মিয়ানমারের আকাশে এয়ার হোস্টেজের শুকনো ঠোঁট

প্রকাশ: ২০১৭-১২-১৩ ৫:৪৭:৩৩ পিএম
ফেরদৌস জামান | রাইজিংবিডি.কম

(ভিয়েতনামের পথে: দ্বিতীয় পর্ব)

ফেরদৌস জামান: বিমানের নির্ধারিত আসনে বসে আমরা দুজনেই বেশ খুশি এবং আনন্দিত। জানালার পাশের আসন, দেখতে দেখতে যাওয়া। হোক সে বিমান কি রেলগাড়ি, সম্পূর্ণ পথ দেখতে দেখতে যেতে আমার খুব ভালো লাগে। আকাশ পথে কোন কোন সময় উপর নিচে সবই আকাশ মনে হয় এবং সাদা মেঘ ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। তবুও আমি তাকিয়ে থাকি বাইরের দিকে। সামনের স্ক্রিনে অন্য কিছু নয় শুধু ফ্লাইট মুড বা বিমানের গতিপথের চিত্র চালু করে রাখি। কিছুক্ষণ পরপর দেখব বিমান কোন এলাকার উপর দিয়ে যাচ্ছে, কত উঁচু দিয়ে যাচ্ছে, গতি কত, তাপমাত্রা কত ইত্যাদি। আরও দেখি নিচে পাহাড়-পর্বত, সমতল ভূমি নাকি সমুদ্র? এমনকি হেড ফোন গুজে দেয়া বা কোন বই পড়াও এ সময় পছন্দ করি না। সচরাচর বিমান ভ্রমণের সুযোগ হয় না বলে এক ধরণের উচ্ছ্বাস থেকে এমনটা হয়ে থাকতে পারে। এমন যদি হয় প্রতি মাসেই আকাশ পথে এখানে-সেখানে যেতে হচ্ছে, আমার মনে হয় তারপরও এই শিশুসুলভ অভ্যাস পরিত্যাগ করতে পারব না।

সময় হলো বিমান ছেড়ে দেয়ার। ঢাকা বিমান বন্দরে একটাই রানওয়ে। ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে একেবারে উত্তর প্রান্তে গিয়ে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষার পর দৌড় শুরু। হনহন করে কিছুটা এগিয়েই আকাশ যান শূন্যে ভেসে উঠল। জানালার পাশে বসা সুজিতের চোখেমুখে উচ্ছ্বাস, বিস্ময় আর আনন্দ; সব মিলিয়ে এক নিষ্পাপ অভিব্যক্তি। সহযাত্রী হিসেবে সেটা আমার খুব ভালো লাগল। মহানগর ঢাকার একটা অংশ এখন একেবারেই দেখা যাচ্ছে। অজস্র দালানের সমাহার। পথগুলো আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। নদী-খাল শাপের মতো বেশ স্পষ্ট। কুয়াশার মতো দেখালেও মহানগরের আকাশে আসলে ধোঁয়া আর ধূলির মিহি পড়তে ঢাকা। দেখে মনে হয় শহরটা এখনই মারা যাবে কিন্তু কি অদ্ভুত রকমে বেঁচে আছে! খানিক বাদে শুধু নদীগুলো বাদে সবকিছু অস্পষ্ট হয়ে গেল। মেঘের পড়ত ভেদ করে ক্রমেই উপরে উঠে গেল অশ্চর্য যান।

