রেশমপথের শহর উরুমছিতে || শান্তা মারিয়া

প্রকাশ: ২০১৮-০২-১০ ৮:২২:৫৬ এএম
শান্তা মারিয়া | রাইজিংবিডি.কম

চীন আমার অতি প্রিয় এক দেশ। সত্যি কথা বলতে গেলে চীনে আমি যতটা সাচ্ছন্দ্য বোধ করি সেটা আর কোন দেশে হয় না। চৈনিক ভূমিতে পা দেওয়া মাত্র বিশেষ এক ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হই। তাই সুযোগ পেলেই চীন ভ্রমণে যাওয়ার চেষ্টা করি। ২০১৭ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ১১ দিনের একটি কর্মসূচিতে আবার চীনে যাওয়ার সুযোগ হলো। চীন সরকার তাদের মিডিয়া ট্যুর কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশের ১২জন সাংবাদিককে চীন সফরে নিয়ে যান। সেই সফরে যাবার সুযোগ পেলাম প্রিয় মহাপ্রাচীরের দেশে। এই সফরে আমরা চারটি প্রদেশের পাঁচটি শহরে ভ্রমণ করি। এই শহরগুলোর মধ্যে উরুমছিতে তিনদিন ছিলাম।

শিনচিয়াং হলো চীনের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত উইগুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। বিশাল একটি অঞ্চল। ১.৬ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার এলাকা।এই অঞ্চলের রাজধানী উরুমছি। প্রাচীনকালে রেশমপথ ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যপথ। সাত হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ এই পথে  সুপ্রাচীনকাল থেকে চলছে বাণিজ্য। এর নামই সিল্ক রোড বা রেশমপথ। প্রাচীনকালে চীন, ভারত, পারস্য, খরেজম, আরবভূমি, অটোমান সাম্রাজ্য, মিশর, রাশিয়া, গ্রিস ও রোমকে যুক্ত করেছিল এই পথ। বলা যায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের প্রধান বাণিজ্য পথ ছিল এই সিল্করোড। শুধু বাণিজ্যই নয়, পূর্ব ও পশ্চিম সভ্যতার যোগসূত্র স্থাপন করেছিল এটি। বিশ্বের বড় বড় বিজেতারা এই পথ ধরে চালনা করেছেন তাদের সৈন্যদল। অবশ্যাম্ভাবীভাবে লুট, ধ্বংস, দখলেরও সাক্ষী এই পথ। এই পথ ধরে বাহিনী পরিচালনা করেছেন সম্রাট আলেকজান্ডার, চেঙ্গিস খান, তৈমুর লং, বাবরশাহ। কখনও পূর্বে, কখনও পশ্চিমে চলেছে বিজয়ীর বাহিনী। এই পথের শহরগুলোর মধ্যে রোম, অ্যাথেন্স, কিয়েভ,  পার্সেপোলিস, আলেকজান্দ্রিয়া, কায়রো, সমরখন্দ, বুখারা, গুরগঞ্জ, উরুমছি, বেইজিং, কিয়েতো, হিরাত, কাবুল, দিল্লি এমন বহু বিখ্যাত শহরের নাম ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করছে।
 


রেশমপথের পূর্ব প্রান্তে চীনের সিআন শহর। চীনের সান সি, কান সু, নিং সিয়া, ছিং হাই, শিনচিয়াং প্রদেশ হয়ে পামীর মালভূমি অতিক্রম করে মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক ,সিরিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগরের পূর্বতীরে বলকান পর্যন্ত পৌঁছেছিল এই পথ। ভারতও যুক্ত ছিল এই পথের সঙ্গে। এমনকি শেরশাহর গ্র্যান্ড ট্রাংক রোডের মাধ্যমে বাংলার সোনারগাও পর্যন্ত এই পথের বিস্তার ছিল বলে ধরা যায়।  চীনের হান রাজবংশের শাসনামলে (২০৭-২২০ খ্রিস্টপূর্ব) এই পথ দিয়ে বাণিজ্য শুরু হয়। এই বাণিজ্যপথের উপর ডাকাতদল, যাযাবর জাতির মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়তো। নাম রেশমপথ হলেও এই পথ দিয়ে সকল ধরনের পণ্যসামগ্রী বয়ে নিতেন সওদাগররা। এমনকি বাংলার মসলিন ও অন্যান্য সূতিবস্ত্রও পৌঁছে যেত রোমে।

