যে গাড়ির হেলপার নেই

প্রকাশ: ২০১৮-০১-১০ ৩:১৭:২০ পিএম
ফেরদৌস জামান | রাইজিংবিডি.কম

(ভিয়েতনামের পথে: ষষ্ঠ পর্ব)

ফেরদৌস জামান: বাস ছাড়বে নির্দিষ্ট জায়গা থেকে, নির্দিষ্ট সময়ে। অপেক্ষায় আছি, কয়েক মিনিট পর একটা বাস চলে এলো। যখন জানলাম এটাই আমাদের মে হং সন নিয়ে যাবে তখন অবাক না হয়ে পারলাম না- বাস এত সুন্দর হয় কী করে! দ্বিতল বাসে আমাদের আসন উপরে। নিচ তলায় মাত্র কয়েকটা আসন, বাদবাকী জায়গায় ওয়াশ রুম, ব্যাগ এবং খাবার রাখার ব্যবস্থা। উপরে উঠে আসনে বসামাত্র মন ও শরীরজুড়ে বয়ে গেল এক শান্তির অনুভূতি।

আরামদায়ক আসন। জনপ্রতি একটা করে কম্বল ও কুশন এবং আরাম করে ঘুমানোর জন্য ঘারের নিচে দেয়ার জন্য আলাদা তুলতুলে ছোট্ট কুশন। আমি ওর নাম দিলাম আরামবন্ধনী। প্রশস্ত কাচ দিয়ে মোড়ানো বাসের ভেতর থেকে বাহিরটা সুন্দর দেখা যায়। তুলনা করে বললে বিমানের চেয়েও আরামদায়ক ও পরিচ্ছন্ন বন্দোবস্ত। ঠিক ছয়টায় বাস ছাড়ল, এক মিনিটও এদিক-সেদিক হলো না। টিকিটের দাম জনপ্রতি ৬৭৫ বাথ। টিকিট কাটার পর কাউন্টার থেকে বিদায় হচ্ছিলাম আর অস্বস্তি নিয়ে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিলাম, যাচাই-বাছাই করার তো কোনো সুযোগ পেলাম না, কে জানে বাস কেমন হবে? কী আর করা, টিকিট যখন হয়ে গেছে তখন মে হং সন পৌঁছতে পারলেই হলো, সে যেনতেন বাস হলেও আপত্তি নেই। বাসের মান যে এত উন্নত হবে তা ধারণার অতীত বলা যায়। সামনের দেয়ালে দুই দুইটা টেলিভিশন। চলছে স্থানীয় ভাষার গান। আমাদের ধ্যান আপাতত সেদিকে নেই। কাচের এ-পার থেকে মনোযোগ দিয়ে দেখছি বাহিরটা। আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বাস চলছে উড়াল সড়ক দিয়ে। ব্যাংককে কম সড়কই আছে যার উপর দিয়ে উড়াল সড়ক নেই। সমস্ত মূল সড়ক যেন ছাদে ঢাকা। কোন কোন সড়কের উপর দিয়ে দুই-তিন স্তরের উড়াল সড়ক নির্মাণাধীন। এমন নয় যে, উপর দিয়ে পথ নির্মাণের কারণে নিচেরগুলো অচল হয়ে আছে। বরং উপর-নিচ সমস্ত সড়ক সমান হারে ব্যবহার হচ্ছে। একটা মোড়ও চোখে পড়ল না যেখানে ট্রাফিক পুলিশ মুখে বাঁশি অথবা হাতে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সংকেত বাতিতেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ব্যাংককের যানবাহণ।

 


