ক্যানসারের সঙ্গে বসবাস

প্রকাশ: ২০১৯-০৫-২২ ৫:৪১:০৫ পিএম
মো. আবু তাহের খান | রাইজিংবিডি.কম

মো. আবু তাহের খান : রাত ১২টা। টিকটিক শব্দে ঘড়ির সেকেন্ডের কাটা এগিয়ে চলছে। ফেলে যাচ্ছে কিছু স্মৃতিময় সময়। আহ্বান নতুন বছরের। ক্যালেন্ডারে এখন ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি। রোহানের চোখে ঘুম নেই। ২০১৮ সাল, মানে একটি বছর, ৩৬৫ দিন, ৮৭৬০ ঘণ্টা, ৫২৫,৬০০ মিনিট।

রোহান ভাবছে, কতগুলো গাণিতিক সংখ্যা দিয়ে একটি বছর সহজে হিসাব করা গেলেও মানুষের জীবন কি এত সহজে হিসাব করা যায়। ভাবনায় জানালার ফাঁকে রোহানের চোখ বাঁধলো জোনাকি পোকার টিপটিপ আলোতে। তাইতো! জোনাকি পোকার জীবনে আলো জ্বলছে আবার নিভুও হচ্ছে। আলো অন্ধকারের বাড়াবাড়িতে মানুষের জীবনও তো জোনাকি পোকার মতোই। আলো অন্ধকারের অনিশ্চিত জীবনেও কিন্তু মানুষের চাওয়া থাকে, স্বপ্ন থাকে। এই যেমন রোহানও চেয়েছিল মানুষের মতো মানুষ হবে, বড় চাকরি করবে। মানুষের পাশে দাঁড়াবে। স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে রোহান ভর্তি হয় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে। বেকার নামক নতুন পরিচয়ে রোহানের জীবন ছুটে চলছিল লাগামহীন ঘোড়ার মতো। ভাবতে ভাবতে রোহান কল্পনার রাজ্যে ছুটে চলছে। হঠাৎ রোহান কাঁধে স্পর্শ অনুভব করলো। কল্পনার ছোটাছুটি থেকে স্বাভাবিকে ফিরে এলো। রিনি বলতে থাকল রাত পোহাবার আর দেরি নেই। তখন ভোরের আলোতে মাখামাখি করছে সবুজ ঘাস, হিমেল হাওয়ায় ফুলগাছগুলো দোলা খাচ্ছে আর মেহগনির ডালে বসে পাখি কিচিরমিচির করছে।

ফ্রেশ হয়ে রোহান বের হলো ডাক্তার মহাশয়ের চেম্বারের উদ্দেশ্যে। কারণ আজ ফলোআপ ডেট। রোহান আজ ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করবে- ‘পিঠ ব্যথা কী কেমো বা রেডিওথেরাপির ইফেক্ট স্যার? অসহ্য পীড়া নিয়ে সারাদিন কাজ করি, রাতে ঘুমাতে পারি না। না থাক, জিজ্ঞেস করব না। স্যার যদি আবার টেস্ট দেয়। আবার ইনজেকশনের সুচ, ওফ... ক্ষত-বিক্ষত করবে আমার হাত, আমার শরীর। আর মন, সে তো ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে অনেক আগেই। যেদিন জেনেছিলাম আমি ক্যানসার রোগে আক্রান্ত। থাক এসব কথা। আর কত? আজ ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করব- ‘স্যার, আমি কী ক্রিকেট খেলতে পারব এখন?’ রোহানের মনে পড়ছে রিনি প্রেমে পড়েছিল ক্রিকেট খেলা দেখে। হল আর খেলার মাঠ পাশাপাশি হওয়ায় রিনি হলের জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকত রোহানের খেলা দেখার জন্য।

ডাক্তার মহাশয়ের সামনে বসে আছে রোহান। রোহানের কেমোথেরাপির সময় ক্যানসারআক্রান্ত বদরুল নামে একজন ভদ্রলোকও কেমো নিয়েছিলেন। গত সপ্তাহে তিনি মারা গেছেন। খবরটি জানার পর গুছিয়ে রাখা কোনো প্রশ্নই রোহান ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করেনি। শুধু জানতে চেয়েছিল রিকোভার হবার সম্ভাবনা কতটুকু। বাকরুদ্ধ রোহান বলতে পারেনি ডাক্তারকে, আমি বাঁচতে চাই কারণ বাবা মা তাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে আমায় বড় করেছেন। রিনি আমার জন্য আট বছর অপেক্ষা করেছে। আমি রিনির সঙ্গে থাকতে চাই।