সুপ্রাচীন সেই রেশমপথকে নতুনভাবে জাগিয়ে তুলতে চলতি শতাব্দিতে উদ্যোগী হয়েছে চীন। রেশমপথ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও একুশ শতকের রেশমপথ চীনের প্রস্তাবনা। ‘এক পথ এক অঞ্চল’ নামে রেশমপথ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে মৈত্রী গড়তে চাইছে চীন। ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’- এক পথ এক অঞ্চল বিষয়ক বিভিন্ন পরিকল্পনা কর্মসূচি চীনের সদ্য সমাপ্ত উনিশতম জাতীয় কংগ্রেসে ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছে। বলা যায় চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি সি চিন পিং এই ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড কর্মসূচিকে ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই অঞ্চলের আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে অর্থনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে চীনের প্রভাব অনেক বৃদ্ধি পাবে বলাবাহুল্য। রেশমপথ অঞ্চলের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে চীনের শিনচিয়াং প্রদেশ। এখানে বাস করেন ১ কোটিরও বেশি মুসলিম। চীনে যে ২.৩ কোটি মুসলিম রয়েছেন তাদের প্রায় অর্ধেকই বাস করেন এই প্রদেশে। এটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ। এই প্রদেশের রাজধানী উরুমছি। প্রাচীনকাল থেকেই যার বাণিজ্যিক গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে বাস করে উইগুর, উইরাত, তাজিক, কাজাখ, তুর্কমেন, হুই, মঙ্গল, কিরঘিজ, আফগান, মঙ্গোল, কিপচাক, কারাকিতাই, জাগতাইসহ মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন জাতির মানুষ। এর মধ্যে দশটি জাতির মানুষ মুসলিম। আর চীনের সংখ্যাগরিষ্ঠ হান জাতির মানুষ তো আছেই। তারা এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ।  অঞ্চলটির রাজনৈতিক গুরুত্বও ব্যাপক। চীনের উত্তর পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত শিনচিয়াং । সীমান্তে রয়েছে ভারত ও রাশিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিবেশী। এখানে রুশ প্রভাবও অনেক বেশি। প্রচুর রুশ বাস করেন এখানে। রয়েছে বেলারুশ জাতির অনেক মানুষ। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আরও আছে মঙ্গোলিয়া, কাজাখস্তান, কিরঘিজস্তান, তাজিকিস্তান, পাকিস্তান ও আফগাস্তিান। তেল, খনিজ সম্পদ ও মূল্যবান রত্ন সম্পদেও এই প্রদেশ সমৃদ্ধ। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ২০১৪ সালে সিনচিয়াং পরিদর্শনে গিয়ে উরুমছির মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। উরুমছির বৃহত্তম মসজিদে যান তিনি। আলাপ করেন প্রধান ইমাম মুখতারাম শরীফের সঙ্গে। রাষ্ট্রীয় খরচে মসজিদ কমপ্লেক্সের উন্নয়নে ভালো রকম অর্থ ব্যয় করেন।  ১৯তম জাতীয় কংগ্রেসে উরুমছির উইগুররা তাই সি চিন পিংয়ের সাফল্য কামনা করেন। অন্তত এমনটিই জানান মুখতারাম শরীফ।
 


