শাহ্‌নাজ মুন্নীর গল্প || কুলপদ্দীর বানরেরা

প্রকাশ: ২০১৯-১০-৩১ ৬:০৪:০২ পিএম
শাহ্‌নাজ মুন্নী | রাইজিংবিডি.কম

অলঙ্করণ: গৌতম ঘোষ

‘বানরের গল্প শুনবেন?’

একদম কানের কাছে হঠাৎ এই প্রশ্ন করে আমাদের প্রায় চমকে দিয়ে সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে লোকটা। লম্বায় আমাদের কোমরের কাছাকাছি- বামন নাকি? আমরা মনে মনে ভাবি। ঘাড়টা নিচু করে পাশে তাকাই, চাদরে ঢাকা লোকটার মুখ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তার কথা শোনা যাচ্ছে স্পষ্ট। আজকে বিকেলেই চর মুগুরিয়া বন্দরে প্রায় শ’ তিনেক বানরকে একসাথে ঘুরতে দেখে এসে বানর সম্পর্কে আমাদের কৌতূহল যথেষ্ট বেড়ে গেছে, তাই শকুনী লেকের পাশে শহীদ মিনারের বাঁধানো বেদিতে জুত করে বসে আমরা বলি, ‘শোনান তো দেখি।’

লোকটাও বসে, ঘাসের ওপর, তারপর বলতে শুরু করে।

সে অনেক দিন আগের কথা। পদ্মা নদীর সঙ্গে যেখানে কুমার নদ এসে মিলে গেছে সেখানটাকেই এ অঞ্চলের লোকে তখন ডাকতো ‘কুলপদ্দী’ বলে, পদ্মার কোল ঘেঁষে শুয়ে থাকা আদুরে মেয়ের মতোই ছোট্ট সবুজ আর খুব আহ্লাদি এক এলাকা ছিল এই কুলপদ্দী। কলকাতার বেথুনে পড়া মেয়ে শাশ্বতী যখন কুলপদ্দীর অভিজাত রায় পরিবারের বউ হয়ে শেয়ালদা থেকে রেলে চড়ে পূর্ব বঙ্গের এই নিঝুম এলাকায় পা রেখেছিল তখনই কেন যেন কুলপদ্দীকে ভারি ভালো লেগে গিয়েছিল তার। কলকাতা থেকে এত দূরে বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়ে যাওয়ার পর বড়দা নাক কুঁচকে বলেছিল, ‘যাচ্ছিস তো বাঙালদের দেশে, সাবধানে থাকিস, দালানের বাইরে পা দিস না যেন।’

তা দালান বলতে কুলপদ্দীতে তখন এক ছিল রায় বাড়ির এই কারুকাজ করা লাল রঙা দোতলা দালান- যে বাড়ির একমাত্র ছেলে যোগেশ রঞ্জন রায়ের বউ হয়ে এসেছিল শাশ্বতি আর ছিল পদ্মার পাড়ে সবে তৈরি হওয়া জজ সাহেবের একটা ঝকঝকে একতলা বাংলো, এ ছাড়া তো বাকি সবই দরিদ্র চাষা-ভূষা মানুষের কুঁড়েঘর, দিগন্ত ছোঁয়া ধান ক্ষেত, পাট ক্ষেত আর কচুরি পানা ভরা জলাভূমি। বাড়ির সামনে পেছনে নারকেল গাছে ঘেরা বিশাল দুটো দিঘি আর রকমারি গাছের সমারোহে বিরাট বাগানে ঢাকা রায় বাড়িটাকেই আস্ত এক মিউজিয়াম বলে মনে হচ্ছিল কলকাতার মেয়ে শাশ্বতির। না, না, মিউজিয়াম না, চিড়িয়াখানা।

চিড়িয়াখানা নয়তো কি? বাগানের গাছে গাছে এত রংবেরঙের পাখি, এত বানর আর এত কাঠবিড়ালি। কলকাতার পাকা রাস্তা, এদো গলি আর ওয়েলেসলি স্ট্রিটে নিজেদের কবুতরের খুপড়ির মতো ইটের বাড়ির তুলনায় কুলপদ্দীকে দারুণ আকর্ষণীয় মনে হলো ওর। এই মনে হওয়ার অবশ্য কারণও আছে, আপনারা জানেন না, আমাদের শ্রীমতি শাশ্বতি রায়ের একটা গোপন লাজুক কবি মন রয়েছে, কলকাতায় থাকতে খাতা ভরে পল্লীগ্রামের সৌন্দর্য বিষয়ে অজস্র কবিতা লিখেছে সে। সেসব কবিতায় গ্রামের গরিব কৃষক বধূর নিকানো দাওয়া, তুলসি মঞ্চ, জলের মধ্যে বাচ্চা হাঁসের খেলা, শ্রাবণের মেঘে ঢাকা আকাশ ইত্যাদি চিত্রই কল্পনা করে করে শব্দের পর শব্দ জোড়া দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছে সে।

