অপরাধ দমনে সাদ্দাম হোসেনের ‘সেলফ প্রটেক্ট’ অ্যাপ

প্রকাশ: ২০১৭-০৩-২৯ ৪:৫৭:০৫ পিএম
মনিরুল হক ফিরোজ | রাইজিংবিডি.কম

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ডেস্ক : নাগরিক নিরাপত্তা, জরুরি সাহায্য ও অপরাধ দমনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে ‘সেলফ প্রটেক্ট’ অ্যাপ তৈরি করেছেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড   ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. সাদ্দাম হোসেন।

আমাদের চারপাশে নানা কারণে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ যেমন, মাদক পাচার, মানি লন্ডারিং, চাঁদাবাজি, ভাড়াটে খুন, প্রতারণা, মানব পাচার, ডাকাতি, দুর্নীতি, কালো বাজারি, রাজনৈতিক সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদ ও অপহরণ, নারী নির্যাতন ইত্যাদি সংঘঠিত হয়। এসব অপরাধের প্রভাবে সাধারণের নিরাপত্তা ব্যাহত হয়। এসব অপরাধ থেকে নিজেকে ও অন্যকে রক্ষায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা দেবে ‘সেলফ প্রটেক্ট’ অ্যাপ।

যেকোনো মুহূর্তে আপনার চারপাশে এমনকি নিজের সঙ্গে ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ বিপদের মতো ঘটনা। অথবা একদল সশস্ত্র সন্ত্রাস আপনাকে আক্রমণ করতে এগিয়ে আসছে আপনি নিরাপদ আশ্রয় পেতে ও সাহায্যের জন্য ব্যাকুল হচ্ছেন কিন্তু কোনো উপায় নেই। ঠিক এ রকম মুহূর্তে র্স্মাটফোনে ‘সেলফ প্রটেক্ট’ অ্যাপটি ইনস্টল করা থাকলে দ্রুত নিকটবর্তী আইন-প্রয়োগকারী সংস্থা থেকে সহায়তা পাওয়া যাবে।

অ্যাপটির সুবিধা
* যেকোনো বিপদের সময় স্মার্টফোনের পাওয়ার বাটনটি পরপর ৩ বার প্রেস করার সঙ্গে সঙ্গেই নিকটস্থ  আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও ফ্রেন্ডস এবং ফ্যামিলির কাছে ব্যক্তির অডিও, ফুটেজ এবং অবস্থান মানচিত্রসহ প্রয়োজনীয় বার্তা পৌঁছে যাবে।

* ফোন হারানো বা মোবাইল ফোনের সিম পরিবর্তন করলে ফোনটির অবস্থান, ব্যবহৃত নতুন সিমের সিরিয়াল নম্বর ও ফোনের আইএমইআই নম্বর অ্যাপে সেটআপকৃত ফ্রেন্ডস এবং ফ্যামিলি নম্বরে পৌঁছে যাবে

* জরুরি সেবা যেমন পুলিশ স্টেশন, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, ব্লাড ব্যাংক ইত্যাদির  লোকেশনসহ যোগাযোগ নম্বর পাওয়া যাবে।

* নিকটস্থ  বাস-স্ট্যান্ড, এটিএম বুথ, ব্যাংক, রেস্টুরেন্ট, শপিংমল ইত্যাদি অ্যাপ স্ক্রিনে পাওয়া যাবে। এবং ব্যবহারকারী তা থেকে তার প্রয়োজনীয় সেবাটা গ্রহণ করতে পারবে।

* এছাড়াও আইন-প্রয়োগকারী সংস্থা, মানবাধিকার কমিশন, আইনী সহায়তা কেন্দ্র, দূর্নীতি দমন কমিশন  এর কাছে প্রয়োজনীয় অভিযোগ এবং মতামত জানানো যাবে।

অ্যাপটি যেভাবে কাজ করে
সেলফ প্রটেক্ট অ্যাপটির দুটি অংশ। একটা হচ্ছে, ক্লায়েন্ট বা ইউজার অ্যাপ অর্থাৎ সবার কাছে যে অ্যাপটি থাকবে। আরেকটা হচ্ছে, ওয়েব অ্যাপ নোটিফিকেশন রিসিভার অ্যাপ, যেটি পুলিশের কাছে বা পুলিশ স্টেশনে থাকবে। বিপদের সময় স্মার্টফোনের পাওয়ার বাটনে পরপর চাপার সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ পুলিশ স্টেশনের ওয়েব অ্যাপে প্রয়োজনীয় তথ্যসহ নোটিফিকেশন পৌঁছাবে।

বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি (ভিকটিম) এর কাছে থাকা মোবাইল ফোনের বাটন চাপার মাধ্যমে নোটিফিকেশনটি সেন্ট্রাল সার্ভারে পৌঁছাবে, তারপর সেন্ট্রাল সার্ভার প্রথমে সার্চ করবে যে ব্যক্তিটির সবচেয়ে কাছের পুলিশ স্টেশনটির ওয়েবঅ্যাপ কোনটি। সেই ওয়েবঅ্যাপটি জিপিএসের মাধ্যমে চিহ্নিত করবে যে ভিকটিম কোন জায়গায় অবস্থান করছে। তারপর সেই জায়গার অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ মান সহ ভিকটিমের আশেপাশের শব্দ রেকর্ডিং বা ধারণ করা ছবি পুলিশ স্টেশনের ওয়েবঅ্যাপে প্রেরণ করবে। পুলিশ স্ক্রিনে ভিকটিমের অবস্থানরত এলাকার মানচিত্র, ধারণকৃত ছবি (ফুটেজ) ও শব্দ শুনতে পাওয়ায় দ্রুত সাহায্য ও উদ্ধার করতে পারবে।

অ্যাপটির সেবা পাওয়ার জন্য অ্যাপটিকে সবসময় সক্রিয় রাখতে হবে। অ্যাপটি ব্যবহার করার জন্য ব্যবহারকারীর কোনো ইন্টারনেট কানেকশন বা ডাটা অন থাকা লাগবে না। অর্থাৎ ব্যবহারকারীর ইন্টারনেট কানেকশন অফ থাকলেও জিপিএস অন থাকার জন্য সার্ভিস প্রোভাইডার বা মোবাইল অপারেটরের সাহায্যে বার্তাটি পুলিশ স্টেশনে পৌঁছাবে। তবে সার্ভার অ্যাপ্লিকেশনে বা পুলিশের কাছে থাকা অ্যাপে ইন্টারনেট কানেকশন থাকতে হবে, যেন ভিকটিমের কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রয়োজনীয় তথ্য সমৃদ্ধ বার্তাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই অপরাধ সংঘটিত স্থানটির গুগল মানচিত্রটি স্ক্রিনে দেখা যায়। মোবাইলফোন ছিনতাইকারী নিয়ে যাওয়ার পর সিম পরিবর্তন করলে অ্যাপটি থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোবাইলফোনটির অবস্থান পুলিশের সার্ভার অ্যাপ্লিকেশনে চলে আসবে। এতে করে ছিনতাইকারীর অবস্থান জানা সম্ভব ও তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে। অ্যাপটিতে ব্যবহারকারীর জন্য টেস্ট মুড ও রিয়েল মুড অপশনও রাখা হয়েছে। যেন ব্যবহারকারী অনিচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার থেকে রক্ষা পায়। অ্যাপটি অপব্যবহার বা মিস ইউজ করলেও দ্রুত আইনী ব্যবস্থা নিতে পারবে পুলিশ প্রশাসন। কেননা অ্যাপটির ব্যবহারকারীদেরকে মোবাইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্র সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্যাদি নিয়ে নিবন্ধনকৃত করতে হয়।

এ ধরনের অ্যাপ তৈরির ধারণা যেভাবে এলো
মো. সাদ্দাম হোসেন জানান, ২০১২ সালের মার্চের এক সন্ধ্যায় চুয়াডাঙ্গার রেলওয়ে স্টেশন থেকে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরছিলাম। হঠাৎ ৭-৮ জনের ছিনতাইকারী আমার কাছে থাকা মানিব্যাগসহ মোবাইলফোন ছিনতাই করে নেয়। মোবাইলটার জন্য একটু বেশি মন খারাপ হচ্ছিল। কারণ অনেক ‍গুরুত্বপূর্ণ নম্বর ছিল। ঠিক তখনই আমার মনে ভাবনা আসে যে, আমার মতো প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ছিনতাইকারী কিংবা অপহরণকারীর কবলে পড়ছে অথচ এ ধরনের অপরাধীদের কাছ থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো উপায় নাই। তারপর মনে হল যে, আমার স্মার্টফোনে যদি এমন একটা অ্যাপ থাকত যেটার মাধ্যমে আমি পুলিশ প্রশাসনের কাছে একটা বাটন চাপার মাধ্যমে আমার বিপদরে কথা জানাতে পারতাম। তাহলে হয়তো আমি ছিনতাইকারীদের পুলিশে ধরিয়ে দিতে পারতাম বা আমার মোবাইল ফোনটা ফিরে পেতাম। সেদিন থেকেই গবেষণা শুরু করি আমার এই আইডিয়াটিকে মোবাইল অ্যাপে বাস্তবায়ন করার জন্য।

