উজান স্রোতের সান্তিয়াগোর বোকা শৈশব

প্রকাশ: ২০১৯-০৭-২৫ ৭:৫৭:৫৯ এএম
আঁখি সিদ্দিকা | রাইজিংবিডি.কম

||আঁখি সিদ্দিকা ||

‘আমার একদম ছেলেবেলায় বাবার সঙ্গে আমাদের তেমন কোনো যোগাযোগ হয়নি। আমি তখন মায়ের হাতে বড় হচ্ছি। আমার বয়স যখন সাড়ে পাঁচ বছর, তখন মাও মারা গেলেন। সুতরাং একদম ছেলেবেলায় মায়ের বেত এবং একজন শিক্ষক শরদিন্দু বাবুর হাতেই আমার শিক্ষাজীবন শুরু। শরদিন্দু বাবু আমার শৈশবের শিক্ষক। তাঁর খালি পা। অনেক দূর থেকে আসতেন। পা দু’খানা ধুলায় ধূসর হয়ে থাকত। আমাকে তিনি ভীষণ আদর করতেন। পকেটে করে পেয়ারা নিয়ে আসতেন। কারণ আমাদের চারপাশে প্রচুর আমগাছ ছিল। ফলে আমের ব্যাপারে আমাদের কোনো আগ্রহ ছিল না। পকেটে করে তিনি পেয়ারা নিয়ে আসতেন এবং আমাকে দিতেন। অসাধারণ মানুষ ছিলেন আমার শৈশবের শিক্ষক শরদিন্দু বাবু। বড় হয়ে তাঁকে অনেক খুঁজেছি, পাইনি। সেই শরদিন্দু বাবুর কাছ থেকে শৈশবেই শিখেছিলাম, বইপড়া ব্যাপারটা যে একটা বড় আনন্দের ব্যাপার, এটা তাত্তি্বক এবং কল্পনার বিষয়। আমার মা খুবই কঠোর ছিলেন, অসুস্থও ছিলেন, যে জন্য তাঁর মেজাজও খিটখিটে ছিল। তিনি মারা যান আমাদের অল্প বয়সেই। তাঁর সব সময়ই ভেতরে একটা আতঙ্ক কাজ করত, আমরা বুঝি নষ্ট হয়ে যাচ্ছি। তাঁর অবর্তমানে হয়তো আমরা শেষ হয়ে যাব। সে জন্য আমাদের তাঁর অনুশাসনে রাখতেন সব সময়। অসুস্থতার সময়ও তিনি আমাদের সঙ্গে কঠোর ব্যবহার করতেন। এ একেবারে ছেলেবেলার কথা। আমার মধ্যে যা কিছু ভালো, তার বড় একটা অংশ এসেছে শিক্ষকদের কাছ থেকে। এরপর আমি জামালপুরে চলে গেলাম। সেখান থেকে পাবনা। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে বাবা অধ্যক্ষ হয়ে গেলেন। আমি তখন ভর্তি হলাম পাবনার রাধানগর মজুমদার একাডেমিতে। ওই স্কুলে যেসব শিক্ষককে আমি পেলাম, তাতে আমার মনে হয়, আমার জীবন জ্বলে উঠল। আমাদের এক স্যার ছিলেন— তাঁর নাম পতিরাম বাবু। তখন পতিরাম শব্দটির অর্থ আমি জানতাম না। বড় হয়ে জেনেছি। জ্ঞানী। কিন্তু তিনি একটি অকাট মূর্খ ছিলেন। কিন্তু এখানে তাঁর শিক্ষক হওয়ার পেছনে কারণ ছিল। সব সময়ই জমিদার পরিবারের একজন এই স্কুলের শিক্ষক থাকতেন। তবে যারা খুব চৌকস হতো বা ঝকঝকে হতো, তারা কেউ শিক্ষকতায় আসত না। পতিরাম বাবু এমন কিছু পড়াতেনও না। কিন্তু হঠাৎ তিনি একদিন জ্বলে উঠলেন। স্বামী বিবেকানন্দের গল্প বলতে শুরু করলেন। কী করে স্বামী বিবেকানন্দ অনেক কষ্ট, ত্যাগের মধ্য দিয়ে আমেরিকায় গেলেন কিংবা কীভাবে বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনে বক্তৃতা দিলেন, কীভাবে মানুষকে জাগিয়ে তুললেন ইত্যাদি। মানে সে যে কী অনুপ্রেরণাকারী বক্তৃতা! শুনে আমার মনে হলো, আমি স্বামী বিবেকানন্দ হব। হলে এটাই হতে হবে। আমার ভেতরে তিনি স্বপ্ন জাগিয়ে তুললেন। আমার মনে হয়, শিক্ষকদের বড় একটা ভূমিকা রয়েছে ছাত্রদের জীবন গড়ার ব্যাপারে। এ ছাড়া আরো ভালো ভালো শিক্ষক ছিলেন। এরপর ভর্তি হলাম পাবনা জিলা স্কুলে। সেখানেও অসাধারণ সব শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ হলো। কলেজে যখন এলাম, তখন যে কত ভালো ভালো শিক্ষক পেলাম! বাগেরহাট প্রফুল্লচন্দ্র কলেজ ছিল আমার কলেজ। প্রফুল্লচন্দ্রের নিজের হাতে বানানো কলেজ এটি। তিনি বেছে বেছে সেরা শিক্ষকদের ওই কলেজে নিয়ে এসেছিলেন। ১৯৫৫ সাল, আমি যখন কলেজে ভর্তি হলাম, তখনো সেই গুণী শিক্ষকরা ছিলেন। ১৯৫৬ সালে তাঁরা চলে গেলেন। কী অসাধারণ শিক্ষক তাঁরা ছিলেন তা বলে শেষ করার মতো নয়। কী প্রেরণা, কী স্বপ্ন, কী আলো, কী ঝলমলে পৃথিবী তাঁরা দেখাতে জানতেন, সেটা পুরোপুরি অন্য রকম।’ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