শাশ্বতির স্বামী যোগেশ রঞ্জন রায় বিয়ের দুদিন পরেই নতুন বউ রেখে ব্যারিস্টারি পড়তে চলে গেছে বিলাতে। যোগেশের এক বিধবা দিদি সৌদামিনি, মা হেমাঙ্গিনী, অকৃতদার জেঠা মশায় আর একগাদা চাকর বাকর ছাড়া পুরো বাড়িটাতে আর কেউ ছিল না। এই নিঝুম নীরবতায় শাশ্বতির দিন কাটত দিঘির পারে আর বাগানে ঘুরে ঘুরে। সৌদামিনি অবশ্য ব্যাপারটা ভালো চোখে দেখত না- ‘ও লো বউ, তুই কেমন মেয়ে লো? এমন বন বাদাড়ে ঘুরে বেড়াস? তোর কি ভয় ডর করে না?’

‘ভয় তো করে না দিদি, ভালই লাগে।’

‘মরণ! পুজো আর্চ্চার দিকে একটু মন দিলে তো পারিস।’

‘আমি যে প্রকৃতি দেবীর পুজো করি গো দিদি।’

শাশ্বতি হাসতে হাসতে বলে, সৌদামিনির এসব কথা বুঝতে পারার কথা নয়, সে মুখ ঝামটা মেরে বলে, ‘তোরা কলকাতার মেয়ে, কত ঢং জানিস, তোদের বোঝা ভার, তার ওপর পেটে আবার কিছু বিদ্যেও আছে শুনেচি।’

নন্দাইয়ের কথায় হেসে গড়িয়ে পড়ে শাশ্বতি। নিজের ঘরে দরজা লাগিয়ে সে যোগেশের পত্রের উত্তর লিখতে বসে। যোগেশ চিঠি লিখে ইংরেজিতে, ইংরেজের আদব কায়দা, ইংরেজি চাল-চলন সবই তার বিশেষ পছন্দ, চিঠিজুড়ে তাই টেনিস কোর্ট, ব্রেকফাস্ট, টি পার্টি, ডিনার, পিয়ানো আর ইংল্যান্ডের উইন্টারের বর্ণনা। শাশ্বতি চিঠি লেখে বাংলাতে, তার মনে হয় ইংল্যান্ডের পাতা ঝরার সৌন্দর্য যোগেশের চোখে পড়লেও কুলপদ্দীর বকুল আর শিউলির দিকে সে বোধহয় কখনো ফিরেও তাকায়নি। শাশ্বতি তাই লেখে:

‘ওগো, কাল ভোরে উঠিয়া দেখি, গাছ হইতে শিউলি ঝরিয়া ভূমিতে এক অপূর্ব চিত্র তৈরি হইয়াছে, আমার চিত্ত তাহা দেখিয়া এতো আনন্দে পরিপূর্ণ হইলো, যাহা বর্ণনা করা কঠিন। জানো, বাড়ির বৃক্ষরাজির মধ্যকার প্রাণী সকলের সহিত আমি বন্ধুত্ব গড়িয়া তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করিতেছি, তবে উহারা খুবই দুষ্ট আর চঞ্চল প্রকৃতির, অবশ্য সম্প্রতি উহাদের কেউ কেউ যে আমাকে পছন্দ করিতে শুরু করিয়াছে তাহা টের পাইতেছি। ভাবিয়াছিলাম কুলপদ্দী আমার ভাল লাগিবে না, কিন্তু সেই ভাবনা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হইয়াছে।’

তবে শাশ্বতির এই প্রাণিপ্রীতি হেমাঙ্গিনীর কিন্তু মোটেও পছন্দ হচ্ছিল না- ‘এ রাম, ছি ছি, ঘেন্নায় মরে যাই, তুই এসব জন্তু জানোয়ারকে ঘরে আসতে দিচ্ছিস যে বউ, এদের লাই দিলে মাথায় ওঠে, জানিস না?’

