মহামারি বিষয়ক উপন্যাসগুলো যা শেখায়: ওরহান পামুক

প্রকাশ: ২০২০-০৪-৩০ ১:৪৯:২৯ এএম
কে এম রাকিব | রাইজিংবিডি.কম

ওরহান পামুক নোবেলজয়ী তুর্কি কথাসাহিত্যিক। তাকে সমসাময়িক পৃথিবীর অন্যতম সেরা প্রভাবশালী জীবিত লেখক হিসেবে অভিহিত করা হয়। তার অনবদ্য সাহিত্য দুটি ভিন্ন ধর্ম এবং ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে।  যদিও ঔপন্যাসিক, চিত্রনাট্যকার এই কথাসাহিত্যিক নিজেকে ‘ইস্তাম্বুলের গল্পকথক’ হিসেবে মনে করেন। তার এই প্রবন্ধেও এসেছে ইস্তাম্বুলের কথা। তার প্রকাশিতব্য উপন্যাস ‘Nights of Plague’. এই উপন্যাস, সাম্প্রতিক মহামারি এবং কালজয়ী উপন্যাসগুলোতে মহামারির চিত্রায়ন এই প্রবন্ধের উপজীব্য। প্রবন্ধটি টার্কিশ থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন একিন ওকলাপ। ‘নিউইয়র্ক টাইমম’-এ প্রবন্ধটি  প্রকাশিত হয়েছে ২৩ এপ্রিল, ২০২০-এ। বাংলায় তর্জমা করেছেন কে এম রাকিব

গত চার বছর আমি একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখছি যার বিষয়বস্তু ১৯০১ সালের প্লেগ। থার্ড প্লেগ প্যান্ডেমিক বলে পরিচিত বিউবনিক মহামারির এই প্লেগ এশিয়ায় লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে, যদিও ইউরোপের খুব বেশি লোক এই প্লেগে মারা যায়নি। গত দুই মাস ধরে, আমার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন এবং যে সাংবাদিকরা আমার উপন্যাস ‘Nights of Plague’ বিষয়ে জানেন, তারা মহামারির বিষয়ে অনবরত অজস্র প্রশ্ন করে যাচ্ছেন।

বর্তমান মহামারি এবং ঐতিহাসিক কলেরা ও প্লেগের মহামারির মধ্যে মিল নিয়েই তাদের কৌতূহল বেশি। প্রচুর মিল আছে। মানুষ এবং সাহিত্যের ইতিহাসজুড়ে মহামারিগুলোকে যা এক করেছে তা জীবাণু বা ভাইরাসের মিল নয় শুধু; যে কোনো মহামারি ছড়িয়ে পড়লে আমাদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া মোটামুটি একই ধরনের।

মহামারি ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া সবসময়ই ছিলো অস্বীকার করা। জাতীয় ও স্থানীয় সরকার সাড়াদানে সবসময় দেরি করেছে। সরকারগুলো তথ্য ও পরিসংখ্যান বদলে ফেলেছে, মিথ্যা তথ্য দিয়েছে মহামারির অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে।

সংক্রমণ এবং মানব স্বভাব তুলে ধরার সবচেয়ে ভালো মাধ্যম সাহিত্যকর্ম। ১৬৬৪ সালের ‘প্লেগ বর্ষের জার্নাল’-এর শুরুর দিকে লেখক ডেনিয়েল ডিফো জানাচ্ছেন, লন্ডনের স্থানীয় কিছু সরকার প্লেগে মৃতের সংখ্যা কমানোর চেষ্টা করছে। তারা নতুন রোগের নাম উদ্ভাবন করে, মৃত্যুর জন্য সেইসব রোগ দায়ী, প্লেগ নয়- এমন প্রচারণা চালিয়েছে।

১৮২৭ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘বাগদত্তা’ প্লেগের মহামারি নিয়ে রচিত সম্ভবত সবচেয়ে রিয়ালিস্টিক উপন্যাস। ইতালিয়ান লেখক আলেসান্দ্রো মানজোনি এই উপন্যাসে মিলানের ১৬৩৯ সালের প্লেগের সময় সরকারী কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপে স্থানীয় লোকজনের ক্ষোভ তুলে ধরেছেন। প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও, মিলানের গভর্নর রোগের ভয়াবহতাকে অগ্রাহ্য করেছেন, এমনকি একজন প্রিন্সের জন্মদিন উদযাপনের অনুষ্ঠান পর্যন্ত বাতিল করেন নি। মানজোনি দেখিয়েছেন, যেহেতু জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যা হয়েছে তাও অপর্যাপ্ত, প্লেগ দ্রত গতিতে ছড়িয়ে পড়েছে।