এই সময়টাতে বিমানজুড়ে এক ধরনের নড়াচড়া আর নিরাপত্তা বন্ধনি খোলার খুটুস-খাটুস শব্দের শোরগোল তৈরি হলো। বিমানের প্রায় এক চতুর্থাংশ আসন ফাঁকা। অনেকেই সুবিধা মতো জায়গা অনুসন্ধান করতে থাকল। আমাদের পাশের আসন যাত্রীশূন্য। অতএব, দুজনের গল্পগুজবে অস্বস্তির কারণ নেই। সুজিত মাঝেমধ্যেই জানালার বাইরে কুণ্ডলি পাকিয়ে থাকা মেঘমালার ছবি তুলছে। কেবিন ক্রু বেশ বেতিব্যস্ত। পানি ও শরবত পরিবেশন করছে। হঠাৎ পেছন দিক থেকে উড়ে এলো বিরিয়ানির মনমাতানো সুবাস। ঘুরতে থাকল বিমানের আনাচে-কানাচে। খানিক পর নিশ্বাস দীর্ঘ করেও আর খুঁজে পাওয়া গেল না। কোথায় হারিয়ে গেল? যেন খদ্দের আকর্ষণে রাস্তার ধারে খাবার দোকানের ডেকচির ঢাকনাটা খুলে আবার ঢেকে দেয়া। দুপুরের খাবার খাওয়া হয়নি, ক্ষুধায় যে ভাঁজ হয়ে যাচ্ছি; এতক্ষণ তা উপলব্ধি করতে পারিনি। আশপাশের লোকেরা নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। অনুমান করা যায় তাদের মনেও আমাদের মতো একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে- এ কেমন নিষ্ঠুরতা, সুবাস ছড়িয়ে আর কোন দেখা নেই!



টয়লেট থেকে এসে দেখি খাবার পরিবেশন হয়ে গেছে। খুব স্বাদের খাবার, তবে পেট ভরার জন্য যথেষ্ট নয়। ইচ্ছা হলো আর একটা চেয়ে নেই কিন্তু তা শোভন দেখাবে না। তার চেয়ে বরং কিছুক্ষণ পর দুজনকে একটা করে কফি দিতে বললাম। ক্রুগণ এরই মধ্যে বেশ খানিকটা বেসামাল হয়ে পড়েছে। যাত্রীদের সাথে বাধ্য হয়ে ভদ্রতা করে কথা বলছে, ফরমায়েশ অনুযায়ী কাজ করছে কিন্তু ভীষণ নিষ্প্রাণ, আন্তরিকতা নেই। কারও মুখে হাসি নেই। মানুষের মন যোগানো সহজ কথা নয় কিন্তু অন্য এয়ারলাইনগুলো ঠিকই পারে। তাদের আচরণে পেশাদারিত্ব ফুটে ওঠে। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের অনেক পরিশ্রম হয় তাই না? এমন জিজ্ঞাসা তারা প্রত্যাশা করে বলে মনে হলো না। শুকিয়ে খটখটে হয়ে যাওয়া ঠোঁটজোড়া কোনো রকমে দুই কানের লতি পর্যন্ত প্রসারিত করলেন, যা দিয়ে বোঝালেন আমার কৌতূহলে তিনি হাসছেন। এবং উত্তরে বললেন, জি হয় আরকি!

অন্ধকারে ঢেকে গেছে আকাশ। নিচ থেকে গুচ্ছ গুচ্ছ আলোর কণা চিকমিক করছে। অনুমান করা যায় বন-জঙ্গলের মাঝে লোকালয় থেকে উত্থিত আলো। স্ক্রীনে দেখাচ্ছে বিমান এখন মিয়ানমারের আকাশে। চোখজোড়া টানটান করে নিচে তাকিয়ে থাকলাম দেখি না কেমন এই দেশ! এটা বর্তমানে অনেক আলোচিত একটি নাম। সন্ত্রাসী নির্মূলের নামে লাখ লাখ মানুষকে পিটিয়ে দেশ থেকে বের করে দিচ্ছে। আত্মীয়-স্বজন এবং সহায়-সম্বল হারিয়ে যে যার মতো প্রাণ হাতে নিয়ে পাড়ি দিচ্ছে পাশ্ববর্তী দেশে। না, কিছুই চোখে পড়ে না! অন্ধকারের মাঝে অনেক দূর পরপর ক্ষুদ্র আলোর গুচ্ছ। তাও যেন অনেক কষ্টে বেড়িয়ে আসতে চায়, একটু নিশ্বাস নেয়ার জন্য। এখানে কি কোন মানুষ থাকে? বাহির থেকে কি কেউ কখনও যেতে পারে? এমন সব এলোমেলো প্রশ্নের জাল ভেদ করে প্রবেশ করি অন্য কোন ভাবনায়। চোখ এখনও নিচের দিকে। পেরিয়ে গেছে অনেকটা সময়। ঘোষণা এলো বিমান থাইল্যান্ডের মাটি স্পর্শ করবে। অপেক্ষায় আছে ব্যাংকক সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরের রানওয়ে। কি সুন্দর নাম- সুবর্ণভূমি! যেন এর চেয়ে সুন্দর আর কোন নাম হতে পারে না।

