অ্যালিস মানরোর গল্প || আসক্তি (সূচনা পর্ব)

প্রকাশ: ২০১৯-০৮-২৩ ১:০৯:১৪ পিএম
অভিজিৎ মুখার্জি | রাইজিংবিডি.কম

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, অটাওয়া ভ্যালিতে ট্র্যাভারস’দের গ্রীষ্মাবকাশের বাড়িটার খোঁজে গিয়েছিল গ্রেস। দেশের ঐ অংশটায় বহুবছর যাওয়া হয়নি ওর, পরিবর্তন তো নিশ্চয়ই হয়েছে। যেসব শহরের একেবারে ভিতর দিয়ে যেত, হাইওয়ে সেভেন এখন সেগুলোকে পাশ কাটিয়ে যায়। কোথাও কোথাও একেবারে সোজা চলে গেছে, যেখানে বাঁক ছিল বলেই ওর মনে পড়ছিল। ক্যানেডিয়ান শীল্ডের এই অংশটাতে অনেক ছোট ছোট হ্রদ আছে, সাধারণ ধরনের মানচিত্রে যেগুলোকে আর দেখানো হয়ে ওঠে না। শেষপর্যন্ত যখন লিটল সাবোট লেকটা বের করল, বা ভাবল যে করেছে, ঐ প্রদেশের মূল রাস্তা থেকে যে কত কত রাস্তা এসে শেষ হয়েছে ওতে, আর তারপর যখন তার মধ্যে থেকে একটাকে বাছল, গাদা গাদা বাঁধানো রাস্তা সেটার আড়াআড়ি চলে গেছে, তার একটারও নাম ও মনে করতে পারল না। সত্যি বলতে কী, চল্লিশ বছরেরও বেশি আগে ও যখন এখানে ছিল, রাস্তার তখন কোনও নামই থাকত না। ফুটপাথও হতো না। লেক-এ যাওয়ার একটাই মাটির রাস্তা ছিল তখন, তারপর লেকের ধার দিয়ে আরেকটা মাটির রাস্তা এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছিল।

একটা গ্রাম এল। কিংবা হয়তো শহরতলীও বলা যায়, কেননা কোনও পোস্ট অফিস ওর চোখে পড়ল না, এমনকি একান্ত দৈন্যদশার কোনও মণিহারি দোকানও। চারটে কি পাঁচটা বড়ো-রাস্তা নিয়ে লেকের ধার বরাবর বসতির প্রসার। ছোট ছোট জমির ওপর বাড়িগুলো পরস্পরের খুব কাছাকাছি। এর কয়েকটা নির্ঘাত গ্রীষ্মাবকাশ কাটানোর জন্য— জানালাগুলো ইতোমধ্যে কাঠের তক্তা দিয়ে ঢেকে দেওয়া, শীতের সময় চিরকালই যেটা করা হয়। কিন্তু অন্য অনেক বাড়িই দেখে মনে হচ্ছে সারাবছর জুড়ে সেখানে লোক বাস করে— বাস করে অনেকক্ষেত্রেই এমন লোকেরা যারা উঠোন ভরিয়ে রাখে প্লাস্টিকের তৈরি জিমের উপকরণ দিয়ে, খোলা জায়গায় রোস্ট করার গ্রিল দিয়ে, ট্রেনিং বাইসাইকল, মোটরবাইক, সঙ্গে পিকনিক টেবিল, যেখানে হয়তো কেউ কেউ বসে লাঞ্চ খেয়েছিল, কিংবা বীয়ার। সেপ্টেম্বর মাসের দিনের বেলায় এখনও খানিকটা উষ্ণতা রয়ে গেছে। অন্যধরনের লোকও বাস করে, তেমন চোখে পড়ে না তাদের— তারা হয়তো ছাত্রটাত্র, কিংবা একা থাকে এমন বুড়ো হিপি—যারা ফ্ল্যাগ কিংবা টিনফয়েল পর্দার মতো টাঙিয়ে রাখে। ছোট ছোট, বেশিরভাগই বেশ ছিমছাম, খুব ব্যয়সাপেক্ষ নয় এমন বাড়ি সব, শীতকালটা যাতে টিকে যেতে পারে তার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কোনোটায় কোনোটায়, কোনো কোনোটায় নেওয়া হয়নি।

গ্রেস হয়তো ফিরেই যেত, যদি না আটকোণা বাড়িটা ওর চোখে পড়ে যেত। কাঠের কারুকাজ দিয়ে ছাদের ধারগুলো বাঁধানো, মাঝখানে একটা করে বাদ দিয়ে দিয়ে প্রতিটি দেয়ালে দরজা। উডস’দের বাড়ি। আদ্যন্ত ওর স্মৃতিতে ছিল যে বাড়িটায় আটটা দরজা, কিন্তু এখন তো দেখা যাচ্ছে যে মাত্র চারটেই ছিল। ভেতরের পরিসরটা নানা ঘরে বিভক্ত কিনা, হলেই বা ঠিক কীভাবে, সেসব ওর দেখা হয়নি, কারণ ভিতরে কখনো ঢোকাই হয়নি। ট্র্যাভার্স পরিবারের কেউও যে কখনো এবাড়ির ভেতরে গেছে, এমনও ওর কখনো মনে হয়নি। আগে বাড়িটা ঘিরে ছিল বিশাল সব ঝোপ, আর ঝকঝকে সব পপলার গাছ, হ্রদের তীরে বহমান হাওয়ায় গাছগুলোর পাতা মর্মরিত হতে থাকত। মিস্টার এবং মিসেস উডসের অনেক বয়েস হয়েছিল—যেমন এখন গ্রেসের হয়েছে—ওদের সঙ্গে দেখা করতে কোনও বন্ধুবান্ধব বা বাচ্চারা আসত বলে মনে হয়নি। ওদের এই অভিনবরকম স্বতন্ত্র বাড়িটা এখন কেমন নিঃসঙ্গ দেখায়, যেন কী একটা ভুল হয়ে গেছে। প্রতিবেশীরা তাদের জোরালো আওয়াজের সিডি কি ক্যাসেট প্লেয়ার, কখনও কখনো ভাঙাচোরা গাড়ি, খেলনা, ধুয়ে মেলে দেওয়া জামাকাপড় ইত্যাদি সহকারে ঘেঁষাঘেঁষি করে বাস করছে বাড়িটার দু’ধারে।

