পলান সরকারের প্রয়াণ ও গুণীর সম্মান-অসম্মান

প্রকাশ: ২০১৯-০৩-০৫ ৪:৩৬:০৭ পিএম
দীপংকর গৌতম | রাইজিংবিডি.কম

দীপংকর গৌতম: পলান সরকার। একনামে যিনি দেশজুড়ে পরিচিত। আলোর এই পথযাত্রী’র মূল  কাজ ছিলো বই বিলানো।  মানুষ বই পড়ে ঋদ্ধ হোক, আলোকিত হোক এটা তিনি খুব করে চাইতেন। তার এই চাওয়া একদিনের নয়; পুরো ত্রিশ বছরের। মানে এই ত্রিশ বছর নিজের গাঁটের টাকা খরচ করে বই বিতরণ না করে পুকুর কাটলে কমপক্ষে পনেরোটা পুকুর কাটতে পারতেন। কিন্তু আলোর ফেরিওয়ালারা বৈষয়িক হন না। জ্ঞানের শিখা ছড়িয়ে দিতে তিনি ঘুরতেন দ্বারে দ্বারে। পলান সরকারের বই বিতরণ নিয়ে আমরা দুটি বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করতে পারি। একটা হলো আগুন, আরেকটা আলো। তিনি আগুন জ্বালতে চাননি। আলো ছড়াতে চেয়েছিলেন। নিজের খেয়ে যারা বনের মোষ তাড়ান, তিনি ছিলেন সেই দলের। সমাজের ভেতরে জমা নিকষ কালো তিনি বিদায় করতে চেয়েছিলেন। আমৃত্যু তিনি সেই লক্ষ্যে কাজ করেছেন। এবং এর মাধ্যমে দেশজুড়ে তিনি জ্ঞানের আলো বিতরণের পথিকৃৎ হয়ে উঠেছিলেন।

‘পলান সরকার’ মায়ের দেয়া নাম। তার পারিবারিক নাম হারেজ উদ্দিন। কিন্তু জন্মের পর থেকেই মা ‘পলান’ নামে ডাকতেন। এক সময় তার পারিবারিক বিত্তবৈভব ছিলো। তার নানা ময়েন উদ্দিন সরকার ছিলেন স্থানীয় ছোট জমিদার। যৌবনে পলান সরকার নানার জমিদারির খাজনা আদায় করতেন। দেশ বিভাগের পর জমিদারি ব্যবস্থা বিলুপ্ত হলে ১৯৬২ সালে বাউসা ইউনিয়নে কর আদায়কারীর চাকরি পান। নানার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ৪০ বিঘা সম্পত্তির মালিকও হন তিনি। সম্পত্তি বলতে এটুকুই। কিন্তু ঘরে বসে খেয়ে তার বাঁচতে ইচ্ছা করেনি। ব্রিটিশ আমলেই তিনি যাত্রাদলে যোগ দিয়েছিলেন। ভাঁড়ের চরিত্রে অভিনয় করতেন। পাশাপাশি যাত্রার পাণ্ডুলিপি হাতে লিখে কপি করতেন। অন্যদিকে মঞ্চের পেছন থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সংলাপ বলে দিতেন। এর মধ্য দিয়ে তার বই পড়ার নেশা হয়। প্রথম দিকে যাত্রার বই-ই পড়তেন। তারপর বিভিন্ন বই পড়ার দিকে চোখ যায়। বই পড়ার মধ্য দিয়ে একটি প্রাগ্রসর সমাজ গঠন সম্ভব এই ভাবনা তার মাথায় এলেও কীভাবে কাজ শুরু করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। ‘বইপাগল’ মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে বাউসা হারুন অর রসিদ শাহ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সাথে যুক্ত ছিলেন। পরে চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এখান থেকেই তার বইপড়া আন্দোলনের সূত্রপাত। প্রতিবছর স্কুলের ছাত্রছাত্রী যারা ১ থেকে ১০-এর মধ্যে মেধাতালিকায় স্থান পেত, তাদের তিনি একটি করে বই উপহার দিতেন। এখান থেকেই শুরু হয় তার বই বিলির অভিযান। ইতিমধ্যে তার ডায়াবেটিস রোগ ধরা পড়ে। ডাক্তার প্রতিদিন হাঁটতে বলেন। তিনি হাঁটার সুয়োগটিকে কাজে লাগান। তখন তার মাথায় আসে ঘরে ঘরে বই পৌঁছে দিলে তার আন্দোলনও হবে, হাঁটার কাজটিও হবে। সেই শুরু হলো বই বিতরণ।

