ঐক্যফ্রন্ট ইস্যুতে বড় ঝড়ের সামনে বিএনপি

প্রকাশ: ২০১৯-০৫-০৯ ২:১১:১৩ পিএম
রেজা পারভেজ | রাইজিংবিডি.কম

এসকে রেজা পারভেজ : শুরু থেকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের বিরোধিতা করা ২০ দলীয় জোটের মিত্র দলগুলোর নতুন করে ওই জোটবিরোধী অবস্থানে বেকায়দায় পড়েছে বিএনপি।

সম্প্রতি এই ইস্যুতে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর জোটটিতে বড় ধরনের ধস নামতে যাচ্ছে। গোচরে-অগোচরে জোটসঙ্গী বিএনপিকে এমন হুমকি দিয়ে রেখেছে অন্য দলগুলো। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ঐক্য ধরে রাখতে তাই বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। রাজনীতিতে বিএনপির ঐক্যে এই ফাটল দলটির মনোবলকে আরো ভেঙে দিয়ে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ফুরফুরে মেজাজে রাখতে সহায়তা করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

নির্বাচনের আগে ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম, মাহমুদুর রহমানের নাগরিক ঐক্য, আ স ম আবদুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রি দলকে (জাসদ) নিয়ে গঠিত হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। পরে তাতে যোগ দেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। এই জোট গঠনের আগে থেকেই তাতে বিরোধিতা করেন ২০ দলীয় জোটের নেতারা। তবে তাদের আশ্বস্ত করা হয়, উভয় জোট নিয়ে একই সঙ্গে পথ চলতে সমস্যা হবে না বিএনপির। যদিও রাজনীতির মাঠে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আড়ালে চলে যায় ২০ দলীয় জোটের কার্যক্রম। এ নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয় জোট নেতাদের মধ্যে। যার সর্বশেষ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থের জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া। এর মাধ্যমে বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে থাকা সম্পর্কের অবসান হলো। আন্দালিব রহমান পার্থ জোট ছাড়ার যে ঘোষণা দিয়েছেন, সেখানে স্পষ্ট বলেছেন, জোটের রাজনীতিতে গুরুত্ব হারানোর কারণেই তিনি জোট ছেড়েছেন।

জোট ছাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘বিরোধী দলীয় রাজনীতি অতিমাত্রায় ঐক্যফ্রন্টমুখী হওয়ায় ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের আগে এবং পরে সরকারের সঙ্গে সংলাপসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ২০ দলীয় জোটের বিএনপি ছাড়া অন্য কোনো দলের সম্পৃক্ততা ছিল না। কেবল সংহতি এবং সহমত পোষণের জন্য ২০ দলীয় জোটের সভা ডাকা হতো।’

‘৩০ ডিসেম্বরের প্রহসনের ও ভোট ডাকাতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ২০ দলীয় জোটের সবার সম্মতিক্রমে এই নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে প্রথমে ঐক্যফ্রন্টের দুইজন এবং বিএনপির সম্মতিতে দলটির চারজন সংসদ সদস্য শপথ নেওয়ায় দেশবাসীর মতো বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপিও অবাক এবং হতবাক। শপথ নেওয়ার এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিএনপি ছাড়া ২০ দলের অন্য কোনো দলের সম্পৃক্ততা নেই।’

আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) মনে করে, এই শপথের মাধ্যমে বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্ট ৩০ ডিসেম্বরের প্রহসনের নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করার নৈতিক অধিকার হারিয়েছে। ফলে ২০ দলীয় জোটের বিদ্যমান রাজনীতি পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিজেপি ২০ দলীয় জোটের সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বেরিয়ে আসছে।’

দলীয় সূত্র বলছে, আন্দালিব রহমান পার্থের পথ ধরে জোট থেকে বেরিয়ে যেতে পারে আরো কয়েকটি দল। এ নিয়ে ক্ষোভ চরম দানা বেঁধেছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ চাইছে ২০ দলীয় জোটে থাকা দলগুলোর বড় একটি অংশ। এরই মধ্যে দু-একটি দল প্রকাশ্যে হুমকিও দিয়েছে। জোটের অন্যতম দল লেবার পার্টি বিএনপিকে জোট ছাড়তে ২৩ মে পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। তা না হলে আন্দালিব রহমান পার্থের পথ অনুসরণ করার হুমকি দিয়ে রেখেছেন দলটির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান।

মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, ‘আমরা বিএনপিকে ড. কামালের ঐক্যফ্রন্ট ছাড়ার জন্য এবং কারাবন্দি বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য কর্মসূচি দিতে আগামী ২৩ মে পর্যন্ত আল্টিমেটাম দিচ্ছি। এর মধ্যে বিএনপি সিদ্ধান্ত না নিতে পারলে ২৪ তারিখে আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত নেব। শুধু আমার দল নয়, আমি যদি ২০ দলীয় জোটে না থাকি তাহলে আরো অন্তত ৪-৫টি দল এই জোট থেকে বেরিয়ে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপি দল এবং জোট পরিচালনায় চরমভাবে ব্যর্থ, এটা পরিষ্কার। আমরা ২০ দলীয় জোটকে কার্যকর রাখতে চাই। ২০ দলীয় জোটই আন্দোলন-সংগ্রামের পরীক্ষিত জোট। পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের কারণে জোটকে বাইরে রাখা হয়েছে। আওয়ামী লীগের একটা এজেন্ডা হচ্ছে এই ঐক্যফ্রন্ট।’

‘বিএনপি সংসদে গিয়ে জনগণের সঙ্গে জোটের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। জোট এবং ফ্রন্টের সিদ্ধান্তই ছিল সংসদে না যাওয়া। এটা তারা সঠিক কাজ করে নাই। একদিকে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করব, আরেক দিকে সংসদে যাব! তাহলে তো ওই সংসদকে বৈধতা দেওয়া হয়। নতুন নির্বাচনের আমাদের দাবি থাকে কোথায়? নতুন নির্বাচন চাই, আমরা বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই’, বলেন তিনি।

তবে বেশ কয়েকটি দল মনে করছে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ইস্যুতে জোটের যেসব দল অসন্তোষ প্রকাশ করেছে সেটি তাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা। অনেক দলই মনে করছে, বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট একসঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ২০ দলীয় জোটের দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির সমন্বয়ের মাধ্যমে যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব। 

এ বিষয়ে কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান রাইজিংবিডিকে তিনি বলেন, জোট ছেড়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। এক্ষেত্রে হয়তো কয়েক দিন ভালো মিডিয়া কাভারেজ পাওয়া যাবে। কিন্তু এরপর ভালো কিছু হবে না। যেকোনো বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করে সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব।

‘এটা সত্য যে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর ২০ দলীয় জোটের গুরুত্ব কিছুটা কমেছে। তবে এটিও সত্য যে, বৃহত্তর ঐক্য প্রশ্নে সেটি মেনে নেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে সমন্বয়নের মাধ্যমে যে ঘাটতি বা অভিযোগগুলো রয়েছে দলগুলোর সেগুলো পূরণ সম্ভব।’

২০ দলীয় জোটে সংস্কার দরকার, এ কথা জানিয়ে জোটটির এই নেতা বলেন, ২০ দলীয় জোটই রাখতে হবে, এই সংখ্যাতত্ত্ব থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে। জোটের অনেক নেতা মনে করেন যে, জোটের শকির হওয়ার পরই তারা এমপি-মন্ত্রী হয়ে গেছেন। এই ১০ বছরে জোটের নেতারা কী করেছেন সেটি বিবেচনায় নিয়ে জোটের সংখ্যাতত্ত্বে প্লাস-মাইনাস করে সংস্কার দরকার।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর ২০ দলীয় জোটের গুরুত্ব কমার অভিযোগ স্বীকার করে ডেমোক্রেটিক লীগের সাইফুদ্দিন আহমেদ মনি বলেন, এটা নিয়ে জোটের মধ্যে ক্ষোভ আছে। তবে হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে জোট ছাড়াই কোনো সমাধান নয়। এই জোট শুধু বিএনপির নয়, পুরো ২০ দলীয় জোটের। সুতরাং ভুলত্রুটি থাকবে, সেটির সমাধানও আছে। বিএনপির উচিত দুই জোটকে সমান গুরুত্ব দেওয়া। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে তারা (বিএনপি) যদি বেশি গুরুত্ব দেয় সেটি তাদের দুর্বলতা।

বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির আগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল এনপিপি, এনডিপি, ন্যাপ ভাসানী, লেবার পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ ন্যাপ। যদিও এসব দল ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গেলেও দলগুলো একটি অংশ ওই নামেই থেকে যায় জোটে। ফলে জোটে দলের সংখ্যায় কোনো পরিবর্তন হয়নি।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৯ মে ২০১৯/রেজা/রফিক

     


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

বিচারাধীন মামলা ৩৫ লাখ ৮২ হাজার

২০১৯-০৬-১৮ ৮:২১:৪০ পিএম

নাসায় যাচ্ছে শাবির ৪ শিক্ষার্থী

২০১৯-০৬-১৮ ৮:১২:৩২ পিএম

ভুয়া ম্যাজিস্ট্রেট গ্রেপ্তার

২০১৯-০৬-১৮ ৭:২৫:০২ পিএম