ডাকসু: অনেক প্রত্যাশার নির্বাচন

প্রকাশ: ২০১৯-০৩-০৯ ২:২৭:২৭ পিএম
মাছুম বিল্লাহ | রাইজিংবিডি.কম

মাছুম বিল্লাহ : যেখানে প্রতি বছর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, সেখানে বাংলাদেশের ৪৮ বছরের ইতিহাসে মাত্র সাতবার ডাকসু নির্বাচন হয়েছে। সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯০সালে। একথা কে না জানে, ডাকসুতে নির্বাচিত নেতারাই জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। গত ১৭ জানুয়ারি মাননীয় হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ আগামী ছয় মাসের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। নির্দেশটি দেয়া হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। তার পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ আটাশ বছর পর আগামী ১১মার্চ  অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতিক্ষীত ও আলোচিত ডাকসু নির্বাচন। এতে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৎপর সব ছাত্র সংগঠন কেন্দ্রীয় এবং হল সংসদে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। এতে ১২টি ছাত্র সংগঠনসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। ডাকসু যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষার্থীদের একটি সার্বজনীন ফোরাম। কিন্তু এর গুরুত্ব ও প্রভাব জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত।

দেশের সর্বোত্তম এই বিদ্যাপীঠ থেকে বহু শিক্ষার্থী বেরিয়ে গেছেন। তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন দেশ ও বিদেশে। পালন করছেন অনেক গুরু দায়িত্ব। কিন্তু তাদের ছাত্রজীবনে ডাকসু নির্বাচন প্রত্যক্ষ করেননি। সেই অর্থে বর্তমানে যারা বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পড়াশোনা করছেন তারা ভাগ্যবান। ১৯২১সালের ১জুলাই অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে শিক্ষাদানকারী ও আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কলা, বিজ্ঞান ও আইন– এই তিনটি অনুষদ, ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক ও ৮৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে। সে সময় হল ছিল মাত্র তিনটি; বর্তমানে আঠারোটি। ১৯২১ সালের ১ ডিসেম্বর কার্জন হলের শিক্ষকদের সভায় ১৯২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ’ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। পরে ১৯৫৩ সালে গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে এর নাম হয় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ’ বা ডাকসু। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি বছর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা কিন্তু বছরের পর বছর দেশের সর্বোচ্চ এই বিদ্যাপীঠে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। তাহলে কীভাবে আমরা গণতন্ত্রের চর্চা শিখব? কীভাবে নেতৃত্ব তৈরি হবে?

প্রার্থীরা হলের আবাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন, মেধার ভিত্তিতে সিট বরাদ্দসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকটের কারণে কিছু কক্ষে শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করেছে যা ‘গণরুম’ নামে পরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলে ৮১টি গণরুম আছে। এসব কক্ষে গাদাগাদি করে গড়ে ৭০ জন থেকে ২৫০ জন শিক্ষার্থী থাকেন। বারান্দায়ও থাকেন ৩৫০ এর অধিক শিক্ষার্থী। এই কি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড? এই কি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের চেহারা? বর্তমানে ভোটকে সামনে রেখে গণরুমের বাসিন্দাদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছেন প্রার্থীরা।

ডাকসু দেশের মিনি পার্লামেন্ট। ডাকসু ও হল সংসদ পাঠ্যসূচির বাইরে খেলাধুলা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, বিতর্ক সভার আয়োজন ও বার্ষিকী প্রকাশসহ ছাত্র-ছাত্রী এবং দেশের মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক বিষয়ে বিগত দিনগুলোতে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনসহ উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। তাই বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন নিয়মিত অনুষ্ঠিত হওয়া জরুরি- এর কোনো বিকল্প নেই।

