ছোটগল্প || বিষণ্ন পৃথিবী ছেড়ে

প্রকাশ: ২০২০-০১-১৬ ৮:৫৭:৫৭ পিএম
মেহেদী ধ্রুব | রাইজিংবিডি.কম

কাওরাইদ বাজারে, বৈশাখী মেলার সময় নাগরদোলায় চড়লে যেভাবে মাথা ঘুরে যেত, সেভাবে মাথা ঘুরছে। পেটপোড়া খালে, শিরিষ গাছের মগডাল থেকে ছলছলা পানিতে ঝাঁপ দিলে যেভাবে আত্মা উড়ে যেত সেভাবে আত্মা উড়ে যাচ্ছে। আরাফ কিছুই বুঝতে পারছে না। বিছানা-খাট ভনভন করে ঘুরছে। মনে হচ্ছে বাসা উলটপালট হয়ে যাবে- কী শুরু হয়েছে? এসব কীসের আলামত? ভূমিকম্প নাকি কেয়ামত?

আরাফ কান খাড়া করেও মানুষের চিৎকার শুনতে পায় না। সে বরং শোয়া থেকে ওঠার চেষ্টা করে, কিন্তু মাথা উঁচু করলেই মাথা ঘোরানো বেড়ে যাচ্ছে। পেটের ভেতর থেকে নাড়িভুড়ি বের হয়ে আসবে যেন! হাজার চেষ্টা করেও নিজেকে স্থির রাখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে সে আর মানুষ নেই। লাটিম খেলার কোপ খাওয়া লাটিম হয়ে গেছে। হাত-পা-মাথা কোনো কিছুর নিয়ন্ত্রণ আর নিজের কাছে নেই। হয়তো আড়াল থেকে অন্য কেউ তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে- তাকে নিয়ে খেলছে।

আদিবা চলে যাবার পর থেকে প্রায়ই এমন হচ্ছে। সঙ্গে নতুন করে দুটি ঝামেলা এসে হাজির হয়েছে। একটা কুমির জানালার পর্দায় চড়ে লেজ বাঁকিয়ে ফাঁসের দড়ির মতো হয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়টি হলো আদিবার শরীর থেকে যে গন্ধটা আসত, যে গন্ধটা ছিল মায়ের শরীরের গন্ধের মতো- সেই গন্ধটা আরো প্রকট হচ্ছে। মাথার মধ্যে চিন্তার ঘুণপোকা করাতকলের মতো শব্দ করছে। যেখানে পানির নামগন্ধ পর্যন্ত নেই, আশেপাশে খাল-বিল পর্যন্ত নেই, সেখানে কুমির আসবে কোথা থেকে? যে বাসায় আদিবার চিহ্ন পর্যন্ত নেই, বেসিনে বা ড্রেসিং টেবিলের সামনে বা বাসার কোথাও একটা ছেঁড়া-খোড়া চুল পর্যন্ত নেই, সেখানে গন্ধ আসবে কোথা থেকে?

সে কুমিরের হাত থেকে বাঁচার জন্য পর্দায় চোখ রাখছে না, কিন্তু গন্ধ থেকে বাঁচার উপায় কী? সাড়া গায়ে পারফিউম মেখেও কাজ হচ্ছে না। এদিকে অফিসে যাওয়া হচ্ছে না; উনিশ-বিশ দিন হয়ে গেছে! এত দিন অফিস কামাই করলে প্রাইভেট জব থাকার কথা নয়। অথচ হাতে টাকাকড়ি নেই। গত মাসের বাসা ভাড়া পর্যন্ত দেয়া হয়নি। কেন এমন হচ্ছে? কেন?

এমন শোচনীয় জীবন ছিল না আরাফের। মা পর হয়ে যাবার পরেও না; আদিবার সঙ্গে ঘর বাঁধার পরেই না মা এসে সব উলটপালট করে দিলেন। সুন্দরী ও ফ্যাশন সচেতন আদিবা উগ্র ছিল না। কিন্তু আদিবার মতো মেয়ে তার মতো পাগলের সঙ্গে সংসার করবে কেন? যেখানে পুরাতন প্রেমিক এখনো এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে তাকে গ্রহণ করার জন্য। সেখানে তার মতো ছেলের অস্বাভাবিক আচরণ মেনে নেয়ার কোনো মানেই হয় না। যদিও আদিবার পুরাতন প্রেম বা মেসেঞ্জার বা চ্যাটিং নিয়ে তার মাথাব্যথা ছিল না কখনো। গণ্ডগোল পাকিয়েছে মা!

