মিরপুরে মঙ্গলচণ্ডী ও সোনারগাঁয়ের বউমেলা

প্রকাশ: ২০১৮-০৪-১৪ ৫:০৩:৩৬ পিএম
গাজী মুনছুর আজিজ | রাইজিংবিডি.কম

গাজী মুনছুর আজিজ : সনাতনধর্মীরা বৈশাখ মাসের প্রথম মঙ্গলবার মিরপুর-গাবতলীর গৈদারটেকে মঙ্গলচণ্ডীর পূজা করেন। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের জয়রামপুর গ্রামের ভট্টপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে বটতলায় বৈশাখ মাসের দ্বিতীয়দিন পূজা হয়। এই পূজাকে কেন্দ্র করে মেলা বসে। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘বউমেলা’ নামে পরিচিতি।

মঙ্গলবার হয় বলে পূজার নাম ‘মঙ্গলচণ্ডী’। তবে সব মঙ্গলবার হয় না। শুধু বাংলা নতুন বছরের প্রথম মঙ্গলবার। ঢাকার মিরপুর-গাবতলীর গৈদারটেকের একটি বটগাছের গোড়ায় বসে এ পূজার আসর। পূজা উপলক্ষে বসে মেলা। এক সকালে এ মেলায় হাজির হই আমি।সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পঞ্জিকা মেনে সাধারণত পয়লা বৈশাখ উদযাপন করেন। সরকারীভাবে দেশে যেদিন পয়লা বৈশাখ পালন করা হয়, তার পরের দিন তারা পয়লা বৈশাখ পালন করেন। সেই হিসেবে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পঞ্জিকা অনুযায়ী বাংলা সনের প্রথম মঙ্গলবার মঙ্গলচণ্ডী পূজা করেন। সকাল থেকে শুরু হয় পূজার কার্যক্রম।

বটগাছটির বয়স কতো হবে তার সঠিক তথ্য পাওয়া কষ্টকর। তবে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল শত বছর ছাড়িয়ে গেছে গাছের বয়স। কেউ কেউ বলেন, কয়েক’শ বছরও হতে পারে। পূজার আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে এ বটগাছের গোড়ায় কেউ দুধ ঢেলে দেন, কেউ নিবেদন করেন নানা পদের ফল-মূল। কেউ আবার পুরো বটগাছটি ফুলের মালা দিয়ে মুড়িয়ে দিচ্ছেন। কেউ ফুলের মালার বদলে নতুন কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে দিচ্ছেন। অন্যদিকে গাছের গোড়ার এক কোণে বসে পূরোহিত মন্ত্র পাঠ করছেন। সামনে বসে আছেন পূণ্যার্থীরা। এভাবেই সম্পন্ন হয় মঙ্গলচণ্ডীর আনুষ্ঠানিকতা। পূজা শেষে পূণ্যার্থীরা মেলা ঘুরে ফিরে যান নিজ গৃহে।



স্থানীয়রা বলেন, একসময় হিন্দু ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত এলাকা ছিল গৈদারটেক। তখন এলাকার বেশিরভাগ জায়গায় ছিল খাল ও জলাশয়। বর্ষায় থই থই পানিতে দ্বীপের মতো জেগে থাকতো এখানকার একেকটি বাড়ি। পূজা-পার্বণ লেগেই থাকতো প্রতি বাড়িতে। পাকিস্তান আমল থেকে এখানে মুসলমান বসতি বাড়তে থাকে। আস্তে আস্তে ভরাট হতে থাকে জলাভূমি। আর সনাতনধর্মীরা চলে যেতে থাকেন অন্যত্র। এখন এ এলাকায় আদি সনাতনধর্মী পরিবার নেই বললেই চলে। তবে এলাকায় সনাতনধর্মী পরিবার না থাকলেও বছরের একটা দিন অনেকেই এখনও চলে আসেন গৈদারটেকের এ প্রাচীন বটতলায়। আনুষ্ঠানিক কোনো প্রচার-প্রচারণা ছাড়াই এখানে মঙ্গলচণ্ডী পূজার আয়োজন হয়ে থাকে। আর পূজা ঘিরে আশপাশের রাস্তায় বসে লোকজ পণ্যের মেলা। সবমিলিয়ে এ মেলা পরিণত হয় সর্বজনীন লোকজ উৎসবে।

বটগাছটির মতো মঙ্গলচণ্ডী পূজা ও মেলার বয়স ঠিক কতো তার সঠিক কোনো ইতিহাস এখানকার অনেক মানুষের জানা নেই। তবে কেউ কেউ ধারণা করেন, বৃটিশ আমল থেকেই এখানে এই পূজা ও মেলা বসে আসছে। উত্তরাধিকারসূত্রে মঙ্গলচণ্ডী পূজার পৌরহিত্য করছেন মিরপুর কোর্টবাড়ীর তপন চক্রবর্তী। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। তিনি বলেন, গাবতলীর কোর্টবাড়ির ঠাকুরবাড়ির লোকদের হাতেই এখানকার পূজার যাত্রা। ১৯৪০ সালের দিকে ঠাকুরবাড়ির জুরান ঠাকুর স্বপ্নাদিষ্ট হন, মা মঙ্গলচণ্ডী তাকে স্বপ্নযোগে গৈদারটেক বটতলায় পূজার আয়োজন করতে বলেন, তখন থেকেই শুরু হয় এ পূজা, সঙ্গে বসে মেলাও।