এই ঝলমলে আলোময়, আলোর দিশারি মানুষ থেকে গত আড়াই বছর সরাসরি দূরে থাকলেও মন ও মননে ধারন করেছি এক যুগেরও বেশি স্মৃতি ও স্নেহ। গত ২১ জুলাই রোববার স্যার (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ) আর খালাম্মার সঙ্গে আড্ডা হয়ে গেল। স্যার আশিতে পা দিলেন! কিন্তু আশ্চর্য লাগে, মাঝে মাঝে মনে হয় আট বছরের  দীর্ঘ এক শিশুর সাথে কথা বলছি। এখনো বিস্মিত হবার পুরোপুরি ক্ষমতা রাখেন তিনি। অনর্গল বলে যান স্বপ্নের কথা, আগামীর কথা। নতুন কিছু শুনলে, সৃষ্টির কথা শুনলেই স্যারের চোখ আলোয় চিকচিক করে ওঠে যেন এক মণিমুক্তোর সন্ধান পেলেন! বেশির ভাগ তার সামনের লেখালেখি নিয়ে কথা হলেও তার স্বভাবসূলভ কৌতুকমাখা হাসিতে বলেন ‘আমার তো একটি বোকা শৈশব ছিল!’

পর পর জন্ম নিলো দুটি মেয়ে। বড় মেয়ের বয়স পাঁচের সময় জন্ম মেঝো মেয়ের। মেঝো মেয়ের জন্মের পর সবাই হতাশ। পরিবারের সবাই উন্মুখ একটি ছেলে সন্তানের জন্য। অবশেষে এই অভিনন্দিক সময়ে, বড় মেয়ের প্রায় আট  বছর পর জন্ম হলো এক ছেলে সন্তান।

ছেলেটি বেড়ে উঠছে। ধীরে ধীরে এই পৃথিবীর আলো-বায়ূর সাথে পরিচয় ঘটছে। নীরবে দর্শন করছে চারপাশের অবস্থা। চারপাশ নানান চরিত্রে ভরপুর। তার বাবা, একজন আদর্শবান সফল শিক্ষক। বাবার মান-মর্যাদা দেখে নিজে শিক্ষক হতে মরিয়া হয়ে উঠে মাঝেমধ্যে। তার কাছে মনে হয়, পৃথিবীতে শিক্ষকের চেয়ে বড় কিছু নেই। থাকা সম্ভব নয়।

