পশুপাখি যা ছিল সব পালিয়ে বাঁচল

প্রকাশ: ২০১৮-০২-০৮ ১:৩৭:৫৫ পিএম
ফেরদৌস জামান | রাইজিংবিডি.কম

(ভিয়েতনামের পথে: ১৩ তম পর্ব)

ফেরদৌস জামান: মে হং সনে কেনা কলার প্রায় অনেকটাই অবশিষ্ট ছিল। সাথে আগের রাতে কেনা মাখন ও পাউরুটি। এই দিয়ে সকালের নাস্তা করে সাড়ে ছয় কি সাতটায় বেরিযে পরলাম। পাড়ি দিতে হবে অনেকটা পথ তাও আবার পায়ে হেঁটে! এখানে দেখার কি আছে তার একটা চমৎকার তালিকা দেশ থেকেই করে আনা হয়েছিল। আমাদের অজকের গন্তব্য পেমবক ওয়াটার ফল এবং পাই ক্যানিয়ন। উভয় লক্ষ্য একই পথে। সুতরাং প্রস্তুতিটা সর্বোচ্চ মানের হওয়া চাই। এই সমস্ত গন্তব্যে পর্যটকরা হয় প্যাকেজ ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে, নয়তো মোটর সাইকেল নিয়ে নিজের মত যায়। পায়ে হেঁটে কেউ যায় না। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে অন্তত এমনটাই জানা গেল।

চলতি পথে যে ক’জন মানুষের সাথে কথা হয়েছে প্রত্যেকেই অবাক হয়ে গেছে এমনকি কেউ কেউ নিরুৎসাহিতও করেছে। তাদের ক্ষেত্রে এমনটা ভাবা স্বাভাবিক। তবে পশ্চিমারা প্রত্যেকেই সাধুবাদ জানিয়ে সফলতা কামনা করেছে। শহর পেরিয়ে মাহাসড়কে পনের থেকে বিশ মিনিট সবে হয়েছে অমনি শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। একটা মোটর গ্যারেজের ছাউনিতে বৃষ্টি কমার অপেক্ষা করছিলাম। খেয়াল করলাম, বৃষ্টি তো কমলোই না, উল্টো আকাশে ঘন কালো মেঘ এসে জুড়ে বসল। বৃষ্টির ভয়ে অধিক সময় বসে থাকার পরিণতি যা হতে পারে তা হলো, লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়া। অতএব, কালক্ষেপণ না করে বুটজোড়া খুলে রাবারের স্যান্ডেল পরে রওনা হলাম। পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে যে সব ব্যবস্থা নিয়েছিলাম তা যথার্থ প্রমাণিত হলো। পরনে হাফপ্যান্ট, গায়ে গেঞ্জি আর মাথার উপর ছাতা। সড়কের পাশ ধরে এগিয়ে চলছি। বৃষ্টি ঝড়ছে অবিরাম। বৃষ্টি ফোঁটার ঘনত্বে গাড়িগুলো হেডলাইট জালাতে বাধ্য হচ্ছে এবং পানির কারণে ভারি হয়ে যাওয়া পথ চিড়ে-ফেড়ে বেশুমার এগিয়ে চলছে।

পথ উঠে গেছে ঐ উঁচুতে। তবে তা হঠাৎ করে নয় বরং ধীরে ধীরে অনেকটা ধৈর্য নিয়ে। তাতে করে যে কোনো ধরনের ঝুঁকি এবং অযথা ইঞ্জিনের শক্তি ক্ষয় দুই-ই এড়ানো সম্ভব হয়। সড়ক অবকাঠামো নির্মাণে সুচিন্তিত ও বাস্তব সম্মত পরিকল্পনর চমৎকার উদাহরণ। পাহাড়ি ঢলে ইতিমধ্যেই নদীটা ঘোলা পানিতে ফুলে টইটুম্বুর। সেতু পেরিয়ে সড়কের শীর্ষদেশে যেতে যেতে বৃষ্টি খানিকটা হলকা হয়ে এলো। এ পর্যায়ের পথটা এই বৃষ্টি তো এই বৃষ্টিহীন সো সো বাতাস। আমরা থেমে নেই, পরিস্থিতি অনুকূলে নিয়ে চলছি আর চলছি। জানি না কত কিলোমিটার যেতে হবে তবে আমাদের বাস্তবতায় এই পথটুকু সুদীর্ঘ বলা যায়। অনেক দূর পরপর ওঠানামা। বাম পাশে বিস্তীর্ণ উপত্যকার ধান ক্ষেতে বাতাসের ¯্রােত বয়ে যাচ্ছে। এমন সবুজের মাঝে হঠাৎ দুই-একটা খামার বাড়ি। খামার বাড়ি নয় যেন এক টুকরো স্বপ্নের রচনা। উপত্যকার শেষ প্রান্ত দিয়ে দীর্ঘ পর্বত সারি। মেঘ-বৃষ্টিতে পর্বতের দেয়াল গাঢ় সবুজ রূপে ধরা দিয়েছে। ঠিক তার মাঝ থেকে মাথা বের করে রয়েছে বকের পালকের মত ধবধবে সাদা কিছু একটা। এত দূর থেকেও ঠিকই বোঝা যায়, ধ্যানমগ্ন বুদ্ধদেব। এক পর্যায়ে মেঘের পড়ত ফুড়ে বেরিয়ে এলো মিষ্টি রোদ। সেই সাথে এই পর্যায়ের পথও ফুরালো। মহাসড়ক থেকে ডান দিকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেছে সরু পথ। মোড়ে টিনের ছাউনি দেয়া কাঠের উন্মুক্ত বিশ্রামাগার। হেলান দেয়া বেঞ্চ; শরীরটা যেমন দু’দ- বিশ্রামের জন্য ব্যাকুল তেমনি পেট মহাশয়ও কিছু খাওয়ার জন্য কচলাকচলি শুরু করে দিয়েছে।
 