আরাফের শয়নে-স্বপনে বারবার আসে মায়ের মুখ। যা বর্তমানের সঙ্গে ভয়ংকরভাবে লেপ্টে যায়। হাজার চেষ্টা করেও একটা থেকে আরেকটা আলাদা করা যায় না। হৃদয়-মন্দিরে কথার পুতুল নেচে যায়। অথচ সংসার জীবনের শুরুতে, মানে আদিবা চলে যাবার আগে কত কথা, কত স্বপ্ন, কত সুখ আর আনন্দে মন-মঞ্চ মুখরিত ছিল ! কিন্তু মা এসে সবকিছু এলোমেলো করে দিলেন। ক্ষণে ক্ষণে মা কোথা থেকে এসে কোথায় নিয়ে যান? কোন মায়ার জগতে? কোন স্বপ্নের ঘোরে? মা কেন বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে চুমু খান? কেন শরীরে হাত বুলিয়ে দেন? কিন্তু মায়া বা স্বপ্নের ঘোর কেটে গেলে সে বুঝতে পারে মা নয়, এটা তার স্ত্রী আদিবা। এক নিমিষেই মা হয়ে যায় আদিবা অথবা আদিবা হয়ে যায় মা।

অথচ দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় মা পর হয়ে গেছেন অথবা মরে গেছেন অথবা ভুলে গেছেন অথবা হৃদয়ের এক কোণে দাফন হয়েছেন। সেসব কথা মনে হলে পাগল পাগল লাগে। যখন গ্রামের লোকেরা মাকে চাচার সঙ্গে এক ঘরে রেখে তালা দিয়ে রাখে, যখন পরপুরুষকে ঘরে জায়গা দেয়ার অপরাধে লিচু গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখে, যখন জেনা করার অপরাধে একশ একটা দোররা মেরে কবুল বলতে বলে, তখন তার মনে হয় বাঁচার একমাত্র পথ আত্মহত্যা। ইচ্ছে করে পৃথিবীটাকে কচলিয়ে দুমড়ে-মুচড়ে পিষে ফেলতে।

তবে শেষ পর্যন্ত ফাঁসের দড়ি থেকে নিজেকে ফেরাতে পারে সে। কারণ সেদিন রাতেই মাকে রেখে গ্রাম ছেড়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। কিন্তু ঘর থেকে বের হবার পরে বাবার কথা মনে পড়ে খুব। বাবার কবরের কাছে একবার মাত্র দাঁড়ায় সে। তারপর পবনের মতো গতি আসে পায়ে। এক টানে স্টেশনে পৌঁছে যায়। থেকে থেকে মনে পড়ে বাবার কথা, মার কথা, গ্রামের লোকের কথা, স্কুলের কথা, ডেইজির কথা- সব মনে পড়ে। অথচ কিছুদিন আগেও তাদের সময় যেত পঙ্খিরাজ ঘোড়ার মতো। বাবা মারা যাবার পরেও মাকে নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে কেটে যেত সময়। বাবা একটা বিদেশি কোম্পানিতে কাজ করতেন। কোম্পানি মোটা অংকের টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল। সেই টাকায় সংসার চলত স্বাচ্ছন্দ্যে। কত সুখ, কত আনন্দ, কত আবেগ; মাকে জড়িয়ে না ধরলে ঘুম আসার নামগন্ধ পর্যন্ত আসত না। যদিও কিছু দিন ধরে মা তার সঙ্গে ঘুমাতেন না। মায়ের সঙ্গে ঘুমাতে চাইলে মা বলতেন, ‘তুই বড় হয়ে গেছিস, ওই ঘরে ঘুমা বাপ, হুনছস না, আলাদা ঘরে ঘুমানোর কথা হাদিসেও আছে।’

আঠারো বছর পরে সেই মা ক্ষণে ক্ষণে ফিরে এসে বুকে জড়িয়ে ধরলে কী করার থাকে তার? অন্তরের কথা শোনার মতো কেউ কি আছে? অথচ অন্তরের অতলে কত কথা, কত গুঞ্জন, কত আলোড়ন!