দেশ ভাগ। হিন্দুরা নিশ্চুপে এদেশ ছেড়ে চলে যাওয়া। এদের মধ্যে আছে তার বন্ধু অরুণের পরিবার। অরুণকে সে একসময় বেস্ট ফ্রেন্ড হিসেবে মেনে নেয়নি। কারণ তার অপরিণত বয়সে ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ বলতে বুঝে ‘একমাত্র বন্ধু’। আর ‘শ্রেষ্ঠ বন্ধু বা একমাত্র বন্ধু’ যে হবে তাকে সব দিক থেকে সেরা হতে হবে। কিন্তু অরুণদের চলে যাওয়ার কারণে, অরুণকে এখন চিরদিনের মতো হারাতে হবে ভেবে— নিজের কাছে তার অসহনীয় লাগছে।

শৈশবে মায়ের মৃত্যু। মাকে এক সময় খুব নিষ্ঠুর মনে হতো। যিনি উশৃঙ্খলতায় অসহনীয় হয়ে অমানুষিকভাবে মারতেন। এখন সেই মায়ের মৃত্যুতে নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। নিজেকে গভীর শূন্যতা আর বিষণ্নতা চেপে ধরছে। এই পৃথিবীকে অস্পষ্ট কুয়াশায় ঝাপসা মতো লাগছে। সবাই কবর দিয়ে চলে গেলেও ছেলেটি মায়ের কবরের পাশে বসে থাকে। রাতে মায়ের কোলে শুয়ে থাকার মতো কবরের অন্ধকারেও মাকে জড়িয়ে শুয়ে থাকার ইচ্ছা করে তার। তার নিজের কথায়— ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক জায়গায় লিখেছিলেন যে ছেলেবেলায় যাহাদের স্মৃতি কিল চড় আকারে মনে আছে।…সে তাহাদের একজন। আমার মায়ের স্মৃতি শাসনের এবং আতঙ্কের সঙ্গে মনে আছে। বড় হয়ে বুঝেছি আমাদের নিয়ে মায়ের যে উৎকণ্ঠা, তিনি জেনে গেছেন তিনি চলে যাবেন কিছুদিন পর। তারপর তাঁর ছেলেমেয়েগুলোর কী হবে। মরার সময়ও তাঁর শেষ দুটি কথা ছিল, আমার ছেলেমেয়ে, আমার ছেলেমেয়ে।’

বন্ধুর মৃত্যু। অরুণ দেশ ছেড়ে চলে যাবার পর বন্ধুত্ব গড়ে আব্দুল্লাহ নামে এক ছেলের সাথে। তাদের এই বন্ধুত্ব উপলক্ষে আব্দুল্লাহর বাবা খাসি জবেহ করেন। একবার বড় এক অনুষ্ঠানের জন্য কলেজের মাঠে প্যান্ডেলের কাজ হচ্ছে। সে আর আব্দুল্লাহ আগ্রহ নিয়ে অংশগ্রহণ করে কাজে। দুপুরে খানাতে ওরা যায় যার যার বাড়িতে। ও ফিরে আসে আবার। কিন্তু আব্দুল্লাহ ফিরেনি। আর কখনো ফিরবেও না।