বাংলাদেশ সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের অধীনে দেশব্যাপী পরিচালিত মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন (অ্যাপ) উন্নয়নে সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির কর্মসূচির আওতায় সারা দেশের ন্যায় আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮-১২ ফেব্রুয়ারি ৫ দিনব্যাপী অ্যাপ তৈরির প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করি। এই প্রশিক্ষণ থেকেই মোবাইল অ্যাপ তৈরির কাজ শুরু করি। মোবাইল অ্যাপ তৈরির ৫ দিনের প্রাপ্ত প্রশিক্ষণের পর উদ্ভাবনী কাজ এবং অন্যান্য অ্যাপ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় রিসোর্স ইন্টারনেট থেকে শিখছি। অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট করতে গিয়ে যেকোনো সমস্যায় পড়লে ইন্টারনেট থেকে সাহায্য পেয়েছি এবং আমার প্রশিক্ষকদের কাছে থেকে সাহায্য নিয়েছি। অ্যাপটিকে আরো ব্যবহার উপযোগী হিসেবে উন্নয়নে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন জাতীয় মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন (অ্যাপ) উন্নয়নে সচেতনতা বৃদ্ধি ও  প্রশিক্ষণ কর্মসূচি-২০১৪-এর প্রশিক্ষক কৃষ্ণ রায় মিথুন এবং ফারুক আহমেদ জুয়েল ভাই।

‘সেলফ প্রটেক্ট’ অ্যাপটি ডেভলপমেন্ট করতে ২ বছরের বেশি সময় লেগেছে এবং এখনো এটিকে কিভাবে আরো সহজে ব্যবহার উপযোগী ও সহজিকরণ করা যায় তা উন্নয়ন করার চেষ্টা চলছে।

সরকারের অনুমতির অপেক্ষা
মো. সাদ্দাম হোসেন জানান, অ্যাপটি জননিরাপত্তামূলক ও অপরাধ দমনসংক্রান্ত হওয়ায় অ্যাপটি গুগল প্লে-স্টোর, উইন্ডোজ  অ্যাপ স্টোর ও আইওএস অ্যাপ স্টোর এ দিতে পুলিশ সদর দপ্তর বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগবে। কারণ অ্যাপটির মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা প্রথমে পুলিশ বা আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রথমে জানাবে। এবং বিপদগ্রস্থ ব্যক্তিটিকে সহায্য করতে এগিয়ে আসবে। এজন্য পুলিশ সদরদপ্তর ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন প্রোগ্রাম (এটুআই) প্রকল্পে আবেদন করা হয়েছে। সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে অ্যাপটি মার্কেট প্লেসে আনা হবে। ইতিমধ্যে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এই অ্যাপটি সরকারিভাবে কার্যকর করার ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন। এ বছরের শেষের দিকে অ্যাপটি সরকারিভাবে সহযোগিতা ও অনুমোদন লাভ করবে বলে প্রত্যাশা করেছেন তরুণ এই উদ্ভাবক।

‘সেলফ প্রটেক্ট’ অ্যাপ উদ্ভাবন করায় ২০১৭ সালে মেহেরপুর জেলা ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলাতে শ্রেষ্ঠ তরুণ উদ্ভাবক ও খুলনা বিভাগীয় পর্যায়ে ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলাতে শ্রেষ্ঠ তরুণ উদ্ভাবকের সম্মানান ও সনদ পেয়েছেন মো. সাদ্দাম হোসেন এবং প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্প আয়োজিত ‘উদ্ভাবকের খোঁজে’ প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বের জন্য সম্প্রতি নির্বাচিত হয়েছেন।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৯ মার্চ ২০১৭/ফিরোজ

   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