শাশুড়ির কথায় শাশ্বতির মধ্যে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায় না, সে আগের মতোই যেমন দিচ্ছিল তেমনি করে এক কাঁদি কলা থেকে একটা একটা করে কলা ছিঁড়ে হাতে নিচ্ছিল আর জানালা দিয়ে একের পর এক বানর সেনা ঢুকে শাশ্বতির হাত থেকে কলাটা নিয়েই দিচ্ছিল ছুট, যেন খুব মজার একটা খেলা খেলছে তারা, শাশ্বতির চোখে মুখেও কেমন একটা স্নিগ্ধ আনন্দের ভাব ফুটে উঠেছিল, ওর আঁচল গড়াচ্ছিল মেঝেতে, কয়েকটা বানর সেই আঁচল মারিয়ে এসেও কলা নিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ করে ঘরে ঢুকে চোখের সামনে পুত্রবধূর এসব কাণ্ড দেখে হেমাঙ্গিনীর তো ভিমড়ি খাওয়ার জোগাড়।

‘এ্যাঁ,... এ কি হলো? যোগেশ দেখি কলকাতা থেকে একটা পাগলি বিয়ে করে এনেছে রে,... রামো, রামো, রামো!’

হেমাঙ্গিনির কথা যেন শুনতেই পায়নি এমনভাবে বানরদের কলা বিতরণ শেষ করে নিজের লুটিয়ে পড়া আঁচলটা তুলে নিয়ে শাশ্বতি বলে, ‘মা দেখো, ওই যে বড় পেয়ারা গাছটায় গম্ভীর হয়ে একজন বসে আছে না! দেখো ওই যে...’

‘এ ভগবান এ তো দেখি এক ভোৎকা বানর! এ কোথ থেকে এলোরে?’

‘জানো মা, ওর ভাব ভঙ্গি না অনেকটা মানুষের মতো।’

‘কি যে তুই বলিস না বউ!’

হেমাঙ্গিনী গজ্‌গজ্‌ করেন, ‘শোন, বনের প্রাণিকে বনে থাকতে দে, ঘরে এনে তুলিস না, ঘেন্না পিত্তি বলে তোর ভেতরে ভগবান কিছু দেয়নি, নাকি?’

বানরকে এত ঘেন্না করার কি আছে, ভেবে পায় না শাশ্বতি। বড়দা তো বলতোই, ‘মানুষের পূর্বপুরুষ আসলে বানর, হোমোসেপিয়ান গ্রুপের সদস্য এই বানরই হচ্ছে মানুষের সবচে কাছের আত্মীয়, বুঝলি?’

তাই যদি সত্যি হবে তাহলে ওদের কেন ঘেন্না করব? শাশ্বতি আবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়, চেয়ারের মতো বেঁকে থাকা পেয়ারা গাছটার ডালে কেমন বাবুদের মতো গম্ভীর হয়ে বসে আছে বড় বানরটা।

‘কি রে কলা নিতে এলি না যে?’ শাশ্বতি জানালা থেকে মুখ বাড়িয়ে বলে। বানরটা চোখ ঘুরিয়ে শাশ্বতির দিকে তাকায়, গম্ভীর হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়েই থাকে তারপর যেন তার খুব রাগ হয়েছে এমন ভাব দেখিয়ে গাছ থেকে নেমে ঘন গাছ-পালার আড়ালে হারিয়ে যায়। শাশ্বতির হঠাৎ মনটা খারাপ হয়ে যায়। আজ সকালের ডাকে যোগেশের চিঠি এসেছে। সেই কঠিন কঠিন শব্দে ইংরেজি ভাষায় লেখা ভাব-গম্ভীর চিঠি। যোগেশ লিখেছে:

‘তুমি দ্রুত কলকাতায় চলে যাও, কুলপদ্দীর জঙ্গলে থেকে তোমার কোন উন্নতি তো হবেই না বরং তুমি দিন দিন জংলী হয়ে উঠছো, শুনতে পাই পশুদের সাথে তোমার খুব ভাব। তোমার অবগতির জন্য জানাই পশুরা সামান্য খাবার, আশ্রয় আর সঙ্গ পেলেই খুশি, তাদের মধ্যে কোনো আবেগ, ব্যক্তিত্ব বা তুমি যাকে মন বলছো, তার বালাই নাই।’

কচু জানো তুমি! মনে মনে যোগেশকে বুড়ো আঙ্গুল দেখায় শাশ্বতি। এই যে বড় বানরটার কথাই ধরো না, ও সবার সঙ্গে কলা নিতে এলো না কেন? আর কেউ বুঝুক আর না বুঝুক শাশ্বতি ঠিকই বুঝেছে, অভিমান করে ও আসেনি, সবার সাথে গণহারে সে কিছুতেই খাবার খাবে না, সে চায় শাশ্বতির স্পেশাল আর অখণ্ড মনোযোগ। যোগেশ তো প্রাণিদের বিবেচনা করছে বই পড়ে, বাইরে থেকে, আর শাশ্বতি ওদের দেখেছে হৃদয় দিয়ে, ভেতর থেকে, এই যে বানরগুলো ওদের মধ্যে ঈর্ষা, ভয়, দুঃখ, ভালোবাসা কি নেই? হ্যাঁ, মানুষের মতো জটিলতা হয়তো ওদের মধ্যে নেই, কিন্তু যা আছে তা-ই বা কম কিসে?