সেই রাস্তা ধরে আরো কোয়ার্টার মাইল মত যাওয়ার পর ট্র্যাভার্স’দের বাড়িটা দেখা গেল। একই অবস্থা সেটারও। রাস্তা এখন সেই বাড়িতেই শেষ না হয়ে, ছাড়িয়ে কোথাও যায়, আর পুরো বাড়ি ঘিরে চওড়া বারান্দার কয়েক ফিটের মধ্যেই দু’পাশের বাড়িঘর।

এভাবে বাড়ি তৈরি সেই প্রথম দেখেছিল গ্রেস— একতলা উঁচু, সবদিকেই ছাদটা টানা ছড়িয়ে গেছে বারান্দার ওপর দিয়ে, বারান্দা ছাড়িয়ে। পরে অস্ট্রেলিয়াতে ওরকম বাড়ি অনেক দেখেছিল ও। দেখলেই, গ্রীষ্মকালের গরমের কথা মনে করিয়ে দেয় এই স্টাইলটা। বারান্দা থেকে এক দৌড়ে গাড়ি ঢোকার রাস্তার ধূলিধূসরিত প্রান্ত পর্যন্ত চলে যাওয়া যেত, তার ওধারে একখণ্ড বালি ফেলা জমিতে আগাছা আর বুনো স্ট্রবেরি মাড়িয়ে যেতে হত, ওটুকুও ট্র্যাভার্স’দেরই সম্পত্তি। আর তারপরে লেকের ভেতর লাফিয়ে পড়া— না, আসলে জল ভেঙে এগিয়ে যাওয়া। এখন আর লেক চোখেই পড়ে না, এত বাড়ি তৈরি হয়ে গেছে— এখানকার কয়েকটামাত্র প্রথামাফিক শহরতলীর বাড়ির মধ্যে এটা একটা, দু’টো গাড়ি রাখার মতো গ্যারেজ—রাস্তা আটকে দিয়ে এই বাড়িগুলো বানানো হয়েছিল।

এই অভিযানে যে বেরিয়ে পড়ল গ্রেস, উদ্দেশ্যটা আসলে ঠিক কী? যা চাইছে বলে ভেবেছিল, ঠিক সেটাই পেয়ে গেলে বোধহয় সবচেয়ে বাজে হত। ছাদের ছাউনি, ঢেকে দেওয়া জানালা, সামনে একটা হ্রদ, সারি দিয়ে সমান আকারের মেপল আর সেডার গাছের সন্নিবেশ, তার পিছনে ‘বাম অব গোলিয়ড’ গাছেরা। নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত অতীত, একেবারে অটুট, ওর নিজের সম্বন্ধে যা মোটেই বলা যাবে না। কোনোকিছুকে এতটা হতশ্রী হয়ে যেতে দেখলে, এখনো যার অস্তিত্ব আছে কিন্তু তেমন অর্থ নেই— ট্র্যাভার্সদের বাড়িটা দেখে যেমন মনে হয় আরকি, ঢালু ছাদ ফুঁড়ে ওঠা খাড়া ‘ডর্মার’ জানালা, চমকে দেওয়ার মতো নীল রঙ— শেষ বিচারে হয়তো কম অসহনীয় ঠেকে।

আর যদি দেখতে যে একেবারেই নেই? তাহলে তুমি বাড়াবাড়ি করে বসতে। এসে শোনার মতো কেউ সেখানে থাকলে, জিনিসটা নেই বলে তুমি বুক চাপড়ে বিলাপ করতে। কিংবা এমনও তো হতে পারে, পুরনো দ্বিধা, বন্ধন সব মুছে গিয়ে নিষ্কৃতি পাওয়ার একটা অনুভূতি হয়তো তোমাকে ছুঁয়ে যেত?

মিস্টার ট্র্যাভার্স বাড়িটা বানিয়েছিলেন— আসলে, বাড়িটা মিসেস ট্র্যাভার্সকে বিয়ের উপহার হিসেবে দিয়ে অবাক করে দেবেন উনি, এই উদ্দেশ্যে বানানো হয়েছিল। গ্রেস যখন প্রথম দেখে, তখনই সম্ভবত বাড়িটা তিরিশ বছরের পুরনো। মিসেস ট্র্যাভার্সের সন্তানদের মধ্যে বয়েসের অনেকটা করে ফারাক— গ্রেচেন প্রায় আটাশ কি উনত্রিশ, বিয়ে থা’ হয়ে গেছে এবং নিজেই এখন একজন মা, ম’রি একুশ, কলেজের সর্বশেষ বছরের ছাত্র। আর আছে নিইল, সে এখন মধ্য তিরিশে। নিইল অবশ্য ট্র্যাভার্স নয়। ওর নাম নিইল বরো। মিসেস ট্র্যাভার্সের আগে একবার বিয়ে হয়েছিল, সেই স্বামী মারা যাওয়ার পর একটা সেক্রেটারিয়াল স্কুলে বিজনেস ইংলিশ পড়িয়ে উনি জীবিকা নির্বাহ করছিলেন, বাচ্চা মানুষ করছিলেন। ওঁর সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগে মিসেস ট্র্যাভার্স এই যে সময়টা কাটাচ্ছিলেন, তার কথা বলতে গিয়ে মিস্টার ট্র্যাভার্স এমনভাবে বলতেন যেন মহিলা সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন, সানন্দে মিস্টার ট্র্যাভার্স ওঁকে সারাজীবন আরামে রাখার দায়িত্ব নিলেও যেন সেই কষ্ট আর পুষিয়ে দেওয়া যায় না।

