আত্মীয়দের নিয়োগ দিতেই অনিয়ম : অভিযানের পর অনুসন্ধানে দুদক

প্রকাশ: ২০১৯-০২-০৯ ৮:৪০:৩৯ পিএম
এম এ রহমান | রাইজিংবিডি.কম

এম এ রহমান মাসুম : বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) ছয় অফিস সহায়ক পদে আত্মীয়দের নিয়োগ দিতে অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ার পর এবার অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১৩ জানুয়ারি দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিমের অভিযানে সত‌্যতা পাওয়ায় অনুসন্ধানের উদ্দেশ‌্যে দুই সদস‌্যের টিম গঠন করে কমিশন। দুদকের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র রাইজিংবিডিকে এসব তথ‌্য জানিয়েছে।

সম্প্রতি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নবগঠিত অনুসন্ধান টিম অভিযোগ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহের জন‌্য বিএসটিআইর মহাপরিচালক বরারব চিঠি দিয়েছে। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে পাঠানো চিঠিতে নিয়োগ সংক্রান্ত নথিপত্র, পরিচালক (প্রশাসন) মো. খলিলুর রহমান ও সমন্বয়ক লুৎফর রহমানের ব‌্যক্তিগত নথি ও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের আরো কিছু নথিপত্র চাওয়া হয়েছে। দুদকের সহকারী পরিচালক শেখ গোলাম মাওলা ও উপ-সহকারী পরিচালক আবুল কালাম আজাদের সমন্বয়ে গঠিত টিম এ অনুসন্ধান করছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রাইজিংবিডিকে বলেন, নথিপত্র চেয়ে চিঠি দেওয়ার পর ইতিমধ‌্যে নিয়োগ সংশ্লিষ্ট বেশকিছু কাগজপত্র দুদকে এসেছে। আরো কিছু নথিপত্র আসা বাকি আছে। দুদক মূলত অভিযানে সত‌্যতা পাওয়ার পরপরই অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ‌্য-উপাত্ত বিএসটিআইয়ে পাঠিয়ে এ বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে।

গত ১৩ জানুয়ারি দুদকের অভিযানে বিএসটিআইর ছয়টি অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির প্রমাণ পায় বলে দাবি করে সংস্থাটি। প্রাথমিক অনুসন্ধানে নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (প্রশাসন) মো. খলিলুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতনদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে, এমন দাবিতে ওই দিনই অনুসন্ধান প্রতিবেদন বিএসটিআইর মহাপরিচালক মো. মুয়াজ্জেম হোসাইন বরাবর পাঠানো হয় বলে জানিয়েছিলেন সংস্থাটির মহাপরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী।

দুদক জানায়, হটলাইনে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির অভিযোগ পেয়ে বিএসটিআইয়ে দুটি অভিযান চালায় দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম। দুদকের সহকারী পরিচালক শেখ গোলাম মাওলা, উপ-সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়া ও মো. আবুল কালাম আজাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল এ অভিযানে অংশ নেয়।

বিএসটিআইর অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ পরীক্ষার টেবুলেশন শিটে জালিয়াতির মাধ্যমে নম্বর পরিবর্তন করে ছয়জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। টেবুলেশন শিটে নিয়োগ কমিটির সদস্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী থাকা সত্বেও তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি, এমন অভিযোগে অভিযান চালিয়েছিল দুদক।

এ বিষয়ে দুদকের মহাপরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী বলেন, এ নিয়োগ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং নিয়োগ বাতিল করারও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অন‌্যদিকে, বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য ও বিএসটিআইয়ে পাঠানো দুদকের প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, দুদকের অভিযানে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, প্রার্থীদের আবেদনপত্র, আবেদন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া, বিদ্যমান কোটা অনুসরণ সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা, রেজুলেশন ইত্যাদি নথি পর্যালোচনায় প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ক্যাটাগরির ৭৭টি শূন্য পদে সরাসরি নিয়োগের জন্য দুটি জাতীয় পত্রিকায় ২০১৭ সালের ১৩ এপ্রিল বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে ১২ ক্যাটাগরির ৭১টি পদে নিয়োগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ কর্তৃক লিখিত পরীক্ষা ও ২৬ সেপ্টম্বর নির্বাচিত প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। তবে চতুর্থ শ্রেণির দুটি ক্যাটাগরির ‍দুটি অফিস সহায়ক ও চারটি নিরাপত্তা প্রহরীসহ মোট ছয়টি পদে লিখিত পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা না থাকায় ২০১৭ সালের ১৫ অক্টোবর ও ১৬ অক্টোবর সরাসরি মৌখিক পরীক্ষা সিলেকশন কমিটির মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়।