শাশ্বতি তাক থেকে খাতা কলম পেড়ে নিয়ে যোগেশকে চিঠি লিখতে বসে।

‘তুমি লিখিয়াছো ইংরেজি ভাষায় পত্র লিখিতে, হ্যাঁ, তাহাতে ইংরেজির চর্চা হয় ঠিক, কিন্তু বাংলা ভাষায় পত্র না লিখিলে আমার মন ভরে না, ওগো জানো, ওই যে বড় বানরটার কথা তোমাকে লিখিয়াছিলাম, উহার একটা নাম দিয়াছি, নামটা হইলো, ‘গুলটুশ’ আমি বাগানে গিয়া ‘গুলটুশ’ বলিয়া উচ্চস্বরে ডাক দিলেই সে আসিয়া উপস্থিত হয়। ও আমাকে ভারি ভালোবাসে। গুলটুশকে আমার কখনো কখনো একটি ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ বলিয়া ভ্রম হয়। সে দেখিতে যেমন অনেকটা মানুষের কাছাকাছি, তেমনি তার আচরণও অনেকটা মানুষের মতোই। সম্ভবত সে নরবানর, তুমি তো ডারউইনের বিবর্তনবাদ পড়িয়াছো...’

‘বউ ও বউ, দেখ তোর বাপের বাড়ি থেকে লোক এসেছে।’ সৌদামিনির ডাকে নিজের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসে শাশ্বতি দেখে, তার পিসতুতো ভাই ধীরেন এসেছে।

‘পুজোয় তোকে কলকাতা নিয়ে যাবার জন্য মামা পাঠিয়ে দিলেন দিদি, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে, কাল ভোরেই ট্রেন।’

তা শাশ্বতি যাবে বৈকি, পুজোর মতো এমন একটা উৎসব বাড়ির লোকদের সঙ্গে কাটাতে কার না ভালো লাগে? কিন্তু তার এখানের সংসার? তার বৃক্ষরাজি, পক্ষী দল, বানরকূল, কাঠবিড়ালি?

দিঘি থেকে জাল পেতে তোলা পাকা রুইয়ের মুড়ো দিয়ে বানানো মুড়িঘন্ট খেতে খেতে ধীরেন তার দিদির দিকে তাকায়, ‘এত কষ্ট করে তোকে নিতে এলাম, আর তুই কি-না একটুও খুশি হলি না দিদি?’

‘না না, খুশি হইনি কে বললো? আসলে এই জায়গাটা আমার কেন জানি খুব ভালো লেগে গিয়েছে রে। দুদিনের জন্য যাব তাতেই ছেড়ে যেতে কেমন মায়া লাগছে।’

ধীরেনের তাড়ায় ট্রেন ধরতে ভোরবেলায় বেরিয়ে পড়তে হলো শাশ্বতির, গুলটুশ বা অন্য কারো কাছ থেকে আর বিদায় নেয়া হলো না তার।

পুজোকে কেন্দ্র করে শাশ্বতিদের কলকাতার বাড়ি একেবারে সরগরম। দাদা, বউদি, দুই দিদি, জামাইবাবু, তাদের ছেলেমেয়ে, সবার সঙ্গে হৈ হুল্লোড় করে, পুজো মণ্ডপগুলো ঘুরে বেশ কাটল পুজোর কয়েকটা দিন। যদিও এতসব হুল্লোড়ের মধ্যেও মাঝে মাঝেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিল শাশ্বতি, জামাইবাবুরা রসিকতা করে বলছিল, ‘কিরে শ্বাতি, যোগেশের জন্য মন কেমন করছে বুঝি?’

