রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যজগৎ

প্রকাশ: ২০২০-০৫-১১ ১২:৪৬:৩৮ পিএম
শরীফ আতিক-উজ-জামান | রাইজিংবিডি.কম

[কে জি সুব্রামানিয়াম ভারতীয় চিত্রশিল্পী, লেখক, শিক্ষক এবং শিল্প দার্শনিক। ছেলেবেলা থেকেই ছিল ছবি আঁকার প্রতি ঝোঁক। বিশেষ করে মন্দিরগাত্রের নানাবিধ শিল্পকর্ম তাঁকে টানতো। তারপরও মাদ্রাজের প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতিতে ভর্তি হয়েছিলেন। এক পর্যায়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। কারাবরণ করায় কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি  হতে পারবেন না মর্মে ব্রিটিশ রাজ নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ১৯৪৪ সালে তিনি শান্তিনিকেতনের কলাভবনে ভর্তি হন। সেখানে তিনি শিক্ষক হিসেবে নন্দলাল বসু, রামকিঙ্কর বেইজ, বিনোদবিহারী মুখার্জিকে পেয়েছিলেন। এর বহু বছর পর  ১৯৮০ সালে শিক্ষক হিসেবে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে যোগ দেন। শিল্পী হিসেবে তাঁর অসামান্য খ্যাতি তাঁকে পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ ও পদ্মবিভূষণ-এর মতো রাষ্ট্রীয় খেতাব এনে দিয়েছে। কে জি সুব্রামানিয়াম রবীন্দ্রনাথের ওপর কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি আয়োজিত সেমিনারের উদ্বোধক হিসেবে ২০১১ সালের ২৩ নভেম্বর এই বক্তৃতা করেন। বক্তৃতাটি অনুবাদ করেছেন শরীফ আতিক-উজ-জামান।]

আজকের এই আলোচনাচক্রের উদ্বোধন এবং বিশিষ্ট প্রাজ্ঞজন ও সাহিত্যিকদের সমাবেশে বক্তৃতা করার জন্য এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক আমন্ত্রিত হয়ে আমি অত্যন্ত আনন্দ বোধ করছি, যদিও এই অনুরোধের কারণটা আমার কাছে এখনও স্পষ্ট নয়। এই কাজের যোগ্যতা আমার আছে কিনা সে সম্পর্কে আমি নিজেই সন্দিহান। আমি একজন চিত্রশিল্পী, সাহিত্যিক নই, এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে আমার যথেষ্ট জানাশোনা নেই। আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে যে বিষয়টি আয়োজকদের প্ররোচিত করেছে তা হয়তো আমার বয়স। সম্ভবত এই এক দেশ যেখানে এখনও বয়সকে গভীর শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়, সঠিক বা বেঠিক যে কারণেই হোক না কেন।

আরেকটা কারণ হতে পারে যে, একটা সময়ে আমি বিশ্বভারতীতে পড়াশোনা করেছি যা রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। এই প্রতিষ্ঠানকে তিনি একটি বৈশ্বিক শিক্ষালয় হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রেষ্ঠ মনীষীরা পারস্পরিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে একে অন্যকে শিক্ষিত করে তুলতে এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আকৃষ্ট হবেন। আর এভাবেই জ্ঞান বিকশিত হয়ে একটি সভ্যজগৎ গড়ে উঠবে এবং সমৃদ্ধির জন্য কাক্সিক্ষত পরিবেশ সৃষ্টি হবে। মনে মনে তিনি এমনই কল্পনা করেছিলেন।

দুটি বিশ্বযুদ্ধের মাঝ দিয়ে জীবন কাটিয়ে এবং মানুষের জীবনের ভয়াবহ দুর্দশা ও অমানবিকতা প্রত্যক্ষ করে রবীন্দ্রনাথ এমন একটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। মূলত একজন কবি ও সাহিত্যস্রষ্টা হলেও তিনি মোটেও নিরুদ্বিগ্ন শব্দের কারিগর ছিলেন না। তাঁর কবিতা-নাটক-উপন্যাস-বক্তৃতা ও প্রবন্ধসমূহের মধ্য দিয়ে তিনি বৈশ্বিক সমস্যাবলী তুলে ধরেছেন এবং সবকিছু নতুনভাবে ভাবতে উৎসাহ জুগিয়েছেন যা মানুষকে তার পরিবেশ ও সেখানে বসবাসকারীদের মূল্য দিতে শেখাবে; তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের গভীরতা বাড়াতে নতুন উপায় খুঁজে বের করবে এবং তাদের কুরে কুরে খেয়ে সর্বস্বান্ত করা অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়তে শেখাবে। কিন্তু তিনি আরো এগিয়ে গেলেন এবং শেষমেষ এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন যা তরুণদের এই লক্ষ্য অর্জনে সহযোগিতা করবে। যদিও তিনি প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে এবং সঠিক মানুষদের আকৃষ্ট করতে গিয়ে কঠিন সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। তদুপরি তিনি তাঁর প্রচেষ্টাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন এবং চেয়েছেন তাঁর প্রতিষ্ঠানটি যেন শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে। শোনা যায়,  ১৯৪০ সালে যখন মহাত্মা গান্ধী অসুস্থ কবিকে দেখতে যান তখন তিনি তাঁর সহযোগিতা চেয়েছিলেন। একটি হাতে লেখা চিঠিতে তিনি এই প্রতিষ্ঠানকে একটি জাহাজের সঙ্গে তুলনা করেছেন যা তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ বহন করে চলেছে।