বিয়ের পরেই আদিবা আন্দাজ করতে পারে, তাই তাকে প্রেম দিয়ে, মায়া দিয়ে, কামনা-বাসনা দিয়ে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে। দেহ-মন চাঙা করার চেষ্টা করে। এতে মাঝে-মধ্যে তাদের মধ্যে কিছু একটা হয়; কিন্তু ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে শেষ হয়ে যায় সব। অথবা মাটির চুলায় আম কাঠের আগুনে পোড়া বেগুনের মতো চুপসে যায় তার বিশেষ অঙ্গ। এরকম মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করা কঠিন। বিশেষ করে আদিবার মতো সুন্দরী যৌবনার পক্ষে। কিন্তু আদিবা লক্ষ করে, কোনো কোনো রাতে আরাফ বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অকাল ঝড়ের মতো লণ্ডভণ্ড করে দেয় সব। মনে হয় মুহূর্তের মধ্যে শান্ত করে দিবে ভেতর ও বাহির। প্রথম প্রথম আদিবা ঝড়ের তাণ্ডবে ব্যাকুল হয়েছে, গায়ে-গতরে পানির ঝাপটার জন্য অপেক্ষা করেছে। কিন্তু সেই অপেক্ষা শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পায়নি। অথচ আরাফ এই পূর্ণতা বা অপূর্ণতার সব কিছুই বুঝতে পারে। কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারে না যে, এটা তার শারীরিক নাকি মানসিক অক্ষমতা?

তবে এটা ঠিক যে, এভাবে চলতে পারে না। কিছু একটা করা দরকার- অন্তত ডাক্তারের কাছে যাওয়া দরকার। কিন্তু কোন ডাক্তারের কাছে যাবে সে? যৌন রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নাকি মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে? অথচ একদিন তার সমস্ত দুঃখ-কষ্ট ঢাকা পড়েছিল আদিবার আগমনে। সেই রাতে সমস্ত আকাশে খেলা করে তৃপ্তির জোছনা। এক মুহূর্তে স্বপরা হয়ে যায় বাস্তব। অথবা বাস্তব হয়ে যায় স্বপ্ন। তারা আবেগে আহ্লাদে উল্লাসে ফেটে পড়ে। আরাফের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে জান, সোনা, জাদু, মানিক, টুনটুনো, টোটন পাখির মতো আদুরে শব্দ। কিন্তু মুখ থেকে শিশুদের মতো আধোআধো সুরে বেরিয়ে আসে মা শব্দটিও; তাও একবার নয়। বেশ কয়েকবার। তখন সে থতমতো খেয়ে দ্রুততার সঙ্গে বলে, ‘ও মাগো, কী সুখ, ও মাগো, ইশ।’

আদিবা বুঝে ফেলে। বুঝতে পারে বলেই ব্যাপারটা আস্তে আস্তে ভয়াবহ রূপ নেয়। সে তার মার সঙ্গে, বোনের সঙ্গে, বন্ধুর সঙ্গে কথা বলা বাড়িয়ে দেয় এবং কিছু দিনের মধ্যেই পরিষ্কার করে জানিয়ে দেয়- এরকম পাগলের সঙ্গে সংসার করবে না।

আদিবা চলে যাবার পরে আরাফের মনে প্রশান্তি আসে। কিন্তু স্মৃতি-বিস্মৃতিরা পিছু ছাড়ে না। যখন-তখন ভূমিকম্পের মতো কাঁপে। মাথা ঘুরে ওঠে, নাকে আসে পরিচিত গন্ধ। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও স্বশরীরে মা আসেন না- শয়নেও না, স্বপনেও না। তবে কুমির আসে; জানালার পর্দার উল্টো পাশে তিড়তিড় করে। লেজ নাড়ায়, লেজ বাঁকায়, ফাঁসের দড়ির মতো হয়ে যায়। আরাফ মগজ থেকে লেজ বা ফাঁস তাড়াতে চায়। নাক থেকে গন্ধ তাড়াতে চায়। কিন্তু পারে না। আসে মা ও আদিবা; তারা যেন হাত ধরাধরি করে আসে। এই একসঙ্গে আসার ব্যাখ্যায় সে যেতে পারে না। তবে বুঝতে পারে। বুঝতে পারে বলেই ঘোরটা বাড়ে। অনেকটা চোরাবালিতে পড়ে যাবার মতো। অথবা কোনো এক স্বর্ণকুমারী মাছের মতো। কিন্তু সে এই চিন্তার চোরাবালি থেকে, এই অদৃশ্য বেড়াজাল থেকে, এই ফাঁসের শাড়ি থেকে, এই গন্ধের মায়া থেকে বের হতে চায়।  তার মন বলে, সেদিন মা’র সঙ্গে অভিমান করে সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলে এলেও কখনো নিজের মা, বসতভিটা বা সমাজের কথা ভুলতে পারেনি। ফলে তার মনের কোথাও হয়তো একটা ভাপ জমে আছে, যা বের হতে পারছে না। মনের এই ভাপ দূর করতে হলে আবার গ্রামে যেতে হবে। নিজের বসতভিটাতে যেতে হবে।