বৌদি ঠেস মেরে বলেছিল, ‘নায়িকার এখন বিরহ পর্ব চলছে, ক্ষণে ক্ষণে মন তো উতলা হবেই।’

মৃদু হেসে চুপ করে থেকেছে শ্বাশতি, সে কেমন করে এদের বোঝাবে যোগেশ নয়, যোগেশের বাড়ির গাছপালা আর প্রাণিকুলের জন্য তার খুব মন খারাপ লাগছে। আচ্ছা, ওদেরও কি আমার কথা এরকম করে মনে পড়ছে? এই দুপুর রোদে কি করছে গুলটুশ? কেমন আাছে পুরোনো বকুল গাছটা? কদবেল গাছের বেলগুলো কতখানি বড় হলো?

শাশ্বতির মা নেই, পুজো শেষে বাবা আদর করে বললেন, ‘কার্তিক মাস পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে থেকে যা না মা।’

উফ্, কলকাতা যে এত বেশি দম আটকানো বদ্ধ একটা জায়গা তা আগে কেন এমন করে মনে হয়নি শাশ্বতির, জানালা খুললে ছোট্ট একটা ধোয়াটে মলিন আকাশ, হাজার খুঁজেও সবুজের দেখা মেলা ভার, চারপাশে একটাও প্রজাপতি নেই, ঘাসফুল নেই, বাতাসটাও কেমন যেন চাপা আর গুমোট, সব শুনে বড়দা বলল, ‘তুই তো দেখি দুদিনের বৈরাগি হয়ে ভাতকে অন্ন বলতে শুরু করেছিস শ্বাতি, সারাজীবন বাস করলি কলকাতায়, এখন মাথা খুঁড়ে মরছিস কোথাকার কোন অজ পাড়াগাঁ কুলপদ্দীর জন্য, ওখানে তোর মন টেকে কি করে, ভেবে পাই না।’

শাশ্বতি নিজেই কি জানে কি করে ওর মন টেকে, আর কেনইবা ওখানকার সব কিছু এত ভালো লেগে গেছে ওর। শাশ্বতি যেন নিজেই নিজেকে চিনতে পারে না। এ তার কেমন টান! কেমন আবেগ! অঘ্রাণের শুরুতে আর পারল না, ধীরেনকে নিয়ে প্রায় জোর করে কুলপদ্দীতে ফিরে এলো শাশ্বতি।

‘ও বউ এসেছিস, এবার আমাদের উদ্ধার কর, তোর বাঁদরগুলো তোকে দেখতে না পেয়ে আমাদের যেন ছিঁড়ে খায়, তুই যে কি যাদু করেছিস ওদের তা তুই-ই জানিস বাপু!’

শাশ্বতি আসাতে সৌদামিনি আর হেমাঙ্গিনী দুজনেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। ওফ, শাশ্বতি বড় করে শ্বাস নেয়, তার ফুসফুস ভরে ওঠে বিশুদ্ধ বাতাসে, দালানের বাইরে বেরিয়ে এসে কিশোরীর মতো দুই হাত দুই পাশে ছড়িয়ে দিয়ে ঘুরতে থাকে শাশ্বতি- ‘কইরে আমার গুলটুশ, কইরে আমার বানরকুল, কইরে আমার কাঠবিড়ালি, আমার আদরের গাছ পাতা, পশু পাখি।’

কুলপদ্দীর সবাই যেন তৃষ্ণার্ত হয়ে ছিল রায় বাড়ির যোগেশের বউ শাশ্বতির মুখের এই আদুরে ডাকটা শোনার জন্য, যেন তারা ক্ষুধার্ত হয়েছিল শাশ্বতির একটুখানি স্নেহ, একটুখানি মমতা আর একটু মনোযোগ পাবার জন্য।

‘ওরে আমার সোনারে, তোরা এতদিন কেমন ছিলিরে, কেমন করে কেটেছে তোদের দিন? আহা, গুলটুশ তুই বুঝি একটু শুকিয়ে গেছিস, ওরে শিরীষ, তোর ডালটা এমন ভাঙল কীভাবে রে? মা গো, এত ফুল কীভাবে ফুটালি তোরা চম্পা-পারুল? আরে, আরে বাবলার ডালে দেখি নতুন অতিথি, ওরে ওটা কোন পাখির বাসারে? এ্যাঁ, লেজ দুলিয়ে গান করছিস, কেরে তুই বেনে বউ নাকি কুটুম পাখি?’