এত পরিশ্রমের পর খুঁজে পাওয়া পথ, মনের ভেতর এক ধরনের স্বার্থকতার অনুভূতি বয়ে গেল। তবুও দ্বিধা কাটে না- ঝরনায় যাওয়ার পথ এটা নাকি আরও সামনে। কারণ মহাসড়ক থেকে বেড়িয়ে যাওয়া এখন পর্যন্ত যত রাস্তা দেখে এলাম সবকটাকেই ঝরনার পথ মনে হয়েছে। ব্যাগ থেকে কলা বের করে খাচ্ছি আর শারিরীক ও মানসিক প্রস্তুতিতে নিজেদের সজ্জিত করছি- এখনও হাঁটার বাকি রয়েছে অনেক! ফুটফুট শব্দ তুলে পেরিয়ে গেল বেশ কয়েকটা স্কুটি। হাই, হ্যালো আর দু’এক কথায় নিশ্চিত হলাম, সঠিক পথেই আছি। এমনিতেই পাই একটা প্রত্যন্ত শহর, তার ওপর দিয়ে চলে এসেছি শহর ছেড়ে আরও প্রত্যন্ত এলাকায়। জনবসতি খুবই কম। ঘরবাড়ি একেবারেই হাতে গোনা- এখানে একটা তো আধা কিলোমিটার দূরে আর একটা। ঘরের কাঠামো ওই একই, পার্বত্য অঞ্চলে সাধারণত যা হয় আরকি। মজবুত খুঁটির উপর দাঁড় করানো তবে বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে এখানকার ঘরের ভিন্নতা এতটুকুই- সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে তৈরি, বাঁশের ব্যবহার নেই। আর জুম চাষের কথা বলতে গেলে তা অনেক উন্নত। ক্ষেত পর্যন্ত ট্রাক্টর বা গাড়ি যাওয়ার পথ এবং ফসল পরিবহণের জন্য পিকআপ বা ক্যারিবয় ধরনের গাড়ির ব্যবস্থাও আছে। কোন কোন জুম ক্ষেত একেকটা মাঝারি আকারের ফার্ম হাউসের মত। ট্রাক্টর দিয়ে চলছে জমি কর্ষণের কাজ। সামনে একটা বসতি। বসতির মুখেই সাজিয়ে রাখা বেশ কিছু পাকা, আধাপাকা কলা। আজকের পথ অনেক লম্বা। তাছাড়া, দামেও বেশ সস্তা। অতএব, রসদ হিসেবে আপাতত এর বিকল্প হতে পারে না।

কলা খরিদ করতে গিয়ে এই সময়ের মধ্যে আমাদের সাথে যুক্ত হয় একাকি এক ইয়োরোপিয়ান নারী। একসাথে চলছি অনেকক্ষণ। স্বল্পবাক এবং ন¤্র স্বভাবের সহযাত্রীকে একরূপ খুঁচিয়ে খুঁচিয়েই কথা বলাতে হচ্ছে। কোথায় ভাগাভাগি করবো অভিজ্ঞতার দুই-চার কথা তা নয়, তিনি এক বিষণœœ চেহারা করে হাঁটছেন। কি জানি, সহযাত্রী হিসেবে আমাদের হয়তো পছন্দ হয়নি! এক পর্যায়ে পরিস্থিতি অস্বস্তিতে রূপ নিল। না পারছি আমরা তাকে ছেড়ে চলে যেতে, না সে আমাদের। সামনেই বাগানবিলাস আর ফুলগাছ ঘেরা একটা দোকান। লেখা আছে দ্য ল্যান্ড স্পিøট। অর্থাৎ এখান থেকে ডানে একটু উপরে ট্রেইল ধরে এগুলে এক বিশেষ জায়গা আছে, যেখানে গেলে দেখা যায় স্বল্প দৌর্ঘ্যরে এক খাদ। বর্তমানে জায়গাটি পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দোকানে বসা নারীর সম্মুখে বেশ কিছু ব্যাগ ও জুতা-স্যান্ডেলের স্তুপ। তার সাথে কথা বলা শুরু করতেই এগিয়ে এলেন তার বাবা। ভাঙা ইংরেজি দিয়ে তিনি বর্ণনা করার চেষ্ট করলেন জায়গাটার গুণ। এতক্ষণ পর্যন্ত ভাবছিলাম যাব কি যাব না। কারণ সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আর এই জায়গাটা সম্পূর্ণই পরিকল্পনার বাইরের বিষয়। ভেবে দেখলাম পরিকল্পনা ছাড়া যেমন কোন কিছু করা অনুচিত তেমনি পরিকল্পনার মধ্যে সবকিছু আবদ্ধ করে ফেললে কখনও কখনও রোমাঞ্চের ঘাটতি হয়। প্রবেশ মূল্য পরিশোধ করার মত উটকো কিছু নেই। তাদের স্বার্থ একটাই পর্যটকরা ল্যান্ড স্পিøট দেখে ফেরার পথে মন চাইলে দোকান থেকে নাস্তা অথবা ফলের জুস কিছু খাবে।
 