আমি স্বীকার করি যে, আমি এই প্রতিষ্ঠানের সোনালি সময়ের ছাত্র নই। রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুবরণ করেন ১৯৪১ সালে; আর আমি যোগদান করি তিন বছর পর। তখন ওখানে খুবই সংকট চলছে। রবীন্দ্রনাথের আকর্ষণীয় উপস্থিতি ব্যতিরেকে এই প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে ও উপযুক্ত জনবল ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছিল। যদিও তার কিছু ঘনিষ্ঠ সহকর্মী, যারা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে বিখ্যাত, তখনো বেঁচেছিলেন এবং তাঁর ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন, তবে তখনো কোনোপ্রকার সরকারি সহযোগিতা নেওয়ার ব্যাপারে চাপাচাপি ছিল না। তারপরও কিছু পূর্বঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমঝোতা বা বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল এবং পরবর্তী সময়ে তা করতেও হয়েছিল। সুতরাং রবীন্দ্রনাথের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও আমরা একটা ভালো সময়ের মধ্যে ছিলাম যারা চিত্রশিল্পী হওয়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলাম। আমাদের চর্চার সীমিত ক্ষেত্রের বাইরে একটি সামগ্রিক সংস্কৃতির স্বপ্ন আমাদের চোখের সামনে উন্মোচিত হয়েছিল। মানুষের ভাবনার গুরুত্ব রয়েছে এমন অন্যান্য বিষয়ে যারা অধ্যয়ন করছিলেন তাদের দৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতও বিস্তৃত হতে পেরেছিল।

যখন আমার জীবনের পথ চলা শুরু হয়েছিল এই দেশ তখন ছিল একটি উপনিবেশ। আমার বেড়ে ওঠার দিনগুলো রঙিন হয়েছিল বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা প্রতিরোধ চেতনার রঙে। যদিও এই প্রতিরোধের রঙের অজস্র মাত্রা ছিল। সামগ্রিক দৃশ্যপথে ছায়া পড়েছিল দুজন উল্লেখযোগ্য নেতার ভাবনা ও কর্মের একজন রবীন্দ্রনাথ, অন্যজন মহাত্মা গান্ধী। বিশ্বে তাঁদের স্মৃতি ও আদর্শের বড় ধরনের স্বীকৃতি ও গুরুত্ব লাভের কারণগুলো আজ খুব স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যাচ্ছে। যে পৃথিবীতে মানুষের বিকাশ বিভাজন-নীতিমালা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সেখানে প্রথমজন মানবজাতির সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছিলেন যা মৃত্তিকালগ্ন অস্তিত্ব থেকে ধাপে ধাপে পরিপূর্ণ সৃষ্টিশীলতায় উত্তীর্ণ হবে। আর দ্বিতীয়জন তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির প্রচারণায় একটি নৈতিক আদর্শজুড়ে দেওয়াার প্রয়াস পেয়েছেন। উভয়েই বিশ্বাস করতেন, দেশের রাজনৈতিক মুক্তি শেষ কথা নয়। তার প্রকৃত চাহিদা হলো অভ্যন্তরীণ সম্পদের পরিপূর্ণ উন্নয়ন যাতে করে সে নিজের ক্ষমতা নিজেই পরিচালনার যোগ্যতা অর্জন করে এবং সামাজিক কাঠামোর বিশেষ দুর্বলতাকে উপড়ে ফেলতে পারে।

অনেক আগেই এমনকি ভারতীয় রাজনীতির দৃশ্যপটের কেন্দ্রে মহাত্মা গান্ধীর আবির্ভাবেরও পূর্বে ১৯১৭ সালের দিকে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেছিলেন:

Those of us in India who have come under the delusion that mere political freedom will make us free have accepted their lessons from the West as the gospel truth and lost their faith in humanity. We must remember whatever weakness we cherish in our society will become the source of danger in politics. The same inertia which leads us to our idolatry of dead forms in social institutions will create in our politics prison houses with immovable walls.