প্রকৃতির খোঁজখবর নেয়া যেন শেষই হয় না শাশ্বতির। আর গুলটুশ? গুলটুশ কিন্তু অন্যদের মতো এক ডাকেই ছুটে এলো না, একটা অর্জুন গাছের শিকড়ে বসে রাজ্যের অভিমান নিয়ে তাকিয়ে রইল শাশ্বতির দিকে। নীরবেই যেন কত কথা বলছে সে, যেন বলছে, ‘এই তোমার ভালোবাসা? কাউকে কিচ্ছু না বলে হুট করে চলে গেলে, এখন এসে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছো। তোমরা মানুষরা বুঝি এমনই।’

তো শেষ পর্যন্ত গুলটুশের রাগ ভাঙাতে কত কথা, কত অনুনয় যে করতে হলো শাশ্বতিকে।

‘পাগলি! পাগল বউ জুটেছে আমাদের যোগেশের কপালে।’

সৌদামিনি আর হেমাঙ্গিনী ওর কাজ কারবার দেখে খানিকটা বুঝি প্রশ্রয়ের সুরেই বলে।

হেমন্তের শুরুতে যোগেশ চিঠি লিখল যে, সে দেশে ফিরছে। সৌদামিনি আর হেমাঙ্গিনী বসে গেল যোগেশের প্রিয় খাবার, প্রিয় পিঠা, প্রিয় মিষ্টি তৈরির যোগাড়যন্ত্র করতে, শাশ্বতি কী করবে? যোগেশকে যতখানি চিনেছে, বুঝেছে, তাতে করে চুপচাপ অপেক্ষা করা ছাড়া, ওর এখন কিছুই করার নেই।

‘জানিস গুলটুশ, তোদের জামাই বাবু আসছে, হ্যাঁরে, বাবু শ্রী যোগেশ রঞ্জন রায়, ব্যারিস্টার এট ল’। মন মেজাজ কেমন? তা একটু চড়া বটে, উহু, পশু পাখি বোধহয় তার একবারেই পছন্দ নয়, না না ভয় পাসনি, তোদের পাশে আমি আছি না।’

যোগেশ কুলপদ্দীতে এলো সত্যিকারের সাহেব সেজে, পরনে কোট টাই হ্যাট, ঠোঁটে ধোয়া উগড়ানো পাইপ আর মুখে ইংরেজি বোল চাল। সৌদামিনি আর হেমাঙ্গিনী তো বটেই, যোগেশকে দেখে শাশ্বতিও খানিকটা ঘাবড়ে গেল। মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া হয় কি-না, খাওয়ার জলের মধ্যে কলেরার জীবাণু আছে কি-না তা নিয়ে যোগেশ যেন খামাকাই একটু বেশি ব্যস্ত। ইংল্যান্ডে নারী-পুরুষের মধ্যে মেলামেশা কত সহজ আর স্বাভাবিক তা নিয়ে রাতে শাশ্বতির সাথে এক তরফা গল্প করে গেল যোগেশ। শাশ্বতি কথা বলবে কি? ওর জগত যাদের নিয়ে তাদের ব্যাপারে তো বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই ওর স্বামীর। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কলকাতা বা ঢাকা গিয়ে প্র্যাকটিস শুরু করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে যোগেশ। যতদিন মা আর দিদি আছে ততদিন না হয় কুলপদ্দীর বাড়িটা রইল, তারপর সব বেচেবুচে ঢাকা বা কলকাতায় স্থায়ী হওয়ার ইচ্ছা যোগেশের। শাশ্বতি চুপচাপ শুনে যায়, কুলপদ্দীর এই বাড়ি গাছপালা প্রাণিকুল থাকবে না, ভাবতেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ব্যথা করে ওঠে ওর।

‘ন্যাস্টি! তুমি ওই বানরগুলোর এত কাছে যাচ্ছো কেন? ওদের শরীরে নানারকম জার্ম থাকতে পারে! ওরা তোমাকে কামড়ে দিতে পারে, ওহ্ রাবিশ!’

শাশ্বতি প্রতিদিনের মতোই সকালবেলা কলা খাওয়াচ্ছিল বাঁদরদের, ব্যাপারটা একদম পছন্দ হলো না যোগেশের। শাশ্বতি যোগেশকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল- ‘না, না, ওরা কিচ্ছু করবে না, বড্ড লক্ষ্মী ওরা, দেখো কি সুন্দর লাইন ধরে এসে খাবার নিয়ে যাচ্ছে, এই তুমিও এসো না গো, এসো, তোমাকে গুলটুশের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।’

‘নাহ্, এই কুলপদ্দীতে থেকে থেকে তুমি একবারে গেঁয়ো ভূত হয়ে গেছো।’