যথারীতি ব্যাগ রেখে ট্রেইল ধরে এগিয়ে যেতে থাকলাম। বৃষ্টিতে হালকা পিচ্ছিল ও কাদা হয়ে গেছে। সাবধানে এগিয়ে যেতে যেতে প্রবেশ করলাম বাঁশঝাড়ের এক গহীন জঙ্গলে। পেছনে তাকিয়ে দেখি আমাদের ইউরোপিয়ান সহযাত্রীটি নেই। ট্রেইলের মাঝখানে কোথাও ছাড়া পরেছে। বিপরীত দিক থেকে ভিন্ন এক ট্রেইলে সাদ-কালো পশ্চিমা দর্শনার্থীর দল এসে যুক্ত হলো মূল ট্রেইলে। তাদের হৈচৈ আর অতি উল্লাসে আপাতত কুলানো কঠিন। এক অস্বস্তি থেকে নিস্তার পেয়ে পরে গেলাম আরেক অশান্তিতে। আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হতে থাকল। আশপাশে পশুপাখি যা ছিল তা বোধহয় পালিয়ে বাঁচল। এখান থেকে শুরু পাহাড়ের ফাটল। পাথর নয় তবে পাথরের কাছাকাছি ধরনের খরখরে মোটা বালির শক্ত চাই। যেন পাহাড়টাকে দুই হাতে দিয়ে দুই পাশে সরিয়ে রেখেছে। খাড়া দেয়ালের মাঝ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, দুই দেয়াল আবার দু’পাশ থেকে এগিয়ে এসে চাপা দিয়ে না মারে!

মূল ফাটল থেকে ডানে-বায়ে এগিয়ে গেছে আরও দু’একটা সরু ফাটল। মেপে দেখার পর কোন এক ফাটল ধরে এগুতে চাইলে কিছু দূর গিয়ে ব্যর্থ হয়েই ফিরতে হলো। লাল প্রাচীরের গোড়া দিয়ে থোকা থোকা ফণিমনসার ঝোঁপ মাড়িয়ে আরও কিছু দূর এগিয়ে পুনরায় ফিরে আসতে হলো মূল ট্রেইলে। এখান থেকে আর এক ফাটল ধরে পাহাড়ের ওপরে আরোহণের পথ। উপরটায় ঘাসের চত্বরের মাঝে ছোট্ট এক প্রার্থনা ঘর। এখানেও ধর্ম চর্চার বিষয়টি বেশ জটিল। বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী হলেও জায়গায় জায়গায় বিচিত্র কিছু দেব-দেবি মূর্তির সংরক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। কি শহর আর কি জঙ্গল, পথের ধারে কিছু দূর পরপর মন্দির আকৃতির ছোট্ট বস্তুর দেখা মেলে। খুঁটি বা টেবিলের উপর স্থাপন করা কাঠের এই জিনিসের ভেতর কোন মূর্তি থাকে না। অথচ, ফুল-ফল এমনকি জুস-কোকের বোতলের অর্ঘ্য দেখা যায়। ব্যাংকক থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি জায়গাতেই এটি দেখলাম।
 


এবার পাহাড় থেকে ছোট্ট জুম ক্ষেতের মাঝ দিয়ে নেমে আসতে হলো। সংক্ষিপ্ত এই পরিভ্রমণে  সময় একটু গেল বটে, তবে প্রকৃতির এক চমৎকার নিদর্শন দেখা হলো। সানন্দে নিচে নেমে কেউ কেউ বাঁশের হ্যামকে শরীর ছেড়ে দিয়ে মুখে ঢুকিয়ে রেখেছে রঙিন জুসের নল অথবা প্রাণ ভরে ধুমপান করছে। সানন্দে আমরাও বেরিয়ে পড়লাম। আমরা যে কিছু খেলাম না তাতে তাদের চোখে-মুখে আশাহত বা বিরক্ত হওয়ার কোন অভিব্যক্তি প্রকাশিত হলো না। অধিকন্তু, ধন্যবাদের সাথে বিদায় জানাতে এতটুকু কার্পণ্য করল না। (চলবে)



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮/তারা

   
 



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

সাহিত্য সংবাদ

২০১৮-০৯-২১ ৯:২১:২৩ এএম

নতুন লড়াইয়ে পুরনো উত্তাপ

২০১৮-০৯-২১ ৮:৩৭:২৯ এএম