ভিয়েতনামের পথে: ১৬তম পর্ব

প্রকাশ: ২০১৮-০৩-০৯ ৪:৩৫:২৪ পিএম
ফেরদৌস জামান | রাইজিংবিডি.কম

ফেরদৌস জামান: পাই ক্যানিয়নকে বিদায় জানিয়ে এখনই ফিরতি পথ না ধরতে পারলে বিপদ হয়ে যাবে। তবে কোনো অপঘাতের আশঙ্কা নেই। সন্তুষ্টির ব্যাপর হলো, পরিকল্পনা মাফিক আজকের লক্ষ্য দুটি অত্যান্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। মাঝখান থেকে অর্জিত হয়েছে বিচিত্র কিছু অভিজ্ঞতা। আসলে ঘর থেকে বেরুলেই চারপাশে দেখার উপভোগের বা উপলব্ধি করার কত কী যে ছড়িয়ে থাকে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা আমাদের নজরে আসে না। নিজের মাঝ থেকে দেখার সেই দৃষ্টিভঙ্গি আবিষ্কারের অবিরত প্রচেষ্টা একজন পর্যটকের অন্যতম কাজ।

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কত বিষয় যে আছে যার মাঝে সঞ্চিত থাকে অসাধারণ সব গল্পমালা। আজ অব্দি যা দেখছি তা কেবলই গতানুগতিক, বিশেষ কিছু নয়, যেন পূর্বসূরীগণ যা দেখে গেছেন বারংবার তারই পুণরাবৃত্তি ঘটছে। চোখের দেখা; মনের দেখা হয়ে উঠছে না। এখনও অনেক পর্যটক আসছে। বিশেষত তাদের লক্ষ্য ক্যানিয়ন থেকে সূর্যাস্ত দেখা। আর এদের প্রায় শতভাগ প্যাকেজ ট্যুর অপারেটরের ব্যবস্থাপনায় আগত। সাইট সীং করানো প্যাকেজে সাধারণত দিনের সর্বশেষ গন্তব্য হিসেবে থাকে পাই ক্যানিয়নে সূর্যাস্ত উপভোগ করা। চলতি পথে চেনা জানা হওয়া দু’এক জনের সাথে আবারও দেখা হলো। তাদের উৎসাহ আর সাধুবাদের ভাষা এমন যে, তোমরা পারোও বটে! তাতে করে গর্বে আমাদের বুকটা যে সমান্য স্ফীত হয়ে উঠল না তা নয়। ওদিকে স্থানীয়রা শুনে তো এমনভাবে আঁতকে ওঠে যেন চোখ দুটো কোটর ভেঙে এখনই মাটিতে খুলে পরবে! এরা অলস বা ফাঁকিবাজ নয়, তবে হাঁটার বেলায় নারাজ। বস্তবতা হলো, গতিময় বাস্তবতার সাথে চলতে গিয়ে সময়ের হিসাব তাদের একটু কর্কশভাবেই কষতে হয়।

 


পথ এগুলো অনেকটাই। চলে এসেছি সেই একাকি রেস্টুরেন্টে। অর্জনের উৎফুল্লতায় এবার তবে আবারও কফি পান করা যাক। বাইরে বসা কিশোরী ফ্রিজ দেখিয়ে বললো, ওখান থেকে ক্যান বের করে নিয়ে ভেতরে বসে পান করুন। যেন কত দিনের চেনা। অথচ, দেখা আজই এবং মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে। পর্যটক হিসেবে একটু ব্যাতিক্রম ঠেকায় হয়তো মনে রাখতে পেরেছে। অন্ধকার নেমে এসেছে, বাকি আছে পথের প্রায় দশ ভাগের আরও আট ভাগ। তারপরও চিন্তা নেই, পথের পাশ দিয়ে এগিয়ে চলবো সমান তালে। যেখানে মন চাইবে সেখানে বসে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবারও চলতে থাকবো। পথে কোনো বাহণ পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ এখানে পাবলিক পরিবহণ বলতে আছে শুধু পিক-আপ ধরনের ট্যাক্সি। তাও আবার সংখ্যায় একেবারেই হাতে গোনা। সুতরাং, দেখা মেলার সম্ভাবনা আজ আর নেই। যদি রিজার্ভ কোনো ট্যাক্সিতে জায়গা করে নেয়া যায় তাহলেও চলে। মাথা প্রতি ভাড়া যা আসে তা নিয়ে নেবে। অতিরিক্ত এই সম্ভাবনাকে সামনে রেখে আপাতত পায়েই ভরসা।

 