যোগেশ স্ত্রীর আহ্বানে সাড়া না দিয়ে নাক সিঁটকে মন্তব্য করে।

‘বাড়ি তো নয়, যেন ফরেস্ট বানিয়ে রেখেছে, উফ্, কোনো সিভিলাইজড মানুষ এখানে থাকতে পারে!’ যোগেশ তার বিরক্তি প্রকাশ করে আবার ঘরের ভেতর ঢুকে যায়। শাশ্বতি বুঝতে পারে যোগেশের হাবভাব বানরকুলের মোটেও পছন্দ হয়নি। সে চোখ পাকিয়ে ওদের ধমকে দেয়- ‘এই খবরদার, উনি কিন্তু আমার স্বামী, পতি দেবতা, হু।’

গুলটুশের ভাব ভঙ্গি তো রীতিমতো হিংস্র, যেন সে যোগেশকে সহ্যই করতে পারছে না। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে গুলটুশকে কোনোভাবে শান্ত করে শাশ্বতি।

‘এই, স্নান না করে ঘুরে ঢুকো না কিন্তু,’ দোতলার জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে শাশ্বতিকে বলে যোগেশ, ‘ওই নোংরা জীব-জন্তুগুলোর সঙ্গে তুমি কীভাবে যে মিশো আমি ভেবেই পাই না!’

দিঘিতে  স্নান সেরে উদোম গায়ে শুধু শুকনো কাপড়টা এক প্যাঁচ করে পড়ে শোবার ঘরে ঢুকলো শাশ্বতি, পালঙ্কে কাত হয়ে শুয়ে একটা ইংরেজি নভেল পড়ছিল যোগেশ।

সৌদামিনি আর হেমাঙ্গিনী দুজনেই সেদিন পুজো দিতে গিয়েছিল মন্দিরে। ফলে দোতলার পুরোটাই ছিল খালি। দিনের আলোয় স্বল্পবসনা শাশ্বতিকে দেখে যোগেশের মনে হঠাৎ করে কিছু একটা ওলট পালট হয়ে যায়, সে আস্তে আস্তে উঠে এসে পেছন থেকে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে।

‘আঃ, এই, কি করছো, ছাড়ো, ছাড়ো।’ বলে শাশ্বতি যতই বাধা দেওয়ার চেষ্টা করুক যোগেশের সবল হাতের বাঁধন খুললো না। সে প্রায় পাঁজাকোলা করে শাশ্বতিকে নিয়ে এলো বিছানায়।

‘এই এসব কি হচ্ছে, দরজা জানালা খোলা তো।’

কিন্তু শাশ্বতির কোনো কথাই যেন কানে ঢুকলো না যোগেশের যেন সে মাতাল কিংবা যেন সে চেতনে নাই, যেন প্রবল এক ঘোরের মধ্যে সে ঘুরপাক খাচ্ছে আর সেই ঘোরের ঘুর্ণিতে সে টেনে নিতে চাইছে শাশ্বতিকেও, অতঃপর সেই অপ্রতিরোধ্য টানে সেই প্রবল ঘুর্ণিপাকে শাশ্বতি এবং যোগেশ দুজনেই জ্ঞান হারিয়ে যেন অন্য কোনো জগতে চলে যেতে থাকে ...

তাদের ঘরের জানালা খোলা থাকে, আর একটু দূরের পেয়ারা গাছের ডালে বসে সেই দৃশ্য গভীর বিস্ময় ও ঈর্ষার সঙ্গে অবলোকন করে একটি প্রাণি, তার কণ্ঠে ভাষা নাই, তার শরীর রোমশ, তার চেপ্টা কান দুটি চেপে বসেছে মাথার সঙ্গে, তার উঁচু কপালের নিচে ছোট ছোট দুটি বাদামি চোখ, সেই চোখের ভাষা অন্যরা না বুঝলেও শাশ্বতি বুঝতে পারে, কিন্তু শাশ্বতি তো এখন শাড়ি-টারি গুছিয়ে দেয়ালে বসানো আয়নায় মুখ দেখে কপালে সিঁদুর পরতে ব্যস্ত। গুলটুশ গোঙানির মতো একটা শব্দ করে পেয়ারা গাছের ডাল থেকে লাফ দিয়ে পাশের আম গাছের ডাল ধরে ঝুলে পড়ে। এতে ধপ করে একটা ভারি শব্দ হলে শাশ্বতি চমকে তাকায়, তার কপালের সিঁদুর কিছুটা থেবড়ে যায়, বিছানায় আধ শোয়া হয়ে নভেল পড়তে পড়তে যোগেশও চমকায় তারপর হেসে বলে,  ‘নিশ্চয়ই তোমার বানর সেনাদের কেউ।’