প্লেগ ও ছোঁয়াচে রোগ নিয়ে রচিত অধিকাংশ সাহিত্যে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন শাসকদের অবহেলা, অপারগতা আর স্বার্থপরতাই জনগণের ক্ষোভকে বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে, ডিফো বা কামুর মতো মহৎ লেখকেরা জনবিক্ষোভের রাজনীতির অন্তরালে মানব পরিস্থিতির কিছু সহজাত বৈশিষ্ট্যের দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

ডিফোর উপন্যাস আমাদের দেখায়, সীমাহীন শোক ও ক্ষোভের আড়ালে, নিয়তির প্রতি, স্বর্গীয় অধ্যাদেশের প্রতি মানুষের ক্রোধ, যে নিয়তি অন্তহীন মৃত্যু ও দুর্দশাকে দেখে এবং স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শেখায়। দেখায় রোগ প্রতিরোধে সংগঠিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অপারগতার প্রতি মানুষের ক্ষোভ।

মহামারির ক্ষেত্রে মানবজাতির চিরাচরিত ও স্বতঃস্ফূর্ত  প্রতিক্রিয়া হলো গুজব সৃষ্টি করা এবং মিথ্যা ছড়ানো। অতীতের মহামারিগুলোকে, গুজবে ইন্ধন যুগিয়েছে মূলত ভুল তথ্য এবং পূর্ণাঙ্গ চিত্র দেখা মানুষের পক্ষে অসম্ভব ছিলো বলে। ডিফো এবং মানজোনি লিখেছেন, রাস্তায় দেখা হলে লোকের দূরত্ব বজায় রাখা এবং একইসঙ্গে তারা পরস্পরের অঞ্চলের খবরের ব্যাপারে জানতে চাচ্ছেন, যাতে তারা রোগের এবং সার্বিক পরিস্থিতির ব্যাপারে একটা পূর্ণাঙ্গ ধারণা পেতে পারেন। সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পেলেই কেবল তারা মৃত্যুকে এড়িয়ে নিরাপদ কোনো আশ্রয় খুঁজে পাওয়ার আশা করতে পারেন।

সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন বা ইন্টারনেটবিহীন দুনিয়ায় অধিকাংশ নিরক্ষর লোকের সম্বল ছিলো তাদের কল্পনাশক্তি, যা দিয়ে তারা বিপদের স্বরূপ ও  মাত্রাকে মেপে নেওয়ার চেষ্টা করতো। কল্পনার প্রতি এই নির্ভরতার কারণে প্রত্যেকের ভীতির এক ধরনের নিজস্ব, স্থানীয়, আধ্যাত্মিক ও পৌরাণিক অভিপ্রকাশ ঘটতো। মহামারির সময় সবচেয়ে বেশি গুজব ছড়াতো কোথা থেকে রোগটার শুরু হলো এবং কারা এই রোগ বহন করে নিয়ে এলো তা নিয়ে। মার্চের মাঝামাঝি তুরস্কে যখন ভীতি ও আতঙ্ক ছড়াতে শুরু করে, চিহাঙ্গিরে আমার ব্যাংকের ম্যানেজার  আত্মবিশ্বাসের সাথে জানালো, ‘এই জিনিস’  যুক্তরাষ্ট্র ও বাকি বিশ্বের প্রতি চীনাদের অর্থনৈতিক প্রতিশোধ।

প্লেগকে সবসময়ই চিত্রিত করা হয়েছে এমন অশুভ শক্তি হিসেবে যা বহিরাগত। এই অশুভ শক্তি অন্য কোথাও আগে আঘাত হেনেছে এবং একে সামলানোর জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্লেগ মহামারি আকারে এথেন্সে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে, থুকিদিদেস আলাপ শুরুই করেছেন এই বলে যে, মহামারি শুরু হয়েছে বহুদূরে, ইথিওপিয়া এবং মিশরে।  এই রোগ বিদেশি। বাইরে থেকে এসেছে। মন্দ উদ্দেশ্যে এই ব্যাধিকে দেশে আনা হয়েছে। আদি রোগবাহকের পরিচয় নিয়ে গুজব সবসময়ই ছিলো সর্বত্র এবং জনপ্রিয়। ‘বাগদত্তা’য়, মানজোনি এক চরিত্রের বর্ণনা করেছেন, মধ্যযুগ থেকেই প্লেগের মহামারির লোককল্পনায় ঘুরেফিরে যিনি এসেছেন। প্রতিদিন এই চরিত্রকে নিয়ে গুজব ছড়াতো যে, কীভাবে এই অশুভ শক্তি অন্ধকারে প্লেগ-আক্রান্ত তরল পদার্থ বাড়ির দরজায় আর জলাধারে ছড়িয়ে দিচ্ছে। অথবা ক্লান্ত কোনো বৃদ্ধকে চার্চের ভেতরের মেঝেতে হয়তো বসে থাকতে দেখা গেলো। কোনো নারী হয়তো তাকে দেওয়া একটা জামা নিয়ে ঘষাঘষি করতে দেখলো। মুহূর্তের মধ্যে ক্রোধোন্মাদ লোকেরা সেখানে জড় হয়ে গেলো।