নিয়তি রোহানের জীবনের মোড় ঘুড়িয়ে দিয়েছে ২০১৮ সালে। ২০১৬ সাল থেকে বিসিএস নামক সোনার হরিণের পেছনে ছুটে চলার ২ বছর পর এই ১৮ তেই রোহান চাকরি পায়। দীর্ঘ আট বছরের অবসান ঘটিয়ে ১৩ এপ্রিল রোহান রিনিকে বিয়ে করে। চাকরিতে যোগদানের ৩ মাস পর নিয়তি নিষ্ঠুর আচরণ করে রোহানের প্রতি। শরীরটা অবশ্য কয়েকদিন আগে থেকে খারাপ যাচ্ছিল। কিন্তু ৩০ এপ্রিল সোজাসুজি হাসপাতালে। হাসপাতালের ফিনাইলের গন্ধ আর হাতের শিরায় শিরায় প্রবাহমান স্যালাইনের শিরশির অনুভূতি, সঙ্গে রড লাইটের তীব্র আলোয় মাথা ভার ভার ভাব রোহানের। আশেপাশে সাদা ড্রেস পরিহিত নার্সদের ছোটাছুটি। উফ কী...সময়টা। এরপর এই টেস্ট, সেই টেস্ট, হরেক রকমের টেস্ট। সরু সুইয়ের খোঁচায় রোহান দেখতে পায় টেস্টটিউবে নিজের রক্ত। ডাক্তার মহাশয় বললেন লিম্ফোমা। নন-হচকিন্স টাইপ। অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন। জরুরি চিকিৎসা দরকার। সহকর্মীরা আশ্বাস দিলেও প্রযুক্তির কল্যাণে ততক্ষণে রোহানের জানা হয়ে গেছে রোগটা আর কিছুই নয়। মরণব্যাধি। রোহান নিজে ক্যানসার বা কর্কট রাশির জাতক। সে ভাবল, বাহ! ভালোই তো, ক্যানসার শব্দটি জীবনের সঙ্গে আরো ওতপ্রোতভাবে জড়াচ্ছে।

এভাবেই রোহানের ক্যানসারময় জীবনের সঙ্গে ছুটে চলা। বিষে বিষক্ষয় কেমোথেরাপিতে রোহান মনে করতে থাকে সেই দিনগুলোর কথা। হাতে ক্যানোলা লাগাতে নার্সরা কত কষ্টই না দিয়েছে। দামি রং-বেরঙের তরল ওষুধগুলো যখন শিরার ভেতর দিয়ে প্রবেশ করে তখন সমগ্র পৃথিবীকে মনে হতো দুর্গন্ধময়। শরীরকে মনে হতো শক্তিহীন একটি জড়বস্তু। আর দামি ওষুধ খেয়ে বমি ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা। ঝরতে থাকে চুল, নখের রঙ হয় বিবর্ণ, তীব্র মাথাব্যথায় রোহানের মনে হতো অর্থহীন এ বেঁচে থাকা শুধুই কষ্টকর। রোহান মনে করতে থাকে সেই দিনগুলোর কথা যখন সে শুধুই বেঁচে থাকতে চাইত তার মা-বাবা ও জীবনসঙ্গীর জন্য। সময়ের সাথে সাথে শেষ হয় কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি কোর্স। ডাক্তার আশ্বাস দেয় ৬০% রোগীরাই ভালো হয় কিন্তু সবসময় তাদের চেকআপের মধ্যে থাকতে হবে। তখন রোহানের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছিল বাকি ৪০% এর কি হয়? রোহানের খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছিল এই ৬০% এর মধ্যকার সেও একজন। ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হয়ে রোহান রিনির হাত ধরে হাঁটতে থাকে আর ভাবতে থাকে আরো ৬০টি বছর যদি এভাবেই তারা হাতে হাত রেখে চলতে পারত। রোহান ভাবে বেঁচে থাকাটা কতটাই না সুখের যদিওবা সেটা ক্যানসারের সঙ্গে বসবাস।

লেখক : কাস্টমস কর্মকর্তা



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২২ মে ২০১৯/আমিরুল/ফিরোজ

     


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

বিশ্ব রেফ্রিজারেশন দিবস পালিত

২০১৯-০৬-২৬ ৯:৪৬:১৩ পিএম

ভারতের বিপক্ষে ভাগ্য সহায় হয় না!

২০১৯-০৬-২৬ ৯:৩৪:৪১ পিএম

আর আমেরিকা যেতে চাইবে না তারা

২০১৯-০৬-২৬ ৯:১৬:৩৮ পিএম
জেএফএ কাপ-২০১৯

আনিকার ডাবল হ্যাটট্রিকে ঠাকুরগাঁও’র বড় জয়

২০১৯-০৬-২৬ ৮:৫৯:৩৯ পিএম

নিশামের ৯৭-এ নিউজিল্যান্ডের ২৩৭

২০১৯-০৬-২৬ ৮:৫১:৩০ পিএম