্রী কলেজে অধ্যয়নকালে ঢাকা চলে আসেন এবং তারপর থেকে তার আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। এটি তার সঙ্গে জঙ্গি গোষ্ঠীর জড়িত থাকা নিয়ে সন্দেহের উদ্রেক করে। 

আরেকবার অফিসিয়াল কাজে আফ্রিকার কেনিয়া ও  সিয়েরালিয়ন যাব। কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবি। মহিলা ইমিগ্রেশন পুলিশ বারবার বলছেন নাইরোবির দেশে আপনি কেন যাবেন? আমরা তিন সহকর্মী। তিনি সময়ক্ষেপণ করছিলেন। অযথা ধীরে ধীরে কি যেন পড়ছেন, চেক করছেন আবার আস্তে আস্তে বলছেন- আপনারা ওখানে যাবেন কেন? স্পষ্ট লেখা আছে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির কাজে সেখানে যাচ্ছি, অফিসিয়াল ডকুমেন্টস আছে। তারপরও প্রশ্ন- ব্র্যাক সেখানে কী করে, কেন করে ইত্যদি? ওদিকে বিমানে বিলম্ব হয়ে যাচ্ছে। লাইনের অন্য যাত্রীরাও দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বিরক্ত হয়ে গেছেন। পরে অন্য এক পুলিশ এসে তাড়াতাড়ি আমাদের লাইন ভাগ করে আরও দুটি লাইনে ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেন এবং ঐ মহিলা পুলিশকে বললেন- ব্র্যাক পৃথিবীর বহু দেশে শিক্ষা নিয়ে কাজ করে, আপনি জানেন না? তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেন। তারপরও তিনি  পিঁপড়ার গতিতে কাজ করছিলেন। কী ধরনের এবং কত দক্ষ পুলিশ সেখানে দেয়া উচিত সেটি আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। সাধারণ মানুষের এ ধরনের বহু অভিযোগ আছে কিন্তু কাকে তারা এগুলো জানাবে? জানানোর তো কোন জায়গা নেই।

আমাদের স্মরণ থাকার কথা যে, ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরপত্তার প্রশ্নে মাত্র দু’বছর আগে  কথা বলেছিল যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র সরকার। যুক্তরাজ্য ঢাকা থেকে সরাসরি কার্গো বিমান চলাচল বন্ধ রেখেছিল। এক পর্যায়ে ব্রিটিশ কোম্পানিকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তারা দায়িত্ব পালন শেষে বিদায় নিয়েছে। এখানে আর একটি কথা বলা প্রয়োজন। আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক উন্নত বিশ্বে মাঝে মাঝে পানশালায় কিংবা স্কুলে হঠাৎ গুলি করে মানুষ মারার ঘটনার কথা শুনি। এটা শুনে আমাদের কর্তাব্যক্তিরা বলেন, উন্নত বিশ্বও তাদের জনগণের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেখানে আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ঐসব দেশে নাগরিকদের রাষ্ট্র প্রভূত সম্মান করে। সেখানে মানুষ অবাধে চলাফেরা করতে পারে। কারো অযথা হেনস্থা হওয়ার আশঙ্কা নেই। আমি নিজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাসায় পাসপোর্ট রেখে এক স্টেট থেকে আরেক স্টেটে ঘুরে বেড়িয়েছি। কোনদিন কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেনি। আমি প্রথম প্রথম পাসপোর্ট সাথে নিতে চেয়েছিলাম কিন্তু আমাকে বলা হলো- এখানে নিরাপত্তা বাহিনী তোমাকে যেখানে সেখানে ধরবে না এবং কিছু  জিজ্ঞেস করবে না। তাই আমি পরীক্ষা করার জন্য পাসপোর্ট সাথে নিয়ে যাইনি। দেখলাম আসলেই কেউ কেখনও কোথাও কিছুই জিজ্ঞেস করেনি। আমাদের দেশের মতো রাস্তাঘাটে কোনো পুলিশও নেই। পুলিশের গাড়ি দেখা যায় কেউ যদি ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে তখন। আর একটি বিষয় আমাদের অবশ্যই অবাক করবে। সেটি হচ্ছে নাগরিকদের যাত্রী অধিকার। কোন ট্যাক্সিতে যখন আপনি উঠবেন আপনাকে কখনও জিজ্ঞেস করবে না- কোথায় যাবেন? ভাড়া নিয়ে কথা তো দূরের কথা। যাত্রী গাড়িতে ওঠার পরে বলবে সে কোথায় যাবে। আর আমাদের দেশে দশটি, বিশটি সিএনজিকে বলেও আপনার গন্তব্যে কাউকে নিতে পারবেন না। এখন অবশ্য উবার ও পাঠাও সেবার কারণে যাত্রী তথা নাগরিকদের কিছুটা সুবিধা হয়েছে। মনে রাখতে হবে, এগুলো সবই বেসরকারি পর্যায়ে পরিচালিত। উন্নত বিশ্বে নাগরিকদের দেয়া উদার সুবিধাসমূহ অপরাধীরা কাজে লাগায়। সেখানে আমাদের আত্মতৃপ্তির কিছু নেই। আমাদের দেশে একজন সাধারণ মানুষ একটি ব্যাগ নিয়ে রাস্তায় বের হলে তার মনে অনেক শঙ্কা কাজ করে। পথে তাকে হয়রানির শিকার হতে হবে না তার গ্যারান্টি নেই। তাই বলছি, বিমান ছিনতাই চেষ্টা কর্তৃপক্ষের জন্য ‘ওয়েক আপ’ কল। আশাকরি তারা জনগণের প্রকৃত নিরাপত্তার কথা ভেবে যথার্থ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৪ মার্চ ২০১৯/তারা

     


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

রঙ বাংলাদেশের ঈদ পোশাক

২০১৯-০৫-১৯ ৯:৫৭:২৯ পিএম

১৪তম রোজার সাহরি ও ইফতার সময়

২০১৯-০৫-১৯ ৮:৪৮:৩৩ পিএম

বিএএসএর ইফতার মাহফিলে স্পিকার

২০১৯-০৫-১৯ ৮:৪৪:৫৫ পিএম