সহিংসতার এমন অপ্রত্যাশিত ও অনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ, গুজব, আতঙ্ক, বিদ্রোহ প্লেগ মহামারির সময়ে সাধারণ ঘটনা। মার্কাস আউরেলিয়াস রোমান সাম্রাজ্যে জলবসন্তের মহামারির জন্য খ্রিস্টানদের দায়ী করেছেন। কারণ এই খ্রিস্টানরা রোমান দেবতাদের সন্তুষ্টির জন্যে ধর্মানুষ্ঠানে অংশ নিতো না। পরবর্তী সময়ে প্লেগগুলিতে অটোমান ও খ্রিস্টান ইউরোপে কূপ ও জলাধারে ইহুদিরা বিষ মেশায়-এমন মিথ্যা অভিযোগে ইহুদিরা অভিযুক্ত হয়েছে।

প্লেগের ইতিহাস ও সাহিত্য আমাদের দেখায় যে, দুঃখভোগের তীব্রতা, মৃত্যুভয়, আক্রান্ত লোকজনের অবর্ণনীয় মানসিক অস্বাভাবিকতাই তাদের ক্ষোভ আর রাজনৈতিক অসন্তোষের মাত্রা নির্ধারণ করতো। পুরনো প্লেগের মহামারির মতোই, ভিত্তিহীন গুজব, জাতীয়তাবাদী, ধর্মীয়, বর্ণবাদী এবং অঞ্চলবাদী পরিচয়ের ভিত্তিতে অভিযোগ করোনাভাইরাসের মহামারিতেও প্রভাব রেখেছে। সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডানপন্থী পপুলিস্ট মিডিয়াও ভূমিকা রেখেছে। তবে ইতিহাসের অন্য যেকোনো মহামারি আক্রান্ত মানুষের চেয়ে মহামারি সম্পর্কে আজ আমরা অনেক বেশি পরিমাণে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানতে পারছি। আমরা যে সবাই যৌক্তিক ভীতির মধ্যে আছি এবং সেটা আমরা সকলেই জানি, এই ব্যাপারটিই অতীতের মহামারির অভিজ্ঞতার চেয়ে করোনাভাইরাসের মহামারিকে আলাদা করেছে। আমাদের ভীতি যতটা না গুজবের কারণে তার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল তথ্যের কারণে।

আমাদের দেশে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লাল বিন্দুর বৃদ্ধি দেখতে দেখতে আমরা বুঝি পালিয়ে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা ভাবতে এখন আমাদের কল্পনাশক্তির প্রয়োজন নেই। ইতালির ছোট্ট শহরে লাশবাহী কালো আর্মি ট্রাকের বিশাল সারির ভিডিও দেখে আমরা যেন আমাদের নিজেদেরই অন্তেষ্টিক্রিয়া দেখি। অবশ্য যে ভয় আমরা অনুভব করি, তাতে কল্পনাশক্তি আর ব্যক্তিগত নিজস্বতা নেই। সহজেই বুঝতে পারি, কি অস্বাভাবিক একই রকম আমাদের অসহায়ত্ব ও মানবতা! ভীতি; যেমন মরে যাবার চিন্তা, আমাদের একাকিত্বের বোধ জাগায়, কিন্তু আমরা সবাই এই আতঙ্কের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি- এই ভাবনা  আবার আমাদের একাকিত্ব থেকে মুক্তি দেয়।