(Nationalism in India)

এখানে বিস্ময়কর এক দূরদৃষ্টির প্রকাশ ঘটেছে। এমনকি আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার ৭০ বছর পরও রাজনৈতিক- সাংস্কৃতিক দৃশ্যপটে সঙ্কীর্ণতা, ক্ষুদ্র দলাদলি, অসহিষ্ণুতার ব্যাপক উপস্থিতি। এই সেদিনও কতিপয় ধর্মান্ধের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচী থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন কবি ও সংস্কৃতিবোদ্ধার জনপ্রিয় মহাকাব্য বাদ দেওয়ার বেদনাদায়ক এক সংবাদ শুনলাম আমরা। বিগত কয়েক দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের  দৃষ্টান্ত আশ্চর্যজনকভাবে বেড়েই চলেছে।

আপনারা হয়তো জিজ্ঞাসা করতে পারেন, এই আলোচনাচক্রের উদ্বোধন করতে এসে আমি এই বিষয়গুলোকে কেন সামনে নিয়ে আসছি। যে বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার জন্য আমি এটা করছি তা হলো, রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্মের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের যেনতেন প্রকাশও আমাদের জানান দেবে যে তিনি শুধু তাঁর সময় নয়, বরং আমাদের সময়েরও অনেক সামনে চিন্তা করতেন। যখন আমরা আমাদের কাঁধ থেকে ঔপনিবেশিক জোয়াল ছুঁড়ে ফেলতে ব্যস্ত তিনি তখনই উত্তর-ঔপনিবেশিক। মুক্তমনা, সর্বজনীন হওয়া এবং বাকি বিশ্বের সঙ্গে একটি অর্থপূর্ণ প্রতিপক্ষ হওয়ার লক্ষ্যে পূর্বাবস্থায় ফিরে আসার জন্য যে লড়াই আমরা করছিলাম সেই স্বাধীনতা তিনি চাইতেন। আমরা শুধু বলতে পারি যে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অনেক বেশি উত্তর-বৈশ্বিক। আমাদের সেই উন্মুক্ত পথের দিকে নজর রাখতে হবে যে পথ ধরে তিনি সমস্ত বৈশ্বিক যোগাযোগে সাড়া দিয়েছিলেন নিজের আত্মপরিচয় ও অভিজ্ঞতাসূত্রকে অক্ষুণœ রেখে। তাঁর রচনাসম্ভারকে ঔপনিবেশিক, উত্তর-ঔপনিবেশিক, আধুনিক, উত্তরাধুনিক, বৈশ্বিক ইত্যাদি কেতাদুরস্ত বিশেষ কোনো শব্দবন্ধের বেড়াজালে বেঁধে ফেলা যায় না। তাঁর সৃষ্টি সবসময় এই ধরনের বিভাজন ও পরস্পরবিরোধী মতাদর্শের বাইরে অবস্থান করে। এর কারণ সম্ভবত আমরা যাকে পরিপূর্ণ লেখক বলি; যে লেখকের সৃষ্টির পরিধি ও বৈচিত্র অসীম এবং বিপুল ভাষাগত বৈভব থাকার কারণে যিনি কাব্য থেকে ছড়া, হাইকু থেকে মার্গীয় র্দশন, গল্প থেকে নাটক বা পালা, রাজনৈতিক রচনা থেকে ক্ষুদ্র ব্যঙ্গাত্মক লেখা ইত্যাদি প্রকাশের সব পথে সহজইে পরিভ্রমণ করতে পারেন, তিনি ছিলেন তাই।

সৃষ্টির এই বহুমাত্রকিতা ও বিপুল পরিসর আমার মতো ঐক্ষিক শিল্পীর কাছে গভীর আবেদন সৃষ্টি করে। যদি তিনি সামান্যতম পেশাজীবী শিল্পী না হয়ে থাকেন বা কোনো নির্দিষ্ট শিল্পশৈলী অনুসরণ না করে থাকেন, তাহলে প্রত্যেক নিষ্ঠাবান শিল্পী এই ব্যাপকতার চর্চা করতে বাধ্য। শুরুতে সে চারিপাশের দৃশ্যগ্রাহ্য বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তাকে পর্যবেক্ষণ করে, তার আলোকে চলমান গড়নের উপযোগিতা ও সক্ষমতা নির্ণয় করে বা তার উপস্থাপনের উন্নয়ন ঘটায় এবং শেষমেশ নিজস্ব একটি প্রকাশভঙ্গির উন্মোচনে সফল হয়। এই সামগ্রিক পদ্ধতিটি শিল্পী ও প্রকৃতির সাথে একটি পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সক্রিয় স্তর নির্মাণ করে। একজন দক্ষ ও অনুসন্ধানী শিল্পী বারংবার এই চর্চার মধ্য দিয়ে এগোতে থাকেন এবং প্রকৃতি ও তার মাঝে নিজের অবস্থান পুনঃআবিষ্কারে সক্ষম হন।

খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী ও শিক্ষক নন্দলাল বসু, যার চিন্তাসূত্র আমার শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখেছে, সবসময়ই এই বিষয়গুলোকে কার্যকর কাহিনিসহ ব্যাখ্যা করে বুঝাতেন। বিশ্বভারতীতে যখন আমরা তাঁর ছাত্র ছিলাম, তখন সেখানে কালু নামে একজন অন্ধ ছিলেন। হোস্টেলে তিনি আমাদের সঙ্গেই থাকতেন। সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে তিনি আশ্রমের মন্দিরে ভক্তিমূলক গান গাইতেন। অন্ধ হলেও কালু ক্যাম্পাসে স্বাভাবিকভাবেই চলাফেরা করতেন। তিনি থেকে থেকে হাতে তালি দিতেন এবং তার প্রতিধ্বনি থেকেই চারপাশে কি রয়েছে তা অনুমান করে নিতে পারতেন। নন্দলাল বসু তার উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চাইতেন, যেভাবে হাতে তালি দিয়ে চারপাশে কি আছে তা অন্ধ কালু বুঝে নিতে সক্ষম, ঠিক সেভাবেই শিল্পীরা তাদের সৃষ্টির মাধ্যমে বিশ্বজগতকে আবিষ্কার করে থাকেন। তার আগ পর্যন্ত আমরা সবাই অন্ধ। এরপর যখন আমরা দেখতে শুরু করি, আমরা বারংবার সেই কাজটিই করি। প্রতিটি নতুন প্রত্যক্ষণে আমাদের কাছে জগতের নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। তার মাঝে আমরা আমাদের নতুন অবস্থান খুঁজে পাই। নিরন্তর অন্ধের মতো হাতড়ে ফেরা আর নতুন খুঁিটনাটি ও মাত্রাসহ জগতের পুনঃআবিষ্কার আমাদের প্রকৃতিকে ভিন্নভাবে দেখতে শেখায় এবং এভাবেই সৃষ্টিশীল নতুন এক পৃথিবীর উন্মোচন ঘটে। এই সামগ্রিক প্রক্রিয়া একজন শিল্পীকে ক্ষুদ্র পেশাজীবীর বাইরে পরিপূর্ণ শিল্পী হওয়ার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।

কে জি সুব্রামানিয়াম

পশ্চাৎপটে এই ধারণাকে রেখে আমরা রবীন্দ্রনাথকে একজন পরিপূর্ণ সাহিত্যিক হিসেবে দেখতে পারি যিনি অন্য যে কারো  চেয়ে সফলভাবে ভারতীয় রেনেসাঁকে ব্যাখ্যা করতে পেরেছেন। তাঁর সৃষ্টি পরিপার্শে¦র বাস্তবতাকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে।  সেই সাথে গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পেয়েছে। দেশ-বিদেশের ‘সাহিত্য ঐতিহ্য’র অনেক কিছুর সাথেই তাঁর পরিচয় থাকার ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে টিকে থাকার সার্মথ্যকে তিনিই প্রথম খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তারপর তার শৈলী ও বিষয়বস্তুকে নতুনভাবে ব্যবহার করেছেন। তিনি বাংলা ভাষাকে বৃহৎ পরিসরে স্থাপন করার পাশাপাশি একটি শক্ত অবস্থান নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। নিরক্ষর কৃষক থেকে সুশিক্ষিত পর্যন্ত সমস্ত সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর ভাষা ও শৈল্পিক প্রকাশের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের প্রতি তিনি সংবদেনশীল ছিলেন। কবিতায় তিনি নতুন ছন্দ ও সাংগীতিক বৈশিষ্ট্য আরোপ করতে পেরেছিলেন। একটি নন্দনতাত্ত্বিক রূপরখো নির্মাণ করেছিলেন যা মানুষ ও প্রকৃতির মাঝে পারস্পরিক সম্পর্কের একটি নতুন অর্থ দাঁড় করিয়েছিল। যখন তাঁর আগ্রহ বহুমাত্রিকতা পেল, তিনি তাঁর পরিশীলিত পরিবারের মধ্য থেকেই গুরুত্বর্পূণ পঠন-পাঠন ও আবিষ্কারে আগ্রহী বিশেষ সক্রিয় দল গঠনে অগ্রসর হলেন।