এই সফরে গিয়ে শিনচিয়াংয়ের মানুষজনের সঙ্গে যেমন আলাপ হলো, তেমনি এই এলাকার অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেও মুগ্ধ হলাম। এখানে গ্র্যান্ড বাজার বা মসজিদ বাজার নামে একটি বড় জায়গা রয়েছে। সেখানে মসজিদের বিশাল মিনারের স্থাপত্যশৈলী অনবদ্য। এখানে শপিং করারও সুযোগ পেলাম। বিরাট শপিং কমপ্লেক্স। মধ্য এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী পোশাক থেকে শুরু করে স্যুভেনির আর খাবারের ছড়াছড়ি। নিজের দোকানে বেচাকেনার ফাঁকে ফাঁকে হাসিমুখে গল্প করছিলেন মারহাবা। তিনি নিজেই এই দোকানের বিক্রেতা এবং মালিক। দক্ষহাতে হিসাবপত্র সামলাচ্ছেন, ক্রেতাদের সঙ্গে দর কষাকষি করছেন, সেইসঙ্গে ছোট্ট সন্তানটিকেও দেখাশোনা করছেন। অবশ্য একাজে তাকে সহায়তা করছেন তার স্বামী আক্রাম। মারহাবা হলেন চীনের উরুমছি শহরের একজন নারী। উরুমছি শহরে বিভিন্ন জাতির মুসলিম নারীরা স্বাধীনভাবে বেছে নিচ্ছেন বিভিন্ন পেশা। ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন অনেকেই। রেস্টুরেন্ট, পোশাকের দোকানসহ বিভিন্ন রকম ব্যবসা পরিচালনা করছেন তারা। চীনের অন্যান্য শহরের মতো এখানেও নারীদের ব্যস্ত পদচারণা চোখে পড়ে। রাস্তাঘাটে বড় বড় গাড়ি সাবলীলভাবে চালাচ্ছেন নারীরা। যে প্রতিষ্ঠানেই যাই না কেন, চোখে পড়ছে নারীর স্বতঃস্ফূর্ত ও সম অংশগ্রহণ। শুধু সম অংশগ্রহণ নয় বরং বলা যায় নারীরা যেন পুরুষের চেয়েও বেশি কর্মদক্ষ। এই প্রদেশের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান শিনচিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে প্রশাসনিক প্রধান থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিভাগেও প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন নারী।
 


একটি মাধ্যমিক স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে দেখলাম ছেলে শিক্ষার্থীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন শিক্ষাকার্যক্রমে মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে। এই স্কুলের বিজ্ঞান ক্লাবে শিক্ষার্থীরা বানাচ্ছে ছোট ছোট রোবট। বিজ্ঞান ক্লাবেও ছেলেমেয়ের সংখ্যা সমান সমান। তারা বানাচ্ছে ছোট ড্রোন ঘুড়ি, চালাচ্ছে বিজ্ঞানের নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আবার নাচ, গান, বাজনাতেও পিছিয়ে নেই তারা।

উরুমছির শিল্পকলা প্রতিষ্ঠানে গিয়েও মুগ্ধ হলাম নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে। এখানে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একটি বাদ্যদলের সদস্যদের সঙ্গে আলাপ হলো। এই বাদ্যদলের প্রধান পরিচালক আখমদ পরিচয় করিয়ে দিলেন তার স্ত্রীর সঙ্গে। তিনিও এই বাদ্যদলের সদস্যা এবং বেশ খ্যাতিসম্পন্ন।
 


ব্যালে নৃত্যদলেও রয়েছেন অনেক নারী। তারা দারুণ কৃতিত্বের সঙ্গে তাদের নৃত্যকুশলতা দেখালেন।

উরুমছির কাছাকাছি অনেকগুলো ট্যুরিস্ট স্পট রয়েছে। রয়েছে তিয়েনশান পর্বতের অনন্য সৌন্দর্যমণ্ডিত সব জায়গায় ভ্রমণের সুযোগ। পর্যটকদের জন্য রয়েছে ঘোড়ায় চড়া, উটের পিঠে চড়ার নানা রকম আয়োজন। সেসব গল্প না হয় আরেকদিন হবে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮/তারা

   
 


Walton AC

আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

২০৫ বলে ১ বাউন্ডারি!

২০১৮-১২-১৫ ৯:৪৮:৫০ এএম

টিভিতে আজকের খেলা

২০১৮-১২-১৫ ৮:৩৫:১৪ এএম

জ্বলে-পুড়েও মুগ্ধ দহন’র দর্শক

২০১৮-১২-১৫ ৮:০৭:৫২ এএম