পূর্ব ঘোষিত সময়ে নেমে এলাম। অনেকটা হেঁটে গিয়ে ইমিগ্রেশন কাউন্টার। ভিড় নেই, শব্দ নেই, একেবারে নিরিবিলি। দুজনের পরেই আমি। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা কোন কথা না বলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আনুষ্ঠানিকতা সারলেন। অথচ, মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে আমার দেশের ইমিগ্রেশনে যাত্রীদের সাথে যা হলো তার তুলনা হয় না। ঘরির কাটা সামনের দিকে এক ঘণ্টা সরে গেছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশ থেকে থাইল্যান্ডে সময় এক ঘণ্টা যোগ। ব্যাগ নিয়ে বাইরে বেরুতেই সামনের স্টল থেকে এক নারী এগিয়ে এসে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে জানতে চাইল, কোথায় যেতে চাই, কীভাবে যাব এবং আর কোন তথ্যের প্রয়োজন আছে কি না? সত্য কথা বলতে প্রথমে পাত্তা না দিয়ে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলাম, কোন মতলব আছে কি না কে জানে। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম বাংলাদেশে নয় থাইল্যান্ডে আছি। এখন কিছু পরিমাণ ডলার ভাঙানো দরকার। ভেতরেই মানি এক্সচেঞ্জ আছে। সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সৌজন্যতায় মিষ্টি হেসে মানি এক্সচেঞ্জের নারী কর্মীটি স্বাগত জানল। ডলার ভাঙানোর পর তিনি দুজনের হাতে একটা করে মানচিত্র দিলেন।



কাঁচ ঘেরা পরিবেশ থেকে বেরুতেই উপলব্ধি করলাম ব্যাংককের তাপমাত্রা প্রায় বাংলাদেশের মতো অথবা তার চেয়ে একটু বেশি। আমাদের গন্তব্য ফায়া থাই নামক জায়গা। আর সেখানে যাওয়ার উত্তম উপায় মেট্রো রেল। বিমানবন্দরের ভেতর থেকেই রেল চলাচল করে। অতএব, পুনরায় ভেতরে প্রবেশ করতে হলো। কাউন্টারে ভাড়া পরিশোধ করে একটা করে প্লাস্টিকের কয়েন আকৃতির বস্তু নিয়ে রেল স্টেশনে প্রবেশ করলাম। সুশৃঙ্খল লাইনে দাঁড়ানোর কয়েক মিনিটের মধ্যেই ট্রেন চলে এলো। ট্রেন চলছে শহরের উপর দিয়ে। অনেক যাত্রী কিন্তু কারও সাথে কারও কথা নেই, যে যার মতো মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্রাউজিং-এ ব্যস্ত। আধা ঘণ্টা বা তার কিছু বেশি সময়ের পথ। এই সময়টুকুর ভেতর বোধহয় একজনকেও দেখলাম না পাশের জনের সাথে কথা বলছে। ভীষণ যান্ত্রিক! এটাকে আসক্তি বলব নাকি কর্মব্যস্ততার অন্তে নিজের জগৎ অথবা পৃথিবীটাতে চোখ বুলিয়ে পরিভ্রমণ তা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। আমরা দুজন বোকার মতো চেয়ে চেয়ে শুধু দেখতে থাকলাম আর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ের নির্বাক অভিব্যক্তি আদান-প্রদান করলাম। তাছাড়া আমাদের করার মতো কিছু ছিল না। আমরা মোবাইল ফোনের সিম কার্ড কেনার প্রয়োজন মনে করিনি, মানি এক্সচেঞ্জ থেকে বিমানবন্দরের বিনা পয়সায় ওয়াইফাই-এর কোড দিয়ে দেয়ায় দরকারি কাজ তাতেই সেরে নেয়া গেছে। কিছুক্ষণ পরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বলে দেয়া হচ্ছে সামনে অমুক স্টেশন।