আমার মতো শিল্পীর জন্য তিনি বহুভাবেই ছিলেন একজন পথপ্রর্দশক। অন্য যে কারো চেয়ে আমি তাঁর ‘সৃষ্টিশীলতা ও সংস্কৃিত’ সর্ম্পকিত ধারণাকে অধিক গ্রহণযোগ্য মনে করি, বিশেষ করে তাঁর ‘বাড়তি সৃষ্টিশীলতা’র ধারণাকে। তাঁর মতে, মানুষ ও পশুর একটি সহজাত প্রবণতা রয়েছে যা তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার নিশ্চয়তা দেয়, কিন্তু মানুষের অতিরিক্ত যা রয়েছে তা হলো, এইসব বস্তুগত চাহিদার বাইরে যাওয়ার আকাক্সক্ষা। সুতরাং জগতের রহস্য উদঘাটনের মাধ্যমে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে এই বাড়তি প্রবণতাকে তারা ব্যবহার করে এবং নানাভাবে নিজেদের ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটায়। রবীন্দ্রনাথের মতে, মানুষের ব্যক্তিত্ব পরির্পূণভাবে সহজাত নয়, বরং তা বিকশিত হয় জগতের সাথে ব্যক্তির আবেগ সম্বন্ধীয় মিথস্ক্রিয়া থেকে র্অথাৎ যে জগৎকে সে ভালবাসে এবং আবেগতাড়িত হয়ে সাড়া দিয়ে থাকে তা থেকে। এই সক্রিয়তার মাধ্যমে তা ভালোবাসা বা ঘৃণা, আনন্দ বা বেদনা, ভীতি বা বিস্ময় যা-ই হোক না কেন এই জগত তাঁর ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে ওঠে। জগতের বিকাশের সাথে ব্যক্তিত্ব বিকশিত হয় আবার পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। আত্তীকরণের আকার অনুযায়ী ব্যক্তিত্বের আকার ছোট বা বড় হয়ে থাকে।

আমাদের জ্ঞান ও সংস্কৃতরি গুরুত্বর্পূণ অংশের উদ্ভব ঘটে এই প্রকাশভঙ্গি থেকে। সাহিত্য, সংগীত, নৃত্যকলা, নাট্যকলা, চিত্রকলা, বিভিন্ন দলীয় অনুষ্ঠান ও আচার ইত্যাদি সব ধরনের সৃষ্টিশীল অভিব্যক্তিকে সংস্কৃতি ধারণ করে। যেহেতু যৌক্তিকতা ও স্পষ্টতার মধ্যে রয়েছে জ্ঞানের ছাপ, সৃষ্টিশীল শিল্প ও সাহিত্য বিস্তৃত সূত্র ও নান্দনিক পরিসরের দিকে ঝুঁকে পড়ে, অন্য অর্থে খানিকটা লাগামহীন হয়ে পড়ে। তাদের সূত্রসমূহ প্রকাশধর্মিতা ও বৈশিষ্ট্যে বিস্তৃত, সংকুচিত বা পরিবর্তিত হয় আর তা নির্ভর করে তাদের প্রতি সাড়া প্রদানকারীর সক্রিয়তার মাত্রার ওপর।

রবীন্দ্রনাথ প্রবাহমানতার সক্রিয়তাকে প্রথাগত ভারতীয় নন্দনতত্ত্বের ‘নবরসে’র আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। এই পদ্ধতিকে বিবেচনা করা হয়েছে শিল্পকর্মের বিষয়বস্তুর আবেগধর্মিতা বা রসবৈশিষ্ট্য অথবা লেখার সঙ্গে দর্শক অথবা পাঠকের সংবদেনশীলতার মাঝে যোগাযোগ বা আন্তঃসর্ম্পকের ভিত্তিতে, তবে স্বাভাবিকভাবেই তাদের বৈশিষ্ট্য ও জটিলতার কারণে ফলাফলের ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়।