স্যারের ভয়। একজন ভয়ঙ্কর রাগী স্যার প্রতিদিন বাসায় হাজির হন পড়ানোর জন্য। স্যার তাদের বেদম পিটান। প্রতিদিনের মতো সেদিনও পেটাচ্ছিলেন। প্রথমে তাকে পিঠানো হলো, তারপর তার ভাই মামুনকে। তারা স্যারের পিটুনিতে নাচে। সেদিন দৃশ্য পাল্টে গেলো, উল্টো মামুন নাচালো স্যারকে। এরকম স্কুলের স্যারদের ভয় তাকে গ্রাস করে নেয়।
সে একেকবার হতে চেয়েছে একেক কিছু। কখনো গুণ্ডা, কখনো খেলোয়ার, কখনো কবি, কখনো দার্শনিক, কখনো একজন আদর্শ শিক্ষক। কখনো ট্রেনের ড্রাইভার, কখনো চার্টার অ্যাকাউন্ট্যান্ট। এরকম শিশু জীবনের অসহায়তা, বোকামি, লোভ, উৎসাহ, স্বপ্ন বা দস্যিপনা দিয়ে সাজানো ‘বোকা শৈশবের’ গল্প আমরা কাছ থেকে যারা শুনেছি তারা তো শুনেছি কিন্তু ২০১০ সালে তিনি সবার জন্য প্রকাশ করলেন ‘আমার বোকা শৈশব’। বইটিকে তিনি আটটি অধ্যায়ে ভাগ করেছেন। বইটি ‘সময়’ প্রকাশনী থেকে ২০১০ সালে বের হয়েছে। ছোট্ট ছোট্ট আড্ডার ছলে  স্যার তার বোকা শৈশবের গল্প করেছেন এই বইয়ে। স্বপ্নের অলিন্দে, পালাবদল, নানা পথের হাতছানি, প্রথম সোপান, ওপরের আকাশ, ভিন্ন ভূগোল, চকিত জানালা, পরিশিষ্ট। এই আটটি ভাগে ভাগ করে কখন কোথায় কেমন ছিলেন, তার বেড়ে ওঠা ছবির মতো আমরা দেখতে পাই। ‘আমার বোকা শৈশব’ বইটি মূলত ‘বহে জলবতী ধারা’-এর কিশোর সংস্করণ। বইটিতে ভাষাশৈলী অসাধারণ, বর্ণনাভঙ্গি প্রাণবন্ত, সাথে সাথে রসবাধেও টইটুম্বুর। লেখক ‘আমার বোকা শৈশব’ বইটিতে তুলে ধরছেন তার শিশু জীবনের বিচিত্র গল্পগুলো। একটা শিশুর চোখে শৈশব এঁকেছেন এই  বইয়ে। একজন শিশু কীভাবে দেখে এই জগতকে, তা তুলে ধরেছেন বইটিতে। যেন চোখের সামনে ভেসে উঠে একটা দুরন্ত শৈশব। করেছেন শৈশবের স্মৃতিচারণ, করটিয়া, জামালপুর, পাবনা, বাগেরহাটের নিসর্গ জীবন আর ঢাকা ও কলকাতার নাগরীক জীবনের উত্তেজনা।

বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন— ‘ছেলেবেলার গল্প নিয়ে আমার একটা বই আছে নাম ‘বহে জলবতী ধারা’ । বইটা আমি যখন লিখি তখন আমার বয়স তেষট্রি বছর। তখন মোটামুটি বৃদ্ধই আমি। কাজেই ছেলেবেলার গল্প নিয়ে লিখলেও বইটা শুধু একটি শিশুর রচনা হয়নি, হয়েছে একজন বুড়ো ও একজন শিশু দুজনের মিলিত লেখা। শিশুর জীবনের অসহায়তা, বোকামি, লোভ, উৎসাহ, স্বপ্ন বা দস্যিপনার সঙ্গে সেখানে জড়িয়ে রয়েছে প্রবীণ মানুষটির পরিণত চাউনি, যে কেবল গল্পটা বলেই শেষ করতে চায় না, সেই সঙ্গে জীবনের পটভূমিতে তার একটা মনমতো ব্যাখ্যাও দিতে চায়। বড়দের কাজে এই ব্যাখ্যাগুলো খারাপ লাগে না। এগুলোর মধ্যে দূর অতীতে ফেলে আসা নিজেদের অর্থহীন আর আনন্দময় শৈশবের একটা সন্তোষজনক অর্থও তারা হয়তো খুঁজে পায়। কিন্তু শিশুরা যখন বইটা পড়ে তখন তারা কিন্তু এই ব্যাখ্যার জায়গাগুলো ঠিকমতো বুঝতে পারে না। এগুলো তাদের কাছে অযথা, অকারণ এবং অনেক সময় দুরূহ ঠেকে। এর কারণ আছে। শৈশব নিয়ে লেখা বইয়ে শিশুরা শৈশবের নির্জলা গল্পটুকুই শুধু শুনতে চায়, এর স্বপ্ন, আনন্দ, কল্পনা আর মজাটুকুই কেবল পেতে চায়। এর উটকো দার্শনিক ভার ওদের অপছন্দ। শিশু পৃথিবীতে নতুন এসেছ। মানুষের মধ্যে কেবল তারাই অতীতবিহীন। জরা, ক্ষয় বা কষ্টের নিগ্রহ এখনো তাদের হাড় গুড়িয়ে দেয়নি। কাজই জীবনের ভারী ভারী অভিজ্ঞতা বা তত্ত্ব ব্যাখ্যা যা তারা শুনতে নারাজ। তারা চায় তরতাজা জীবনের সোজাসাপটা গল্প। চেতনা জগতের উপলব্ধি নয়, ইন্দ্রিয়ের পঞ্চমপ্রদীপ জ্বলা জীবনের রূপগন্ধময় আস্বাদ। এইসব সাতপাঁচ ভেবে বইটি প্রকাশের পরপরই এর একটি কিশোর সংস্করণ বের করার কথা মনে হয়েছিল। এবার সেটা বের করার উদ্যোগ নিয়েছি। এতে মূল বইয়ের সেটুকুই শুধু রাখা হলো যেটুকু কিশোর কিশোরীদের আনন্দ দেবে, যার মধ্যে তারা নিজেদের জীবনের বাস্তব সুখ-দুঃখের গল্প খুঁজে পাবে।’­

আজকের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ হয়ে ওঠার পেছনে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে কাজ করেছেন তার পিতা অধ্যক্ষ আযীমউদ্দিন আহমদ। সায়ীদ স্যার বলেন, ‘‘আব্বা ছিলেন আমার কাছে বড় জীবনের আদর্শ। আব্বার মর্যাদা আর সম্ভ্রমের অবস্থা আমাকে শিক্ষক হতে উদ্বুদ্ধ করে। সারা অস্তিত্ব শিক্ষক হওয়ার নেশায় মরিয়া হয়ে ওঠে। মনে হয় পৃথিবীতে শিক্ষকের চেয়ে বড় কিছু কোথাও নেই। ... বৈষয়িক লিপ্সা তার মধ্যে একেবারেই ছিল না। তার প্রধান আনন্দ ছিল শিক্ষার জন্য জীবন উৎসর্গ করায়, বিদ্যায়তনের পর বিদ্যায়তন গড়ে তোলায়। ...ঘর সংসারের কোনো অস্তিত্বই যেন আব্বার কাছে নেই। মা আমার মধ্যেও আব্বার ওই একই চরিত্র দেখতে পেয়ে দুঃখ করেন। টাকাপয়সার ব্যাপারে ওই একই অনাগ্রহ। দিনরাত কেবল ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। পুরোনো দুঃখটা চাগিয়ে ওঠে তার। বলেন : ‘সেই বাপের ধারা পাইছে গো। নিজেগো জন্যে একটু মায়াদয়া নাই।’ ...মানুষের ঘরে জন্ম নেয় সন্তান। কেউ মেধাবী, কেউ মাঝারি, কেউ নির্বোধ। এরা জন্মায় জৈবিক ধারাবাহিকতায়। কিন্ত মানুষের আত্মার প্রকৃত সন্তান হয় কজন? কজনের মধ্যে পিতামাতা তাদের স্বপ্নের সত্যিকার সম্প্রসারণ দেখতে পায়? ...ছেলেমেয়েদেরও তো স্বপ্নের বাবা-মা আছে, যে বাবা-মাকে পেলে সন্তানের ভেতরকার কনকপ্রদীপ অলীক প্রভায় জ্বলে ওঠে। আমি সেই বাবাকে পেয়েছিলাম। সেই শিল্পী, শিক্ষক, আদর্শবান, প্রজ্বলিত পিতাকে। আমার প্রথম জীবনের স্বপ্নকে তিনি জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। এ ছিল আমার এক বিরাট পাওয়া। আমার দুরন্ত শৈশব যে বিপথগামী হয়ে নৈরাজ্যের মধ্যে নষ্ট হয়নি, সে হয়তো তারই কারণে। আব্বার ব্যক্তিগত নৈতিকতা, উঁচুমাপের আদর্শ, সামাজিক মর্যাদা আমাদের সামনে এক উচ্চতর জীবনের আদর্শ দাঁড় করিয়ে রেখেছিল, যে আদর্শ থেকে নিচে নামা সম্ভব ছিল না। ...আব্বা একা একা যে ঘরটায় পড়াশোন করতেন তাকিয়ে দেখতাম ঘরের পাঁচ দিকের দেয়ালগুলো বইয়ের সার-সার উঁচু আলমারিতে ঠাসা, তাতে রঙবেরঙের অজস্র নয়ন-লোভন বই। চারপাশে বইয়ের এমন প্রাণবন্ত বিশাল সমারোহ আমি এর আগে কখনো দেখিনি। বইয়ের বিশাল জগৎটা একটা আনন্দিত রঙবেরঙের ভুবনের মতো চারপাশ থেকে আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু সেদিন পলকের জন্য অবাক হয়ে দেখা বইয়ের সেই ভুবনমোহন বিপুল রূপটি যেন আমার সারা জীবনের নিয়তি হয়ে গেল। সেই ছোট্ট বয়সে যে অনবদ্য বিশাল গ্রন্থভাণ্ডারকে আমি আমার চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম সারা জীবন তাকেই হয়তো আমি খুঁজে বেরিয়েছি। অমনি দৃষ্টিনন্দন সুশোভন স্বপ্নেভরা বই দিয়ে আমার চারপাশকে ভরে তুলতে চেষ্টা করেছি।’’