পুরান ঢাকা থেকে এসেছেন মণিকা সরকার। তিনি বলেন, প্রতি বছরই বাবা-মা, ভাইবোনসহ এখানে আসি এবং মনের বাসনা পূরণের জন্য পূজা ও মানত করি। মিরপুর থেকে আসা সুমন কুমার বলেন, আগের বছর যে মানত করেছিলেন তা পূর্ণ হয়েছে। এ বিশ্বাস থেকেই প্রতি বছর এখানে আসি পরিবারের সবাই মিলে।



গাবতলীর বাসস্ট্যান্ড থেকে গৈদারটেক বটতলার দূরত্ব হবে প্রায় দেড় কিলোমিটার। এ পথের দুইপাশে বসেছে মেলা। মেলায় আসা পণ্যের মধ্যে শিশুদের খেলনা সামগ্রীই বেশি। এছাড়া মিষ্টিসহ দেশীয় খাবারের দোকানও আছে। আরও আছে কাঠের আসবাব, বাঁশ-বেত, লোহা-পিতল, মাটির হাঁড়ি-পাতিল, পুতুলসহ নানা লোকজ পণ্য। আছে নাগরদোলাও।

মিষ্টি ব্যবসায়ী আবুল কালাম বলেন, ১০-১২ বছর ধরে নিয়মিত এ মেলায় আসি। স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলচণ্ডী মেলা এখন এ এলাকার সর্বজনীন একটি উৎসব। এ মেলায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব লোকের সমাগম ঘটে।

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের জয়রামপুর গ্রামের ভট্টপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে আছে আরেকটি বটগাছ। প্রচীন বিশাল এ বটতলায় বৈশাখ মাসের দ্বিতীয়দিন সকালে পূজায় বসেন সনাতনধর্মী নারীরা। আর পূজা উপলক্ষে মেলা বসে। যেহেতু বাড়ির বউয়েরা এ পূজায় বসেন এবং পূজার জন্য মেলা বসে তাই এ মেলা স্থানীয়দের কাছে ‘বউমেলা’ নামে পরিচিতি। স্থানটির নামকরণও হয়েছে ‘বউতলা’ হিসেবে। বটগাছটির একপাশে পঙ্ক্ষীরাজ খাল। খালের পাশে রাস্তা। তারপর মাঠ। মাঠের একপাশে বড় একটি পুকুর। অন্যপাশে প্রাথমিক বিদ্যালয়। এরই মাঝে বিশাল বটগাছটি দাঁড়িয়ে। গাছের গোড়া রাস্তার দিকে হলেও এর ডালপালা ছড়িয়ে আছে  মাঠজুড়ে।



প্রতি বছরের মতো পূজা করতে এসেছেন সোনারগাঁয়ের অপর্ণা সাহা। তিনি বলেন, মনের আশা পূর্ণ করতে প্রতিবছর বৈশাখ মাসের দ্বিতীয়দিন সকালে আমরা এ বটতলায় পূজার আসরে বসি। পূজার জন্য আমরা আম, কলা, কাঁঠাল, তরমুজসহ বিভিন্ন মৌসুমী ফল নিয়ে এসে বটতলায় রাখি ভোগ হিসেবে। পূজা শেষে এসব খাবার পূণ্যার্থীদের মাঝে প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করি। এছাড়া অনেকে মানত করে এ পূজায় ছাগল বা কবুতর ভোগ দেন। পূজা করতে আসা ইতিকা সাহা ও সৌভাগ্য দাস বলেন, সংসারের সুখ-শান্তি ও স্বামী-সন্তানের মঙ্গল কামনায় আমরা এ পূজা করে আসছি প্রতি বছর।

কবি শাহেদ কায়েস বলেন, এ বটগাছের বয়স শত বছরের বেশি বলে এখানকার অনেকে মত দেন। মূলত বটতলাটি সিদ্ধেশ্বরী কালীতলা নামে পরিচিত। কিন্তু বউমেলার জন্য এ বটতলা এখন বউতলা নামেই বেশি পরিচিত। এছাড়া সনাতনধর্মী নারীরা তাদের স্বামী-সন্তান ও সংসারের কল্যাণ কামনায় প্রতিবছর বৈশাখ মাসের দ্বিতীয়দিন সকালে এখানে পূজা করেন, ভোগ দেন। আর পূজা উপলক্ষেই মাঠজুড়ে লোকজ পণ্যের মেলা বসে। তাই মেলার নাম হয়েছে বউমেলা। পূজা সনাতনধর্মী নারীরা করলেও মেলাটা সর্বজনীন। এ মেলা সোনারগাঁয়ের শত বছরের লোকজ ঐতিহ্য। পূজা দ্বিতীয় দিন হলেও মেলা চলে পাঁচ দিন।

ছবি : লেখক



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৪ এপ্রিল ২০১৮/তারা

   
 



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

দ্বিতীয় ম্যাচেও এইচপি দলের জয়

২০১৮-০৭-১৮ ১০:৩৩:৩৯ পিএম

ভারতীয় টেস্ট দলে নতুন মুখ পন্ত

২০১৮-০৭-১৮ ৮:১৩:৫০ পিএম

যেভাবে জানা যাবে এইচএসসির ফল

২০১৮-০৭-১৮ ৮:০৪:২৩ পিএম