ফায়া থাই নেমে হাঁটতে শুরু করলাম থাকার জায়গার উদ্দেশ্যে। রাত সাড়ে দশটা বাজে। শহরের পথে নেমে এসেছে নীরবতা। ঠিকানা অনুযায়ী দিক নির্দেশনা চাওয়ার মতো কেউ নেই। দুই একজনকে পেলেও দেখা যায় ইংরেজিতে দুর্বল। খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে গেলাম। ফুটপাতে খাবার দোকানগুলো বেশ জমজমাট, খানাপিনা আর আড্ডা চলমান। অল্পক্ষণের মধ্যে সমস্ত দোকান বন্ধ হয়ে যাবে। চাইলেও খেতে বসতে পারছি না। হোটেলটা আগে খুঁজে পাওয়া দরকার। ভাষাগত জটিলতার কারণে সমস্যা যেন জটিল আকার ধারণ করল। হাঁটছি, এই গলি সেই গলি। কথায় পরিষ্কার করতে না পারলেও কোন মতে যদি কাউকে বুঝানো যায় আসলে কি চাচ্ছি বা কোন জায়গা খুঁজছি; দেখা যায় সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল ফোন বের করে ম্যাপ দেখে সাহায্য করার চেষ্টা করে। কোনো কোনো গলিতে ঘুরে একাধিকবার এসেছি কিন্তু ইয়োলো ম্যাঙ্গো হোটেলের দেখা পাই না। পথে এমন কিছু তরুণ-তরুণীকে পেলাম যাদের দেখে অনুমান করা যায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী কিন্তু তারা আমাদের বিন্দু মাত্র সাহায্য করতে পারল না। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই না-সূচক হাত নেড়ে বুঝিয়ে দেয় ইংরেজি জানে না। একে তো ঠিকানা খুঁজে পাওয়ায় বিড়ম্বনা তার উপর দিয়ে গরমে শরীর ঘেমে কাহিল। কথা বলতে না পারলেও বিষয়টা বুঝে নিয়ে এক দোকানি বৃদ্ধা সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলেন এবং তাকে শুধু অনুসরণ করতে বললেন। রাতের অন্ধকারে চিকন গলির মাঝ দিয়ে তার পিছে পিছে যেতে হলো বেশ খানিকটা পথ। মোটামুটি একটা বিলাসবহুল হোটেল দেখিয়ে তিনি বিদায় নিলেন। তার এই অসামান্য উপকারের কথা কোন দিনই ভুলবার নয়।

বৃদ্ধার দেখিয়ে দেয়া হোটেলে আমাদের থাকার সামর্থ হলো না, তবে সেখান থেকে বিকল্প ব্যবস্থার পরামর্শ মিললো। রাত বেড়ে অনেকটা বাজে, ঘুমানোর একটা বন্দবস্ত না হলে নির্ঘাৎ রাস্তায় বসে বসে রাত পার করতে হবে। এক পর্যায়ে ইয়োলো ম্যাঙ্গোর আশা বাদ দিয়ে অন্য কোন জায়গা খোঁজাকে শ্রেয় মনে করলাম। সমস্ত হোটেল ভরা, খালি জায়গা নেই। এমন সময় শুরু হলো বৃষ্টি। হুড়মুড় করে দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ি এক হোটেলে। জানানো হলো দুই জনের থাকার মতো ফাঁকা জায়গা নেই তবে একজনের হতে পারে। বৃষ্টি ভেজা এই রাতে আর কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। কোন রকমে একটা ব্যবস্থা করে দেয়ার অনুরোধ করার আগেই নারী ব্যবস্থাপকের বোধহয় আমাদের জন্য মায়া হলো। সেটা তার আচরণে কিছুটা হলেও ফুটে উঠলে আমরা যেন আশাবাদী হওয়ার সাহস পেলাম। কম্পিউটারের কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। এবং উপকারের মাত্রা বুঝাতে অবগত করলেন, আমাদের জন্য তাকে একটা বুকিং বাতিল করতে হলো। সে জন্য যে আমরা কৃতজ্ঞ তা জানাতে আমরাও কার্পণ্য করলাম না। (চলবে)




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ ডিসেম্বর ২০১৭/তারা

   
 



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

এবার সাদা রঙের ইয়াবা

২০১৮-১০-২১ ৮:৪৮:৫৮ পিএম

ঢাকা-মস্কো কমিশনের বৈঠক সোমবার

২০১৮-১০-২১ ৮:১৬:০৯ পিএম

ধরন পাল্টেছে কিশোর অপরাধের

২০১৮-১০-২১ ৮:০৪:৩৭ পিএম