বিএসটিআই সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৫ সালের ৩৭ নং অর্ডিন্যান্স মোতাবেক বিএসটিআই প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্ডিন্যান্সের ৯ নং অনুচ্ছেদে পরিষদ বা কাউন্সিল কর্তৃক কার্য সম্পাদনের জন্য কমিটি গঠনের বিষয়টি বর্ণনা করা আছে। ১৯৮৭ সালের ২৫ জুলাই কাউন্সিলের ১ম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিলেকশন বোর্ড ও সিলেকশন কমিটি গঠন করার কথা বলা হয়েছে। যেখানে গেজেটেড ১ম শ্রেণির পদে নিয়োগ বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিএসটিআইর মহারিচালকের সভাপতিত্বে একটি সিলেকশন বোর্ড গঠন হবে। যার সদস্য থাকবেন- একজন আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞ, উপ-সচিব শিল্প, সংশ্লিষ্ট পরিচালক ও উপ-পরিচালক (প্রশাসন)। আর নন-গেজেটেড ২য়, ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির পদে নিয়োগ  ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে মহাপরিচালকের নেতৃত্বে সিলেকশন কমিশন কমিটি হবে। যার সদস্য থাকবেন- সংশ্লিষ্ট পরিচালক, প্রশাসনের পরিচালক, উপ-পরিচালক ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব।

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৌখিক পরীক্ষা চলাকালে তৎকালীন মহাপরিচালক সাইফুল হাসিব বদলি হয়ে গেলেও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে পরীক্ষা সম্পন্ন করার জন্য বিএসটিআইতে ২০১৭ সালের ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত কর্মরত থাকেন। বিভিন্ন জটিলতায় ফল প্রকাশ স্থগিত থাকার পর ৪র্থ শ্রেণির ছয়টি পদের মেধাতালিকা প্রণয়নের বিষয়ে ২০১৮ সালের ৪ ডিসেম্বর বিএসটিআইয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত মহপরিচালক এ কে এম শামসুল আরেফীনের সভাপতিত্বে সিলেকশন কমিটি কাজ শুরু করে। ৪র্থ শ্রেণির ছয়টি পদে জনবল নিয়োগের জন‌্য ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর ও ১৬ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত মৌখিক পরীক্ষার উপস্থিত সদস‌্যবৃন্দ ২০১৭ সালের ২১ নভেম্বর মেধাতালিকা প্রস্তুত করেন। যার সভাপতি ছিলেন মহাপরিচালক মো. সাইফুল হাসিব, বিএসটিআইর পরিচালক (প্রশাসন) মো. খলিলুর রহমান, উপ-পরিচালক মো. তাহের জামিল ও সহকারী সচিব বেগম ছামছুন নাহার। অথচ দুই অফিস সহায়কসহ চতুর্থ শ্রেণির ছয় পদে নিয়োগকৃত ব‌্যক্তিদের টেবুলেশন শিটে মহাপরিচালক মো. সাইফুল হাসিবের সই পাওয়া যায়নি। এমনকি সদস‌্য মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব ছামছুন নাহারের স্বাক্ষরের অমিল পাওয়া গেছে। অভিযান পরিচালনাকালে দুদক টিমের কাছে বিএসটিআইর কর্মচারীরা অভিযোগ করেন, ৬৮ জন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রচুর টাকা লেনদেন হয়েছে। মো. লুৎফর রহমান ও পরিচালক (প্রশাসন) মো. খলিলুর রহমান ক্ষমতার অপব‌্যবহার করে নিজের আত্মীয়-স্বজনদের বিএসটিআইতে নিয়োগ দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, ফরিদপুর অফিসের অফিস সহায়ক মো. রুহুল আমিন পরিচালক (প্রশাসন) খলিলুর রহমানের শ্যালিকার ছেলে, ফরিদপুর ডাটা এন্ট্রি ও কন্ট্রোল অপারেটর সফিকুল ইসলাম পরিচালকের বড় ভাইয়ের ছেলে, ঢাকায় কর্মরত খালাসী মো. সালাউদ্দিন পরিচালক খুলিলুর রহমানের চাচাতো শ‌্যালক, ফরিদুপরের ডাটা এন্ট্রি ও কন্ট্রোল অপারেটর মহিউদ্দিন পরিচালকের বড় ভাইয়ের মেয়ের জামাই।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯/এম এ রহমান/রফিক

   
 


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

‘অন্যায়ের সঙ্গে আপোস নয়’

২০১৯-০৩-১৯ ১০:৩০:১৬ পিএম