এই চিন্তা দৃঢ় বিশ্বাসে রূপ নিলে গ্রামে যাবার প্রস্তুতি শেষ হয়। আহা! ভাবতেই কেমন লাগছে- আঠারো বছর পর, তার গ্রাম, তার পথ, তার ভিটে-মাটি, বাবার স্মৃতি- অবশেষে অনেক রাতে গ্রামের উদ্দেশ্যে, ট্রেনের জানালা দিয়ে ভাওয়াল গড়ের কিছুই দেখা যাচ্ছে না, শুধু অন্ধকার আর পরিচিত-অপরিচিত গন্ধ; কিন্তু ভাবতে ভাবতে কখন যে পৌঁছে গেছে কে জানে। এই তো সেই স্টেশন, সেই আগের মতোই মায়াময়, স্মৃতিগন্ধে ভরপুর। সে এদিক-ওদিক চেয়ে পুবের দিকে পা চালায়। একটু সামনে গিয়ে দক্ষিণে যেতে হবে। কিন্তু দক্ষিণে ঢোকার রাস্তা খুঁজে পায় না। কিছুক্ষণ খোঁজাখুজি করে, তারপর মানুষ খোঁজে। হেমন্তের রাতে সাপের মতো অন্ধকার। বৃষ্টির কণার মতো শিশির পড়ছে। সে ভাবে, রাস্তাটা হয়তো পরিবর্তন হয়ে গেছে অথবা অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু সে জানে রাস্তা পেয়ে গেলে দশ-বারো মিনিট হাঁটলেই বাড়ি পৌঁছে যাবে। তখন পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। একটা লোক, মাফলার দিয়ে নাক-মুখ প্যাঁচানো। আরাফ ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘এই যে ভাই, এই দিক দিয়ে না বালিয়াপাড়া যাবার রাস্তা ছিল! খুঁজে পাচ্ছি না। একটু বলবেন?’

লোকটা বলে, ‘আমার বাড়ি সামনেই, এই দিকে রাস্তা ছিল না কখনো, আর বালিয়াপাড়া কী? এনামে তো কিছু নাই এইদিকে।’

বলে কী লোকটা! সে কি তবে ভুল স্টেশনে নেমে গেছে? লোকটা চলে গেলে আবারো স্টেশনে ফেরে সে। স্টেশনের নামফলকে স্পষ্ট করে লেখা আছে ‘কাওরাইদ’। তারপর স্টেশনের কয়েকজনকে বালিয়াপাড়া যাবার রাস্তার কথা জিজ্ঞেস করে। লোকজন জানায়, এখানে বালিয়াপাড়া নামে কোনো গ্রাম নেই। এতে দমে যায় না আরাফ। এবার সে জিজ্ঞেস করে, ‘এখানে একটা স্কুল ছিল না? ওটা কোন দিকে?’

লোকজন জানায়, ‘এটা পুব দিকে।’ হ্যাঁ, স্কুল তো পুব দিকেই, সে স্কুলের দিকে হাঁটা শুরু করে। কিছু দূর যাবার পরে দেখে হাতের ডান পাশে, মানে দক্ষিণ পাশে একটা রাস্তা ঢুকেছে, সে রাস্তা ধরে একটা মাঠে ঢুকে পড়ে। এটা স্কুলের মাঠ। মাঠের চারপাশে শিরিষ গাছের সারি। এই স্কুলেই পড়েছে সে। নাকি এটা অন্য কোনো স্কুল? এই তো একটু সামনে ঘরের মতো দেখা যাচ্ছে। মনে পড়ে মাঠের দক্ষিণ পাশে, স্কুলের দক্ষিণ পাশে চেয়ারম্যান চাচার ঘর ছিল। সে ঘরের দিকে আগায়।