উল্লিখিত গভীরতা বা জটিলতা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিটি আবেগধর্মী শিল্পর্কম বা স্মৃতি জাগানিয়া লেখা মনের গভীর অরণ্যে বিস্তর পরিভ্রমণ করে। তাদের প্রাথমিক আকাক্সক্ষা ও ফলাফল রহস্যময় পথপরক্রিমার ওপর নির্ভর করে। একজন শিল্পীর ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির শুরু বাস্তবতা পর্যবেক্ষণের ফলশ্রুতিতে প্রাপ্ত আকাঙক্ষা থেকে যাকে তিনি ধরে গড়ন দেয়ার চেষ্টা করেন। প্রায়শই যা ধরা যায় না তিনি তাকেই ধরতে চান এবং পলায়নপর অলীক বস্তুনিচয়ের পিছে ছুটতে থাকেন। এই পথ-পরিক্রমার কিছু পুরস্কার মেলে। পথপার্শে¦ শিল্পী অনেক বিস্ময়কর জিনিস আবিষ্কার করেন যা মূল পথের অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতিপূরণ হয়ে ওঠে। আমার ধারণা, একজন সৃষ্টিশীল লেখকের ক্ষেত্রেও এমনই ঘটে। তারাও যা অনির্বচনীয় তাকে রূপ দেয়ার চেষ্টা করেন। তারপর তাদের পথ, অভিজ্ঞতা, উদ্বেগ, হতাশা, সাফল্য ও বিস্ময় পাল্টে যায়। রবীন্দ্রনাথের কিছু রম্যবাদী গানে এই ধরনের উদ্বেগ ও অপেক্ষার কিছু ধাবমান চিত্র ধরা পড়েছে। কিছু অকস্মাৎ প্রকাশ ও ক্ষণস্থায়িত্বের সাথে সাক্ষাৎ রহস্যময় ঘূর্ণন ও সৃষ্টিশীলতার পথে বাক বদলের রূপক বলে আমার অনুমান। দৃষ্টান্ত হিসেবে ‘ওগো আমার চির-অচেনা পরদেশী’র কথা বলা যায়।

রবীন্দ্রনাথ এই লেখায় রহস্যময় অভ্যাগমনের উল্লেখ করেছেন, এক আগন্তুকের কথা বলেছেন, যার ভাষা দুর্বোধ্য কিন্তু তিনি তার কথায় সাড়া দেন আবার অকস্মাৎ হারিয়ে যান। একই রকমের আভ্যাগমনের দৃষ্টান্ত দেখতে পাই ‘আমার প্রাণের পরে চলে গেল কে’ কবিতায়। এ রকম অজস্র কবিতা রয়েছে যেখানে অপেক্ষার প্রহর, ক্ষণস্থায়ী সাক্ষাতের উল্লেখ রয়েছে, রয়েছে নুপুর, হাতের চুড়ি, পায়ের শব্দ, ফুল বা মালা বিনিময়, পরশপাথরের অনুসন্ধান যা লোহাকে সোনায় রূপান্তরিত করে ইত্যাদির চিত্রকল্প। এ সবকিছু তুলে ধরে অর্ন্তজাগরণের অদৃশ্য ঘটনাপ্রবাহ, মধ্যযুগীয় রসায়নশাস্ত্র যা সৃষ্টিশীল পদ্ধতির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

আমি নিশ্চিত, অনেকেই রয়েছেন যারা এই সমস্ত কবিতার অতীন্দ্রিয় বৈশিষ্ট্য, যা মানুষের অসীমের প্রতি আকাক্সক্ষা তুলে ধরে এমন ধারণায় অনড়। আবার আরেকদল রয়েছেন যারা এই কবিতাগুলোর শরীরে অধিক পার্থিব রং চড়াতে ব্যস্ত। কবিতাগুলোতে প্রেয়সীর প্রতি প্রেমিকের আকুল আকাক্সক্ষার প্রকাশ ঘটেছে। দু’ধরনের ব্যাখ্যাই হয়তো সত্য। এই ধরনের প্রলেপ আমাদের দেশীয় সংস্কৃিততে অতিসাধারণ এক ঘটনা। যদি আমি ঠিক ঠিক মনে করতে পারি তাহলে রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর একটি বক্তৃতায় উল্লেখ করেছিলেন যে, কীভাবে একটি প্রথাবদ্ধ সংস্কৃতিতে মানুষ তার নিজের জীবনের ঘটনা প্রবাহকে পৌরাণিক চরিত্রের ঘটনাপ্রবাহের সাথে মেলাতে চায় এবং বাস্তব ও অবাস্তবের সাথে সেতুবন্ধ রচনা করে। যে কোনো ক্ষেত্রেই মনে রাখা উচিত যে, একজন নিষ্ঠাবান শিল্পী বা কবির সৃষ্টিশীল অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে অনুভূতির তীব্রতা ও আপামর জনসাধারণ এই সকল পার্থিব ও অপার্থিব অপ্রত্যাশিত সাক্ষাতের চেয়ে কম গুরুত্বর্পূণ বা কম পবিত্র নয়।