বই পড়াটাকে তিনি একটি আন্দোলনে রূপ দিয়েছিলেন। তিনি বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে মানুষের চিন্তায় পরিবর্তন আনা যায়। এজন্য দলে দলে লোক বা হোন্ডার বহর লাগে না, লাগে না বক্তৃতা বা বিবৃতি। শুধু সদিচ্ছা থাকলেই অনেক বড় কাজ করা সম্ভব। পলান সরকার যে অবস্থার মধ্য দিয়ে এত বড় আন্দোলন গড়ে সারা দেশে সম্মানের সঙ্গে নিজেকে তুলে ধরতে পেরেছেন এটা তার একদিনের কাজ নয়। এর পেছনে রয়েছে তার বিশাল জীবন সংগ্রাম। জীবনে লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে তিনি মানুষের অন্তর্গত জীবনকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চেয়েছেন। প্রথমে সবাই তার এই কাজকে নিছক পাগলামি ভেবেছেন। কিন্তু তিনি ছিলেন প্রকৃত জ্ঞানীজন। ফলে কোনো কথাই কানে তোলেননি। তাছাড়া পলান সরকার খুব গুছিয়ে কথা বলতে পারতেন। কথা বলে মানুষকে হাসাতে পারতেন। কাঁদাতেও পারতেন। বই পড়ার আন্দোলন সম্পর্কে ২০১৬ সালের নভেম্বরে এক সাক্ষাৎকারে পলান সরকার বলেছিলেন, ‘আমি হাঁটতে হাঁটতে এই সমাজটাকে বদলানোর আন্দোলনে নেমেছি। যত দিন আমি হাঁটতে পারি, ততো দিন আমার আন্দোলন চলবেই। আমি হাঁটতে হাঁটতে মানুষের বাড়িতে বই পৌঁছে দেব। যারা পাঠাগারে আসবেন, তারা ইচ্ছেমতো বই পড়বেন। তবে আমার বয়স হয়েছে। জানি না আর কত দিন হাঁটতে পারব। যেদিন আমার পথচলা থেমে যাবে, সেদিন এই পাঠাগার আমার পক্ষে আন্দোলন করে যাবে।’ এই বক্তব্যের পেছেনে তার বিশাল এক সংগ্রামমুখর জীবনের কথা চাপা পড়ে গেছে।

যে পলান সরকার আজ সবার শ্রদ্ধেয়, যাকে এক নামে চেনেন দেশের মানুষ, তাকে জীবনে বহু কষ্টের পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। তারপরও তার ইচ্ছা শুকিয়ে যায়নি। বরং দিনে দিনে তা পত্র-পল্লবে বিকশিত হয়েছে। তার এই একক সংগ্রাম আমাদের বলে দেয়, শুভচিন্তার জন্য মানুষকে এমপি, মন্ত্রী বা জমিদার হতে হয় না। শুভচিন্তা থাকলেই চরম দারিদ্র্যের ভেতর দিয়েও তা বিকশিত হতে পারে। তাকে আমি দক্ষিণ বাংলার আরজ আলী মাতুব্বরের সঙ্গে তুলনা করতে চাই। তিনিও তারই মতো  আরেক সংগ্রামী পুরুষ। জ্ঞানের পরিধি বিস্তার করে দু’জনেই আমাদের চিন্তা-চেতনা বা মনোবিকাশের উপনিবেশ ভেঙে দিয়েছেন। অথচ এই পলান সরকারের জীবন কতো ঘটনাবহুল, কন্টকময় তা না শুনলে বোঝা যাবে না। শত কষ্টের মাঝেও শুভচিন্তার মানুষেরা ঠিক তার অভিষ্ট লক্ষে পৌঁছে যায়। পলান সরকারের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