মিসেস ট্র্যাভার্স নিজে অবশ্য এ নিয়ে মোটেই এভাবে বলতেন না। নিইলকে নিয়ে উনি থাকতেন একটা পুরনো, খুব বড়ো বাড়িতে, বাড়িটা অনেকগুলো অ্যাপার্টমেন্টে ভাগ করা, পেমব্রোক শহরে, রেলপথ থেকে বেশি দূরে নয়। সেখানকার অনেক ঘটনা নিয়ে ডিনার টেবলে উনি গল্প করতেন, অন্য ভাড়াটেদের কথা, ফরাসি-ক্যানেডিয়ান বাড়িওয়ালা, তার কঠিন ফ্রেঞ্চ আর জট পাকিয়ে যাওয়া ইংরিজি নকল করে দেখাতেন। গল্পগুলোর হয়তো একটা করে নামও ছিল, সেই থার্বারের গল্পগুলোর মত, ‘দ্য অ্যান্থোলজি অব অ্যামেরিকান হিউমার’ বইতে যেগুলো পড়েছিল গ্রেস। ক্লাস টেন-এর ক্লাসরুমের পিছনে লাইব্রেরির তাকে কী করে যেন বইটা পাওয়া গিয়েছিল (এছাড়াও সেই তাকে ছিল, ‘দ্য লাস্ট অব দ্য ব্যারনস’ আর ‘টু ইয়ারস বিফোর দ্য মাস্ট’)।

‘দ্য নাইট মিসেস ক্রোমার্টি গট আউট অন দ্য রুফ।’ ‘হাউ দ্য পোস্টম্যান কোর্টেড মিস ফ্লাওয়ার্স।’ ‘দ্য ডগ হু এট সার্ডিনস।’

মিস্টার ট্র্যাভার্স কখনো গল্পটল্প বলতেন না, ডিনারে কথাই বলতেন খুব কম, কিন্তু যদি ওর নজরে পড়ত যে আপনি হয়তো তাকিয়ে আছেন এখানে সেখানে মাঠেঘাটে পাওয়া পাথর দিয়ে তৈরি ফিল্ডস্টোন ফায়ারপ্লেসটার দিকে, উনি হয়তো তাহলে বলতেন, ‘আপনার কি পাথর নিয়ে আগ্রহ আছে?’ এবং জানাতেন কোত্থেকে কোত্থেকে একেকটা খণ্ড এসেছে, কীভাবে উনি খুঁজেই গেছেন, খুঁজেই গেছেন একটা নির্দিষ্ট ধরনের গোলাপি গ্রানাইট, কেননা একবার পাথুরে জমি কেটে তৈরি এক রাস্তায় ওরকম একটা পাথর দেখে মিসেস ট্র্যাভার্স একেবারে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন। কিংবা হয়তো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাতেন এমন সব জিনিস, যেগুলো বাড়িটার নকশায় উনি নিজে যোগ করেছিলেন। যদিও সেগুলো মোটেই তেমন বিরল কিছু নয়—রান্নাঘরের কোণে কাবার্ডের তাক, যেগুলো ঘুরে বাইরের দিকে আসে, জানালার পাশে বসার জায়গায় নিচে খানিকটা স্পেস, যেখানে মালপত্র রাখা যায়। মানুষটার দীর্ঘ শরীর সামনের দিকে একটু ঝোঁকা, কণ্ঠস্বর নম্র, পাতলা চুল আঁচড়ে মাথার পিছন দিকে পাঠানো। জলে নামার সময় স্নান করার জুতো পরে নিতেন, যদিও সাধারণ পোশাকে ওঁকে মোটা বলে মনে হত না, ঐ সময় কোমরের কষি থেকে উপচে বেরিয়ে থাকত প্যানকেকের মত একফালি সাদা মাংস।

লিটল সাবোট লেকের উত্তরে বেইলি ফলসের একটা হোটেলে সেই গ্রীষ্মে গ্রেস কাজ করছিল। মরসুমের গোড়ার দিকে ট্র্যাভার্স পরিবার সেখানে একদিন ডিনার করতে এসেছিলেন। গ্রেস ওঁদের খেয়াল করেনি—ও যে টেবিলগুলোর দায়িত্বে ছিল, তার কোনওটাতে ওঁরা বসেননি, সেই রাতে ব্যস্ততাও ছিল খুব। একটা নতুন পার্টির জন্য টেবল গুছাচ্ছিল ও, সেইসময় টের পেল যে কেউ অপেক্ষা করছে ওর সঙ্গে কথা বলবে বলে।

ম’রি এসেছিল। বলল, ‘ভাবছি, আপনি কখনো আমার সঙ্গে একটু ঘুরে আসতে রাজি হবেন কি না?’

রুপোর পাত্রগুলো ঝেড়ে ঝেড়ে পরিষ্কার করতে করতে মুখ না তুলেই গ্রেস বলেছিল, ‘বাজি ধরেছেন?’। কারণ, ছেলেটার গলা উঁচুপর্দায়, নার্ভাস শোনাচ্ছিল, আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে, যেন জোর করে নিজেকে দিয়ে বলাচ্ছে এসব। সবাই জানত যে কখনো কখনো কটেজের অল্পবয়েসি ছেলেপিলেরা একে অন্যের সঙ্গে বাজি ধরত, ওয়েট্রেসকে বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তাব দিতে পারবে কি না। পুরোটাই যে রসিকতা তাও নয়— সম্মতি জানালে সত্যিই আসত, যদিও অনেকসময় তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হত কোথাও গাড়িটা থামিয়ে তার ভিতরে..., সিনেমাতেও নিয়ে যেত না, এমনকি কফি খেতেও না। ফলে মেয়েদের পক্ষে ব্যাপারটা অপমানজনকই ছিল, যেন পয়সার অভাবে রাজি হয়ে গেছে।