একজন শিক্ষার্থীকে কেন্দ্রীয় সংসদে ২৫টি এবং হল সংসদে ১৩টি সহ মোট ৩৮টি ভোট প্রদান করতে হবে। কেন্দ্রীয় সংসদে ২২৯ জন প্রার্থীর মধ্যে থেকে ২৫ জনকে এবং হল সংসদে গড়ে ৩০ জনের মধ্যে থেকে ১৩জনকে প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিতে হবে। ছয় ঘণ্টায় ৪৩ হাজার ৭২৮টি ভোট গ্রহণ করার সক্ষমতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আছে কিনা এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাই ভোট গ্রহণের সময় চার ঘণ্টা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে ছাত্রলীগ ছাড়া বাকী সব ছাত্র সংগঠন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বলছে ‘সেই সুযোগ এখন আর নেই।’ সমাজ ও দেশের এই প্রেক্ষাপট এবং বাস্তবতায় আমরা কেমন ধরনের ডাকসু চাইব? এমন নেতা  নির্বাচন করতে  হবে, যারা ছাত্রছাত্রীদেরই অংশ। যাদের সঙ্গে দেখা করতে কোনো প্রটোকল পার হতে হবে না, বন্ধুর মতো যাদের কাছে যাওয়া যাবে। যারা পেশী শক্তিকে প্রাধান্য দিবে না, ক্যাম্পাসে সত্যিকার জ্ঞান বিতরণের আলয় হিসেবে গড়ার জন্য কাজ করবে, সকল ধরনের শিক্ষার্থীদের একই চোখে দেখবে। শিক্ষার্থী বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করবে হলে, বিভাগে, লাইব্রেরিতে তথা পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।  কিন্তু সেই ধরনের নেতৃত্ব কোত্থেকে আসবে? আকাশ চিঁড়ে তো আর মহাত্মা গান্ধী আর নেলসন ম্যান্ডেলার মতো নেতা আসবেন না। যেখানে টেন্ডারবাজি করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র আরেক ছাত্রকে হত্যা করে, যেখানে হলের দখল নিতে গিয়ে খুনাখুনি হয়, যেখানে পার্টিতে নতুন শিক্ষার্থীদের ভেড়ানোর জন্য ভীতি প্রদর্শন, অস্ত্র প্রদর্শন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে সেখানে কোথা থেকে আসবে এই ধরনের নেতা? তারপরও সাধারণ শিক্ষার্থীরা আশায় বুক বেঁধে আছে যে সামনে সুদিন আসবে। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা বুক ফুলিয় চলতে পারবে, চলমান সমস্যার সবকিছুর সমাধান না হলেও তারা নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবে।

অনেক প্রার্থী মিডিয়ার কাছে এই নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠুভাবে হবে এ নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। বিশেষ করে ভোট গ্রহণের সময় নিয়ে একটি জোড়ালো দাবি তাদের রয়েছে। ভোটকেন্দ্র, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের পক্ষপাতমূলক আচরণ, পর্যবেক্ষক ও মিডিয়া কর্মীদের প্রবেশ নিয়ে রয়েছে নানারকম নিয়মের মারপ্যাঁচ। তারপরও সচেতন ছাত্রসমাজকে বেছে নিতে হবে যোগ্য নেতৃত্বকে। নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ীরা আবাসন সমস্যার সমাধানের জন্য কাজ করবে, গেস্টরুম-গণরুম নিষিদ্ধ করবে, অছাত্রদের হল থেকে উচ্ছেদ করবে, ক্যাম্পাসজুড়ে খাবারের মানোন্নয়ন, একাডেমিক জটিলতা নিরসনে- যেমন অযৌক্তিক ফি, শিক্ষক নিয়োগে অস্বচ্ছতা, রেজিস্ট্রার ভবনের দাপট ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করবেন। আমরা আশা করছি ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের সঠিক নেতৃত্ব নির্বাচন করতে পারবে এবং তাদের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার প্রকৃত পরিবেশ ফিরে আসবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হবে, শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে মনোনিবেশ করবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। বিশেষ করে এখান থেকেই অতীতের মতো তৈরি হবে ভবিষ্যতের রাজনীতিক।  

লেখক: শিক্ষা গবেষক ও বিশেষজ্ঞ




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৯ মার্চ ২০১৯/তারা

   
 


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

‘অন্যায়ের সঙ্গে আপোস নয়’

২০১৯-০৩-১৯ ১০:৩০:১৬ পিএম