রবীন্দ্রনাথের কবিতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য, যা আমার মতো শিল্পীকে টানে, তা হলো, প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর গভীর সখ্য।  অজস্র কবিতায় তিনি গভীর আবেগ অনুভূতির সাথে প্রাকৃতিক পরিবেশের অনুপুঙ্খ বর্ণনা তুলে ধরেছেন; অনেক গানে আত্মপ্রত্যয় ও নাটকীয়তার সাথে তার ঋতু পরিবর্তনের চিত্র এঁকেছেন। প্রতিটি দৃষ্টান্তই স্পষ্টত বোধগম্য, আর তা এতটাই আবেগ ধারণ করে যে, তা বেশিরভাগ বাঙালি বা বাঙালি সংস্কৃতিপ্রেমীদের অন্তরের সংবেদনশীল অনুভূতির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। অভিবাসী বাঙালিরাও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে স্মৃতিবিধুরতায় আক্রান্ত হয়ে এগুলো নিয়ে আবোল-তাবোল বকে। আমার জানামতে আর কোনো কবি এত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন নি। অন্য কোনো কবি প্রকৃতির ঋতুচক্র   শরতের মেঘ, বসন্তের ফুলদল,  গ্রীষ্মের ঝড়ো প্রকৃতি, বর্ষার বৃষ্টিমাদল, শীতের কুয়াশার খুঁটিনাটি এভাবে তুলে ধরেন নি।

বোটে চড়ে পদ্মায় ঘুরে বেড়ানোর সময় নদী তীরবর্তী গ্রামের যে খুঁিটনাটি বর্ণনা তিনি তুলে ধরেছেন তা কোনো পটে আঁকা ছবির থেকেও কম নয়। প্রকৃতপক্ষে তার বর্ণনা অন্যকে এই দৃশ্য অবলোকনের জন্য উৎসাহ যুগিয়েছেন। সত্যজিৎ রায় বন্ধুদের কাছে স্বীকার করেছেন যে, শান্তিনিকেতনে তার স্বল্পকালীন অবস্থান যে কোনো দৃশ্যের সৌর্ন্দয ও অদ্ভুত  বৈশিষ্ট্য গভীরভাবে উপলব্ধি ও তীক্ষèতাসহ পাঠ করার ব্যাপারে গভীরভাবে সহযোগিতা করেছে।

যদিও রবীন্দ্রনাথ পুকুর পানে তাকিয়েছিলেন তাঁর বারান্দা থেকে আর নদীতীরের গ্রামগুলি দেখেছিলেন পদ্মায় বোটে বসে,  তথাপি তিনি কোনো দূরবর্তী দর্শক ছিলেন না। তিনি প্রকৃতিকে সমস্ত অনুভূতি দিয়ে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছেন এবং অন্যকেও তা করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আমি শুনেছি যে, শান্তিনিকেতনে প্রথম দিকে যখন তিনি নিজেই ছাত্রদের পড়াতেন এবং তারা খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করত, তিনি খালি পায়ে ছাত্রদের সাথে হেঁেট বেড়াতেন এবং বর্ষার সময় তাদের নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতেন; তিনি তাদের বলতেন যদি তারা তাদের অনুভূতি দিয়ে প্রকৃতিকে পড়তে পারে তাহলে তারা তা ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারবে এবং তাদের প্রকাশের ভাষা হবে সমৃদ্ধ ও সর্ম্পূণ। কেউ যদি অন্তদৃষ্টি সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করত, তিনি বলতেন চর্মচক্ষুতে যা দেখা যায় তাকে আরো বেশি গভীরতা ও উচ্চতর মাত্রা দান করা যায় যদি কেউ তা থেকে আনন্দ লাভ করে।

কী চমৎকার মনোমুগ্ধকর হতে পারে প্রকৃতির বর্ণনা যা তাঁর একটি অতি পরিচিত কবিতায় উঠে এসেছে যেখানে তিনি বলেছেন, ‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ূরের মতো নাচে রে’।

রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে এই উত্তেজনা ও আনন্দ আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মতো একই রকমের, কারণ তা একজনের আত্মপরিচয় অন্য বস্তুর সাথে জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এবং সে জগতের সবকিছুর সঙ্গে একাত্মবোধ করে। ১৯০১ সালে যখন তিনি তার শিক্ষালয় গড়ে তোলেন এবং প্রায় ১৫ বছর পরে তাকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করেন, তখন এমন একটি ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন যেখানে প্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশ্ববিদ্যালয় চালু হওয়ার কয়েক বছর পর তিনি ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলো পালন করতে শুরু করেন যা এই উদ্দেশ্যই শুধু স্পষ্ট করে তোলে না, বরং তা প্রাচীন কিছু অনুষ্ঠানাদির জায়গা দখল করে নেয় যেগুলো জনপ্রিয় কিছু কুসংস্কার ও পৌত্তলিক আচারের ওপর ভিত্তি করে পালিত হতো। সংগীত ও নাটক নির্মাণের ক্ষেত্রে তাঁর বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতা এবং প্রকৃতির বৈচিত্র ও ব্যাপকতা উদযাপনে অজস্র গান রচনার ফলে এই প্রতিস্থাপন সহজে সম্ভব হয়েছিল। প্রকৃতির গুরুত্ব উপলব্ধিতে উদ্দীপনা তৈরির  ক্ষেত্রে তা ছিল এক মার্জিত পদক্ষপে যা প্রাচীন অপরাধ পীড়িত আচার-অনুষ্ঠানের মাঝে অনুপস্থিত ছিল (আরো একটি লক্ষ্য করার বিষয় হলো যে, এইসব অনুষ্ঠান রঙ বদলে শহরতলীর মানুষের বিনোদনের উপলক্ষ হয়ে উঠছিল)।