‘সে কী!’ আহত স্বরে ছেলেটা বলেছিল, আর তখন গ্রেস কাজ থামিয়ে ওর দিকে তাকাল। ওর মনে হয়েছিল, সেই মুহূর্তে ছেলেটার পুরোটা যেন ও দেখতে পেয়ে গেল, আসল ম’রিকে। ভীত, বেপরোয়া, নিষ্পাপ, দৃঢ়সংকল্প।

‘ঠিক আছে,’ দেরি না করে গ্রেস বলে উঠেছিল। হয়তো বলতে চেয়েছিল, ঠিক আছে, ঘাবড়াবার কিছু নেই, আমি বুঝেছি যে এটা বাজি ধরা নয়, আপনি ওরকম করার লোক নন। কিংবা, ঠিক আছে, আমি আপনার সঙ্গে ঘুরতে যাব। ও নিজেই জানত না এরমধ্যে কোনটা। কিন্তু ম’রির মনে হল যে ও রাজি হয়ে গেছে, এবং তক্ষুণি ব্যবস্থা করে ফেলল—গলা এতটুকু না নামিয়ে, অথবা চারপাশে যারা ডিনার করতে এসেছে তারা যে কীভাবে ওর দিকে তাকাচ্ছে সেসব খেয়াল না করে— যে পরেরদিন রাতে কাজ থেকে ফেরার পথে ও এসে গ্রেসকে গাড়িতে তুলে নেবে।

ও অবশ্য সিনেমায় নিয়ে গিয়েছিল। ওরা দেখেছিল ‘ফাদার অব দ্য ব্রাইড’। গ্রেসের একদমই ভালো লাগেনি। সিনেমাটায় এলিজাবেথ টেলর যে ভূমিকায় ছিল, সেই ধরনের মেয়েদের একদমই ভালো লাগত না ওর, যত্তোসব বখে যাওয়া বড়োলোকের মেয়ের নানা চাহিদা, আর পটিয়ে পাটিয়ে সেগুলো পূর্ণ করা ছাড়া তাদের যেন আর কোনও কাজ ছিল না। ম’রি বলেছিল, আরে এটা তো নেহাতই একটা কমেডি, কিন্তু গ্রেস বলল যে সেটা কথা নয়। কথাটা যে কী সেটা খুব পরিষ্কার বলে উঠতে পারছিল না। সকলেই ভাববে যে কারণটা হল, ওকে ওয়েট্রেসের কাজ করতে হয়, কলেজে পড়তে যাবার মত পয়সা নেই, এবং ওরকমভাবে বিয়ে করার ইচ্ছে হলে বহুবছর ধরে টাকা জমাতে হবে নিজেকেই তার খরচ যোগাতে। (ম’রি সেটাই ভেবেছিল এবং ওর প্রতি একটা সমীহের ভাব তৈরি হয়েছিল, প্রায় শ্রদ্ধা সহকারেই)।

ও বুঝিয়ে বলতে পারেনি, নিজেও ঠিক বোঝেনি যে ওর যেটা হয়েছিল, সেটা পুরোটাই ঈর্ষা নয়, হয়েছিল রাগ। মোটেই এই কারণে নয় যে ও ওদের মত করে কেনাকাটা করতে পারে না বা পোশাক আশাক পরতে পারে না। রাগ হয়েছিল কারণ, মেয়েদের যেন এরকমই হওয়ার কথা। এটাই পুরুষেরা— লোকেরা, সক্কলে—ভাবে, যে ওদের ওরকমই হতে হয়। সুন্দরী, সম্পদশালী, অতি আহ্লাদী, স্বার্থপর, বুদ্ধিশুদ্ধিহীন। চিরটা কাল।

রাগে ফুঁসছিল ও, পাশে বসে ছিল একটি ছেলে যে কিনা ওর প্রেমে পড়েছে, কেননা ওর শরীর ও মনের সততায় ও স্বাতন্ত্রে তার পূর্ণ আস্থা জন্মেছে—একটি মুহূর্তেই—এবং তার চোখে ওর দারিদ্র নেহাতই এসবের ওপর একটা রোমান্টিক প্রলেপ। (ও যে গরিবঘরের সেটা ছেলেটা ধরতেই পারত, ওকে যে কাজটা করতে হচ্ছিল সেটার কারণে নয়, ওর কথার মধ্যে স্পষ্টরকম ওটাওয়া ভ্যালির টানের কারণে, এই ব্যাপারটা তখনও গ্রেসের জানা ছিল না।)

সিনেমাটা দেখে গ্রেসের কীরকম লাগল, সেটাকে ছেলেটা উড়িয়ে দেয়নি। গ্রেস রাগতভাবে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করার যে চেষ্টা চালাচ্ছিল, সেটা শুনে নিয়ে ও চেষ্টা করল ওর তরফ থেকে কিছু বলার। এখন ও বুঝতেই পারছে যে ব্যাপারটা ঠিক ঈর্ষার মতো সরল, মেয়েলি কিছু নয়। এখন বুঝতেই পেরেছে। আসলে ব্যাপারটা হলো যে গ্রেস লঘু মানসিকতা জিনিসটা সমর্থন করে না, আর পাঁচটা মেয়ের মত হতে পারলেই ওর চলবে না। সে স্পেশাল।

