স‌্যারকে মনে পড়ে

প্রকাশ: ২০১৯-১০-০৪ ২:২৭:৩৭ পিএম
মো. জাহানুর ইসলাম | রাইজিংবিডি.কম

মো. জাহানুর ইসলাম

শ্রদ্ধেয় শাকিরুল স্যার আমার ছাত্রজীবনে একটি বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছেন। তিনি আমার জীবন পরিবর্তনের কারিগর। তাঁর হাত ধরেই আমি আজকের আমি। ছাত্র জীবনে তাঁর মতো শিক্ষক পেয়েছিলাম বলেই হয়তো আমার লেখাপড়ার ট্রেন আজও বিরতিহীনভাবে চলছে। স্যারের প্রতি আমি চির কৃতজ্ঞ।

আমি তখন বড়বাড়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। সেই সময় আমাদের রংপুর সদরের মরিচটারী গ্রামে ‘পূর্ব বড়বাড়ী খায়রুল উলুম রহিমিয়া দাখিল মাদ্রাসা’ নামে একটি নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। সেখানে যোগ দেন একদল তরুণ উদ্যমী শিক্ষক। শাকিরুল স্যার ছিলেন তাদেরই একজন। আমি স্কুল ছেড়ে নতুন মাদ্রাসায় এক ক্লাস নিচে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হই। এক ক্লাস নিচে ভর্তি হওয়ার কারণ হল লেখাপড়ায় আমি শুধু কাঁচাই ছিলাম না, ছিলাম একটা গোবর গণেশ। কোনো কিছুই পারি না। আর পারবই বা কী করে! কোনো অক্ষরই তো ভালো করে চিনতাম না। ইংরেজি তো ছিল আরো কঠিন। শাকিরুল স্যার ছিলেন ইংরেজি শিক্ষক। তিনি আমাদের ইংরেজি পড়াতেন। ক্লাসে ১০/১১ জনের মতো ছাত্রছাত্রী ছিলাম। তাদের মধ্যে যে ৩/৪ জন একদম কিছুই পারতাম না, তাদের মধ্যে আমি ছিলাম অন্যতম। অন্য স্যার ম্যাডামরা পড়া না পারার জন্য হালকা মারধর কিংবা বকাঝকা করলেও শাকিরুল স্যার ছিলেন একদম ব্যতিক্রম। বিশেষ করে আমার ক্ষেত্রে তো ছিলেন আরো ব্যতিক্রম। লেখাপড়ায় আমি খুব দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও  কেন জানি তিনি আমাকে খুব আদর করতেন। ভালো ছাত্রদেরকে যদি তিনি বাড়ির কাজ ওয়ার্ড মিনিং দিতেন, আমাকে দিতেন বর্ণ পরিচয়। তাদেরকে যদি দিতেন ইংরেজিতে বাক‌্য গঠন, আমাকে দিতেন শব্দার্থ। তিনি বুঝতে পারছিলেন, আমি অন্য সবার সাথে তাল মেলাতে পারব না। তাই তিনি আমাকে তাদের থেকে আলাদা পাঠদান করাতেন।

দুই মাসের মধ্যে আমার মধ্যে বেশ পরিবর্তন ঘটে গেল। আমি তখন ইংরেজি ২৬ টা অক্ষর শুধু বলতেই পারা শিখলাম না, লেখাও শিখে গেলাম। ১ম ও ২য় সাময়িক পরীক্ষায় ফলাফল খুব একটা ভালো হল না। তবুও নতুন উদ্যোমে কোনো ভাটা পড়ল না। বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল বের হল। রেজাল্ট বেশ সন্তোষজনক ৯ম থেকে ৪র্থ স্থান অধিকার করেছি। বাবা-মা সবাই খুশি। আমি এখনো মনে করি স্যার যদি সেদিন আমার বিশেষ যত্ন না নিতেন, তাহলে হয়ত আমি সেদিন পাশ করতেই পারতাম না। এমনকি আজকের আমিও কোনোভাবে হতেই পারতাম না।