সেখানে এক নরীমূর্তি; পা চলে, ঘরের দিকে, মুখের দিকে। নারীমূর্তি কখনো স্পষ্ট হয়, কখনো অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। তবে অবয়ব পরিচিত লাগে। একবার মায়ের মতো, আরেকবার আদিবার মতো। আরেকটু সামনে গেলে মনে হয় এটা মা বা আদিবা নয়, কুয়াশার মতো লাগছে। অথচ কোনোদিন কারো কাছে কুয়াশার গল্প বলেনি সে। বলা চলে নিজের কাছেও না। কুয়াশা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু। ছয় বছর এক সঙ্গে পড়েছে। ওকে কখনো বলা হয়নি ভালোবাসার কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে কুয়াশা আসতো একটা বাইকের পিছনে চড়ে। লাল ঝকঝকে একটা বাইক। বাইকওয়ালাকে দেখে বোঝা যেত বেশ বড় ঘরের ছেলে। সেই ছেলেকে রেখে তার মতো ভাঙাচোরা একজনকে ভালোবাসতে যাবে কেন?  তবে কুয়াশা নোট নেবার কথা বলে আঙুলের সঙ্গে আঙুল বা শরীরের সঙ্গে শরীর লাগিয়ে দিত বা লেগে যেত। কখনো বুকের সঙ্গে লেগে যেত বাহু।  তখন কুয়াশা অদ্ভুত এক হাসির জাল বিছিয়ে দিত। শরীর থেকে আসত মাতাল করা গন্ধ। সেই গন্ধে কল্পনায় ঠান্ডা হত শরীর। এই তো নাকে আসছে সেই গন্ধটা। নাকি এটা অন্য কোনো গন্ধ? কার গন্ধ? কীসের গন্ধ?

শিউলি ফুলের? কুয়াশার? মা’র নাকি আদিবার? পা চলে গন্ধের দিকে, শিরিষ গাছের দিকে, ঘরের দিকে, মুখের দিকে, পায়ের নিচে পাগলের মতো পড়ে আছে লতাপাতা বা প্রিয় শিউলি; ডানে তাকিয়ে থমকে যায় সে-একটি নারী কোমরে হাত দিয়ে এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ মুখ দেখা যাচ্ছে না। আবার ডানে তাকিয়ে আঁতকে ওঠে। এতক্ষণ যাকে দেখে কুয়াশা, আদিবা বা মা মনে করেছে সেটা আসলে একটা গাছ; লিকলিকে, পাতাগুলো দাঁত বের করে রেখেছে। কোকড়া হয়ে কুমিরের লেজের মতো বেঁকে ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ফাঁস দেখে থামবে না সে। ঘোর নিয়ে, সন্দেহ নিয়ে বাঁচা যায় না। বরং মৃত্যুই সত্য। এবার মনে হচ্ছে ওটা ঘর নয়। ওটা আসলে একটা মঞ্চ। হ্যাঁ, স্পষ্ট মনে পড়ছে এপাশে একটা মঞ্চ ছিল। এখানে তারা আপন-দুলাল সাজত, সিরাজউদ্দৌলা সাজত। বউ-বউ খেলত। সে কখনো হতো আপন-দুলাল বা সিরাজউদ্দৌলা, কখনো হতো চেয়ায়ম্যান চাচার মেয়ের জামাই। আহা, চেয়ারম্যান চাচার মেয়ের কথা মনে হলে পরাণের কোথায় যেন খোঁচা লাগে। মেয়েটিকে মানুষ চেয়ে চেয়ে দেখত- বব কাট চুল, পায়ে আলতা, ঠোঁটে রঙের বাহার, কত ঢং, কত রঙ, কত সঙ। তবে ক্ষণে ক্ষণে অন্দর মহল থেকে মিহি সুরে ডাক পড়ত- ‘ডেইজি, ডেইজি, মামুনি, কোথায় তুমি?’  সঙ্গে সঙ্গে ডেইজি আহ্লাদী সুরে বলত, ‘আম্মু, আসছি।’