‘জীবনের সমস্ত জায়গায় মাধুর্য খোঁজা’ মানুষ, চরম নৈরাশ্যের মধ্যেও প্রবল আশার উজ্জ্বল আলো দেখা  মানুষ  আমার প্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার কামারগাতিতে পৈতৃক নিবাস হলেও তিনি জন্মেছিলেন ১৯৪০ সালের ২৫ জুলাই কলকাতার পার্ক সার্কাসে নানা বাড়িতে। তার পিতা আযীমউদ্দিন আহমদ ছিলেন একজন স্বনামধন্য শিক্ষক। পিতার শিক্ষক হিসেবে অসামান্য সাফল্য ও জনপ্রিয়তা শৈশবেই তাকে শিক্ষকতা পেশার প্রতি আকৃষ্ট করে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ১৯৫৫ সালে পাবনা জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক, ১৯৫৭ সালে বাগেরহাটের প্রফুল্লচন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

‘জাগো বাহে, কোনঠে সবায়’ এই নীরব চিৎকারকে সামনে রেখে  নানা সংঘাত পেছনে ফেলে রুপোলি আকাশে পাখা মেললেন রক্তদীর্ণ শঙ্কার শিকার বোকা শৈশবের উজান স্রোতের সান্তিয়াগো আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