‘গুলটুশ নয়তো?’ শাশ্বতি মনে মনে ভাবে। কিন্তু গাছের ডালের সবুজ পাতার দুলুনি ছাড়া জানালা দিয়ে আর কিছুই চোখে পড়ে না ওদের।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, যোগেশ এখন একাই কলকাতা যাবে, ওখানে যদি ঠিকমতো পসার জমে ওঠে তাহলে পরে এসে শাশ্বতিকেও নিয়ে যাবে। যাক আরো কিছুদিন কুলপদ্দীতে কাটানো যাবে ভেবে মনে মনে স্বস্তি পেল শাশ্বতি, কিন্তু হঠাৎ করে গুলটুশের কি হলো? দূরে দূরে হাঁটছে, খাবার দিলে খাচ্ছে না, কাছে ডাকলেও আসছে না। বাবুর রাগ কত! শাশ্বতি মনে মনে হাসে।

আজকাল সকাল সকাল পশু পাখিদের খাইয়ে একেবারে স্নান সেরে ঘরে ঢোকে শাশ্বতি, বিকেলে বাগানে ঘুরে বেড়ালেও ছোয়াছুয়িটা এড়িয়ে চলে, যোগেশ যখন পছন্দ করে না, তখন কি আর করা? এজন্যই কি গুলটুশ অভিমান করেছে? কে জানে? এমন সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে একটু অন্যমনস্ক হয়েই ভেজা কাপড় ছেড়ে শুকনো শাড়িটা গায়ে জড়াচ্ছিল শাশ্বতি, হঠাৎ পেছন থেকে দুটো লোমশ হাত ওকে জড়িয়ে ধরল, অকস্মাৎ এই ঘটনায় ভয় পেয়ে অস্ফুট একটা চিৎকার করে উঠল শাশ্বতি।

যোগেশ তখন মায়ের ঘরে বসে ওর কলকাতা যাওয়ার দিন তারিখ পাকা করে নিচ্ছিল, শাশ্বতির চিৎকারটা ওর কানে পৌঁছুতে ‘শ্বাতির আবার কী হলো?’ বলে যখন সে তার শোবার ঘরের দিকে ছুটে এলো ততক্ষণে শাশ্বতিকে মাটিতে ফেলে ওকে আদরে আদরে অস্থির করে তুলেছে গুলটুশ। দৃশ্যটা যোগেশের কাছে এমনই বীভৎস মনে হলো যে কিছুক্ষণের জন্য যেন সে সম্বিৎ হারিয়ে ফেলল। তারপরই ‘বাস্টার্ড’ বলে এক হুংকার দিয়ে পাশের ঘর থেকে দৌড়ে তার বন্দুকটা নিয়ে এসে গুড়ুম গুড়ুম শব্দে ঘর কাঁপিয়ে বানরটার মাথা লক্ষ্য করে দুইবার গুলি করল সে। শাশ্বতি তখন থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে জ্ঞান হারিয়েছে। সৌদামিনি আর হেমাঙ্গিনী মিলে অজ্ঞান শাশ্বতির পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বন্দুকের গুলির শব্দে নীচতলা থেকে সিঁড়ির গোড়ায় ছুটে আসা উৎকণ্ঠিত চাকর বাকরদের ডেকে যোগেশ স্থির নিষ্কম্প কণ্ঠে বলে, ‘উপরে এসে রক্তটা ধুয়ে দে, আর মরাটাকে নিয়ে জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আয়।’

গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত, কিন্তু অচেনা লোকটা থামলো না, সে বলল, ‘এর পরদিন কুলপদ্দীর লোকজন দেখলো এক অবাক দৃশ্য, তারা দেখলো শত শত বানর এসে ভিড় করেছে জজ সাহেবের বাংলোর সামনে, এদের মধ্যে দুজন কাঁধে করে বয়ে এনেছে গুলটুশের শব দেহ, আর অন্যরা হাত জোড় করে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে পুরো বাংলোটাকে ঘিরে, সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য, যেন বানরও বিচারকের কাছে করজোড়ে তাদের সঙ্গী হত্যার বিচার চাইছে। পুরো একদিন এক রাত তারা ঠায় দাঁড়িয়ে রইল।’

তারপর?

তার পরদিন থেকে জানেন, কুলপদ্দীর কোথাও আর একটা বানরও দেখা গেল না। যেন রাতারাতি তারা অদৃশ্য হয়ে গেছে কুলপদ্দী থেকে।


ঢাকা/তারা


   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

সুরের মূর্ছনায় হেমন্তের রজনী

২০১৯-১১-১৬ ১:১৮:৫৭ এএম