গ্রেস কখনো ভোলেনি সেই রাতে ওর পরনে কী ছিল। একটা ঘননীল রঙের ব্যালেরিনা স্কার্ট, সাদা ব্লাউজ, যেটার কুচি দেওয়া আইলেটের ভেতর দিয়ে ওর বুকের ওপরদিকটা দেখা যাচ্ছিল, একটা চওড়া গোলাপি রঙের ইলাসটিক দেওয়া বেল্ট। যেভাবে ও নিজেকে পেশ করল আর যে চোখে লোকে ওকে দেখুক বলে ও চাইছিল, নিঃসন্দেহে এ দু’টোর মধ্যে ফারাক ছিল। তবে সেই সময়ের রুচির সাপেক্ষে ওকে কিন্তু মোটেই বেশ একটু রসালো, ফ্যাশনদুরস্ত কিংবা আদবকায়দায় চোস্ত বলে মনে হচ্ছিল না। কেমন একটু অবিন্যস্ত, বলতে কি খানিকটা যেন জিপসিদের মতোই, সবচেয়ে সস্তার রুপোলি রঙ করা চুড়ি, লম্বা চুল, ঘনরঙের, কোঁকড়ানো, কেমন যেন বাগ মানানো কঠিন, টেবিলে টেবিলে ওয়েট্রেসের কাজ করার সময় ওগুলোকে স্কার্ফ দিয়ে বেঁধে ঢেকে রাখতে হতো। 

ওর সম্বন্ধে মা’কে তাই বলেছিল ম’রি, আর মা বলেছিলেন, ‘তোমার এই গ্রেসকে ডিনারে আনো একদিন।’

সবকিছুই নতুন লেগেছিল গ্রেসের, তক্ষুনি ভালো লেগে গিয়েছিল সবকিছু। ম’রি ওর প্রেমে পড়েছিল, বলতে কি, ও নিজেও তেমনই মিসেস ট্র্যাভার্সের প্রেমের পড়ে গিয়েছিল। ম’রির স্বভাবে যে দিকগুলো ছিল, অত খোলাখুলি একেবারে হতবাক হয়ে যাওয়া, পুরোদস্তুর পুজো করতে শুরু করা, এসব ছিল একেবারেই গ্রেসের স্বভাব বিরুদ্ধ।

গ্রেস মানুষ হয়েছিল কাকা কাকিমা’র কাছে। আসলে তারা হলেন বাবা’র কাকা ও কাকিমা। ওর তিনবছর বয়েসের সময় ওর মা মারা যায়, বাবা চলে যায় সাসকাচুয়ানে, সেখানে ওর আরেকটি পরিবার হয়েছিল। ওর এই বিকল্প মা-বাবা ছিলেন খুব সহৃদয়, এমনকি ওর ব্যাপারে বেশ গর্বিতই, যদিও খানিকটা দিশেহারা, তবে বেশিকথার মানুষ তারা ছিলেন না। কাকার জীবিকা ছিল বেত দিয়ে চেয়ার বানানো কিংবা সারানো, গ্রেসকে শিখিয়েও দিয়েছিলেন বেতের কাজ, যাতে ওকে খানিকটা সাহায্য করতে পারে গ্রেস, এবং পরে ওর চোখের দৃষ্টি কমে এলে যাতে গ্রেসই ওর জায়গাটা নিতে পারে। কিন্তু তারপর তো গ্রেস বেইলি ফলসে কাজ পেয়ে গেল গ্রীষ্মকালটার জন্য, এবং যদিও কাকার পক্ষে—কাকিমার পক্ষেও—ওকে যেতে দেওয়াটা কষ্টকরই ছিল, ওরা বিশ্বাস করতেন যে ঘরসংসার পাতার আগে জীবনের স্বাদ পাওয়া দরকার গ্রেসের।

ওর বয়েস তখন কুড়ি, এবং সবে হাইস্কুলের পড়া সাঙ্গ করেছে। একবছর আগেই শেষ হতে পারত, কিন্তু ও একটা অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। খুবই ছোট যে শহরটায় ও থাকত—মিসেস ট্র্যাভার্সের পেমব্রোকের থেকে বেশি দূরে নয়—সেখানে কিন্তু একটা হাইস্কুল ছিল। সরকারি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে সেখানে পাঁচ ক্লাস পড়ানো হত, পরীক্ষাটাকে বলা হত সিনিয়র ম্যাট্রিকুলেশন। যতগুলো সাবজেক্ট সেখানে পড়া যেত তার সবগুলো পড়ার কখনোই দরকার হত না এবং ত্রয়োদশ শ্রেণীতে উঠে প্রথম বছরের শেষে—যেটাই কিনা হওয়ার কথা ছিল ওর শেষ বছরও—গ্রেস বসল ইতিহাস, বটানি, জুওলজি, সঙ্গে ইংরিজি, ল্যাটিন ও ফ্রেঞ্চ পরীক্ষায়। অপ্রয়োজনীয় রকম ভালো নম্বর পেয়ে পাশও করে গেল। কিন্তু সেপ্টেম্বরে আবার সে এসে হাজির, সে এবার পড়তে চায় পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, ত্রিকোণমিতি, জ্যামিতি, আর বীজগণিত, অথচ মেয়েদের জন্য বিশেষ করে এই বিষয়গুলোকেই দুরূহ বলে গণ্য করা হত। ঐ বছরটা সমাপ্ত করে ত্রয়োদশ শ্রেণীর সমস্ত বিষয়ই ওর জানা হয়ে যাওয়ার কথা, বাদ থাকত শুধু গ্রীক, ইতালিয়ান, স্প্যানিশ আর জার্মান, কিন্তু সেই স্কুলে এগুলো পড়ানোর কোনও শিক্ষক ছিলেন না। গণিতের তিনটে শাখায়ই এবং বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে ও যথেষ্ট ভালো ফল করল, কিন্তু তার আগের বছরের মত অত চমকপ্রদ হল না সেই ফল। ও তখন এমনকি এও ভেবেছিল যে নিজেই শিখে নেবে গ্রীক, স্প্যানিশ, ইতালিয়ান আর জার্মান, যাতে পরের বছর আবার ওই বিষয়গুলোর পরীক্ষায় বসতে পারে। কিন্তু তখন স্কুলের প্রিন্সিপাল এসে ওর সঙ্গে কথা বললেন এবং বোঝালেন যে এতে ওর তেমন নির্দিষ্ট কোনও লাভ হচ্ছে না কেননা ও তো আর কলেজে যেতে পারছে না। তাছাড়াও কলেজের কোনও শিক্ষাক্রমেই এরকম রেকাবি-ভরা সবকিছু জেনে আসার দরকার পড়ে না। ও এটা করছে কেন? কোনও বিশেষ পরিকল্পনা আছে কি?