রাত তার সমস্ত অন্ধকার ঢেলে দিয়ে জাপটে ধরেছে চারপাশের সব কিছু। চোখের পাতা টানটান করে ধরলেও কিছু দেখা যায় না। কেবল পায়ের নিচে সটান পরে থাকা পথের এগিয়ে যাওয়া দেখা যায়। মাঝে মাঝে পথের ও-মাথা থেকে হঠাৎ হঠাৎ আকাশের দিকে তাক করা একজোড়া লম্বা আলো এগিয়ে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই খাড়া পথের বাহণ উপরে এসে সমতল পেয়েই যেন ধপাস করে সড়কের উপর ফেলে দেয় তার লম্বা আলোর রেখা। অমনি সব ফকফকা হয়ে এগিয়ে আসতে আসতে আমাদের ঘুটঘুটে অন্ধকারে রেখে এগিয়ে চলে যায় আপন গন্তব্যে। পেছন থেকে ধেয়ে আসা দু’একটা গাড়ি সংকেত দিলে কারও দাঁড়াবার ফুরসত হলো না। মহাসড়কে যানবাহণের সংখ্যা এত কম হলে খুব বেমানান দেখায়। একটু ভয় ভয় লাগছে। ভূত-প্রেত বা জ্বিন-পরীর নয়, অকারণ ভয়। কোন কোন গাড়ি থেকে হৈ হৈ উল্লাস ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ছে রাতের অন্ধকারের নিস্তব্ধতায়। সফলতার আনন্দে তারাও উদযাপন করতে করতে ফিরে যাচ্ছে। তারা জানে না তাদের ফেলে যাওয়া ক্ষণিকের উল্লাস ধ্বনি আমাদের জন্য কতটা সাহসের বস্তু হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। আবার এমনও মনে হচ্ছে যদি পুলিশ-প্রশাসনের কোনো গাড়ি এসে ধরে বসে- তোমরা কারা? ও, পর্যটক! তাহলে এ অবস্থা কেন? নির্জন অন্ধকার পথে হাঁটাহাঁটির মানে কী? সন্দেহজনক, ওঠো গাড়িতে এবং চলো আমাদের সাথে। নির্ঘাৎ তাদের আদেশ পালন করতে বিনাবাক্যে উঠে পরতে হবে, কারণ এদেরকে আমাদের অভিপ্রায় ভাষায় বোঝাবার সাধ্য কার! এই সমস্ত ভাবনা যে কেবল আমার মনের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে তা নয়, সুজিতও বেশ চুপচাপ। না! এমন হলে তো চলে না। এই সমস্ত অমূলক ও উটকো ভাবনায় পথ ভারাক্রান্ত করা অনুচিত। ভয় পেলে মানুষ কথা বলে, জোরে শব্দ করে কথা বলে, চিৎকার করতে চায়, গান গায়। অতএব, আমরা অবলম্বন করলাম শেষেরটাকে। পথ এগুলো তার স্বাভাবিক নিয়ম এবং আমাদের সক্ষমতায়। কোন কোন গাড়ির আচমকা বাঁক পরিবর্তন দেখে মনে হয় তারা হকচকিয়ে গেছে। যেন অদ্ভুত কোনো প্রাণীর মুখোমুখি হয়ে প্রাণ ভয়ে পাশ কেটে পালিয়ে বাঁচলো। এরই মধ্যে টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হলো। অন্ধকার ঠেলে রাস্তাটা পূর্বের তুলনায় আরও কালো অথচ, উজ্জল হয়ে উঠল। ব্যাগ থেকে টর্চলাইট বের করতে হলো। তা না হলে ভেজা পথে পাশ কাটাবার সুযোগ না পেয়ে ঘটে যেতে পারতো যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা।
 


বৃষ্টির ফোঁটা একটু ভারি হতে শুরু করল। এখন যে একটা বিরতি দরকার তা যেন প্রকৃতি ঠিকই আন্দাজ করে নিয়েছে। চারপাশে খোলা ছাউনি পেয়ে একটু বসবার সুযোগ হলো। পথ এখনও অর্ধেকটা পরে আছে। সামনেই অনেকটা ওঠা তারপর কতখানি নেমে গেছে মনে করতে পারছি না। পেছনের উপত্যকা থেকে ধানের শীষ দোলা হাওয়া ভেসে আসছে। ফুরফুরে বাতাসে ঘাম ও বৃষ্টির ফোঁটা উভয় কারণে ভিজে যাওয়া শরীরে যেন প্রশান্তির ধারা বয়ে গেল। এখন বেশ রোমাঞ্চ অনুভূত হচ্ছে। পথ যত দীর্ঘ হয় হোক, প্রয়োজনে সারা রাত হাঁটব! বৃষ্টি থেমে যাওয়ার প্রতীক্ষা বিফলে গেল। অতএব, পুনরায় শুরু করলাম। সামনে থেকে কোনো গাড়ি আসছে দেখলেই টর্চ জ্বালিয়ে নিচু করে ধরার কাজটা আমাকেই করতে হলো। তাতে করে সামনে থেকে আসা গাড়ি এবং আমরা উভয়েই যার যার পথে এগিয়ে যাওয়াটা সহজ ও নিরাপদ। সম্মুখে দূরের আকাশে হালকা হলুদের আভা, শহরের নানান বর্ণের আলোর মিশ্রণ কালো কুচকুচে আকাশের গায়ে আভার মত জড়িয়ে আছে। পথের এই উঁচু জায়গায় এসে দৃষ্টি সীমায় ধরা দিল নদীর ওপারেই সড়ক বাতির আলো। এরপর এক ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম পরিচিত দোকানটায়, যেখান থেকে আগের রাতে বিস্কুট, চিপস এবং কী কী যেন কিনেছিলাম। আমাদের দেখে দোকানী অভিভূত এবং বিস্মিত- আপনারা তাহলে শেষ পর্যন্ত পারলেন! তখন তো সে পারলে আমদের অভিজ্ঞতার সবটুকুই শোনে। ওদিকে দোকানের সামনে কয়লার আগুনে কাঁকড়া চড়িয়েছে, সেটা আবার পুড়ে না যায়। উভয় টানে হন্তদন্ত দোকনাদারকে এই বলে বিদায় নিলাম, আজ আর নয় বরং কাল একবার এদিকটায় এলে গল্প করা যাবে। 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৯ মার্চ ২০১৮/তারা  

   
 



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

শোডাউন ছাড়া কোনো চমক নেই এরশাদের

২০১৮-১০-২০ ৮:৫৯:২৫ পিএম

রূপসায় হেইয়ো হেইয়ো, পাড়ে করতালি

২০১৮-১০-২০ ৮:৪৮:৫৪ পিএম