কীভাবে, কোথায় মাস্ক পরে যেতে হবে? মুদি দোকান থেকে কেনা খাদ্য সবচেয়ে নিরাপদে কীভাবে আনা যাবে?- থাইল্যান্ড থেকে নিউইয়র্ক, পুরো মানবজাতি একই ধরনের দুশ্চিন্তার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। সেলফ-কোয়ারেন্টিন বারবার মনে করিয়ে দেয় যে- আমরা একা না। এটি এক ধরনের ভ্রাতৃত্বের বোধ তৈরি করে। ভীতি আমাদেরকে আর অতীতের মতো নিরাশায় ক্ষুব্ধ করে না; ভীতির মধ্যেও আমরা পারস্পরিক হৃদ্যতাকে উৎসাহ দেওয়া এক ধরনের নম্রতা আবিষ্কার করি।

বিশ্বের বৃহত্তম হাসপাতালগুলোর বাইরে অপেক্ষমান মানুষের ছবি যখন টিভিতে প্রচারিত হতে দেখি, বুঝতে পারি আমার আতঙ্ক শুধু আমার একার না, বাকি মানবজাতিরও; এবং আমি আর একাকি বোধ করি না। সময় যত গড়ায়, নিজের ভীতি নিয়ে আমার লজ্জিত হওয়া কমতে থাকে, বুঝতে পারি আমার প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক। আপ্তবাক্য স্মরণে আনা হয় যে, মহামারি আর প্লেগে ভীতরাই বেঁচে থাকে। একসময় বুঝি, ভীতি আমার মধ্যে; সম্ভবত আমাদের সবার মধ্যেই দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। কখনও নিজেকে অন্য সবার থেকে দূরে সরিয়ে একাকী, নিঃসঙ্গ করে রাখতে বাধ্য করে। অন্য সময় আমাকে বিনয়ী হয়ে ভাতৃত্ববোধের চর্চা করতে শেখায়।

আমি প্লেগ নিয়ে উপন্যাস লেখার কথা প্রথমে ভাবতে শুরু করি প্রায় ৩০ বছর আগে। এমনকি সেই অল্প বয়সেই আমার মনোযোগ ছিলো মৃত্যুভয়ে। ১৫৬১ সালে, লেখক অগিয়ের ঘিসেলিন দে বুসবেক, যিনি সুলতান মহামতি সুলায়মানের শাসনামলে অটোমান সাম্রাজ্যে হাপ্সবুর্গের দূত হিসেবে কর্মরত ছিলেন, ইস্তাম্বুলের প্লেগ থেকে পালিয়ে ছয় ঘণ্টা দূরের প্রিংকিপো দ্বীপে আশ্রয় নেন। প্রিংকিপো ছিলো ইস্তাম্বুলের দক্ষিণ-পূর্বে মর্মর সাগরের প্রিন্সের দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে বড় দ্বীপ। অগিয়ের লক্ষ্য করেন, ইস্তাম্বুলের অপর্যাপ্ত শিথিল কোয়ারেন্টিন আইন এবং দাবি করেন তুর্কিরা তাদের ধর্ম ইসলামের কারণে ‘আত্মঘাতী’।

প্রায় দেড় শতাব্দী পরে, এমনকি প্রাজ্ঞ ডিফো পর্যন্ত তার লন্ডন প্লেগ বিষয়ক উপন্যাসে লিখেছেন তুর্কি এবং মুসলিমরা নিয়তির ব্যাপারে নিয়তিতে আস্থাশীল এবং  বিশ্বাস করে প্রতিটি লোকের মৃত্যু পূর্বনির্ধারিত। প্লেগ নিয়ে আমার উপন্যাস আমাকে সেক্যুলারিজম আর আধুনিকতার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিমদের এই ‘আত্মঘাতী’ হওয়াকে বুঝতে সাহায্য করবে।

আত্মঘাতী বা অন্যকিছু যা-ই হোক, ঐতিহাসিকভাবে  মহামারির সময়ে কোয়ারেন্টিনের পদক্ষেপ মুসলমানদের বোঝানো, খ্রিস্টানদের বোঝানোর চেয়ে সবসময়ই কঠিন ছিলো, বিশেষ করে অটোমান সাম্রাজ্যে। কোয়ারেন্টিনের প্রতিরোধে দোকানদার বা গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাণিজ্য প্রভাবিত প্রতিবাদ আরও তীব্র আকার ধারণ করতো মুসলমান সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে। ১৯ শতকের শুরুর দিকে মুসলমানেরা নিজেদের ‘মুসলমান চিকিৎসক’ দাবি করতে শুরু করলো, যখন বেশিরভাগ চিকিৎসক,  এমনকি অটোমান সাম্রাজ্যেও ছিলো খ্রিস্টান।