প্রাকৃৃতক পরিবেশের সুরক্ষা অনেক বিষয়ের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রধান একটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছিল। আর অন্যান্য বিষয়গুলো কী ছিল আমার এই এলোমেলো কথার্বাতার মধ্যে সেগুলো উল্লেখ করেছি  স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে তাঁর  দেশের বিকাশ (স্বাধীনতা মানে অবশ্যই বিদেশি শাসন থেকে মুক্তি, আর সেই সাথে ক্ষুদ্র মানসিকতা, অজ্ঞতা-কুসংস্কার ও  গোষ্ঠীচিন্তা পরিত্যাগ), স্বাধীনতা ও সংস্কৃতিতে ইতিবাচক অবদান রাখার নিশ্চয়তা প্রদান করা; একটি বৈশ্বিক সমাজ গড়ে  তোলা যেখানে মানুষ আত্মঘাতী প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব থেকে দূরে থাকবে এবং মানুষের সর্বোচ্চ বিকাশে প্রচেষ্টা নেবে; এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে যা আংশিক হলেও এই আকাশকুসুম কল্পনাকে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নেবে।

এ ছাড়াও আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন যা তাঁর অজস্র লেখনীর মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর প্রবন্ধসমূহ নতুন জীবনের স্বপ্ন উন্মোচন করে; তাঁর বিনোদনধর্মী নাটক শিক্ষাপদ্ধতির ত্রুটি তুলে ধরে যা শেষ হয় মানুষের প্রচেষ্টাকে হত্যার মধ্য দিয়ে (তোতা কাহিনী); এমন এক সমাজ ব্যবস্থার খোঁজ দেয় যেখানে মানুষের আচরণকে যান্ত্রিক করে তোলা হয়েছে এবং তাদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে শ্বাসরোধ করা হয়েছে (তাসের দেশ); উন্নতির বিশাল পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে যা সাধারণ মানুষের কল্যাণকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দেয় না (মুক্তধারা)। আরো কিছু নাটকে বাস্তবতার অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতার মতো অনেক দুর্বোধ্য প্রশ্ন তুলেছে (অরূপ রতন); সংগঠিত শক্তি এবং মানুষের সংবদেনশীলতা ও প্রচেষ্টার মধ্যে দ্বন্দ্ব (রক্তকরবী) তুলে ধরেছে। এছাড়াও ব্যক্তিগত সর্ম্পক, সামাজিক দ্বন্দ্ব, লৈঙ্গিক ও জাতিগত বিভাজন ইত্যাদি বিষয়ের গভীর উপলব্ধি তাঁর উপন্যাসসমূহে উঠে এসেছে, যেমন যোগাযোগ, গোরা, ঘরেবাইরে, চার অধ্যায়। আমার তালিকা এই বিষয়গুলো ও তাতে প্রতিফলিত বার্তাসমূহ নিঃসন্দেহে সরলীকরণ করে ফেলেছে, কিন্তু আমি নিশ্চিত, সেমিনারের আগামী সভাগুলোতে এগুলো ব্যাপক পাণ্ডিত্যপূর্ণ মনোযোগ লাভ করবে।

এই কথার সাথে সাথে আমি এই সেমিনারের উদ্বোধন ঘোষণা করছি।


ঢাকা/তারা


     



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

ক্রিকেটের রেকর্ড থেকে

২০২০-০৬-০৩ ৯:০৭:২১ এএম

রেল কি করোনা এক্সপ্রেস ?

২০২০-০৬-০৩ ৮:০৮:২৬ এএম

জিপিএ-৫ পেয়েও কাঁদছেন তানিয়া

২০২০-০৬-০৩ ৩:৩২:৪৪ এএম

৮২ কোচ পেলেন মাশরাফির ‘উপহার’

২০২০-০৬-০৩ ১:২২:৪১ এএম

‘আমি কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে গর্বিত’

২০২০-০৬-০৩ ১২:৩২:১৬ এএম