পলান সরকার ১৯২১ সালে নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া উপজেলার নূরপুর মালঞ্চি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় বাবা মারা যান। টাকাপয়সার টানাটানির কারণে খুব বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেননি। ১৯৬৫ সালে তার গ্রামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় ৫২ শতাংশ জমি দান করেন। তিনি গ্রামে হেঁটে বই বিলি করেন। যাতে গ্রামের মানুষ বিনা পয়সায় জ্ঞানার্জন করতে পারে। এমন কথা প্রচার হওয়ার পর তার এই ব্যতিক্রমী কাজ নিয়ে বহু প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তিনি আলোচিত হয়ে ওঠেন। দেশের সব মহলে ছড়িয়ে পড়ে তার নাম। অকৃত্রিম বাতিঘর হিসেবে চেনা-অচেনা সবার শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে ওঠেন তিনি। তার কারণে এলাকার চায়ের দোকানি পর্যন্ত হয়ে ওঠে বইপাগল পাঠক। প্রতি বিকালে তার দোকানে বসে বই পড়ার আসর। তিনি স্কুলকেন্দ্রিক বই বিতরণের প্রথা ভেঙে বাড়িতে বাড়িতে বই পৌঁছে দেয়া এবং ফেরত নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে অন্যান্য জিনিসের পাশাপাশি তিনি বই উপহার দেয়ার নিয়ম চালু করেন। প্রথমে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার কয়েকটি গ্রামের মানুষই জানত পলান সরকারের এই শিক্ষা আন্দোলনের গল্প।

২০০৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে তাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রচার হলে তিনি সবার নজরে আসেন। ২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ‘ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম ডে’ উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার দৈনিকে তার ওপর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তিনি কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১ সালে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদক লাভ করেন। তাকে নিয়ে তৈরি হয় টেলিভিশন নাটক। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাকে ‘সাদা মনের মানুষ’ খেতাবে ভূষিত করে। সবকিছু ঠিকভাবেই চলছিল। গত বছরের ২১ ডিসেম্বর পলান সরকারের স্ত্রী রাহেলা বেগম (৮৫) মারা যান। এরপর তিনি মানসিকভাবে একা হয়ে পড়েন। মনোবল ভেঙে যেতে থাকে। অবশেষে গত ১ মার্চ শুক্রবার দুপুরে নিরন্তরের পথে পাড়ি জমান এই আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর। তার প্রতি রইল অতল শ্রদ্ধা।

পলান সরকারের মতো একজন মানুষের মৃত্যুতে আমরা তাকে কতটা স্মরণ করেছি, কীভাবে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছি বিষয়টি দুঃখ জাগায়। গতকাল জেনেছি নাটোরের ৫৬টি স্কুলে একযোগে পলান সরকারের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে স্মরণসভা হয়েছে। কিন্তু রাজধানীতে কারো রা শব্দটি নেই। পুঁজি বাজারের দাসত্বের সঙ্গে দেশের সম্মান-শ্রদ্ধাও বাণিজ্যিক ও নগরকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। গ্রামে যত বড় গুণী বাস করুক তার মূল্য এখানে নেই। এমন আচরণ অশ্রদ্ধার সামিল। যে  দেশে গুণীর কদর নেই, সে দেশে গুণীর জন্ম হয় না। এই অকারণ অবহেলার অবসান হওয়া উচিত। পলান সরকারের জীবন ও কর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ মার্চ ২০১৯/তারা

     


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

রঙ বাংলাদেশের ঈদ পোশাক

২০১৯-০৫-১৯ ৯:৫৭:২৯ পিএম

১৪তম রোজার সাহরি ও ইফতার সময়

২০১৯-০৫-১৯ ৮:৪৮:৩৩ পিএম

বিএএসএর ইফতার মাহফিলে স্পিকার

২০১৯-০৫-১৯ ৮:৪৪:৫৫ পিএম