গ্রেস বলল, না, ও কেবল বেতের চেয়ার তৈরি করার কাজে লেগে পড়ার আগে বিনে পয়সায় যা কিছু শিখে নেওয়া যায়, সেগুলো শিখে নিতে চাইছিল।

সেই প্রিন্সিপালের সঙ্গে হোটেলের ম্যানেজারের চেনাশুনা ছিল, এবং উনি বললেন যে গ্রেস যদি গ্রীষ্মে ওয়েট্রেসের ঐ কাজটা করে দেখতে চায়, তাহলে উনি ওর হয়ে বলবেন। উনিও জীবনের স্বাদ পাওয়ার কথাটা বলেছিলেন। অর্থাৎ সেই জায়গায় সর্বপ্রকার জ্ঞানার্জনের দায়িত্বে রয়েছেন যিনি, তিনিও বিশ্বাস করতেন না যে জ্ঞানার্জনের সঙ্গে জীবনের তেমন কোনও সম্পর্ক আছে। এবং যাকেই গ্রেস বলেছে ওর নিজের এই কম্মোটির কথা—নেহাতই ব্যাখ্যা করতে, হাইস্কুল থেকে পাশ করে বেরোতে কেন ওর কিছুটা দেরি হয়েছিল—সে-ই যা বলেছে তার মর্মার্থ হলো, তুমি বাপু বেশ পাগলামোই করেছিলে।

ব্যতিক্রম ছিলেন একমাত্র মিসেস ট্র্যাভার্স, যাকে সত্যিকারের কলেজে না পাঠিয়ে পাঠানো হয়েছিল বিজনেস কলেজে, ওকে বলা হয়েছিল যে কেজো মানুষ হয়ে উঠতে হবে, অথচ এখন ওর কেবলই মনে হয়—উনি বলেওছিলেন—কত ভালো হত যদি তার পরিবর্তে, বা প্রথম থেকেই, মনটা পুরোপুরি দিতে পারতেন অকাজের জিনিসগুলো শেখায়। উনি বলেছিলেন, ‘তোমাকে তো জীবিকা উপার্জন করতেই হত। বেতের চেয়ার বানানো, সারানো তো তাও বেশ একটা কাজের কাজ। দেখা যাক।’

কী দেখা যাবে? পরে কী হবে সেই নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনও ইচ্ছেই ছিল না গ্রেসের। ও চাইছিল, তখন যেমন চলছিল, তেমন করেই যাতে চলতে থাকে। আরেকটা মেয়ের সঙ্গে শিফট পালটাপালটি করে নিয়ে রবিবারগুলোতে ও ব্রেকফাস্টের পর থেকে দিনটা খালি রাখত। এর অর্থ হলো শনিবারের কাজটা শেষ করতে অনেক দেরি হতো সবসময়ই। ফলত ওকে ম’রির থেকে খানিকটা সময় আদায় করে নিতে হতো, যাতে ম’রির ফ্যামিলির সঙ্গেও কিছুটা সময় কাটাতে পারে। তখন আর ম’রির সঙ্গে কখনও সিনেমায় যাওয়া হতো না, ডেট করা বলতে যা বোঝায়, সেটাও আর ঠিকমত হয়ে উঠতো না। তবে, ওর কাজ শেষ হলে, এগারোটা নাগাদ ম’রি এসে ওকে গাড়িতে তুলে নিত, গাড়ি চালিয়ে অনেক দূর অবধি যেত ওরা, কখনো থামত আইসক্রিম বা হ্যামবার্গারের জন্য—ম’রি কিছুতেই ওকে বার-এ নিয়ে যায়নি কখনো, কেননা গ্রেসের তখনও একুশ হয়নি—তারপর কোথাও একটা গাড়িটাকে থামিয়ে রেখে... ।

গাড়িটা থামিয়ে রেখে যে ব্যাপারটা হতো—রাত একটা কি দুটো অবধি গড়াত সেটা—সে ব্যাপারে গ্রেসের স্মৃতি অনেকটাই ঝাপসা হয়ে এসেছে, তুলনায় ট্র্যাভার্সদের গোল ডাইনিং টেবিলে বসার কথা—বা সবার হয়ে গেলে শেষ অবধি কফি কিংবা ফ্রেশ ড্রিংকস হাতে নিয়ে সবাই যে উঠে যেত—গিয়ে যে ঘরের অন্য প্রান্তে হলদেটে বাদামি রঙের চামড়ার সোফায়, রকারে, গদি-আঁটা উইকার চেয়ারে গিয়ে বসত, সেসব অনেক স্পষ্ট মনে আছে। (ডিশগুলো ধুয়ে রাখা, রান্নাঘর পরিষ্কার করা, এসবের ঝামেলা ছিল না—সকালে একজন মহিলা আসতেন, যাকে মিসেস ট্র্যাভার্স বলতেন, ‘আমার কর্মঠ বান্ধবী মিসেস অ্যাবেল।’)