বাস পরিচালনায় আছে মাত্র দুইজন লোক- চালক এবং সুপারভাইজার। থাইল্যান্ডে সুপারভাইজারকে কী বলে জানি না তবে হেলপার নেই। যে অনবরত বলবে- এই ডানে, এই বাঁয়ে। টেলিভিশনে ভিডিও গানের পাশাপাশি দেখাচ্ছে এখন সময় কত এবং কত কিলোমিটার গতিতে যাচ্ছে। লাল স্যুট এবং কালো প্যান্ট পরা সুপারভাইজার ঘুরে ঘুরে দেখছেন সব ঠিকঠাক আছে কি না। তার মুখে মিষ্টি হাসির ছোঁয়া যেন লেগেই আছে। স্যুটে পিন দিয়ে রাজার ছবি সংবলিত কালো ব্যাজ আটকানো। রাজার মৃত্যু হয়েছে এক বছর আগে। তাহলে কি তারা এই দীর্ঘ সময় ধরেই শোক পালন করছে? পথের জন্য কিছু খাবার ও পানি নিয়েছিলাম। অন্যদের সাথে কোনো খাবার নেই। থাকলে নিশ্চই তা সামনের পকেটে রেখে দিত! এতে নিজেদের বেশ সতর্ক এবং বুদ্ধিমান মনে হলো। কয়েক মিনিট পর সুপারভাইজার ট্রেতে পানির বোতল এনে প্রত্যেককে একটা করে সরবরাহ করলেন। এখন মনে হলো খামাখা পানির বোতল টেনে এনে কী লাভ হলো? কয়েক মিনিট পর দিতে এলেন কেক এবং পাউরুটি। সুজিত আমি পরস্পরের দিকে তাকাচ্ছি না, যেন এসব যে দেবে তা আগে থেকেই জানা ছিল। এখানেই শেষ নয়, সুপারভাইজার নিঃশব্দে মন্থর গতিতে শুধু যাচ্ছেন আর কিছু না কিছু নিয়ে আসছেন। এবার এলেন দুধ এবং জুসের প্যাকেট দিতে। আর পারা গেল না, সুজিতের দিকে তাকাতেই দুজনের মুখ ভরে বেরিয়ে আসে বোকা এবং অবাক বনে যাওয়া এক ধরনের মিশ্র হাসি।

বাস চলে এসেছে শহরের বাইরে। দুপাশে ফাঁকা, অনেক দূর পরপর দুএকটা স্থাপনা। সুপ্রশস্ত সড়ক, কত লেনের হবে তা বলা মুশকিল। বাস চলছে ঘণ্টায় আশি-নব্বই কিলোমিটার বেগে। এখন পর্যন্ত এতটুকু ঝাকুনি অনুভূত হয়নি। কথা ছিল কী দেখলাম, কী শিখলাম বা কী খেলাম এসব নিয়ে দুজনে অনেক রাত পর্যন্ত জাবর কাটব। সারা দিন হাঁটা হয়েছে অনেক। তার উপর দিয়ে পিঠে ছিল ওজনদার একটা করে ব্যাগ। সুতরাং পরিশ্রমের পর এমন আরামের ব্যবস্থা পেলে একটা সময় পর দুচোখ মেলে রাখাটা বড়ই দুস্কর হয়ে যায়। নয় কি সাড়ে নয়টার মধ্যে সুজিত হারিয়ে গেল ঘুমের অতল দেশে। যে কোন ধরনের যানবাহণে আমার সহজে ঘুম আসে না। দেখা যায় ঘুমালেও তা একটানা হয়ে ওঠে না। তবে আজকের ঘটনা একটু ব্যতিক্রম। বাসে এত কিছু খেয়ে নিজেকেও আর বেশিক্ষণ টেকাতে পারলাম না।

 