শরীরে নাচের ছন্দ ঝুলিয়ে চলে যেত ডেইজি। এতে মানুষের কলিজায় করাতের কামড় পড়ত। ডেইজিকে ভেবে জঙ্গলে বসে কাটে আটকানো সময়, কিন্তু আরাফের কামড়ে মধু থাকে। জঙ্গলের সময়ে তৃপ্তি থাকে। কেননা ডেইজি কেবল তার সঙ্গে কথাই বলে না। বরং তার চোখে চোখ রাখে। কিন্তু একদিন ভয়াবহ ঘটনা ঘটে যায়। সেদিন সকাল থেকে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি। কিন্তু তার স্কুল কামাইয়ের ইতিহাস নেই। সে স্কুলে গিয়ে দেখে, এখনো কেউ আসেনি। সে ক্লাসের জানালার পাশে বসে বৃষ্টি ফোঁটা দেখতে থাকে। হঠাৎ মানুষের স্পর্শে চমকে ওঠে- কে?

ডেইজি ঠোঁটে আঙুল চেপে বলে ‘চুপ, একদম চুম, কোনো কথা বলো না।’

তারা একটা কথাও বলে না। বৃষ্টি আরো বাড়তে থাকে। মুহূর্তে মুহূর্তে বিদুৎ চমকাতে থাকে, ভাঙা দেয়ালের ফোঁকরে দুটি পাখি মিশে যায়। তখন কে যেন ঘরে ঢোকে- কে? স্কুলের দপ্তরি আলাল উদ্দিন। তারপর অনেক ঘটনা ঘটে যায়। পরদিন সন্ধ্যায় আরাফ ও তার বাবার ডাক পড়ে। মুক্ত মঞ্চে তারা দাঁড়িয়ে থাকে। চেয়ারম্যান চাচা বাবার গালে কষে চর মারে। তবে বাড়িতে ফেরার পর তাকে একটা বকাও দেয় না বাবা। কিন্তু বকা বা মার খায়নি বলে অস্থির লাগে তার। বাবার জন্য মায়া হয়। বারবার মনে পড়ে মঞ্চে দাঁড়ানো বাবার অসহায় মুখ। চর খেয়ে চোখে জল চলে আসার দৃশ্য; তখন ইচ্ছে করছিল চেয়ারম্যান চাচাকে লাত্থি দিয়ে ফেলে দিতে। শুধু চেয়ারম্যান চাচাকে নয়, সুযোগ পেলে ডেইজিকেও; কী আশ্চর্য, ডেইজি নাকি বলেছে, আরাফ নাকি বৃষ্টির দিনে ডেইজিকে ডেকে নিয়ে গেছে। ডেইজি নিজে থেকে কিছু করেনি। সে-ই নাকি ডেইজিকে জড়িয়ে ধরে...। শালার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়!

কত কথা মনে পড়ে। মনে হচ্ছে মঞ্চের ওপরে কিছু একটা ঝুলছে; কোথা থেকে যেন লাল আলোর আভা আসছে; কিন্তু এখনো কোথাও কেউ নেই, তবে গন্ধটা প্রকট হচ্ছে। কার গন্ধ? আদিবা, মা বা কুয়াশা নাকি ডেইজির? তখন উত্তর থেকে দমকা হাওয়া আসে; আরাফের মুখের সঙ্গে কিছু একটা বাড়ি খায়। আবার সরে যায়, আবার বাড়ি খায়; লোহার মতো শক্ত, বরফের মতো ঠান্ডা। নাক ফেটে রক্ত বের হয়ে গেছে কি-না কে জানে; তারপরও সে পা শক্ত করে দাঁড়ায়। গন্ধের চোটে দম নিতে পারে না, মুখ ভরে বমি আসে। উত্তরের হাওয়া থামে না, আবারো নাকে-মুখে বাড়ি খায়; এবার সে খপ করে ধরে ফেলে। কপাল কুঁচকে চোখ ছোটো করে দেখে, এতক্ষণ চোখে-মুখে-নাকে লোহার মতো যা বাড়ি খাচ্ছিল আসলে তা মানুষের পা। সে পাথর হয়ে যাবে যেন। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে্ তবে এখনো অনুভূতি সচল। সে মনে জোর সৃষ্টি করে সমস্ত শক্তি নিয়ে ওপরের দিকে তাকায়, মুখের দিকে তাকায়। ঝুলে আছে যে, যার গলায় ফাঁসের দড়ি সে আর কেউ নয়- তারই মা। মায়ের চোখ বেরিয়ে গেছে। জিহ্বা বেরিয়ে গেছে।