১৮৫০ সাল থেকে, স্টিমচালিত নৌযান সহজলভ্য হতে শুরু করলে, মুসলমানদের পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনায় যাওয়া তীর্থযাত্রীদের অনেকেই ছিলো ছোঁয়াচে রোগের  বাহক এবং সংক্রমক। বিশ শতকের শুরুর দিকে, মক্কা, মদিনার তীর্থযাত্রীদের এবং তাদের দেশে ফেরা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্রিটিশ সরকার মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় স্থাপন করে কোয়ারেন্টিন অফিস। ঐতিহাসিক ক্রমবদলগুলো মুসলমানদের ‘আত্মঘাতী’ হিসেবে স্টেরিওটাইপ করতেই শুধু সাহায্য করেনি, বরং পশ্চিমাদের বদ্ধমূল ধারণা তৈরিতেও সাহায্য করেছে যে, এশিয়ার লোকেরাই ছোঁয়াচে রোগের জন্য দায়ী এবং বাহক।

ফিওদর দস্তয়েভস্কির উপন্যাস ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’-এর শেষ দিকে, মূল চরিত্র রাসকলনিকভ যখন প্লেগের স্বপ্ন দেখে, সে তখন এই প্রথাগত ভাবনাতেই বলেছে: ‘সে স্বপ্ন দেখে পুরো বিশ্ব ভয়াবহ কোনো অদ্ভুত প্লেগের  অভিশপ্ত হয়েছে যা বহুদূরের এশিয়া থেকে এসেছে।’

সপ্তদশ আর অষ্টাদশ শতকের মানচিত্রগুলোতে, অটোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক সীমান্ত, যেখান থেকে পাশ্চাত্য শুরু হয়েছে ভাবা হতো; ধরা হতো দানিয়ুব নদী থেকে শুরু। অবশ্য সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক সীমান্ত ধরা হতো প্লেগ থেকে এই হিসেবে যে দানিয়ুবের পূর্ব পাশে পশ্চিমের তুলনায় মহামারি বেশিই ছড়াত। এসবই প্রাচ্যের লোকদের ও সংস্কৃতিকে ‘আত্মঘাতী’ বলে ভাবাকে জোরদারই শুধু করে নি, এমন ধারণাও তৈরি করেছে যে, মহামারি সবসময়ই প্রাচ্যের অন্ধকার খুপড়ি থেকে আসে।

স্থানীয় ইতিহাসের অজস্র নথিপত্রের চিত্র থেকে দেখা যায়, বড় ধরনের মহামারির সময়েও ইস্তাম্বুলের মসজিদগুলো জানাজা চালিয়ে গেছে, শোককারীরা শোক জানাতে এসে কোলাকুলি করতো মসজিদ প্রাঙ্গণে। রোগটা কোথা থেকে এসেছে বা কীভাবে ছড়াচ্ছে, এ ব্যাপারে দুশ্চিন্তার চেয়ে, লোকে বরং পরবর্তী জানাজার দিকেই বেশি মনোযোগ দিতো। অথচ চলমান করোনাভাইরাস মহামারিতে, তুর্কি সরকার সেক্যুলার ভূমিকা নিয়েছে। করোনাক্রান্ত কোনো মৃতের জানাজায় গণজমায়েত নিষিদ্ধ করেছে। জুম্মাবারেও মসজিদ বন্ধ করেছে, সপ্তাহের যে দিনটিতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক লোক নামাজে অংশগ্রহণ করে। তুর্কিরা এই ধরনের পদক্ষেপের বিরোধিতা করে নি। আমাদের ভীতি যতই বেশিই হোক, এ ধরনের আচরণ ধৈর্য্য ও সুবিবেচনার।

এই মহামারির পরে সুন্দরতর এক পৃথিবীর আবির্ভাবের জন্যে আমাদের অবশ্যই চলমান পরিস্থিতিতে আক্রান্ত   হওয়া হৃদ্যতা ও ভাতৃত্বের বোধকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

 

ঢাকা/তারা


     



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

রেল কি করোনা এক্সপ্রেস ?

২০২০-০৬-০৩ ৮:০৮:২৬ এএম

জিপিএ-৫ পেয়েও কাঁদছেন তানিয়া

২০২০-০৬-০৩ ৩:৩২:৪৪ এএম

৮২ কোচ পেলেন মাশরাফির ‘উপহার’

২০২০-০৬-০৩ ১:২২:৪১ এএম

‘আমি কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে গর্বিত’

২০২০-০৬-০৩ ১২:৩২:১৬ এএম