ম’রি সবসময় একটা কুশন এনে কার্পেটের ওপর রেখে, তাতে বসত। গ্রেচেন, যে ডিনারের সময় জিনস কিংবা আর্মি প্যান্টস ছাড়া আর কিছু পরে এসে বসত না, সাধারণত একটা চওড়া চেয়ারে পা আড়াআড়ি রেখে বসত। ও আর ম’রি দু’জনেই বেশ বড়োসড়ো, চওড়া কাঁধ, খানিকটা মায়ের মতোই দেখতে সুন্দর—ওর ক্যারামেল রঙের ঢেউ খেলানো চুল, উষ্ণ অভিব্যক্তি ভরা হরিণীর চোখ। এমনকি ম’রিরও আছে, গালে একটা টোল। অন্য ওয়েট্রেসরা ম’রির সম্বন্ধে বলত, কী মিষ্টি না! মৃদু করে শিস দিত সেইসময়। হুব্বা হুব্বা। মিসেস ট্র্যাভার্স অবশ্য উচ্চতায় বড়োজোর পাঁচফুট, এবং দেখে মনে হয়, ওঁর সেই ঢিলেঢালা, বেশ রঙচঙে হাওয়াই পোশাক ম্যুম্যু-র নিচে শরীরটা, গোলগাল হলেও সুঠাম, বাড়তে শুরু করার আগের বাচ্চাদের মতো। সঙ্গে চোখের ঔজ্জ্বল্য এবং নিবদ্ধ দৃষ্টি, একটা ফূর্তির ভাব, সবসময় যেন একপা বাড়িয়েই আছেন, এগুলো অনুকরণ করা যায় না, জন্মসূত্রে পাওয়াও যায় না, ওরা কেউ পায়ওনি। আর চিবুকের সেই একটু অমসৃণ, লাল আভাটা তো আছেই। ওটার মূলে ছিল বোধহয় যেকোনও আবহাওয়ায় ত্বকের কথা না ভেবে বেরিয়ে পড়া, ওঁর চেহারা, ম্যুম্যু পোশাক, ইত্যাদির সঙ্গে এটাও আদতে ছিল ওঁর স্বাধীনচেতা স্বভাবটারই একটা প্রকাশ।

রোববারের এই সন্ধ্যাগুলোতে পরিবারের সবাই ছাড়াও, অতিথিরাও থাকতেন একেকসময়। কোনও দম্পতি, এছাড়াও হয়তো একা কোনও একজন, সাধারণত মিস্টার ও মিসেস ট্র্যাভার্সের কাছাকাছি বয়েসের তারা এবং অনেকটা একইরকম হয়তো, যেমন, মহিলাটি হয়তো বেশ উৎসুক, রসবোধসম্পন্ন, পুরুষেরা তুলনায় শান্ত, ধীর, সহনশীল। মজার গল্প বলতেন কেউ কেউ, তার মধ্যে রসিকতা থাকলে অধিকাংশ সময়ই সেটা হত নিজেদের নিয়ে। (বেশ কিছুদিন যাবত গ্রেস নিজেই এখন এমন দক্ষ বাক্যবাগীশ যে একেকসময় নিজেই হয়রান হয়ে পড়ে। এই নৈশাহারের কথোপকথন যে একসময় ওর কতটা অভিনব বলে মনে হতো, সেকথা মনে আনতেও ওকে এখন বেগ পেতে হয়। ও যেখান থেকে এসেছিল, সেখানে প্রাণোচ্ছল কথোপকথন মানেই ছিল নোংরা সব রসিকতা, ওর কাকা কাকিমা অবশ্যই কোনোদিন সেসবের মধ্যে যেতেন না। ক্কচিৎ কখনও লোকজন এলে যেটা হতো, হয় খাবারটার প্রশংসা, নয় সেটার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা, আবহাওয়ার আলোচনা, সঙ্গে খাওয়াটা যাতে যথাশীঘ্র সমাপ্ত হয় প্রাণপণে সেইটে কামনা করা।)

ট্র্যাভার্সদের ওখানে, ডিনারের পরে, সন্ধেয় তাপমাত্রা বেশ কম থাকলে, মিস্টার ট্র্যাভার্স একটা আগুন জ্বালতেন। সবাই মিলে একটা খেলা খেলত, যেটাকে মিসেস ট্র্যাভার্স বলতেন ‘বোকা বোকা কথার খেলা’, কিন্তু সত্যি বলতে কী, খেলতে গেলে কিন্তু বুদ্ধি যথেষ্ট লাগত, এমনকি ফালতু কিছু একটা কল্পনা করে নিলেও। এবং খেলাটা শুরু হলে কিন্তু এমন হতেই পারত, যে ব্যক্তি ডিনারের সময় চুপচাপ ছিল, সে-ই হয়তো সবচেয়ে চৌকস বলে প্রতিপন্ন হতে থাকল। একেবারেই আজব কিছু দাবি করে, তাকে ঘিরে নানা কৃত্রিম যুক্তি গড়ে তুলতে হত। গ্রেচেনের স্বামী ওয়াট এটা শুরু করত, করলে তখন খানিক পরে গ্রেসও, এতে মিসেস ট্র্যাভার্স আর ম’রি খুব খুশি হত। (ম’রি বলে উঠত, ‘দেখেছো? বলেছিলাম না। ওর খুব বুদ্ধি’, সবাই মজা পেত, পেত না কেবল গ্রেস নিজে)। এভাবে অসম্ভব উদ্ভট সব যুক্তি সাজিয়ে কথা তৈরির খেলায় মিসেস ট্র্যাভার্স স্বয়ং নেতৃত্ব দিতেন, উনি আসলে নজর রাখতেন যাতে খেলাটা খুব সিরিয়াস দিকে চলে না যায়, বা কোনও খেলুড়ে যাতে বাড়াবাড়ি রকম কোণঠাসা না হয়ে পড়ে।

নেহাতই একটা খেলায় কারুর অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ার দুর্ঘট একবারই বেঁধেছিল, যেবার মাভিস ডিনারে এল। মিসেস ট্র্যাভার্সের ছেলে নিইলের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল মাভিসের। নিজের দুই সন্তান নিয়ে বাবা মা’র সঙ্গে থাকত মাভিস, লেকের ধার ধরে গেলে বেশিদূর নয় ওদের বাড়ি। সেদিন রাতে শুধু ফ্যামিলির লোকেরাই ছিল, সঙ্গে গ্রেস, কথা ছিল যে মাভিস আর নিইল ওদের ছেলেমেয়েদেরও সঙ্গে আনবে। কিন্তু মাভিস একাই এল—নিইল ছিল ডাক্তার, জানা গেল যে সেই উইকএন্ডে সে অটাওয়াতে একটু ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। মিসেস ট্র্যাভার্সের খারাপ লেগেছিল, কিন্তু উনি সামলে নিয়েছিলেন, হাসিখুশি ভাবেই উষ্মা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘কিন্তু বাচ্চারা নিশ্চয়ই অটাওয়াতে নয়?’