আরাফ বুঝতে পারছে না, এসব কল্পনা নাকি বাস্তব? কোথায় আছে সে? কোথায়? নাকি কাওরাইদ আসেনি সে? এটা কি উত্তরার তের নম্বর সেক্টরের মাঠ? নাকি বিছানায় শুয়ে ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছে? এত ভাবার সময় পাচ্ছে না সে, ঝুলন্ত মায়ের জিহ্বাটা লম্বা হচ্ছে। কুমিরের লেজের মতো বেঁকে যাচ্ছে। বাতাসে দোল খাচ্ছে, ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে তার দিকে আসছে। তবে পরক্ষণেই মনে হয় এটা জিহ্বা নয়। একটা শাড়ি মায়ের মুখ দিয়ে বের হয়ে ফাঁসের মতো হয়ে যাচ্ছে। এটাকে কালো রঙের সেই শাড়ির মতো লাগছে। একদিন শিউলিকে কালো রঙের শাড়িতে ঝুলে থাকতে দেখা যায়। পত্রিকার প্রথম পাতায় শিউলির ছবি ছাপা হয়। এখনো জানা যায়নি যে, এটি আত্মহত্যা নাকি হত্যা? শিউলি তার সহকর্মী।  যে শিউলি শাড়ি পরে এলে ক্ষুধা লাগত তার। শিউলিও বুঝতে পারত। বুঝত বলেই জর্জেটের কালো শাড়ি পরে আসত। রসুনের আচার নিয়ে আসত। দুধ-ডিমের পুডিং নিয়ে আসত। তখন অফিসকে মনে হত সাজানো সংসার।

সংসারকে মনে হত জাদুময় জেলখানা। কারণ, সংসারে গেলে শিউলি কথা বলতে পারে না, মেসেঞ্জারে যেতে পারে না, কিন্তু এক উইকেন্ডে আরাফের বাসা হয়ে যায় নন্দন-কানন। সকালবেলা দরজা খুলে দেখে শিউলি একগুচ্ছ গোলাপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তখন জিওগ্রাফি চ্যানেলে সাপের সংসার চলে। কিন্তু কিছুদিন পরে আরাফকে যেতে হয় শিউলির বাসায়। কারণ, আরাফের দেয়া জর্জেটের কালো শাড়ি দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে থাকে শিউলি। মনে হয় কালো শাড়িটা তার দিকে চেয়ে আছে।  তারও ইচ্ছে করে গলায় শাড়ি পেঁচিয়ে ঝুলে পড়তে।

এখন মনে হচ্ছে এটা সেই শাড়ি, যা চোখের সামনে ভেসে গেলে বুকের কোণে গেঁথে ধরে, মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হয় না, কিন্তু তার কপালের কোণায় ঘামের রেণু জমতে থাকে। আদিবা, কুয়াশা, ডেইজি বা শিউলি কি তাকে মেরে ফেলতে চায়? নাকি তাকে পেতে চায়? নাকি সে চায়? এই চিন্তা শেষ করতে না করতে সে দেখে ফাঁসের শাড়ি বা জিহ্বা লম্বা হচ্ছে। তার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তখন জেদ চাপে মাথায়। এত সংশয়, এত ঘোর, এত শঙ্কা নিয়ে বাঁচা যায় না। এর চেয়ে বরং মৃত্যুই শ্রেয়। সে শক্তি সঞ্চয় করে, যা হবার হবে, মৃত্যু অথবা অপমৃত্যু, কাউকে ভয় পায় না। সে দার্শনিকের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। আসুক, যা হবার হবে। মা আসুক, আদিবা আসুক, কুয়াশা আসুক, ডেইজি আসুক, শিউলি আসুক; শাড়ি আসুক বা কুমিরের লেজের মতো ফাঁস আসুক। কাউকে পরোয়া করে না সে। বালিয়াপাড়া হোক আর মঞ্চ হোক, উত্তরার মাঠ হোক আর বিছানা হোক; তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। স্বপ্ন হোক, কল্পনা হোক অথবা বাস্তব হোক; তাতেও কিচ্ছু যায় আসে না। প্রয়োজনে সে নিজের হাতে গলায় ফাঁস পরে নেবে।

 

ঢাকা/তারা


     



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