মাঝ রাতে বাস থামল অত্যন্ত নিরিবিলি এক রেস্টুরেন্টে। মাত্র একটা বাস দাঁড়িয়ে আছে। প্রস্রাবখানা থেকে ফিরে দেখি আগের বাস আগের জায়গাতেই আছে কিন্তু আমাদেরটা নেই! ঘুরে অপর পাশে যাওয়ার আগেই খেয়াল করলাম রেস্টুরেন্টের ভেতর থেকে সুপারভাইজার হাতের ইশারায় ডাকছেন। ভেতরে ঢুকতেই খাবার নিতে বলা হলো। তখনও আমরা জানি না কী ঘটতে যাচ্ছে! কাউন্টারে যখন বাসের টিকিট দেখাতে বলা হলো তখন নিশ্চিত হলাম এটাও বাস সেবার অন্তর্ভূক্ত। মাংস, ডিমসহ কয়েক প্রকার তরকারি। সাথে সাদা ভাত। ভাতের সাথে তরকারি নেয়া যাবে যে কোন দুইটা। পরামর্শ করার সুযোগ না পেলেও আমরা নিলাম ভিন্ন ভিন্ন তরকারি। এক জনের সাথে আরেকজনের মিল নেই। ওই যে, আমরা এক সাথে খাব কিন্তু খাবার নেব আলাদা ধরনের, ভাগাভাগি করে খাব। অধিক পদের স্বাদ চেখে দেখা ও পরখ করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য। এমন সেবা পাবার পর সন্তুষ্টির ভাষা কী হতে পারে তা খোঁজাখুঁজির বৃথা চেষ্ট না করে আমরা বরং নির্বাকই থাকলাম। আবারও বাস ছেড়ে দিল। দিনের আলো ফুটে বেরুবার সাথে সাথেই যেন সজাগ হয়ে গেলাম। ভাঙা-ছেঁড়া ঘুম হলেও যথেষ্ট হয়েছে। এবার বরং বাহিরটা দেখা যাক। পাহাড়-পর্বতের মাঝ দিয়েও এই প্রত্যন্ত এলাকায় এত উন্নত আর পরিচ্ছন্ন সড়ক হয় কী করে! উঁচু-নিচু আর আঁকাবাঁকা পথেও কোন সংকেত বা হর্ন নেই, নির্দিষ্ট লেন ধরে ক্লান্তিহীন এগিয়ে চলছে বাস। খেয়াল করেছি সারা রাতে হর্নের শব্দ কানে এসেছে গুনে গুনে মাত্র তিন বার। কোন গাড়ি থেকে সে শব্দ এসেছে তা নিশ্চিত হতে পারিনি। অরণ্য আচ্ছাদিত সড়কের পাশে বহুদূর পরপর একটা দুইটা বাড়ি। ভালোভাবে খেয়াল করলে দেখা যায় প্রতি ঘরেই বিদ্যুৎ ও পানির বন্দোবস্ত রয়েছে। গৃহপালিত পশুর মধ্যে মুরগিটাই কেবল চোখে পড়ল। ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি গন্তব্যের চেয়ে যাত্রাপথ অধিক শিক্ষণীয় এবং উপভোগ্য তাই তো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রত্যক্ষ করার চেষ্টা করি চোখ ও মনের নাগালের সব কিছু।

 


আমি জানি না মে হং সন থাইল্যান্ডের একমাত্র পার্বত্য প্রদেশ কি না, তবে কোথায় যেন এমন পড়েছিলাম। আর সেই সূত্রে এটাকে থাইল্যান্ড ভ্রমণ তালিকার প্রধান জায়গায় রাখা। সড়কের ধারে জনবসতি খুবই কম, ভেতরের অবস্থা কি হয়ে থাকবে তা সম্পূর্ণই অজানা। প্রকৃতপক্ষে এই এলাকায় জনবসতি যে কম; প্রাথমিকভাবে তা অনুমান করা যায় জুমের সংখ্যা দেখে। হাতে গোনা দুএকটা জুম ক্ষেত কেবল চোখে পড়ল। তাও আবার যত্রতত্র নয়, উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন করা জুম। জুমের গঠন পদ্ধতি কিছুটা নেপালের মতো, ধাপে ধাপে বানানো। দূর থেকে দেখে মনে হবে পাহাড় থেকে নেমে আসা অনেক সিঁড়ি।  প্রায় ষোলো ঘণ্টার বাস ভ্রমণ শেষে সকাল সাড়ে নয়টায় পৌঁছলাম মে হং সন। পাহাড়ের পাদদেশে পরিষ্কার পরিপাটি ছোট্ট একটা বাস টার্মিনাল। বাস থেকে নেমে চারপাশটা এক নজর দেখে নেয়ার পর বেশ উৎফুল্ল লাগল- নতুন আর একটা জায়গায় চলে এলাম! (চলবে)

 


রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ জানুয়ারি ২০১৮/তারা

   
 



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

এবার সাদা রঙের ইয়াবা

২০১৮-১০-২১ ৮:৪৮:৫৮ পিএম

ঢাকা-মস্কো কমিশনের বৈঠক সোমবার

২০১৮-১০-২১ ৮:১৬:০৯ পিএম

ধরন পাল্টেছে কিশোর অপরাধের

২০১৮-১০-২১ ৮:০৪:৩৭ পিএম