মাভিস বলল, ‘দুর্ভাগ্যেরই বিষয় যে তারা অটাওয়াতে নয়। তারা যে বিশেষ মুগ্ধ করে দেওয়ার মত, এমনও তো নয়। আমি নিশ্চিত করে জানি ডিনারের সময় তারা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে উঠত। ছোটটার ঘামাচি উঠেছে আর মাইকি’র যে কী হয়েছে ভগবানই জানেন।’

বেশ ছিপছিপে, রৌদ্রস্নান করা গাত্রত্বক এক নারী সে, বেগুনী রঙের পোশাক পরা, তার সঙ্গে মিলিয়ে বেগুনী রঙের একটা চওড়া ব্যান্ড কালো চুলগুলো পেছনে ধরে রেখেছে। দিব্যি দেখতে, কিন্তু ঠোঁটের কোণগুলো ঢেকে গেছে অল্প ফুলে উঠে ভাঁজ পড়া মাংসে, জীবনে বৈচিত্রের অভাব আর অনেক কিছুই মেনে নিতে না পারার অবদান। ডিনারে খাবারের অধিকাংশটুকু স্পর্শ না করে প্লেটে ফেলে রাখল, বলল যে ওর নাকি কারিতে অ্যালার্জি।

মিসেস ট্র্যাভার্স বললেন, ‘এমা মাভিস, কী বিচ্ছিরি ব্যাপার, এটা কি সম্প্রতিই হয়েছে?’

‘আরে না না, সেই কবে থেকেই, তবে আমি কিছু বলতাম না। কিন্তু তারপর অর্দ্ধেকরাত জুড়ে কেবল বমি করা, এ আর সহ্য করা যায় না।’

‘একটু যদি বলতে আমাকে— অন্য কিছু খাবে, কী আনব বল?’

‘এই নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হবেন না তো, এই যথেষ্ট। আমার খুব একটা খিদেও নেই, এই গরমে আর মাতৃত্বের আনন্দে।’

একটা সিগারেট ধরিয়েছিল ও।

পরে একসময় খেলতে খেলতে কী একটা জিনিসের সংজ্ঞা নিয়ে ওর আর ওয়াটের মধ্যে তর্ক বেঁধে গিয়েছিল। যখন ডিকশনারিতে দেখা গেল যে ওয়াট ভুল বলেনি, ও বলে উঠেছিল, ‘আমি সত্যি দুঃখিত, তোমাদের কাছে আমি সত্যিই কিচ্ছু না।’ এরপর যখন পরের রাউন্ডের জন্য প্রত্যেককে নিজের নিজের শব্দ লেখা চিরকুট জমা দিতে হচ্ছিল, ও হেসে মাথা নাড়ল।

‘আমার কাছে কিছু নেই।’

মিসেস ট্র্যাভার্স বললেন, ‘সে কী মাভিস!’ আর মিস্টার ট্র্যাভার্স বললেন, ‘আরে তাতে কী হয়েছে, আগের যেকোনও একটা শব্দ হলেও চলবে।’

‘কিন্তু আমার কাছে আগের শব্দও কিছু নেই। দুঃখিত। আজ নিজেকে বড্ড বোকা বলে মনে হচ্ছে। আপনারা আমার চারধারে খেলতে থাকুন না?’

ওরা সেটাই করল, প্রত্যেকেই ভাণ করছিল যেন কিছুই হয়নি, আর মাভিস সিগারেট খেতে খেতে দৃঢ়সংকল্পে হাসিহাসি মুখ করে রইল। মিষ্টি করে একটা আহত, অখুশি হাসি। একটু পরে উঠে পড়ে বলল যে ভয়নাক ক্লান্ত লাগছে ওর, বাচ্চাদেরও এর চেয়ে বেশি আর দিদিমা দাদুর হাতে ছেড়ে রাখতে পারবে না, খুব সুন্দর এবং শিক্ষামূলক বেড়ানো হলো, এখন বাড়ি যেতেই হচ্ছে।

‘পরের ক্রিসমাসে তোমাকে একটা অক্সফোর্ড ডিকশনারি দিতে হবে’, অল্প আওয়াজ করে একটু তিক্ত একটা হাসি হেসে বেরিয়ে যেতে যেতে অনির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তির উদ্দেশ্যে একথা বলে গেল।

ট্র্যাভার্সদের যে ডিকশনারিটা ওয়াট খুলে দেখিয়েছিল, সেটা ছিল একটা অ্যামেরিকান ডিকশনারি।

ও চলে যাওয়ার পরে কেউ কারুর দিকে তাকাচ্ছিল না। মিসেস ট্র্যাভার্স বললেন, ‘গ্রেচেন, তুমি কি সবাইকে এক পট কফি বানিয়ে দেওয়ার মতো অবস্থায় আছ?’ গ্রেচেন রান্না ঘরের দিকে চলে যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলে গেল, ‘কী মজা। যীশু কাঁদছে।’

মিসেস ট্র্যাভার্স বললেন, ‘অনেক হ্যাপার মধ্যে দিয়ে জীবন কাটাতে হচ্ছে ওকে। ছোট ছোট দু’টো বাচ্চা।’ [চলবে]

* অ্যালিস মানরোর গল্প || আসক্তি (শেষ পর্ব)

* অ্যালিস মানরোর গল্প || আসক্তি (২য় পর্ব)


রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৩ আগস্ট ২০১৯/তারা


   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

শেষ ভালোর প্রত্যাশায়

২০১৯-০৯-২০ ১:২৯:০৭ এএম

খালেদের বিরুদ্ধে মাদকের আরেক মামলা

২০১৯-০৯-১৯ ১১:৩১:১৬ পিএম