অনুচ্চকিত আজন্মের আঙ্গুলের ট্রিগার ছড়িয়ে দিলেন আরো তার লিখে যাওয়া বইয়ের ভাঁজে, বোকা শৈশব। বিস্ত্রস্ত জর্নালের মমতায় ওড়ালেন ভালোবাসার সাম্পান। বহে জলবতী ধারা আবার নিষ্ফল হয়নি একবারের জন্যেও নিষ্ফলা মাঠের কৃষকে। উপস্থাপক স্যারকে আমি না চিনলেও চিনে নিলাম উপস্থাপক জীবনে। আমার আশাবাদে আশা রাখলাম একজন সংগঠক বাঙালি স্যারের উত্তরসূরী হয়ে। স্যার প্রায়ই ‘মহাভারত’ থেকে একটি রেফারেন্স টেনে বলতেন, ‘উত্তম গুরু তখনই যখন তার শিষ্যরা তাকে ছেড়ে চলতে পারে।’ খুব সাহস নিয়ে হাশিম ভাই আমাকে বললেন, ‘স্যার কি উত্তম গুরু হয়ে গেলেন, আমরা যে তাকে ছাড়াই চলছি।’ হয়তো হাশিম ভাইয়ের কথাই ঠিক। তিনি কেবল দিয়ে চলেছেন আমাদের। রেখেছেন অতি যত্নে তার প্রতিভাময় আঙ্গুলের ছায়ায়। প্রথম সমুদ্র দেখা এই আঙ্গুল ধরে। সবাই যখন সমুদ্রে নেমে হৈহৈ করছে আর আমি বোকাটির মতো সমুদ্রের পাশে এতটুকু হয়ে বসে আছি, কোথা থেকে এগিয়ে গেলো এই আঙ্গুলগুলো। বললেন, ‘চলো তুমিও নামবে।’ আমি একজন বড় সমুদ্রের হাত ধরে বিশাল সমুদ্রের বুকে পা রাখলাম। সেই বোধ ভাষাতীত। ভাব যেখানে গভীর ভাষা বোধহয় সেখানে অচল হয়ে পড়ে। একইভাবে গড়গড় করে সবাই যখন পাহাড়ে উঠে যাচ্ছিল, এই মানুষটি দাঁড়িয়ে থাকলেন আমার জন্য আমি উঠতে পারব না বলে, তখন পাংশু মুখখানি দেখে বললেন, ‘শুরু করা যাক।’ প্রথম পাহাড় দেখার সাথে সেই পাহাড়ে ওঠা আজও আমায় মাথা উঁচু রাখতে শিখিয়েছে।

অপূর্ব সবুজের মুগ্ধতায় আমার ভিজে যাওয়া চোখগুলো কবি, বন্ধু, স্যারের জন্য আরো একবার ভেসেছিল জীবনের গানে। স্যার প্রায়ই বলেন, ‘জীবন বহমান, জলবতী ধারার মতোই; কিন্তু মানুষের জীবনের একটা আশ্চর্য ব্যাপার হলো, সে শুধু বয়েই চলে না, নিজের গতিপথের দিকে তাকাতেও পারে। একই সঙ্গে একটা জীবন যাপন করা আর সেই যাপিত জীবনের স্মৃতিরচনা করা সম্ভব হয় মানুষের পক্ষে।’

নিঃশব্দে বয়সের অন্ধকারে কি ক্ষয়ে যাবেন না উজান স্রোতের সান্তিয়াগো। কখনোই তা হবে না। পাতারা নিঃশব্দে খসে যায়।  তার বোকা শৈশবের শিশু মানুষটি উদ্যত বল্লমে চিরযৌবনের স্বপ্নস্নায়ু জীবনের মিছিলেই থাকবেন  প্রদীপ উঁচিয়ে…

প্রবলভাবে রঙের মানুষ, প্রিয় মানুষ, প্রিয় শিক্ষকের জন্মদিন উপলক্ষে গত ২১ জুলাই বকুল ফুলের মালার শুভেচ্ছা জানিয়ে এসেছিলাম, আবারো জানাই জন্মদিনের নিরন্তর স্যারের প্রিয় ফুল দোলনচাঁপার শুভেচ্ছা। স্যারের আগামী দিনগুলো সুস্থ ও আনন্দময় কাটুক, সেই কামনা নিরন্তর।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৫ জুলাই ২০১৯/শান্ত


   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

এরশাদ পুত্র সাদ সিলেট আসছেন আজ

২০১৯-১০-২০ ১২:১১:১০ এএম

জাপান যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি

২০১৯-১০-১৯ ১০:৩৫:১৬ পিএম

ভারত সিরিজেও কিপিং করছেন না মুশফিক ?

২০১৯-১০-১৯ ১০:০৮:৪২ পিএম