ননএমপিও ভুক্ত প্রতিষ্ঠান। স্যার ম্যাডামদের কোনো বেতন ভাতা ছিল না। তবুও উনারা আঁকড়ে ধরে থাকলেন যদি কোনো দিন কোনো কিছু হয় এই আশায়।

একদিন স্যার-ম্যাডামদের আশা পূরণ হল ঠিকই, তবে সে যাত্রায় তিনজন স্যার বাদ পড়েছিলেন। দুঃখজনক হলেও এটা সত‌্য যে, বাদ পড়াদের মধ্যে ছিলেন আমার প্রিয় শাকিরুল স্যার। বিভিন্ন নিয়মের বেড়াজালে স্যারের চাকরি এমপিও হয়নি। স্যার জীবিকার সন্ধানে অত্র প্রতিষ্ঠান ছেড়ে অন্যত্র চাকরি নেন। স্যার চলে যাওয়ার কষ্টে আমি হতাশ হয়ে পড়ি। স্যার সেদিন বড়বাড়ী মাদ্রাসা থেকে চলে গিয়েছিলেন ঠিকই, তবে আমার হৃদয় থেকে চলে যেতে পারেননি কোনো কালেই। এমনকি এখনো না। আমি প্রতি মুহূর্তে স্যারের কথা স্মরণ করি।

বন্ধুরা যখন প্রিয় স্যারদের প্রসঙ্গ তুলে, তখন আমি আমার শাকিরুল স্যারের কথা মনে করি। সবসময় আমার একটি কথাই মনে পড়ে, শাকিরুল স্যার আমাদের অস্তিত্বের সাথে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছেন, চাইলেও স্যারকে কোনোদিন ভুলতে পারবো না। সত্যি বলতে আমি এটা চাইও না। স্যার চলে যাওয়ার পর দীর্ঘদিন যাবত তাঁর সাথে আমার কোনো দেখা সাক্ষাৎ ছিল না, ছিল না কোনো যোগাযোগও। স্যার কোথায় কী চাকরি করতেন জানতাম না সেটাও।

মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ করে বাড়িতে যাই। একদিন হঠাৎ করে মরিচটারী মোড়ে স্যারের সাথে দেখা। স্যারকে দেখে আমি তো খুব খুশি। স্যারকে সালাম দিই। স্যারকে সালাম দিতেই কয়েকজন আমার দিকে হা করে তাকিয়ে রইল, তাদের ভাবখানা এমন, আমি উনাকে স্যার ডেকে আমি মস্ত বড় ভুল করেছি। স্যারের সাথে কুশলাদি বিনিময়ের পর জানতে পারি স্যার চাকরি ছেড়ে পুরোদমে কৃষি পেশার সাথে যুক্ত হয়েছেন। এখন পুরো সময় সেখানেই ব্যয় করেন। ঠিক তখনই বুঝতে পারলাম, আমার দিকে অন্যদের কৌতুহল দৃষ্টিতে তাকানোর কারণ কী। উনাকে স্যার বলে ডাকায় অন্যরা যতই কৌতূহলী হোক না কেন, আমার কিন্তু দারুণ লেগেছিল। স্যারকে নিজের পরিচয় দিই। স্যার অনেক খুশি হন। প্রিয় স‌্যারকে অনেকদিন পর কাছে পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলাম আমিও। সেদিনও স্যার আমাকে অনেক পরামর্শ দেন।

নিয়তির ফেরে শাকিরুল স্যার হয়ত এখন অনেকের কাছে শুধুই একজন সাধারণ কৃষক। কিন্তু আমার কাছে তিনি একজন মহান মানুষ, আমার শ্রদ্ধাভাজন, আমার প্রিয় শিক্ষক। সবসময় স্যারের মঙ্গল কামনা করি।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

(zahanurislam122@gmail.com)

 

ঢাবি/জাহানুর ইসলাম/হাকিম মাহি


   



আজকের সর্বশেষ সংবাদ সমূহঃ

ইউপি সদস্যসহ তিনজনের কারাদণ্ড

২০১৯-১০-১৭ ৭:৩৯:০৩ পিএম